রাবেয়া খাতুন পঁচাত্তরেও সচল আধুনিকতা অভিমুখী কথাসাহিত্যিক

আহমাদ মাযহার
বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে আধুনিকতার যাত্রা চল্লিশের দশকে শুরু হলেও পঞ্চাশে গিয়ে পেয়েছিল স্পষ্টরূপ! একঝাঁক লেখকের কলমের সচলতা বাংলাদেশের উপন্যাসকে সমৃদ্ধ করে তুলছিল। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের জীবনচেতনা এর আগের বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিকতাকে বহন করলেও কৃষিনির্ভর মুসলমানপ্রধান গ্রামসমাজের জীবনাভিজ্ঞতার প্রভাবে একটা স্বাতন্ত্র্য অর্জন করতে শুরু করে বিশ শতকের চল্লিশের দশকে। আধুনিকতা অভিমুখী চল্লিশের সেই লেখকদের আগে বাংলাসাহিত্যে মুসলিম সমাজের কণ্ঠস্বর শোনা যেত কমই। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দীন, সত্যেন সেন, শামসুদ্দীন আবুল কালাম তো সক্রিয় ছিলেনই এর সঙ্গে পরবর্তীকালে যুক্ত হলেন সরদার জয়েনউদ্দীন, আবু ইসহাক, রাজিয়া খান, আলাউদ্দীন আল আজাদ, শহীদুল্লাহ কায়সার, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, জহির রায়হান, শওকত আলী, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ। তাঁদের কলম সচল হতে শুরু করলে ক্রমশ মুসলিম সমাজের প্রতিফলন ঘটতে শুরু করে বাংলাভাষার কথাসাহিত্যে। এঁরা কেবল স্বসমাজের কণ্ঠস্বরই শোনান নি, বাংলাদেশের সাহিত্যে নাগরিক আধুনিকতারও সূচনা করেছিলেন। রাবেয়া খাতুন পঞ্চাশের দশকের সেই আধুনিক ধারারই একজন সচল যাত্রী। তিনি বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের এইসব গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের কেবল সহযাত্রীই নন, সৃষ্টিশীলতার ধারাবাহিকতায় সমসাময়িক অনেকের চেয়ে অগ্রসরও। তাঁর সমকালের যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁদের কারও কারও সাহিত্যিক সৃষ্টিশীলতায় ছেদ পড়েছে, অনেকেই একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন। কিন্তু পঁচাত্তর বছরে পা দিয়েও রাবেয়া খাতুনকে দেখা যাচ্ছে তিনি ধারাবাহিকভাবে অবিরল। সংখ্যাপ্রাচুর্যে তাঁর সৃষ্টিভাণ্ডার যতটা সমৃদ্ধ ততটাই বৈচিত্র্যমণ্ডিত!

রাবেয়া খাতুন উপন্যাস লিখেছেন পঞ্চাশটিরও বেশি, এ যাবৎকাল পর্যন্ত চারখণ্ডে সংকলিত ছোটগল্প সংখ্যায় চারশোরও বেশি। ছোটদের জন্য লেখা গল্প-উপন্যাসও সংখ্যায় কম নয়, আবার যদি রাবেয়া খাতুনকে বাংলাদেশের ভ্রমণসাহিত্যের প্রধানতম লেখকও বলা হয় তাহলে হয়ত বেশি বলা হবে না। জরা তাঁকে জড় করতে পারেনি। ভ্রমণের ক্লেশ তাঁর কাছে প্রত্যক্ষাভিজ্ঞতার আনন্দ! কর্মজীবনে অনেক মানুষের সান্নিধ্যে এসেছেন। উদ্বুদ্ধ হয়েছেন যাঁদের দ্বারা স্মৃতিমূলক রচনার মধ্য দিয়ে তাঁদের ব্যক্তিত্ব ও বৈচিত্র্যময় ব্যক্তিতাকে পাঠকের কাছে হাজির করেছেন গভীর মমতায়, আন্তরিক শ্রদ্ধায় ও মুক্ত প্রাণের উচ্ছ্বাসে!

