১৯৭১, ডায়েরির স্মৃতিময় অংশ

মোঃ জয়নাল আবেদীন
মোঃ জয়নাল আবেদীন, ১৯৭১ সালে কলেজের ছাত্র। টগবগে যুবক। ঢাকার বিক্রমপুরের বাসিন্দা। স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি উত্তেজনাময় মুহূর্তের সাথী। ডাক এলে বেরিয়ে পড়লেন ঘর থেকে। ট্রেনিং, যুদ্ধ অংশ হয়ে উঠল জীবনের। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ের কথা প্রায় প্রতিদিন লিখে রেখেছেন ডায়েরিতে। মেলাঘর, মেজর হায়দার, সম্মুখসমর, জীবনমৃত্যুর বাজি রাখা নানা দিনের ডায়েরির স্মৃতিময় সেই অংশ স্বল্পভাষায়, উপলব্ধির তীব্রতায় এখন ইতিহাসের অংশ। মুক্তিযোদ্ধা মোঃ জয়নাল আবেদীন বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক

১ মার্চ, সোমবার
কলেজে যাই। বাংলা, অর্থনীতির ক্লাস হলো। ১টার দিকে রউফ স্যার পৌরনীতির ক্লাস নিতে এসে জানান যে, তিনি রেডিওর খবর শুনেছেন ইয়াহিয়া খান আসন্ন জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছেন। স্যারের কাছে এ কথা শোনার পরে আমি সব ছাত্রদের নিয়ে ক্লাস থেকে বাহির হই এবং ‘ইয়াহিয়ার ঘোষণা মানি না’ স্লোগান দেই। মিছিলসহ কলেজ চত্বর ও শ্রীনগর বাজার প্রদক্ষিণ করি। পথ সভায় সেলিম, আনোয়ার, আমি বক্তৃতা করি। রাতে আকাশবাণী ও বিবিসি শুনি। ঢাকায়ও প্রতিবাদ হয়েছে।

৩ মার্চ, বুধবার
গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকসু ভিপি আসম রব ‘বাংলাদেশের পতাকা’ উত্তোলন করেছেন। পতাকার বিবরণ হলো সবুজ জমিনের ওপর লাল সূর্য তার মাঝে হলুদ বর্ণের বাংলাদেশের ম্যাপ। পত্রিকায় এ খবর দেখে ভালোই লাগল। সেলিম, আনোয়ার, মোফাজ্জলের সঙ্গে কথা বলি। শ্রীনগরে অনুরূপ পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উড়ানোর কথা ওদের বলি। ঠিক হলো ঢাকায় গিয়ে মোয়াজ্জেম ভাইর সঙ্গে আলাপ করে পতাকা উড়ানোর তারিখ ঠিক করব এবং তাকে দিয়েই পতাকা উড়াব। ইত্তেফাক, সংবাদ দেখি। প্রমথ সরকারের দোকানে অনেকক্ষণ কাটাই। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। শমশের স্যার, হারুন স্যারও ছিলেন। ৬ তারিখ পর্যন্ত ৬-২ টা হরতাল হবে। আজও বিবিসি, আকাশবাণী শুনি।

৬ মার্চ, শনিবার
ঢাকায় কেউ যেতে চায় না। পতাকা বানানোর কথা আবার বলি। মজনু দাকে কাপড় দিতে বলি সে অপেক্ষা করতে বললেন। রশিদ মিয়া বলেন বঙ্গবন্ধু কাল কি বলে সেটা দেখে আমাদের কর্মসূচি নিতে হবে।
আজও বিকেলে মাঠে যাই। আজ অনেকেই এসেছে। আগামীকালের জনসভার ভাষণ রেডিও থেকে সরাসরি প্রচারিত হবে। খুব সুসংবাদ। ঢাকায় না গিয়েও একই সময়ে ভাষণ শোনা। এটাও বাঙালির একটি বিজয়। ব্যাটারির জোর কম বিবিসি শুনতে পেলাম না। পেপারে সব খবর আসে না। দেশের অনেক স্থানে গোলগুলি হয়েছে।

৭ মার্চ, রবিবার
আশু পোদ্দারের সঙ্গে কথা হলো তিনি মাইক দেবেন। কাঠপট্টি থেকে ভাষণ মাইকে শোনানো হবে। দুপুরের খাবার খেয়েই সাধনদের বাড়ি যাই। অনিল দা, আমি, ওরা সবাই রেডিওর চারিদিকে। গান হচ্ছে। সভার কোনো খবর নেই। এক পর্যায়ে রেডিও কিছু না বলে বন্ধ হয়ে গেল। মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিছু একটা ঘটেছে। রাতে আকাশবাণী, বিবিসি সভার খবর দিল। ৪টি দাবি করেছেন বঙ্গবন্ধু। রাতে ঘোষণা করা হলো আগামীকাল সকালে ভাষণ প্রচারিত হবে।

৮ মার্চ, সোমবার
৮টার মধ্যে কাঠপট্টিতে মাইক ফিট করে দিয়ে গেল বাদল পোদ্দার। হায়দার ভাইর রেডিওতে নতুন ব্যাটারি ভরা হলো। মাইক্রোফোনে সেলিম ও আমি পশ্চিমাদের হুশিয়ার করে বক্তৃতা করি। ৯টায় সংবাদের পরে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারিত হলো। শত শত লোক দাঁড়িয়ে, বসে ভাষণ শোনে। ঐতিহাসিক ভাষণ। পত্রিকায় ভাষণের ছবি, বিবরণ। বঙ্গবন্ধুকে মনে হলো তিনি ‘সিরাজউদ্দৌল্লাহ’ হয়ে এসেছেন বাংলার স্বাধীনতার জন্য।

৯ মার্চ, মঙ্গলবার
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ পড়ে রেডিওতে শুনে লোকজনের মনে একটা অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে। সবাই একটা কথাই বলছেন যে, ইয়াহিয়া ভুট্টো যদি ষড়যন্ত্র করে তবে এবারে আর রক্ষা নেই। বাঙালিরা এখন একতাবদ্ধ হয়েছে। সারাদিন আমরা মিছিল পথ সভা করি। আইয়ুব আলীর দোকানে একটি পাঞ্জাবি বানাতে দিলাম।

১০ মার্চ, বুধবার
মাওলানা সাহেবের গতকালের জনসভার খবর পড়ি। সেলিমকে নিয়ে ঢাকা যাই। পতাকা উত্তোলনের জন্য মোয়াজ্জেম ভাইকে বলি। তিনি জানান সকল এমএনএ এবং এমপিএদের বঙ্গবন্ধু ঢাকা ছাড়তে নিষেধ করেছেন। শহীদ, জামাল, সেন্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের একজনকে নিয়ে পতাকা উড়াতে বলেন। সেন্টু ভাই যাবেন বলে কথা দিলেন।

১৩ মার্চ, শনিবার
সকালে একবার ঢোল দেওয়া হলো। মানিক চাচাকে বিষয়টি বুঝিয়ে দিলাম। তালতলা দিয়ে সেন্টু ভাই, আনোয়ার, ইউসুফ আসে। বিকেলে সভা হলো। লোক মন্দ হয়নি। সভাপতিত্ব আমি করি। সেন্টু ভাই বাম হাত বুকে ও ডান হাত উপরে তুলে দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করার শপথ করালেন। আনিস ছবি তোলে। আমার বক্তৃতার পর সেন্টু ভাইসহ ঢাকার সবাই শেষ লঞ্চ ধরার জন্য চলে গেলেন। তাদের বিদায় দিয়ে নতুন পতাকা উড়ালাম। আনিস একটি পাকিস্তানি পতাকা এনে দিল। অন্য একজন আগুন জ্বালিয়ে দিলাম চাঁন তারা পতাকায়। বাড়িতে গেলে বাবাকে খুব চিন্তিত মনে হলো।

১৪ মার্চ, রবিবার
গতকাল পাকিস্তানি পতাকা পুড়িয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ানোর খবর শ্রীনগরের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। মুসলিম লীগের লোকজন এ নিয়ে আমার ওপর খুব নাখোশ। বাড়িতে এ নিয়ে বাবাকে খুব চিন্তিত দেখলাম। তিনি শুধু এটুকু বললেন, ‘নিজ হাতে পাকিস্তানি পতাকা পোড়াতে গেলে কেন?’ এ নিয়ে আমার কোনো বিপদ হয় কি না তা ভেবে তিনি চিন্তিত। হয়তো শ্রীনগরে তিনি কিছু শুনে এসেছেন।

