সরকারের প্রথম বছর একটি পর্যালোচনা

নূহ-উল আলম লেনিন
দিনবদলের কর্মসূচি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। অতিক্রান্ত বছরটি ছিল মহাজোট তথা আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। মাত্র এই এক বছরের কর্মকাণ্ড দিয়ে শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের সাফল্য ব্যর্থতার পরিমাপ করা দুরুহ এবং তা’ সঙ্গতও নয়। তবু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি এবং তার সরকারের প্রাথমিক সাফল্য সম্পর্কে সাধারণভাবে কিছু তথ্য এখানে উল্লেখ করছি।

* বিশ্ব অর্থনীতির ভয়াবহ মন্দা, বিএনপি-জামাত জোট সরকারের দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি, দলীয়করণ, প্রতিষ্ঠান ধ্বংস এবং আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, চরম দারিদ্র্য, সুশাসনের অনুপস্থিতি এবং নিরাপত্তাহীনতা প্রভৃতি কারণে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছিলো। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে অর্থনীতিতে নেমে এসেছিলো স্থবিরতা। অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে কলঙ্কিত হয়েছিলো বাঙলাদেশ। এই পটভূমিতে বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হয়।

* ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘‘দিনবদলের কর্মসূচি”র প্রতি দেশবাসী নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট প্রদান করে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট জাতীয় সংসদের তিন চতুর্থাংশ আসনে জয়লাভ করে। দেশবাসীর মনে সৃষ্টি হয় বিপুল প্রত্যাশা। এই জনপ্রত্যাশা পূরণের অঙ্গীকার নিয়েই ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনার সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে। স্বভাবতই সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত অঙ্গীকার মোতাবেক ৫টি অগ্রাধিকারের বিষয়ে মনোযোগ দেয়। দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আসা, মন্দা মোকাবিলা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা মোকাবিলা, দারিদ্র্য নিরসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছিল বিদ্যমান সংকট উত্তরণে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়।

* কিন্তু সরকার সংকট উত্তরণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে না করতেই মাত্র ৪৯ দিনের মাথায় ২৫ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত হয় বিডিআর বিদ্রোহ। স্পষ্টতই সরকারকে অস্থিতিশীল করা এবং ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যেই এই রক্তাক্ত বিদ্রোহ উস্কে তোলা হয়। জননেত্রী শেখ হাসিনা অসীম ধৈর্য্য, সাহস ও প্রজ্ঞার সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে এই বিদ্রোহ দমনের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

* এর পরপরই ২০০৯ সালের ২৫ মে দক্ষিণ-বঙ্গের উপকূলবর্তী জেলাগুলোয় সংঘটিত হয় ঘূর্ণিঝড়- জলোচ্ছ্বাস ‘আইলা’। এতে শত শত মানুষের প্রাণহানি ছাড়াও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে ফসল, ঘরবাড়ি, গবাদি পশু, মৎস্য সম্পদ এবং খাদ্য ও পানীয় জলের বিপুল ক্ষতি সাধিত হয়। এই বিপুল প্রাকৃতিক বিপর্যয়কেও সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করে। আইলার ধ্বংসযজ্ঞ থেকে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি গ্রহণ করা হয় ব্যাপক পুনর্বাসন কর্মসূচি।

* এক বছরের অভিজ্ঞতায় নিঃসন্দেহে বলা যায়, বিশ্বমন্দার অভিঘাত এবং উল্লিখিত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাঙলাদেশের অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব গতি সঞ্চারিত হয়েছে। মন্দা মোকাবিলায় সরকার একিট টাস্কফোর্স গঠন করে এবং ২০০৮-২০০৯ এবং ২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে সর্বমোট ৮৪৭০ কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। মন্দা সত্ত্বেও রেমিটেন্সের হার ২২.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় (রিজার্ভ) অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ এক হাজার কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মন্দা সত্ত্বেও ২০০৮-২০০৯ অর্থ বছরে রপ্তানির পরিমাণ পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১০.৩১ শতাংশ বেড়েছে।