ছোটগল্প দিয়ে শুরু হলেও প্রথম লেখক পরিচয়ে তিনি ঔপন্যাসিক। প্রথম উপন্যাস মধুমতী (১৯৬৩) প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই শক্তিমান কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি পান। সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির টানাপোড়েনে সংকটগ্রস্ত মানুষ উপন্যাসের কাক্সিক্ষত। ক্ষয়িষ্ণু তাঁতি সম্প্রদায়ের জীবনসংকট ও নাগরিক উঠতি মধ্যবিত্ত জীবনের অস্তিত্ব জিজ্ঞাসার মধ্যে ব্যক্তিকে আবিষ্কার করেছিলেন রাবেয়া খাতুন এই উপন্যাসে। যে সময় কথাসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু সে-সময় ঢাকা শহর এত বড় হয়নি, জনজীবন ছিল আধুনিকতা ও গ্রামীণতার সন্ধিক্ষণে। যদি সার্বিক অর্থে তাঁর উপন্যাসের জগৎকে চিনে নিতে চাই তাহলে আমরা দেখব যে, ঢাকা কেন্দ্রিক ঘটমান মধ্যবিত্ত সমাজের সঙ্গে তিনি গ্রামজীবনের ক্রমশ শিথিল হয়ে আসা সম্বন্ধকে ধরে রেখেছেন উপন্যাস ও ছোটগল্পের আধারে। রাবেয়া খাতুন যে সময়ের লেখক সে-সময় কাঠামোগত দিক থেকে ঢাকা খানিকটা নগরের আদল পেলেও গাঢ় হয়ে ওঠে নি তাঁর যথার্থ নাগরিক জীবন। তবে নাগরিকতার অনুষঙ্গসমূহের আগমনে এখানকার জীবনযাত্রার সঙ্গে গ্রামের জীবনযাত্রায় পার্থক্য সূচিত হয়ে গিয়েছিল। ঢাকার এই ঘটমান সমাজমানসে ক্রিয়াশীল চেতনা-প্রবাহের অন্তরঙ্গ চিত্রায়নে তাঁর উপন্যাস ও গল্প বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে। পঞ্চাশের দশকের যে ঢাকা শহরকে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন তার গায়ে ছিল পুরনো আমলের ছাপমারা! রাজাবাগ (১৯৬৭), বায়ান্ন গলির এক গলি (১৯৮৪), কিংবা সাহেব বাজার (১৯৬৯) প্রভৃতি উপন্যাসে ঢাকার সেই স্বাতন্ত্র্যকে রাবেয়া খাতুন স্বচ্ছভাবে তুলে আনতে পেরেছিলেন। সেই পুরনো ঢাকার সামাজিক আবহে ব্যক্তির সংকট যা নিস্তরঙ্গ গ্রামজীবনের মধ্যে খানিকটা তরঙ্গ তুলছিল তার ছবি তিনি এঁকেছেন উপন্যাসে। ষাটের দশকে আইয়ুবী শাসনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক পুঁজির প্রভাবে ঢাকার জনজীবনে চাঞ্চল্য আসে। ষাটের দশকের উত্তাল রাজনীতির গা লাগিয়ে আসে মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ তাঁর কথাসাহিত্যিক সত্তাকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করে। বারবার তাঁর গল্প-উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ ও তার চেতনা প্রাণ পায়। তাঁর লেখা অবরুদ্ধ নয় মাসের দিনলিপি হয়ে ওঠে যুগপৎ সহৃদয়হৃদয়সংবেদ্য সাহিত্য ও যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শব্দটি সাম্প্রতিক ভাবকল্প। বিশ শতকের চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকের বাঙালি মুসলমান সমাজকে আত্মপ্রতিষ্ঠার যে আকাক্সক্ষা উজ্জীবিত করেছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অপরিসীম শোষণ ও স্বেচ্ছাচারের কারণে তার পতন থেকেই ঘটেছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের বিস্ফার। গণতন্ত্রের প্রত্যাশায়, অধিকার অর্জনের আকাক্সক্ষায় ক্রম গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে উপনীত হয়েছিলাম আমরা। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পেয়েছিলাম বাংলাদেশ রাষ্ট্র। কিন্তু যে ধর্মকেন্দ্রিক চেতনা পাকিস্তানকে ধ্বংস করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করেছিল তা নানা ছদ্মবেশে রয়েই গেল। স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখনো চলছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কথাটির মধ্য দিয়ে এই ভাবকল্পের কথাই বলা হয়ে থাকে। রাবেয়া খাতুন এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত একজন লেখক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর কথাসাহিত্যে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। তাই প্রথম বধ্যভূমি (২০০৪) উপন্যাস লেখেন ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে, ফেরারী সূর্য (১৯৭৫), ঘাতক রাত্রি (১৯৯৯), হিরণ দাহ (১৯৯৫), বাগানের নাম মালনিছড়া (১৯৯৫), হানিফের ঘোড়া (১৯৯৫) লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের শ্বাসরুদ্ধকর দিনগুলো নিয়ে। যুদ্ধকালে ব্যক্তিবিপর্যয়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আঁচ পাওয়া যায় এই উপন্যাসগুলোতে। এখানেও মূলত মধ্যবিত্ত জীবনেরই রূপকার তিনি।