১৫ মার্চ, সোমবার
আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে স্বাধীন বাংলার পতাকা নিয়মিত উড়ানো হচ্ছে। রশিদ চাচাকে শ্রীনগরে দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি জনগণকে জানানোর জন্য একটি জনসভা করতে বলি। তিনি চুন্নু মিয়ার সঙ্গে কথা বলে নেতার সঙ্গে দেখা করে জনসভার দিন, তারিখ ঠিক করবেন বলে জানান। শ্রীনগর বাজারে প্রমথ সরকারের দোকানে অনেকক্ষণ কাটাই। ক্যারম খেলা বেশ উপভোগ করি। পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক বঙ্গবন্ধু দলের নেতারাও শেখ মুজিবের সঙ্গে আলাপ করে সমস্যা সমাধানের জন্য ইয়াহিয়া খানের প্রতি আবেদন জানান। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ নির্দেশনা পত্রিকায় দিয়ে যাচ্ছেন। এ নির্দেশ মতেই দেশ চলছে। বিবিসি, আকাশ বাণী শুনি।

২৬ মার্চ, শুক্রবার
১০টার পর থেকে ঢাকা থেকে শত শত লোক শ্রীনগরে আসতে লাগল। গত রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি সৈন্যরা নির্বিচারে বাঙালিদের হত্যা করেছে। অনেকে গোলার শব্দ শুনেছে আগুন দেখেছে। প্রাণ ভয়ে সকলে ঢাকা ছেড়েছে। শ্রীনগর হাইস্কুল ও কলেজে সকলের থাকার ব্যবস্থা করা হলো। বাজার থেকে হোগলা নিয়ে ফ্লোরে বিছানা হলো। চিড়া, মুড়ি, গুড় দেয়া হলো। সন্ধ্যায় প্রমথ সরকারের রেডিওতে ইয়াহিয়া খানের ভাষণ শুনি। সব দোষ আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ও তার অনুসারীদের ওপর চাপিয়েছে। ইয়াহিয়া একটা জানোয়ার।

২৭ মার্চ, শনিবার
ঢাকায় কার্ফু চলছে। আজও বহু লোক আসছে। রশিদ মিয়া, পরেশ কাকা, মজনু দা, সেলিম, আনোয়ারসহ আমরা সকলে আলোচনা করে ঢাকা থেকে আসা মানুষজনদের খাওয়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। ওয়াজিউল্লাহ স্যারের সকল ছাত্র স্বেচ্ছাসেবক। চাল, ডাল দিয়ে খিচুরি রান্না করে আজ খাওয়ানো হলো। পদ্মার দক্ষিণ পাড়ের লোকজনই বেশি। এক রাত থেকে চলে যাচ্ছেন সবাই। গতকাল থেকে খাটাখাটুনিতে শরীর ক্লান্ত। মন আরও খারাপ। দেশের জন্য বঙ্গবন্ধুর জন্য। প্রমথ সরকারের রেডিওতে ক্ষীণ শব্দের একটি বেতার তরঙ্গ ধরা পড়েছে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র। সেখান থেকে বাঙালি হানাদার পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে বেতার কেন্দ্র থেকে বলা হলো বঙ্গবন্ধু তাদের সঙ্গেই আছেন তাঁর নির্দেশেই যুদ্ধ চলছে। দেশাত্মবোধক গান শোনা গেল। একজন আর্মি অফিসার বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে এ কথা শুনেছেন শমসের স্যারসহ অনেকে। আমি কাছে থাকলেও অন্যদের সাথে কথা বলায় নিজে শুনতে পাইনি।

২৮ মার্চ, রবিবার
আজ খবর পেলাম যে ২৬ তারিখে রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা মধুদা, তার স্ত্রী, তার বড় পুত্র ও পুত্র বধূকে হত্যা করেছে। মধুদার এক মেয়েও আহত হয়েছে। এ খবরে আমরা মানসিকভাবে আরো ভেঙে পড়ি। এদিকে রেডিও পাকিস্তান থেকে বলা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গেছে। কোনটি যে সত্য তা বুঝতে পারছি না। বঙ্গবন্ধু ভালো থাকুক এটাই চাই।

২৯ মার্চ, সোমবার
আজ মোয়াজ্জেম ভাই ঢাকা থেকে আসেন। আমাদের নিয়ে আলোচনা করলেন। তিনি জানান, বঙ্গবন্ধুকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করার নির্দেশ দিয়ে গেছেন। শ্রীনগর থানায় যাই। রাইফেল ও গুলি দিতে ওসি সাহেবকে তিনি নির্দেশ দেন। ওসি সৈয়দ আহমদ একটু দেরি করায় আমি একটি চেয়ার ওসির উপর ছুড়ে মারি। এস আই আঃ খালেক রাইফেল দিব না বললে মোয়াজ্জম ভাই খালেককে একটা চড় মারেন চড় খেয়ে খালেক থানা থেকে চলে গেল। রাইফেল ও গুলি দেয়া হলো। সকলে আনন্দিত জয়বাংলা স্লোগান। শ্রীনগর হাইস্কুল প্রাঙ্গণে সভা। মোয়াজ্জেম ভাই, নির্মল স্যার ভাষণ দিলেন। মমিন খা, আউয়াল মিয়াও আমাদের সঙ্গে থাকবেন বলে ঘোষণা করলেন। সৈয়দপুরের দিকে যাওয়া হলো। আজও ঢাকা থেকে মানুষ আসছে।

৩০ মার্চ, মঙ্গলবার
সন্ধ্যার দিকে মোয়াজ্জেম ভাই দলবলসহ সৈয়দপুর থেকে ফিরেন। শ্রীনগরে কিছুক্ষণ কাটিয়ে তারা দোগাছি কলাপাড়ার দিকে চলে গেলেন। ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন কাগজে বঙ্গবন্ধু একটি সোফায় বসা, দু’ধারে দু’জন সৈন্য দাঁড়ানো যে ছবি ছাপা হয়েছে উহাকে অনেকে আগরতলা মামলার সময় তোলা কোনো ছবি বলে মন্তব্য করেন। ঢাকায় ২৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষককে পাকিস্তানি সৈন্যরা হত্যা করেছে বলে একজন বলে গেলেন।

৩১ মার্চ বুধবার
মধুদা’র বাড়ি যাই। তাঁর মেয়ে বানু, প্রতিভা ও অন্যদের দেখে আসি। আমাদের দেখে প্রতিভার সে কি কান্না। ওদের শান্ত্বনা দেবার ভাষাও পেলাম না। তবে ওদের জানিয়ে দিলাম এ হত্যাকা-ের প্রতিশোধ আমরা নেবই। প্রমথ সরকারের দোকানে আকাশবাণী, বিবিসি’র খবর শুনে বাড়ি যাই।

৪ এপ্রিল, রবিবার
শ্রীনগরে থানা ও বাজারের দোকানে দোকানে পাকিস্তানি পতাকা উড়ানো দেখে মেজাজ গরম হয়ে যায়। সেলিম, মোফাজ্জল, তোফাজ্জল ও সাধনকে নিয়ে থানা থেকে শুরু করে সকল দোকানের পতাকা নামিয়ে ফেলি। বিল্লাল তালুকদার জানতে চান পাকিস্তানি সৈন্যরা বাজারে আগুন দিলে আমি ক্ষতিপূরণ দিব কি না? পতাকা নামিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করি। ভারতে যাওয়া যায় কি না তা ছিল মূল বিষয়।

১০ এপ্রিল, শনিবার
মুন্সীগঞ্জে সৈন্যদের একটি দল এসেছে এ খবর সত্য বলে জানা গেল। পোস্টমাস্টার খোরশেদ সাহেব এ কথা জানান। তিনি আরো জানান বিক্রমপুরী সাহেবকে মহকুমা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান করার কথা। তা হলে মানুষের ভালো হবে বলেও তিনি জানান। বিক্রমপুরী নাকি ভালো মানুষ।