* সরকার দেশবাসীকে দুঃসহ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থেকে রেহাই দিতে চাল, আটা, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কেবল রোধই করেনি, চালের দাম ৪০/৪২ থেকে প্রকারভেদে ১৮-২০/২২ টাকায় এবং আটার দাম ৬০/৬৫ টাকা থেকে ১৮/২০ টাকায় কমিয়ে এনেছে। খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্য দ্রব্যমূল্যও জনগণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। বাজেটের পর ঈদের সময়েও জোট সরকারের আমলের মতো দ্রব্যমূল্য বাড়েনি। মুদ্রাস্ফীতির হার অতীতের ১০.৮২ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এছাড়া দ্রব্যমূল্য যাতে স্থিতিশীল থাকে সে লক্ষ্যে সংসদে ‘‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯’’ প্রণয়ন এবং টিসিবির মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্য আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

* নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মোতাবেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ভাতা সর্বনিম্ন ৫৬ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ’৭৩ শতাংশ পর্যন্ত অর্থাৎ গড়ে ৬২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও ক্রয় ক্ষমতা বাড়লেও, মুদ্রাস্ফীতি বা দ্রব্যমূল্য যে বাড়বে না তা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে।

* নির্বাচনী অঙ্গীকার মোতাবেক শেখ হাসিনার সরকার ইতিমধ্যে দুইবার সারের দাম কমিয়েছে। ভর্তুকি মূল্যে প্রয়োজনীয় সার, বীজ, ডিজেল, সেচ যন্ত্রপাতি এবং বিদ্যুৎসহ কৃষি উপকরণ সময়মতো কৃষক ভাইদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। দেওয়া হয়েছে পর্যাপ্ত কৃষি ঋণ। দেশের উত্তরাঞ্চলের বোরো মৌসুমে সেচের জন্য বিনা মূল্যে ১০০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। গত এক বছরে বরেন্দ্র অঞ্চলে দেড় হাজার গভীর নলকূপ স্থাপনসহ সারাদেশে সেচ সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করে অতিরিক্ত ৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিদানে আমাদের কৃষক ভাইয়েরাও দুই মৌসুমে অর্থাৎ বোরো ও আমন ধানের বাম্পার ফলন জাতিকে উপহার দিয়েছে। কৃষি উৎপাদনে স্থবিরতা কেটে গেছে। কৃষির আধুনিকায়ন, গবেষণা, উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনে বিশেষ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে নেয়া হয়েছে বহুমুখী পদক্ষেপ। তাই খাদ্যে প্রত্যাশিত আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

* দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনার উদ্বেগ এবং তাদের কল্যাণে নানা সৃজনশীল উদ্যোগ সর্বজনবিদিত। ইতোমধ্যে তিনি হত-দরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি গড়ে তোলার জন্য গ্রহণ করেছেন বহুমুখী পদক্ষেপ। ভিজিএফ, ভিজিডি, টিআর, কাবিখা ও হতদরিদ্রদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ প্রায় ২৮ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বিতরণ করা হয়েছে। দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে দেশকে বের করা আনা বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়। লক্ষণীয় যে, গত এক বছরে দেশের কোথাও না খেতে পেয়ে কেউ মারা যায়নি বা ‘‘মঙ্গা” শব্দটি শোনা যায়নি। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র নতুন করে প্রণয়ন করা হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা সংবলিত বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও তাতে বর্ধিত হারে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

* বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমস্যা সমাধান সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু তা সত্ত্বেও সরকারের গৃহীত বিভিন্নমুখী পদক্ষেপের কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন বেশ কিছুটা বেড়েছে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও লোড ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থার কারণে লোডশেডিং ক্রমে সহনীয় মাত্রায় নেমে আসছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যেই ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা যাতে অর্জিত হয় সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকার দায়িত্বভার গ্রহণের সময়ের তুলনায় ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বেড়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ১ কোটি বাল্ব বিনামূল্যে বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন গ্যাস কূপ খননের ফলে গ্যাস উৎপাদনও আড়াইশ মিলিয়ন ঘনফুট বেড়েছে। আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে আরও প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে। নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিস্কার ও উৎপাদনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

* বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট পেশের পর ছয় মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে প্রথম চার মাসের বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করেছে। এই রিভ্যিউতে প্রথম চার মাসের বাস্তবায়ন সূচক অত্যন্ত সন্তোষজনকভাবে বলে প্রতিভাত হয়েছে। এডিপি-র লক্ষ্যমাত্রা অর্জন যেমন আশাপ্রদ হয়েছে, তেমনি আমদানি না বাড়লেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও চমকপ্রদ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। গত অর্থ বছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ের হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হয়েছে। এক কথায় সামষ্টিক অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারিত হয়েছে এবং দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে গত অর্থ বছরের তুলনায় বিনিয়োগের পরিমাণ ১০ শতাংশ বেড়েছে।

* শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন নীতিমালা প্রণয়ন ও তা’ বাস্তবায়নের বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিটি পরিবারের একজন শিক্ষিত (এসএসসি ও এইচএসসি) পাশকে চাকরি দেওয়ার লক্ষ্যে ন্যাশনাল সার্ভিস প্রকল্পের কাজ অচিরেই শুরু হচ্ছে। সরকারের অন্যান্য খাতেও হাজার হাজার তরুণ-তরুণীকে কর্মসংস্থান ও নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।

* স্বাস্থ্য খাতে নতুন চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ ছাড়াও ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি, চিকিৎসাসেবার মান বৃদ্ধি ও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। নতুন স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করছে।

* ইতোমধ্যে শিক্ষাঙ্গনে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরে এসেছে। প্রণয়ন করা হয়েছে গণমুখী নতুন শিক্ষানীতি। বইয়ের গুদামে অগ্নিসংযোগ করে সাবোটাজ ও ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে ১৯ কোটি বই পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করেছে সরকার। ইতোমধ্যে ৮০ শতাংশ বই বিনামূল্যে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে প্রায় ২০ লাখ প্রাথমিক শিক্ষার্থীর পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠান একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এছাড়া ২০১০ সালের মধ্যে ১০০ শতাংশ শিশুর স্কুলে যাওয়া নিশ্চিত করা এবং ২০১৪ সালের মধ্যে নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয়েছে বহুমুখী কার্যকর পদক্ষেপ। প্রতিটি উপজেলায় একটি করে সরকারি হাইস্কুল স্থাপন, দেশে ব্যাপক সংখ্যক কারিগরী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

* জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা এবং এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহায়তা আদায়ে সরকার বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্পর্কিত বিশ্ব সম্মেলনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর নেতা হিসেবে দরিদ্র দেশগুলোর- বিশেষত বাংলাদেশের স্বার্থ সমুন্নত রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন।

* সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা-২০০৯ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে প্রশাসনে ই-গর্ভনেন্স, ই-ব্যাংকিং, ই-কমার্সসহ বিভিন্ন খাতে ত্যথপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সেবার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাবরেটরি স্থাপন শুরু হয়েছে।

* সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে জনপ্রশাসন সংস্কারের পদক্ষেপের পাশাপাশি ‘তথ্য অধিকার আইন’ সংসদে পাশ করা হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে অর্থবহ ও সংহত করা এবং নির্বাচন কমিশনসহ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার জন্যও প্রয়োজনীয় আইনি ও লিগ্যাল ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

* দেশের উন্নয়নের পথে অন্যতম প্রধান বাধা দুর্নীতির মূলোৎপাটনে আওয়ামী লীগ সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। নির্বাচনী ইশতেহারেও এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। ইতোমধ্যে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনকে পুনগর্ঠন করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ়ভাবে মনে করেন ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অতীতে যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদের যথেচ্ছ লুটপাট করেছে, বিদেশে অর্থ পাচার করেছে এবং অনোপার্জিত পথে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইনসঙ্গত অভিযান জোরদার করা হবে। দুর্নীতিবাজদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারলেই কেবল বর্তমান ও ভবিষ্যতে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা সহজ হবে। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনার জন্যও সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফলে দীর্ঘদিন পর বর্তমান সরকারের প্রথম বছরেই বাংলাদেশ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বিচারে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকা থেকে অর্থাৎ দুর্নীতিতে উপর্যপরি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য শ্লাঘার বিষয়।

* মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির বয়সসীমা ২ বছর বাড়িয়ে ৫৯ বছর করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও গৌরব পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