ক্ষীয়মাণ গ্রামীণ তাঁতি সম্প্রদায়ের বেদনা নিয়ে মধুমতী (১৯৬৩) নামে যে উপন্যাসটি তিনি লিখেছিলেন তাকে ঠিক বিশুদ্ধ গ্রামীণ উপন্যাস বলা যায় না। এখানে উঠতি মধ্যবিত্ত মানের রোমান্টিক চেতনাও একই সঙ্গে ক্রিয়াশীল ছিল। তুলনায় বরং পল্লীজীবনের কথা তিনি বলেছেন ই ভরা বাদর মাহ ভাদর (১৯৮৮) উপন্যাসে। সরল গ্রামজীবনকেও তিনি গভীরভাবে জানেন তার পরিচয় এই উপন্যাসটিতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সাহিত্যের ভাষাভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য এর আঞ্চলিক শব্দানুষঙ্গে। আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহারে উপন্যাসটি গভীর একটা ব্যঞ্জনা লাভ করেছে।

রাবেয়া খাতুনের তরুণ বয়সে, সাহিত্য যাত্রার প্রথম পর্বে, ধর্মীয় গোঁড়ামিকে ভেদ করে বাঙালি মুসলমান সমাজজীবনে চলচ্চিত্রের মতো বর্ণালি শিল্পমাধ্যম যাত্রা শুরু করেছিল যা হয়ত ঘটনার বিশ বছর আগেই কল্পনা করাও ছিল প্রায় অসম্ভব। তাঁর স্বামী প্রয়াত ফজলুল হক নিজে ছিলেন চলচ্চিত্রকার। তাছাড়া চলচ্চিত্রকার হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘সিনেমা’ নামে চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা। বাংলাদেশে সিনেমাপত্রিকারও তিনিই ছিলেন পথিকৃৎ। খানিকটা সেই সূত্রে এবং নিজের লেখা উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ লাভের সূত্রে রাবেয়া খাতুনকে চলচ্চিত্র জগতেরও মানুষ বলা যায়। এই জগতের মানুষদের জীবন সম্পর্কে ঘনিষ্ঠভাবে জেনেছেন। ফলে তিনি লিখে ফেলতে পেরেছেন এই জগতের মানুষের ব্যক্তিসংকট নিয়ে রঙিন কাচের জানালা (২০০১) বা কখনও মেঘ কখনও বৃষ্টি (২০০৪) উপন্যাস। তবে প্রকৃতপক্ষে রূপালি পর্দার জীবনের অন্তরালে মধ্যবিত্ত জীবনের ব্যক্তিকেই উন্মোচন করেছেন তিনি এবং ঔপন্যাসিক হিসেবে প্রকাশ করেন নিজের জীবন-উপলব্ধিকে।