১১ এপ্রিল, রবিবার
বাবাকে মমিন খা বলেছে শ্রীনগরেও আর্মি আসতে পারে। আমাকে দূরে দূরে থাকতে বলেছে। মাহতাব উদ্দিন (এমএলএ) সাহেবও শ্রীনগরে এসেছেন। লোকজনদের অভয় দিয়েছেন। বাবাকে বলেছেন থানার রাইফেল ও গুলি ফেরত না দিলে আর্মি এলে এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। বাবাকে খুব চিন্তিত মনে হলো। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দেশবাসীর উদ্দেশে তাজউদ্দিন আহমদ ভাষণ দিলেন।

১৬ এপ্রিল, শুক্রবার
শ্রীনগরে শান্তি কমিটি গঠিত
শ্রীনগর থানার সামনে ২৫-৩০ জন লোকের এক সভায় আবদুল হাকিম বিক্রমপুরী বক্তৃতা করেন। ছোটখাট মানুষ বিক্রমপুরী। গত বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়ার সময় মুন্সীগঞ্জে তাকে দেখেছি। পোস্টমাস্টার সাহেবের অফিসে বসে জানালার ফাঁক দিয়ে তার ভাষণ শুনি। শান্তি বজায় রাখা ও পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার কথা বলেন। মীর সাহেবকে সভাপতি করে শান্তি কমিটি গঠিত হলো।

১৭ এপ্রিল, শনিবার
আকাশ বাণীর খবরে স্বাধীন বাংলাদেশর সরকার গঠনের খবরে মনে সাহস ফিরে এলো। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রী। কর্নেল ওসমানীকে সেনাপতি করা হয়েছে (বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন)। মেহেরপুরের এক আমবাগানে মন্ত্রিপরিষদ গঠন ও শপথ গ্রহণ হয়। যাক একটা কাজ হলো আজ। সরকার হয়েছে এখন আস্তে আস্তে সব হবে। মুক্তিবাহিনীও গঠিত হয়েছে বলে শোনা গেল। সেলিম আসে ওকে রশিদ মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলি।

১৯ এপ্রিল, সোমবার
মোয়াজ্জেম ভাইকে প্রধান আসামি করে মালেক ভাই, আমি, সেলিম, আনোয়ার, শহীদ, ইদ্রিস, মোফাজ্জলসহ ১০-১২ জনকে আসামি থানায় রাইফেল ও গুলি লুট করার মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানলাম। আজও বাবা ও মালেক ভাইয়ের বাবাকে অস্ত্র ফেরত দেবার ব্যবস্থা করতে বলেছে শান্তি কমিটির নেতারা।

২০ এপ্রিল, মঙ্গলবার
বাবা জানালেন কলাপাড়া থেকে থানায় রাইফেল ও গুলি জমা দেয়া হয়েছে। শ্রীনগরে আর্মি আসবে। তাই অস্ত্র না দেখলে এলাকায় জ্বালাও পোড়াও ও হত্যাকা- ঘটতে পারে। এ জন্যই শান্তি কমিটি এত তাড়া দিচ্ছিল। অস্ত্র ফেরত পাওয়ায় দায়েরকৃত মোকাদ্দমা হয়তো এখানেই শেষ।

৯ মে, রবিবার
কাল পরশুর মধ্যে শ্রীনগরে আর্মি আসবে। মীর সাহেব, রশিদ মিয়া (বেজগাও) বাবাকে এ কথা বলে আমাকে দূরে আজই পাঠিয়ে দিতে বলেছে। তারা বাড়ির গাছে পাকিস্তানি পতাকা উড়াতেও নাকি বলেছে। আমাকে নিয়ে বাবা বাঘড়া গেলেন। নূরু ফকিরের বাড়িতে আমাকে রেখে গেলেন। আমার অবস্থান কেউ যেন না জানে তাও বলে গেলেন।

১১ মে, মঙ্গলবার
শ্রীনগরে পাকিস্তানি সৈন্যদের আগমন
নুরু ফকিরের বাড়ি। ঘর থেকে বের হই না। সন্ধ্যার দিকে মামা এসে জানালেন শ্রীনগরে একদল আর্মি এসেছে। হিন্দু বাড়ি সব আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। রাঢ়িখালে কয়েকটি বাড়িতে আগুন দিয়েছে। মোয়াজ্জেম ভাইর বাড়িও জ্বালিয়ে দিয়েছে। তবে কাউকে নাকি মারে নাই। হিন্দুদের কোন কোন বাড়ি পুড়িয়েছে তা মামা বলতে পারলেন না। মনটা এত খারাপ হয়ে গেল যে, কিছুই ভালো লাগছে না।

৩০ মে, রবিবার
বাড়িতে নৌকার মিস্ত্রি কাজ করে সারাদিন। সেলিম জানায় হুমায়ুন ২/৩ দিনের মধ্যে শ্রীনগরে আসবে। বাচ্চু কাকার ঘরে আমাদের সঙ্গে দেখা করবে। বাবা জানান শ্রীনগরের হিন্দু যারা ধনী তাদের থেকে চাঁদা তুলছে কতিপয় দালাল। শ্রীনগর হাটে সৈন্যরা এসেছিল। আজ ‘চরমপত্র’ ফক্কা চৌধুরীকে তুলোধুনো করা হলো। ভালোই লাগল।

২ জুন, বুধবার
সেলিমসহ ঠিক করি কার কার নামে লিফলেট পাঠানো হবে। উপরে লেখা হবে ‘চরমপত্র’। ইনভেলাপ ২/১ দিনের মধ্যে ও দেবে। আজ নৌকা নামানো হলো। মাচাইল ধোলা হলো। বিকেলে নৌকা নিয়ে পুকুরে ঘুরি। মাহফুজ দেখা করে। ওরা কয়েকজন ইন্ডিয়ায় যাবে আমাকে নিতে চায়। আমি চিন্তা করে জানাব বলি। স্বাধীন বাংলা বেতারের সংবাদে আজ মোয়াজ্জেম ভাইয়ের কথা হয়। তিনি বাংলাদেশ সংসদীয় দলের সদস্য হিসেবে দিল্লির ভারতীয় পার্লামেন্টে বক্তৃতা করেছেন। তিনি পাকিস্তানিদের অত্যাচার-গণহত্যার বিবরণ দিয়ে বাংলাদেশের স্বীকৃতি দানের আহ্বান জানান। নেতার খবর শুনে আমি আনন্দে আত্মহারা। আজ চরমপত্রে ইয়াহিয়া খানকে জাতে মাতাল তালে ঠিক (এগঞঞ) বলা হলো।

৩ জুন, বৃহস্পতিবার
সেলিম ১০টি ইনভেলাপ দিয়ে গেল। পরিষ্কার গুটি গুটি অক্ষরে ইনভেলাপের উপরে শান্তি কমিটির সদস্য ও দালালদের নাম, ঠিকানা লিখি। উপরে ‘চরমপত্র’ লিখলাম। বাবা জানতে চান এত চিঠি কোথায় লিখছি। আমি বন্ধুদের কথা বলি। আজ স্বাধীন বাংলা বেতার স্পষ্ট শোনা গেল না।

৪ জুন, শুক্রবার
হুমায়ুন ভাইয়ের দেয়া মুজিবনগর সরকারের নির্দেশাবলীর লিফলেট ও সেই সঙ্গে দালালদের হুঁশিয়ারি দিয়ে ছোট চিরকুটসহ ইনভেলাপ ভরা হলো। সেলিম দায়িত্ব নিল উহা দূরের কোনো পোস্ট অফিস থেকে ছাড়বে। সারেং বাড়ির খোরশেদ কাকা ও জাব্বার মিয়ার সঙ্গে অনেকক্ষণ দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করি। রাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনি। ‘চরমপত্রে’ বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনা হয়।

৬ জুন, রবিবার
বাবা ও খোরশেদ কাকা বাজার থেকে এসে জানান মীর সাহেব, তোতা মিয়া, শামসু শেখ, রশিদ মিয়া (বেজগাঁও), মাজিজ খলিফার নামে ‘চরমপত্র’ পাঠিয়েছে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে। এ নিয়ে শ্রীনগরে খুব হৈ চৈ হচ্ছে। খোরশেদ কাকার কাছে রশিদ মিয়া বলেছেন এসব নাকি আমার কাজ। এ কথা অবশ্য গোপনে একা বলেছে। খোরশেদ কাকা তাকে বুঝিয়েছেন যে আমি ওসবের মধ্যে নেই।

