সৈয়দ শামসুল হক ও রাবেয়া খাতুনের জন্মদিন উদযাপিত

রোববার ছিল দেশের বরেণ্য দুই সাহিত্যিক সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক ও কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের ৭৫তম জন্মবার্ষিকী। বাংলা একাডেমী এ উপলক্ষে এক সংবর্ধনা সভার আয়োজন করে। সংবর্ধনার এক ফাঁকে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের দুই দিকপাল
বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত হলো সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক ও কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের ৭৫তম জন্মদিন। বরেণ্য এ দুই গুণী লেখক একই দিনে জন্মগ্রহণ করেছেন। রোববার বিকাল ৪টায় দুই গুণী লেখকের ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষে বাংলা একাডেমীর পক্ষ থেকে একাডেমীর সেমিনার কক্ষে এক সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে সর্বস্তরের কবি, লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সুশীল সমাজের মানুষের অন্যরকম এক মিলনমেলা জমে ওঠে।

৭৫তম জন্মজয়ন্তীতে সর্বস্তরের মানুষের অবাধ ভালোবাসার জবাবে অভিভূত সৈয়দ শামসুল হক বলেন, আজ দিনের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিলাম। কোনো লেখকের জীবদ্দশায় বাংলা একাডেমীর মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সংবর্ধনা দেয়া খুবই কঠিন। এ সংবর্ধনা পেয়ে আমি সম্মানিত বোধ করছি। যদিও মৃত্যু-পরবর্তী সংবর্ধনারও মূল্য আছে। তবুও জীবদ্দশায় সংবর্ধিত করার মূল্য অনেক বেশি। জীবদ্দশায় কবি শামসুর রাহমানের ৫০তম জন্মদিন পালনের মধ্যে দিয়ে এ প্রথা প্রথম বাংলা একাডেমীতে আমি চালু করেছিলাম। আশা করি ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে। সৈয়দ শামসুল হক রাবেয়া খাতুনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তিনি আমার সমবয়সী হলেও ‘আপা’ সম্বোধন করি সবসময়।

লেখকজীবনের স্মৃতিচারণ করে সৈয়দ হক বলেন, ১৯৭৫ সালে মুনীর চৌধুরীর অনুপ্রেরণাতে নাটক লিখেছি। ’৪৮ সালের মার্চ মাসে বাবা ৫ টাকার ঘরভাড়ায় একা ঢাকায় রেখে চলে গেলেন। সেই থেকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, মুনীর চৌধুরী আমাকে পদে পদে সাহায্য করেছেন। তা না হলে আজকের ‘আমি’ হতাম না। আমিও অগ্রজদের পথ অনুসরণ করে অনেক নবীন লেখককে সহযোগিতা করে ঋণ শোধরানোর চেষ্টা করেছি। তিনি বলেন, আমরা ’৫২-এর ভাষাসন্তান। তখন মধ্যযুগীয় অবস্থা চলছিল। জঙ্গল কেটে মাটি কুপিয়ে এখানে আমরা ভাষার বীজ বপন করেছি। ’৫০-এর দশকে লেখালেখির ক্ষেত্র তৈরি করেছি। তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম বাংলা মাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। ’৫২-তে লেখালেখি যখন শুরু করি তখন থেকে আজ পর্যন্ত কবিতায় কখনো ইউরোপীয় মিথ ব্যবহার করিনি। তিনি বলেন, এখন সব ঈর্ষাকাতরতা ভুলে মুক্ত হওয়ার সময় এসেছে। বাংলা একাডেমীর এ সংবর্ধনায় তারই শুভ সূচনা হলো।

সংবর্ধনার জবাবে রাবেয়া খাতুন বলেন, পুরুষ লেখক ও নারী লেখকের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা ও সংগ্রামের ভিন্নতা থাকে। একজন নারী লেখককে অনেক বেশি সংগ্রাম করতে হয়। সব ঠিক রেখে নারী লেখকের লেখালেখি করা কতোটা সংগ্রামের তা বলা সম্ভব নয়। বাংলা একাডেমীর এ সংবর্ধনা আমার বিগত জীবনের দুঃখ ও কান্নার সান্ত¡না।

অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। আলোচনা করেন বাংলা একাডেমীর ফেলো কবি আসাদ চৌধুরী, কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন এবং শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমীর ফেলো কবি জাহিদুল হক। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমীর সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী।

স্বাগত ভাষণে শামসুজ্জামান খান বলেন, শিল্প-সাহিত্যে এতো আনন্দ, সুখ আর উচ্ছ্বাসের মিলনমেলা বোধহয় আর আসেনি। আমাদের সাহিত্য ক্ষেত্রে দুই বরেণ্য লেখকের গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনি ও রচনার মাধুর্য সাম্প্রতিক সাহিত্যে আর দেখা যায় না। দুজনের লেখাতেই মানবিক বোধের তীব্রতা, সৌন্দর্যবোধ ও নান্দনিক চেতনা ফুটে উঠেছে। নিরলসভাবে এ দুই সাধক আমাদের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। বাংলা সাহিত্যে তারা নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। আজ বাংলা একাডেমী তাদের গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।

কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, আমার মনে হয় একজন নয়, কমপক্ষে দশজন সৈয়দ হক লেখালেখি করেন। কেউ উপন্যাস, কেউ কবিতা, কেউ নাটক, কেউবা গান, কেউবা সিনেমায় চিত্রনাট্য রচনা করেন। আবার কেউবা সংবাদও পাঠ করেছেন। তিনি বলেন, দুজনই আমার প্রিয় লেখক। দুজনের লেখার কোনোই তুলনা নেই। বিশেষ করে হক ভাইয়ের সাহিত্যের বিশ্লেষণ তুলে ধরার যোগ্যতা আমার নেই বলে মনে করি।

কবি আসাদ চৌধুরী বলেন, রাবেয়া খাতুনের বড় কৃতিত্ব হচ্ছে তিনি তার সাহিত্যে পাঠককে অতীতের কথা মনে করিয়ে দেন। সাহিত্যে তিনি নিজে রক্তাক্ত হন; কিন্তু পাঠককে ঘাম ঝরাতে দেন না। তার সাহিত্য সত্যকে উপলব্ধি করতে শেখায়।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে কবি জাহিদুল হক বলেন, দুজন একই দিনে পৃথিবীতে এসেছেন। তাদের দুজনের বয়স মিলে হয় দেড়শ বছর। দুজনের পুস্তকও ২৬০টি। আমি ধন্য যে, দুজনকেই দেখেছি। এতো প্রতিকূলতা পেরিয়েও আমাদের সাহিত্য আজ এ পর্যায়ে এসেছে। এ দুই গুণী লেখক সাহিত্যে যে মাত্রা যোগ করেছেন তাতে আমি অভিভূত।
সংবর্ধনায় দুই লেখককে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাকিল আহমেদ ও প্রটোকল অফিসার প্রলয়কুমার জোয়ারদার। আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ওবায়দুল কাদের এবং সহপ্রচার সম্পাদক নাইম নোমান, দৈনিক সমকাল পরিবার, এম আর মঞ্জু সাংস্কৃতিক সোসাইটি, শিক্ষাবিদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদ, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, বাঙালি সংস্কৃতি কেন্দ্র, জাতীয় গীতিকবি পরিষদ প্রমুখ তাদের শুভেচ্ছা জানান। বিভিন্ন ব্যক্তি এবং সংগঠনের পক্ষ থেকে উপহার পাওয়া ফুলে ফুলে ভরে যায় একাডেমীর সেমিনার কক্ষ।

সভাপতির ভাষণে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী বলেন, এ দুই বরেণ্য লেখককে জীবদ্দশায় সংবর্ধিত করতে পেরে বাংলা একাডেমী সম্মানিত বোধ করছে। এ সংবর্ধনা তাদের সৃষ্টিশীলতায় এগিয়ে যেতে আরো বেশি অনুপ্রাণিত করবে।

অনুষ্ঠানে কবি সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা আবৃত্তি করেন আবৃত্তিশিল্পী শাহাদাত হোসেন নিপু এবং রাবেয়া খাতুনের রচনা থেকে পাঠ করেন আবৃত্তিশিল্পী কেয়া চৌধুরী। অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন মিতা হক এবং নজরুলসঙ্গীত পরিবেশন করেন খায়রুল আনাম শাকিল।

বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব : এদিকে বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব শাহবাগ বিসিএস একাডেমি মিলনায়তনে সন্ধ্যা ৭টায় সৈয়দ শামসুল হকের ৭৫তম জন্মজয়ন্তীতে এক সংবর্ধনা সভার আয়োজন করে। হলজুড়ে প্রদীপ প্রজ্বলন ও ফুলের পাঁপড়ি ছিটিয়ে ৭৫তম জন্মজয়ন্তী পালন করা হয়। এতে আলোচনায় অংশ নেন ড. সলিমুল্লাহ খান, ড. রফিকউল্লাহ খান, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ড. কবি মাহবুব হাসান, কবি কাজী রোজী, অসীম সাহা প্রমুখ। সম্মাননাপত্র পাঠ করেন কবি আসাদ মান্নান, শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন কবি মোহন রায়হান, মারুফ রায়হান, আবু হাসান শাহরিয়ার প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেন রাইটার্স ক্লাবের সভাপতি কবি মুহাম্মদ নরুল হুদা।

মধুমতির প্রকাশনা অনুষ্ঠান : সন্ধ্যা ৭টায় হোটেল শেরাটনের উইন্টার গার্ডেনে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী অনূদিত রাবেয়া খাতুনের বিখ্যাত উপন্যাস ‘মধুমতি’র প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

নাগরিক সংবর্ধনা : ২৯ ডিসেম্বর বিকাল ৫টায় বাংলা একাডেমীর নজরুল মঞ্চে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষে নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে।

[ad#co-1]