* প্রতিরক্ষা বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী), সীমান্ত রক্ষী বাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও আনসারসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কল্যাণে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিডিআর বিদ্রোহে নিহতদের পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও বিডিআর বিদ্রোহের ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা বাহিনীর মর্যাদা, শক্তি-সামর্থ্য ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, পুলিশ বাহিনীর সংস্কার ও আধুনিকায়নের জন্যও গ্রহণ করা হয়েছে বহুবিধ পদক্ষেপ।

* আপিল বিভাগে প্রয়োজনীয় সংখ্যাক বিচারক নিয়োগের পর বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত বিচার সম্পন্ন হয়েছে। দেশবাসী এখন গভীর আগ্রহে বিচারের রায় কার্যকর হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। এই রায়ের ভেতর দিয়ে জাতি যেমন কলঙ্কমুক্ত হয়েছে তেমনি আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে শেখ হাসিনার উদ্যোগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সর্বসম্মত প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করা হয়েছে কঠোর অবস্থান। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পুনর্তদন্ত শুরু হয়েছে এবং অন্যান্য জঙ্গি হামলারও বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। মানবাধিকার সংরক্ষণে ‘‘মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯” প্রণয়ন এবং স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হয়েছে।

* জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সব কয়টি স্থায়ী কমিটি গঠন করে সংসদীয় ইতিহাসে অনন্য নজির স্থাপন করা হয়েছে। শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে উপজেলা পরিষদ আইন-২০০৯ এবং ইউনিয়ন পরিষদ আইন ২০০৯ প্রণীত হয়েছে। সংসদে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সকল বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অন্য কোনো জনস্বার্থ বিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পেলেই সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিগুলো অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্তের ব্যবস্থা করছে। সরকারের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। এ ধরনের আরও অনেক নজির তুলে ধরা যেতে পারে। কিন্তু সংবাদপত্রের সীমিত পরিসরে সরকারের এক বছরের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয়।

* প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান, দ্বি-পাক্ষিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার উন্নয়ন, মুসলিম উম্মাহ এবং উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে জাতীয় স্বার্থে আরও ফলপ্রসূ করার জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনা যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তা প্রশংসিত হয়েছে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্যের ধারাকে আরও জোরদার করতে তার প্রয়াস লক্ষণীয়।

* একথা সত্য সরকারের কাছে জনপ্রত্যাশা অপরিসীম। কিন্তু এক বছরে তা পূর্ণ করা সম্ভব নয়। মাত্র এক বছরের কর্মকাণ্ড দিয়ে সরকারের সাফল্য ব্যর্থতার মূল্যায়ন করাও সঙ্গত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধতা আছে, ভুল-ত্রুটিও হতে পারে। তবে দিনবদলের যে অঙ্গীকার নিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে সে অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ-এ ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। বিরোধী বিএনপি-জামাত জোট বর্তমান সরকারের কল্পিত ‘ব্যর্থতা’ নিয়ে যত চিৎকার, চেচামেচিই করুক না কেন জনগণ এতে বিভ্রান্ত হয়নি। আওয়ামী লীগের বড় সাফল্য তারা গত এক বছরে দেশে একটা সহিষ্ণু ও স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। বিএনপি-জামাত জোট চেষ্টা করেও জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামাতে পারেনি। একটি নির্বাচিত সরকারকে নানা ষড়যন্ত্র, অন্তর্ঘাত মোকাবিলা করতে হলেও সরকার বিরোধী কোনো হরতাল বা বড় ধরনের গণ-প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কবলে পড়তে হয়নি। আসলে জনগণ যেমন অতীতের বিএনপি-জামাত জোট সরকারের দুঃশাসনের দুঃসহ স্মৃতি এখনো ভুলতে পারেনি, তেমনি বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেও বড় ধরনের কোন অভিযোগ বা ক্ষোভও তাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়নি।

তবে এতে আত্মপ্রসাদ লাভের কোনো সুযোগ নেই। মহাজোট সরকার তার প্রথম বছরের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হয়েছে বটে, কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে আগামী বছরটিতে। মধুচিন্দ্রমা শেষ। এবার মানুষ নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী দেশের প্রকৃত উন্নয়ন দেখতে চাইবে। দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে অবিচল থেকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার প্রকৃতই দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণ এবং দিনবদল করতে সক্ষম হবে।

[ad#co-1]