৯ জুন, বুধবার
খোরশেদ কাকা জানান যে, ইনভেলাপের লেখার সঙ্গে আমার লেখার মিল নেই। তাই শান্তি কমিটির সবাই একমত হয়েছে যে, এ কাজ দূরের কোনো দল করেছে। যাক আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। মাহফুজ আসে। ও আর শহীদ মুক্তিবাহিনীতে যাবে আমাকে ওদের সঙ্গে যেতে বলে। দেলভোগের খালেক ভাই ওদের দিয়ে আসবে। আমি ফাইনাল কোনো কথা দিলাম না। রাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনি। চরমপত্র ছিল।

১০ জুন, বৃহস্পতিবার
সেলিম জানায়, ভাগ্যকূলে শামসু ভাই কয়েকজনকে নিয়ে মুক্তিবাহিনীর একটি দল গড়বে। এ খবর শুনে ও আমাদের শামসু গাজীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। সামনের কোনো একদিন শামসু ভাইয়ের বাড়িতে যেতে বলে। আমি আনোয়ার, মোজাম্মেল, মোফাজ্জলের সঙ্গে কথা বলতে বলি। গেলে সকলে একত্রেই যাব। চরমপত্রে আজ মুক্তিফৌজের গাবুর মাইর শুরু হইয়া গেছে খুব হাসায়। সাধনের বাবার হাসি আর থামতে চায় না।

১৩ জুন, রবিবার
রশীদ চাচার সঙ্গে মরিচবাড়ি যাই। অকুপ আলী বেপারি আমাকে দেখে মহাখুশি। আলাপে জানলাম তার কাছে মুক্তিবাহিনীর নামে কয়েক হাজার টাকা চাঁদা চেয়েছে কিছু বখাটে। আমার দোহাই দিয়ে নাকি তিনি রক্ষা পেয়েছেন। এ জন্য আমাকে দেখতে চেয়েছেন। নিধনকে মোরগ ধরতে আদেশ দিলেন। মরিচ বাড়ির অকুপ আলী অশিক্ষিত, তবে বেশ সহজ সরল বলে মনে হলো। আমি তাকে আশ্বাস দিলাম মুক্তিবাহিনী এখনো গঠিত হয়নি। মুক্তিবাহিনীর নামে চাঁদা চাইলে বেঁধে রেখে খবর দিতে বলি। বিকেলে ফিরে আমি স্বাধীন বাংলা বেতারে আজ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন সাহেবের ভাষণ শুনি। জয় সুনিশ্চিত ও জয়বাংলা বলে ভাষণ শেষ করেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সবাই বুকে সাহস পেলাম।

১৬ জুন, বুধবার
আজ শ্রীনগর হাটে দুই খোদাই ষাঁড়ে লড়াই লাগে। লোকজন দৌড়াদৌড়ি করলে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, আর্মি এসেছে। ভয়ে সবাই হাট থেকে পালায়। পরে যখন প্রকৃত ঘটনা জানে তখন সবাই হাটে গিয়ে দোকান খোলে। এ নিয়ে লোকজন খুব হাসাহাসি করে। সেলিমের সঙ্গে কথা হলো। শুক্রবার সকাল ১০টায় আমরা ভাগ্যকূল যাব। আকাশ বাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতার শুনি। আজ ‘চরমপত্রে’ শরণার্থী ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পাকিস্তানিদের শয়তানির ব্যাপারে প্রিন্স সদরুদ্দীনের বক্তব্য তুলে ধরা হয়।

২১ জুন, সোমবার
আজ শ্রীনগর বাজারে গেলাম সাহস করে। ছাই রঙের ঢিলেঢালা পোশাক পরা দু’জন (মিলিশিয়া) বিশেষ বাহিনীর সদস্যকে দূর থেকে দেখলাম। সবাই এদের খুব ভালো বলছে। হঠাৎ করে ওয়াজিউল্লাহ স্যারের সঙ্গে দেখা তিনি বলেন শ্রীনগরে রাজাকার বাহিনীতে লোক নেবে। আমরা পরীক্ষা না দিলে রাজাকারের চাকরি নিলে তিনি চেষ্টা করবেন বেতন ভালো বলেও তিনি জানান। স্যারের কথা শুনে মন আরো খারাপ হলো।

৭ জুলাই, বুধবার
আজ আমরা ভাগ্যকূল-মান্দ্রা গেলাম। শামসু ভাই আগের কথা বলেই বিদায় দিলেন। আমরা কাজী জলকদর ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে আমাদের মুক্তিবাহিনীতে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করি। তিনি শামসু গাজীর সঙ্গে আলাপ করে সময়মতো আমাদের খবর দিবেন জানান। শ্রীনগর ফেরার পথে হাতরপাড়ার চকে আকাশ থেকে জলহস্তি নামার দৃশ্য দেখি। হাতির শুঁড়ের মতো কালো মেঘের ঘূর্ণি নিচ থেকে পানি উপরে তুলে নিচ্ছে। ধানগুলোকে দুমড়ে মুচড়ে পিষ্ট করছে। মাঝি আমাদের নৌকা অন্য পথে চালিয়ে দ্রুত চলে আসে। জীবনে এই অভিজ্ঞতা পূর্বে আর ছিল না তবে আকাশ থেকে জলহস্তি নামে এ কথা মানুষের মুখে শুনেছি। কোলাপাড়া বাজারে এসে চিড়া-গুড় খেলাম। বাড়ি পৌঁছি বিকেলে।

৩০ জুলাই, শুক্রবার
সারাদিন বই পড়ে কাটাই। রাতে রেডিওর খবর শুনি। আজ ঢাকা রেডিও শুনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক। এটাই ঢাকার একমাত্র খবর। কয়েক জনের সাক্ষাৎকার প্রচার করে। মনে হয় সব সাজানো। স্বাধীন বাংলা বেতারে চরমপত্রে একটি গল্প বলা হলো বেশ মজার।

৫ আগস্ট, বৃহস্পতিবার (২১ শ্রাবণ)
মুক্তিবাহিনীর হাতে মমিন খাঁ নিহত। এলাকায় মুক্তিবাহিনীর এই প্রথম সফল অপারেশন হলো। রাতে শ্রীনগরের দিক থেকে প্রচ- গোলাগুলির শব্দে ভয় পেয়ে যাই। মোল্লা বাড়ির লোকজন ২/৩টি নৌকা দিয়ে মুক্তিবাহিনীকে পশ্চিম দিকে যেতে দেখেছে। মানুষ খুশি, আমিও। কিন্তু মুক্তিবাহিনীতে কি আমার যাওয়া হবেই না? আবার যোগাযোগ করতে হবে।

৬ আগস্ট, শুক্রবার (২২ শ্রাবণ)
মুক্তিবাহিনী কর্তৃক শ্রীনগর থানা ও হাবিব ব্যাংক শ্রীনগর শাখা অপারেশন। মুক্তিবাহিনী আজ দিনের বেলা লোকজনের সামনে থানা, হাবিব ব্যাংক, পোস্ট অফিসে হানা দেয়। অস্ত্র, টাকা নিয়ে যায়, কাগজপত্র পোড়ায়। তোতা গত রাতে মরেনি। আজ নাকি থানায় মুক্তিবাহিনীর সামনে পড়েছিল, কিন্তু বেঁচে যায় কপালগুণে। আরধিপাড়ায় মমিন খাঁর দাফনে আত্মীয়দের অনেকে যোগদান করেনি।

১০ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার
আরধিপাড়া। রেডিও শুনি। ভারত সরকার বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ইয়াহিয়া খানের সামরিক কোর্টে এক তরফা বিচারের প্রতিবাদ জানায়। এ নিয়ে বিশ্বজনমত গড়ে তুলতে ভারত বদ্ধপরিকর। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ এ ব্যাপারে ভারতকে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণের আহ্বান জানান।

২৭ সেপ্টেম্বর, সোমবার
আজ খবর পেলাম তৈরি থাকতে হবে। যে কোনো দিন রাতে চলে যেতে হবে। জামা-কাপড় খুব বেশি নেয়া যাবে না। একটা চাদর নিতে হবে।

৩০ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার
আজ খবর পেলাম। শনিবার বা রবিবার যে কোনো দিন আমাদের চলে যেতে হবে। বাবাকে জানাই।

১ অক্টোবর, শুক্রবার
বাড়ী। বিকেলে ছোট ফুফা, ফুফুকে বলে আসি-বিদায়ের সময় ফুফুকে কাঁদতে দেখি।