ছোটগল্পকার হিসেবেও তিনি একইভাবে বিচিত্র পথেরই যাত্রিক। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি লিখছেন। সংখ্যায় প্রচুর গল্পের লেখক বলে হয়ত তার ছোটগল্পগুলোকে সানুকম্প বিচার করে দেখা হয় নি। যথার্থ নান্দনিক মাত্রা বিচারের মাধ্যমে বাছাই করে গল্পগুলোর সংকলন প্রস্তুত করা হলে হয়ত আরো শক্তিমান গল্পকারকে শনাক্ত করতে পারব আমরা। আবারও খেদের সঙ্গে বলতে হয় যে, বাংলাদেশের সমালোচনা সাহিত্যের দীনতার কারণে রাবেয়া খাতুনদের মতো লেখকদের সৃষ্টিশীলতার গতিপ্রকৃতিকে অনুসরণ করে দেখা হয়নি।

রাবেয়া খাতুন ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। শুধু ভালোই বাসেন না। ভালোবাসেন সেই ভ্রমণের আনন্দ ও উপলব্ধিকে পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে। সে কারণে প্রচুর ভ্রমণকাহিনীর তিনি লেখক। যে সমাজে তিনি জন্মেছেন সেই বাঙালি মুসলমান সমাজ চিরকালই ছিল গৃহকোণবাসী। হিন্দু সমাজে যেমন নিকটদূরের তীর্থযাত্রার প্রচলন আছে মুসলমান সমাজে তা নেই। ফলে ভ্রমণরচনার অনুপ্রেরণা এই সমাজে কম। বাংলাদেশ তীর্থযাত্রা বলতে বিত্তশালীগণ যেতেন হজে। কিন্তু সে যাত্রার সমৃদ্ধ ভ্রমণ কাহিনী তেমন একটা পাওয়া যায় না। বিশ শতকের মধ্যভাগে এসে উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ যাওয়ার সূত্রে কেউ কেউ দেশভ্রমণ করেছেন। লিখেছেনও কেউ কেউ। কিন্তু ভ্রমণসাহিত্য গড়ে উঠতে পারেনি। রাবেয়া খাতুন ভ্রমণসাহিত্য রচনাকে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করেছেন বলে তাঁর ভ্রমণসাহিত্যের বইও অনেকগুলো। হে বিদেশী ভোর (১৯৯০), মোহময়ী ব্যাংকক (১৯৯১), টেমস থেকে নায়েগ্রা (১৯৯৩), কুমারী মাটির দেশে (১৯৯৪), হিমালয় থেকে আরব সাগরে (১৯৯৯), কিছুদিনের কানাডা (২০০০), চেরি ফোটার দিনে জাপানে (২০০১), কুমারী মাটির দেশ অস্ট্রেলিয়ায় (২০০৪), মমি উপত্যকা এবং অন্যান্য আলোকিত নগর (২০০৫) তাঁর উল্লেখযোগ্য ভ্রমণরচনা। আরও অনেক ভ্রামণিকরচনা পত্রপত্রিকার পাতায় ছড়িয়ে আছে, অপেক্ষায় আছে বই হয়ে প্রকাশের জন্য।

সরাসরি পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী তিনি লেখেননি। কিন্তু বেশ কিছু আত্মজৈবনিক স্মৃতিমূলক রচনা লিখেছেন। একাত্তরের নয় মাস (১৯৯০) বইয়ে লিখেছেন একাত্তরের শ্বাসরুদ্ধকর দিনগুলোর কথা। স্মৃতিকথায় নিজের কথা নয়, নিজের হয়ে ওঠায় যে-সব মানুষের প্রভাব ও ভূমিকা রয়েছে তাঁদের কথা বলেছেন। স্মৃতিকথামূলক লেখাতেও তাঁর ঔপন্যাসিক সত্তারই ভিন্ন রূপ পাই যেন। নিজের ব্যক্তিজীবন নয়, পরিবারের ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের উজ্জ্বল যে-সব ব্যক্তিদের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন তাঁদের মমতাময় ছবি পাওয়া যায় স্বপ্নের শহর ঢাকা (১৯৯৪), স্মৃতির জ্যোতির্ময় আলোয় যাঁদের দেখেছি (২০০৫), চোখের জলে পড়ল মনে (২০০৮) বইয়ে।