২ অক্টোবর শনিবার
সন্ধ্যার পরে বাড়ি থেকে বিদায়। দাদা, বুজি, মা, বাবাকে সালাম করি। দাদা কাছে নিয়ে ফু দিলেন মাথায় হাত বুলিয়ে। লতিফ ভাই, মোফাজ্জল, দিলিপ ও আনোয়ারসহ নৌকা হাসাড়ার দিকে চললো। গ্রামের নাম ভোজপাড়া। পুরাতন দালান। হিন্দু বাড়ি ছিল। আমরা ১০/১২জন। পরিচয় হলো। হাসাড়ার বেশ কয়েকজন। আমাদের ৫ জনকে একটি কক্ষ দেয়া হলো। নিয়মকানুন বলে দেয়া হলো। খাওয়ার পরে ঘুম।

৩ অক্টোবর, রবিবার
আজ সকলের সাথে পরিচয় হলো। হাসাড়ার ৪ জন, লস্করপুরের ১ জন। সিরাজদিখানের ৪/৫ জন, তিনগাও, সোনধাদিয়ার ৫জন মোট ২৩ জন। দুটি গ্রুপে ভাগ করা হলো। ‘ক’ ও ‘খ’ ইউনিট। ‘ক’ ইউনিটের অধিনায়ক হলেন এনায়েত উল্লাহ দেওয়ানকে আর ‘খ’ ইউনিটের অধিনায়ক করা হলো আমাকে। মূল ইউনিটের অধিনায়ক কাজী আজিজুল হক (লেবু কাজী)।

৪ অক্টোবর, সোমবার
ভোজপাড়ার এই বাড়ির বর্তমান মালিক বারেক পাঠান তার বড় ছেলে মর্তুজা। আজ প্রশিক্ষণ সম্পর্কে বক্তব্য রাখলেন মুন্সীগঞ্জের শহীদুল আলম সাঈদ। আমি এত দেরিতে ট্রেনিং নিচ্ছি কেন জানতে চান। আমি সব খুলে বলি।

৫ অক্টোবর, মঙ্গলবার
শবেবরাত আজ। রাইফেলের বিভিন্ন অংশের নাম শিখানো হলো। রাইফেল প্রশিক্ষণ দিল মোড়ল ভাই। ডালু বেশ কয়েকবার ভুল করায়-রাইফেলের বাঁট দিয়ে ওর কোমরে আঘাত করা হলো। এ দৃশ্য দেখে আমার খুব খারাপ লাগে। দিলিপ ছোট মানুষ- তবুও ভালোই করল।

৬ অক্টোবর, বুধবার
আজ রাতে ২/৩ জন নতুন প্রশিক্ষক আসেন। সাতঘড়িয়ার দু’ভাই প্রশিক্ষণ নিতে যুক্ত হলো। প্রশিক্ষক শহীদ তাদের ভাগ্নে। আজ স্টেনগান, কারবাইন সম্পর্কে ধারণা দেয়া হলো। প্রশিক্ষক এক পর্যায়ে নিজের অস্ত্রকে স্ত্রীর সাথে তুলনা করেন। অস্ত্রকে ভালোবাসতে বলেন। একজন গেরিলার হাতের অস্ত্র স্ত্রীর মতো আপন। তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনি।

৭ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার
আজ এসএলআর সম্পর্কে ধারণা দেয়া হলো। বিভিন্ন অংশের নাম, কীভাবে খুলতে হয়, পরিষ্কার করতে হয় ফুল থ্রো মারতে হয় ইত্যাদি। রাইফেলের মতোই ৩টি পজিশন নিয়ে এসএলআর দিয়ে যুদ্ধ করার কৌশল হাতে কলমে শেখানো হলো।

৮ অক্টোবর, শুক্রবার
আজ রাইফেলের ট্রেনিং আরও ভালোভাবে দেয়া হলো। ফুল থ্রো শেখানো হলো। রাতে শহীদ ভাই, মোহাম্মদ হোসেন বাবুল, আনিস আসেন। তাঁদের সাথে পরিচিত হলাম। ট্রেনিং শেষে অস্ত্র আনতে আমাদের দলকে ভারতে পাঠানো হবে এ কথাও তারা বলে গেলেন।

৯ অক্টোবর, শনিবার
আজ আমার ও দিলিপের রাতে সেন্ট্রি দেয়ার ডিউটি পড়ে। পুকুরের ঘাটলায় দাঁড়িয়ে সারারাত ডিউটি করি। পাঠান চাচা এসে রাত ১১টার দিকে বলে গেলেন-পুকুরের তাল গাছের নিকট সাদা-পোশাকের মাওলানার মতো কিছু দেখলে যেন ভয় না পাই। ওখানে নাকি জিন যাতায়াত করে তিনি দেখেছেন। জিনের কথা শুনে দিলিপ ভয় পায় আমি ওকে সাহস দেই।

১০ অক্টোবর, রবিবার
কাজী ভাইকে একটা রেডিওর ব্যবস্থা করতে বলি। খবর ছাড়া ভালো লাগে না। হাসাড়ার জামাল চুপে চুপে বাঁশি বাজায়। এ নিয়ে বেশ হৈ চৈ। পলি নামের এক মেয়ে আছে- ওর কথা মনে হলেই জামাল বাঁশি না বাজিয়ে থাকতে পারে না। এ নিয়ে আমরা বেশ মজা করি। আজ গ্রেনেড সম্পর্কে ধারণা দেয়া হলো।

১১ অক্টোবর, সোমবার
আজ গ্রেনেডের উপর পূর্ণ প্রশিক্ষণ হলো। শব্দ হবে এ জন্য ট্রেনিংয়ের সময় গ্রেনেড নিক্ষেপ করা গেল না। বিকালে ক্রলিংয়ের প্রশিক্ষণ হলো। হাতের কনুই ও হাঁটু অনেকের ছিলে গেল। শরীরে ব্যথা লতিফের জ্বর এসেছেওষুধ দিল।

১২ অক্টোবর, মঙ্গলবার
আজ হাসাড়া বাজারে গেলাম। কেউ চিনতে পেরেছে বলে মনে হলো না। জামাল এক বাসায় গেল। একত্রে ফিরি। একটি রেডিওর ব্যবস্থা হলো। অনেক দিন পর খবর শুনতে পেলাম। রেডিও খুব কম সাউন্ডে কানে লাগিয়ে শুনি।

১৩ অক্টোবর, বুধবার
রাতে ভাগ্নে শহীদ এক বাড়িতে নিয়ে গেল। দালানওয়ালা বাড়ি থেকে এক লোককে ধরে আনা হলো। এই লোককে আমি চিনি বিয়ে করেছে ভিখারিদাস গ্রামে। লোকটিকে শহীদ খুব মারে। আমাদের কথা কেউ জানবে না এ ঘোষণা দেয়ার পরে ছেড়ে দেয়া হলো।

১৪ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার
মোনায়েম খাঁকে মুক্তিবাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে। স্বাধীন বাংলা বেতারে এ খবর প্রচারিত হলো। সত্যি কিনা জানি না। হলে হতেও পারে। ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা বেশ বেড়েছে। প্রশিক্ষণ আবার দ্বিতীয় দফায় শুরু হলো। আজ প্রশিক্ষণ দিলেন শহীদুল আলম সাঈদ। তিনি শত্রুকে কীভাবে টার্গেট করতে হবে সে সম্পর্কে বিশেষ গুরুত্ব দিলেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি নায়িকা কবরীর নাম উল্লেখ করলেন।

১৫ অক্টোবর, শুক্রবার
দিনের বেলা শহীদ ভাই পলিটিক্যাল ক্লাস’ নিলেন। তিনি আমাদের ‘মুজিব বাহিনী’ বলে অভিহিত করেন। তিনি এক পর্যায়ে পাক বাহিনী ও বামপন্থিদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন। ‘মুজিব বাহিনী’ আমার মনে নতুন চিন্তা যোগ করল। মুক্তিবাহিনী কি তাহলে দু’ভাগ হয়ে গেল?

১৬ অক্টোবর, শনিবার
ট্রেনিং পুনরায় আবার শুরু। ভাগ্নে শহীদ এখন প্রধান প্রশিক্ষক। রাতে আঃ লতিফ (সিরাজদিখান) আসে কয়েক জনকে নিয়ে। তিনিও অনেক আলাপ করলেন। তিনি বলেন, “জয়নাল ভাই” বক্তৃতার রাজনীতির দিন শেষ।

১৭ অক্টোবর, রবিবার
ট্রেনিং। আজ থেকে অন্যদের সাথে আমিও সিগারেটে ভাগ বসাই। আগে দু-একটা টান দিতাম।

১৮ অক্টোবর, সোমবার
ট্রেনিং।

১৯ অক্টোবর, মঙ্গলবার
ট্রেনিং।

২০ অক্টোবর, বুধবার
ট্রেনিং।

২১ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার
আজ রাতে আনোয়ারসহ আমি সেন্ট্রি দিলাম। আজ রমজানের চাঁদ দেখা গেল। কাল থেকে রোজা শুরু। পাঠান চাচা জিজ্ঞাসা করে জেনে নিলেন আমাদের মধ্যে কে কে রোজা থাকবে। একজনও পাওয়া গেল না।

২২ অক্টোবর, শুক্রবার
পহেলা রমজান। রোজা শুরু। রোজা রাখছি না। মর্তুজাদের বাড়ির মহিলারা নিজেরা রোজা রেখে আমাদের ২৪/২৫ জনের নাস্তা, দুপুর ও রাতের খাবার রান্না করে দিচ্ছেন। তাদের এই ঋণ কি আমরা কোনদিন শোধ করতে পারব?

২৩ অক্টোবর, শনিবার
আজ আবার ক্রলিং নতুন করে দেয়া হলো। গ্রেনেড নিক্ষেপের পর বুক মাটি থেকে ২/৩ ইঞ্চি উপরে রাখার প্রশিক্ষণও নিলাম।

২৪ অক্টোবর, রবিবার
ট্রেনিং

২৫ অক্টোবর, সোমবার
ট্রেনিং।

২৬ অক্টোবর, মঙ্গলবার
আজ ট্রেনিং শেষ হলো। বলা হলো যে, এখন আমাদের প্রত্যেককে একজন প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা বলা যায়। রাতে মজিদপুর দায়হাটা ডা. বি. চৌধুরী সাহেবের বাড়ি যাই। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের আস্তানা বেশ পূর্ব থেকেই আছে।

২৭ অক্টোবর বুধবার
মজিদপুর দয়হাটা। রাতে হঠাৎ করে গুলির শব্দ। আমরা সবাই চিন্তিত। শত্রু বাড়ি ঘেরাও করেছে এটা ধারণা সকলের। ভারত থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা ক্রলিং করে সব দেখছে। শেষ পর্যন্ত জানা গেল দিলিপের আঙ্গুল ট্রিগারে লেগে মিস ফায়ার হয়েছে। দিলিপের বিচারের ভার আমাকে দেয়া হলো। ছোট মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ক্ষমা করে দিতে বলি। তাই হলো।

২৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার
আজ আমরা ছুটি নিয়ে বাড়ি গেলাম। রাধাকান্ত সাহার বাড়ির সামনে লঞ্চে ভাইকে দেখি। তিনি আমাদের উদ্দেশে বললেন পাকবাহিনীর সঙ্গে আমরা কিছুই করতে পারব না। আমাদের উচিত কলেজে ফিরে লেখাপড়া করা। তার কথায় আমরা আমল দিলাম না।

২৯ অক্টোবর, শুক্রবার
সারাদিন বাড়ি। বাবা, দাদাকে ট্রেনিং সম্পর্কে বলি। তাঁরা উভয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। বাবা রাইফেল চালনা সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য দিলেন। তিনি আনসার বাহিনীতে রাইফেল ট্রেনিং নিয়েছিলেন বলে জানালেন। কয়েকদিন আগে কামারখোলা ও গোয়ালিমান্দ্রায় মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে পাকবাহিনীর যুদ্ধ হয়েছে। কামারখোলায় অনেক বাড়িঘর পাকবাহিনী জ্বালিয়ে দিয়েছে। গোয়ালিমান্দ্রায় পাক সৈন্যরা প্রচ- মাইর খেয়েছেÑ অনেকে মরেছে। এ খবরে খুব খুশি হলাম।

৩০ অক্টোবর, শনিবার
আজ আবার ক্যাম্পে ফিরে আসি। এখন আমাদের অস্ত্র আনতে কবে পাঠাবে সেটাই হচ্ছে প্রধান বিষয়।

৩১ অক্টোবর, রবিবার
কাজী ভাই জানালেন, ২৬ জনের দল নিয়ে আগরতলা পর্যন্ত পৌঁছতে অনেক খরচ। শ্রীনগর থেকে খরচের টাকা পেলেই যাত্রা করা হবে।

১ নবেম্বর, সোমবার
আজও যাত্রার দিন ঠিক হলো না।

২ নবেম্বর, মঙ্গলবার
আজও কোন অগ্রগতি নেই।

৩ নবেম্বর, বুধবার
বসে বসে খাওয়া-তাস খেলা। আমিও টুয়েনটি নাইন খেলায় অংশ নিলাম। দুষ্টামি করে ঝোকার দিয়ে রং করায় সকলে খুব হাসলো একচোট। হাসির জন্যই এটা করেছি।

৪ নবেম্বর, বৃস্পতিবার
দিন-তারিখ ঠিক হলো। আমাদের বাড়ি গিয়ে সকলের সঙ্গে দেখা করে আসতে সময় দেয়া হলো। রাতেই বাড়ি পৌঁছি।

৫ নবেম্বর, শুক্রবার
বাড়ি।

৬ নবেম্বর, শনিবার
বাড়ি।

৭ নবেম্বর, রবিবার
বাড়ি থেকে বিদায় নিলাম। দাদা, বুজি, মা-বাবাকে সালাম করি। দাদা মাথায়হাত রেখে বলেন ‘দেশের জন্য যাচ্ছ কিন্তু খেয়াল রাখবা খামাখা তোমার হাতে যেন কোন আদম সন্তানের মৃত্যু না হয়। বাবা নৌকা বেয়ে সন্ধ্যার পরে আমাকে মোফাজ্জলের বাড়ি নিয়ে আসে। আনোয়ার, ভাসানী, ডালু, মোজাম্মেলও এসেছে। রুটি ও মাংস দিয়ে রাতের খাবার। রাত গভীর হলে আমরা মজিদপুরের দিকে যাত্রা করি।

৮ নবেম্বর, সোমবার
কয়েকটি কেরাইয়া নৌকাযোগে যাত্রা শুরু। আমরা এক নৌকায় ৫/৬ জন। আমাদের মাঝি মাঝে মধ্যে গান গেয়ে আনন্দ দেয়। রাতে গজারিয়ার হোসেনদি। নদীতে লাইট দেখে সবাই ভয় পাই। খবর নিয়ে জানা গেল জেলেরা নৌকার গলুইতে হেজাক ঝুলিয়ে মাছ ধরছে। জব্বার কুকুর দেখে ভয় পায়। এ নিয়ে ছোটাছুটি। সকলে ভেবেছে পাক বাহিনী এসেছে।

৯ নবেম্বর, মঙ্গলবার
খুব ভোরে যাত্রা করে দুপুরে যখন বাঞ্ছারামপুর দিয়ে নৌকা যায় তখন সকলে ছৈয়ের নিচে চুপচাপ বসে থাকি। থানায় আর্মি আছে। সন্ধ্যায় রামচন্দ্রপুরে। এক বাড়িতে অবস্থান। শত শত লোককে এক মহিলা রান্না করে খাওয়াচ্ছেন। আমরাও তার রান্নাই খেলাম। রাত ১০টায় হাঁটা শুরু।

১০ নবেম্বর, বুধবার
সারা রাত হেঁটে সবাই বেশ ক্লান্ত। এক বাজার থেকে কিছু খেয়ে নিলাম। আরও কত হাঁটতে হয় কে জানে? অনেক বাড়িঘর পোড়া দেখলাম। অনেক লোকজন দৌড়ে এসে তার ছেলের নাম জানায় ছেলে অনেক আগে মুক্তিযুদ্ধে গেছে কোন খবর বাবা জানেন না। আজও সারাদিন হাঁটি। পা আর চলতে চায় না। আজ রাতের মধ্যে সিএ্যান্ডবি রোড ক্রস করতে পারলেই বর্ডার। রাতের খাবার এক বাড়িতে। চাঁদ ওঠার আগেই আমাদের এক মন্দিরের সামনে বসিয়ে গাইড উধাও। আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পরে গাইড এসে খবর দেয় রাস্তা ক্লিয়ার। হেঁটে ওপারে গেলাম। সিএ্যান্ডবি নয়ত যেন পুল সেরাত।