ছোটদের লেখক হিসেবেও রাবেয়া খাতুনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। সেখানে তিনি যুগপৎ আধুনিকতা ও লোকায়তিকতার সমন্বিত পথের যাত্রী। তাঁর জন্ম হয়েছিল গ্রামে। এমন এক গ্রাম সেটা যেখানে বাঙালির চিরকালের লোক-সংস্কৃতির অবারিত সম্পদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রাবেয়া খাতুনের সহজাত গ্রহীষ্ণু-প্রতিভা আত্মস্থ করে নিয়েছিল সে-সম্পদকে। ফলে ছোটদের জন্য যা-কিছু লিখেছেন তা এক দিকে যেমন প্রাণবন্ত হয়েছে অন্যদিকে হয়েছে লোকঐতিহ্যের অনুষঙ্গে সমৃদ্ধ। লোকায়ত বাংলা সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্য ও সজীবতার পথিক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার ও জসীম উদ্দীন নির্দেশিত পথে চলা রাবেয়া খাতুনের শিশুসাহিত্যের মাধুর্যের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ্য। ছোটদের জন্য তাঁর লেখায় কথকতার সৌন্দর্য রূপকধর্মী গদ্যে উপস্থাপিত হয়। একই সঙ্গে নিপুণভাবে বাক্সময় করতে পারেন আধুনিক নগরজীবনের শিশুমনস্তত্ত্বকেও। বাংলাদেশে শিশুসাহিত্যের সমালোচনা নেই বললেই তাঁর শিশুসাহিত্যিক সত্তা যথোচিত মর্যাদায় মূল্যায়িত হয়নি। কেবল নাম উচ্চারণে সীমিত থেকেছে। তাঁর সময়ের বাংলা শিশুসাহিত্যে অ্যাডভেঞ্চারকাহিনী ব্যাপক সমাদৃত ছিল। হেমেন্দ্র কুমার রায় ছিলেন এই ধারার সম্মানিত বাঙালি লেখক। রাবেয়া খাতুনের অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী দুঃসাহসিক অভিযান (১৯৬৭) সেই ধারারই যাত্রিক। অধুনা অবশ্য এই ধারাটি স্তিমিত হয়ে এসেছে। বাংলাদেশের প্রথম শিশুচলচ্চিত্রও এই অ্যাডভেঞ্চারকাহিনীর ওপর ভিত্তি করেই রচিত। নগরজীবনের পটভূমিকায় লেখা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের সুমন ও মিঠুর গল্প তো আধুনিক ক্ল্যাসিকই হয়ে উঠেছে। ছোটদের লেখায় মুক্তিযুদ্ধ সরাসরি উপস্থিত রয়েছে একাত্তরের নিশান-এ (১৯৯২) আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দীপ্ত রচনা তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা (১৮৮১) ছোটদের কাছে সমাদৃত হয়েছে।
তাঁর উপন্যাস, গল্প, ভ্রমণসাহিত্য, শিশুসাহিত্যÑ সব মিলিয়ে তাঁর রচনাসমগ্রে যে জগৎ ফুটে উঠতে দেখি তাতে আমরা পাই বিকাশমান নাগরিক আধুনিকতার অভিমুখ্য। একাধারে তা আবার প্রতীকী অর্থে প্রধানত জীবনসংগ্রামেরও প্রতিভূ। আমাদের বিকাশমান সমাজে অনেক চেতনা এখনো অস্ফুট, হয়ত এ-রকমটি থাকবে আরও বেশ কিছুকাল। সাহিত্যযাত্রায় তাঁর আত্মনিবেদন হয়ত যথার্থ মূল্য পায়নি, তাঁর চেতনা ও শ্রমের অনেক স্বেদবিন্দু হয়ত থেকে গেল অলক্ষ্যে; কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি যে নিজেকে সচল রাখবার প্রেরণা এই সমাজের মধ্য থেকেই সংগ্রহ করতে পারলেন সে জন্যও তাঁকে আমাদের অভিনন্দন জানাতে হয়।

আগামী ২৭ ডিসেম্বর রাবেয়া খাতুনের জন্মদিন। পঁচাত্তরে পা রাখছেন তিনি। তাঁকে জানাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধাপূর্ণ সালাম। সরবকলম সুদীর্ঘজীবন হোক তাঁর এই প্রত্যাশা আমাদের!

[ad#co-1]