১১ নবেম্বর, বৃহস্পতিবার
ভোরে হাতিবান্দা। ভারতীয় মাটিতে পা দিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস নিলাম। আরো বহু লোক। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাও দেখলাম। হাত-মুখ ধোয়ার জন্য এক ডোবায় গিয়ে দেখি শত শত লড়ার মৃতদেহ ভাসছে। আমি ঘৃণায় ঐ পানিতে হাত দিলাম না। কিন্তু অনেকেই সে পানি ব্যবহার করছে। আজ মাকে একটি চিঠি লিখি। লোক মারফত চিঠিটি পাঠাতে চেষ্টা করব।

১২ নবেম্বর, শুক্রবার
প্রাতকালীন ক্রিয়া খুব কষ্টে সেরে রওনা হলাম। একটা লরিতে উঠি। পথে নেমে গেলাম। একটি টিনের ঘরে থাকার ব্যবস্থা হলো। নিচে বিছিয়ে আমি মোফাজ্জল চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমাই। রাস্তা দিয়ে সারা রাত ভারতীয় সেনাবাহিনীর বুটের শব্দ পেলাম। মার্চ করে গেল।

১৩ নবেম্বর, শনিবার
আমাদের দল দেখে ভারতীয় সীমান্ত বাহিনীর এক সদস্য দৌড়িয়ে এসে জিজ্ঞাসা করে পরিচয়। জয় বাংলা বলার সঙ্গে সঙ্গেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমরা ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র আনার জন্য এসেছি শুনে আমাদের ক্যাম্পে পৌঁছে দেয়ার জন্য একটি লড়ি দিল। হাতীমারা ক্যাম্পে উঠি। কাজী দা আগরতলা গেলেন।

১৪ নবেম্বর, রবিবার
হাতীমারা ক্যাম্পে সকাল-বিকাল পিটি। কুমিল্লার একজন সৈন্য পিটির সময় “আগেছে টাইম ওস্তাতকা সাথ হেইকাম বিগিন” বলে পিটি শুরু করেন। যা শুনে আমি ও মোফাজ্জল হেসে দেই। এখানে পানির বড় সঙ্কট। বালি মিশ্রিত পানিতে ভাত রান্না হয় যা খেতে হয় অভক্তি নিয়ে।

১৫ নবেম্বর, সোমবার
লেবু ভাই ফিরলেন আবদুল কুদ্দুস মাখনের পত্র নিয়ে। আমাদের বক্সনগর ক্যাম্পে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য পত্র দিয়েছেন মাখন ভাই। লেবু ভাই জানালেন মোয়াজ্জেম ভাইকে ইন্দিরা গান্ধী নাকি নিজ হাতে চা বানিয়ে খাওয়াইছেন। তিনি আমাদের আগমনে খুব খুশি হয়েছেন।

১৬ নবেম্বর, মঙ্গলবার
আজ আমরা হাতীমারা ক্যাম্প ছেড়ে বক্সনগর ক্যাম্পে যাই। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যাপক আবদুর রউফ সাহেব ক্যাম্পের প্রধান। তার সঙ্গে পরিচয় ও আলাপ হলো। এই ক্যাম্পে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যাই বেশি। গোসল করার জন্য হেঁটে অনেক দূরের এক পাহাড়ী খালে যাই। আমার শরীরে খুজলি ওঠা শুরু হয়েছে। কুচকি ও অন্যান্য অঙ্গে চুলকানি দেখা দিচ্ছে।

১৭ নবেম্বর, বুধবার
হাতীমারা। দূরে হেঁটে গোসল করতে যাই।

১৮ নবেম্বর, বৃহস্পতিবার
হাতীমারা ক্যাম্প।

১৯ নবেম্বর, শুক্রবার
হাতীমারা ক্যাম্প। আজ ঈদের চাঁদ দেখা গেল। কাল ঈদ। গরু জবাই করা হবে কিনা তা নিয়ে ক্যাম্পের প্রধানসহ সবাইকে খুব চিন্তিত মনে হলো। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো কর্তৃপক্ষ অনুমতি না দিলেও আমরা গরু জবাই করে ঈদ পালন করব।

২০ নবেম্বর, শনিবার
ঈদুল-ফিতর। ক্যাম্পের ভিতরের চত্বরে ঈদের জামাত হলো। মোনাজাতের সময় ইমাম সাহেব নবী করিম (সাঃ)-এর হিজরতের সঙ্গে আমাদের দেশ ত্যাগকে তুলনা করে এমন ভাষায় আবেগ দিয়ে মোনাজাত করলেন যে আমরা সবাই কাঁদলাম। সেমাই, পোলাও রান্না হয়েছে। জীবনের প্রথম বিদেশে ঈদ পালনের স্মৃতি মনে থাকবে আজীবন।

২১ নবেম্বর, রবিবার
অস্ত্র পেতে দেরি হবে। মোফাজ্জল আর আমি বরপেটা ও করিমঞ্জে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। রউফ সাহেবের সঙ্গে দেখা করে আমাদের দু’জনকে ৪/৫ দিনের ছুটি দিতে বলি। তিনি সম্মত হলেন। আগরতলা গিয়ে ধর্মনগর যাওয়ার টিকেট কিনে আনি। খালি পেটে না খেয়ে কোচে উঠতে হবে। পথ খুব আঁকাবাঁকা পেট ভরা থাকলে বমি হয়।

২২ নবেম্বর, সোমবার
ভোরে আগরতলা। ৭টায় কোচ ছাড়ে। সন্ধ্যায় ধর্মনগর পৌঁছি। পাহাড় আর পাহাড়। এমন আঁকাবাঁকা ও উঁচানিচা রাস্তা কীভাবে যে তৈরি করেছে তা ভাবতে অবাক হই। সারা পথ আমি কমলা খাই মাত্র চার আনায় এক হালি। ধর্মনগর এক হোটেলে ভাত খাই। সিটের নম্বর ধরে উচ্চঃস্বরে বেয়ারা বিল বলে। রাত কাটালাম রেল স্টেশনে।

২৩ নবেম্বর, মঙ্গলবার
ভোরের ট্রেনে করিমগঞ্জ পৌঁছি ৯টার দিকে। টিকেট কাটিনি টিটি জিজ্ঞাসাবাদ করলে ‘জয় বাংলা মুক্তিফৌজ’ বলি। দাশপট্টি পেতে কষ্ট হলো না। শ্রীনগর পোদ্দার পাড়ার বলাই, পরিতোষ, ব্রুজাপাড়ার কৃষ্ণ দা, ননী, মাধবকে পেয়ে গেলাম। শ্রীনগরের লোকজনে ভরা দাশপট্টি। অনেকে খবর পেয়ে আমাদের দেখে গেল। বড়রা দাদা, দাদি, বাবার কথা জিজ্ঞাসা করেন। কেউ বলেন আমাকে এই ছোট্টকালে দেখেছিলেন। আজ মোয়াজ্জেম ভাইকে চিঠি লিখি যা লেবু কাজীর সঙ্গে দিয়ে দেব।

২৪ নবেম্বর, বুধবার
করিমগঞ্জ। এক বাসায় নাস্তা, অন্য বাসায় দুপুরের খাবার, আরেক বাসায় রাতের খাবার। স্কুল-কলেজের ছাত্রীরা আমাদের দেখে গেল। আমাদের পাশের বাড়ির যোগেশের মা, যোগেশও আমার খবর পেয়ে দেখে গেল। বাড়ির সকলের কথা জিজ্ঞাসা করে। গোবিন্দ পোদ্দারের এক বোন, ভাগ্নে (ডাক্তারী পড়ে), ভাগ্নি দেখে গেল। সময়ের অভাবে বরপেটা মোফাজ্জলের বাবার কাছে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।

২৫ নবেম্বর, বৃহস্পতিবার
করিগমগঞ্জ থেকে ধর্মনগর যাত্রা। ধর্মনগর থেকে আগরতলাগামী এক ট্রাক ড্রাইভারের সিটের পাশের সিটে বসি। রাতে ট্রাক ছাড়ে। একবার রাস্তায় বাঘ জাতীয় প্রাণীকে এক পাহাড় থেকে অপর পাহাড়ে যেতে দেখি। ভোরে আগরতলা পৌঁছি।

২৬ নবেম্বর, শুক্রবার
আগরতলা থেকে ক্যাম্পে এসে দেখি লতিফ, ডালুসহ আমাদের দলের একজনও নেই। আমাদের কক্ষের বেড়ার চটিতে লতিফ চিঠি লিখে গেছে যে, আমাদের ভাগ্য খারাপ তাই দেশের জন্য যুদ্ধ করতে এসেও যুদ্ধ করতে পারলাম না। ওরা ২/১ দিনের মধ্যেই অস্ত্রসহ যুদ্ধ করতে দেশের ভেতরে চলে যাবে। পত্র পেয়ে ঘাবড়িয়ে যাই। পরে মোফাজ্জলসহ ট্যাক্সি ভাড়া করে সোজা বক্সনগর ক্যাম্পে যাই। যেখানে কেউ নেই। পরে মেলাঘর ক্যাম্পে যাই সেখানে সকলকে পাই।

২৭ নবেম্বর, শনিবার
মেলাঘর ক্যাম্পে ১৭টি জেলার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র লাভের জন্য অপেক্ষা করছে। প্রত্যেক রাতেই ২/৩টি দল অস্ত্র নিয়ে দেশের ভেতরে যুদ্ধ করার জন্য যাচ্ছে। কয়েক মাইল এলাকা নিয়ে এই ক্যাম্প। প্রধান গেটে নিরাপত্তার দায়িত্বে যিনি, তাকে সবাই নানা বলেন বাড়ি নেয়াখালীর দিকে। আমরা নীল রঙের পলিথিনের তাঁবুতে থাকি। রাতে প্রচ শীত। ফুলহাতা গেঞ্জি পরে দু’ চাদর গিঁটু দিয়ে মোফাজ্জল ও আমি শরীরে শরীর লাগিয়ে ঘুমাই।

২৮ নবেম্বর, রবিবার
শ্যামসিদ্ধির মজিদ চাচা, গজাল হাটির জলিলকে এই ক্যাম্পে পেলাম। মজিদ চাচা জানালেন তিনি ভিত্তি ফৌজের ট্রেনিং নিয়েছেন। জলিল অনেক কাজে আমাকে সহায়তা করল। এখানেও অনেক দূরে পাহাড়ী নদীতে গিয়ে গোসল করতে হয়। রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করি। কাঁচা লাকড়ি দিয়ে রান্নার সময় প্রচুর ডালডা চুলায় ঢালতে হয়Ñ যা দেখে আমার খুব দুঃখ লাগে। সকালে এক মগ চা খাই নাস্তার পর।

২৯ নবেম্বর, সোমবার
লেবু ভাইকে স্থানীয় ২/৩জন মাস্তান ক্যাম্প থেকে ধরে নিয়ে যেতে চায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি দেশে নাকি হিন্দু বাড়ি দখল করেছেন। এ খবর শুনে আমরা খুব রাগান্বিত হই, আবার ভয়ও পাই। ক্যাপ্টেন হায়দারকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। তাঁর হস্তক্ষেপে মাস্তানরা পিছু হটে। মুন্সীগঞ্জের ফজলে এলাহী আমাদের সঙ্গে দেশের ভেতরে যাবেন তিনি হায়দার সাহেবের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ।

৩০ নবেম্বর, মঙ্গলবার
আজ মতিনগর গেলাম লাকড়ি আনতে। মতিনগর গিয়ে এক গাছে সবুজ বর্ণের সাপ দেখতে পেলাম। গাছের পাতার মতো সাপের রঙ বোঝার উপায় নেই। গাছ কেটে ট্রাকে ভরে ক্যাম্পে ফিরি। মতিনগর বনে আমলকী গাছ থেকে অনেক আমলকি পাড়ি। আমলকী খেয়ে পানি খেলে চিনির শরবতের স্বাদ পাওয়া যায়।

১ ডিসেম্বর, বুধবার
আজ রাতে আমি সেন্ট্রি দিলাম। পাসওয়ার্ড যেন ভুলে না যাই সে ব্যাপারে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করি। ক্যাপ্টেন হায়দারের বাংলোর সামনে আমার ডিউটি ছিল। গভীর রাতে হায়দার সাহেব বাংলা থেকে বাহির হয়ে ডিউটি ঠিকমতো চলছে কিনা তা দেখেন। আমাকে পিঠ চাপড়িয়ে বাহবা দিলেন। উপরের বড় বড় গাছ থেকে বৃষ্টির ফোটার মতো শিশির পড়ে।

২ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার
আজ ক্যাম্পে এক রাজাকার কমান্ডারকে ধরে আনা হলো। দেখতে গেলাম। লতিফ জানায় আমাদের জন্য ২৬০০/- টাকা অতিরিক্ত দেয়া হয়েছে সে টাকা পেয়েছ কিনা? আমি তো অবাক-২৬টি পয়সাও আমাদের দেয়া হয়নি। বাচ্চু কাকা গোপনে এ কথা লতিফকে বলেছে। আমরা আলোচনা করে লেবু ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করি। তিনি জানান আমাদের জন্য অতিরিক্ত টাকা দেয়া হয়নি। পুরো দলের জন্য ২৬০০/- টাকা দেয়া হয়েছে। আমরা যা বুঝার বুঝে নিলাম। পুরো টাকা একজনে মেরে দিয়েছে।

৩ ডিসেম্বর, শুক্রবার
আজ পাকিস্তান- ভারত যুদ্ধ শুরু হলো। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিয়ে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করায় আমি বলি যে, হয়ত ভারতীয় সৈন্যদের সঙ্গেও আমাদের যুদ্ধ করতে হতে পারে। লতিফ আমার মুখ চেপে ধরে এ কথা যেন আর উচ্চারণ না করি। ক্যাম্পের রেডিওতে আকাশবাণীর খবর শুনি।

৪ ডিসেম্বর, শনিবার
আমরা ২/১ দিনের মধ্যে অস্ত্র পাব এ আভাস পাওয়া গেছে। লেবু ভাই জানতে চান আমরা কেনাকাটা করতে যাব কিনা? বিকালে মোফাজ্জলসহ লেবু ভাইয়ের সঙ্গে বিশালগড় বাজারে গেলাম। চাদর কিনলাম। পথে এক বৃদ্ধ ঠাট্টা করে বলেন, “কি রে হেকের পোরা একণ আমাগো দেশে আইছ কেন?” আমি বলি যুদ্ধে জয়ী হয়ে আপনাদের দেশ থেকে নিজ দেশে চলে যাব। যুদ্ধ চলছে।

৫ ডিসেম্বর, রবিবার
আগামীকাল আমরা অস্ত্র পাব। ফজলে এলাহী তার লোকজন নিয়ে আমাদের সঙ্গে যাবেন। তাঁকে দলের ডেপুটি কমান্ডার করা হলো। যুদ্ধ চলছে ভারত এগিয়ে মুক্তিবাহিনী ভারতীয় সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

৬ ডিসেম্বর, সোমবার
দুপুরের খাবারের পর পরই আমাদের সব গুছিয়ে তৈরি হতে হলো। কে্যাঁদ থেকে অস্ত্র নিলাম। ২টি ৩ ইঞ্চি মর্টার শেলও আমাদের গ্রুপ পেল। এলএমজি দু’টি, রাইফেল, এসএলআর, এসএমজি, গ্রেনেডসহ প্রচুর গোলাবারুদ পেলাম। আমি একটি এসএমজি নিলাম। সন্ধ্যার পর পরই আমরা দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। সারারাত হাঁটি।

৭ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার
সারারাত হেঁটে ক্লান্ত। আমার খুজলি এমন আকার ধারণ করেছে যে, জাঙ্গিয়ার সঙ্গে লেগে গেছে। মুরাদনগর থানার এক বাজারে সামান্য বিশ্রাম। এ সময় আমি প্রস্রাব করার জন্য জাঙ্গিয়া খুলতে গিয়ে হঠাৎ করে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যাই। ধরাধরি করে এক ডাক্তারের কাছে নেয়া হলো। ডাক্তার ইনজেকশন দিলেন। ওষুধও দিলেন খাবার জন্য। এক কৃষকের বাড়িতে বিশ্রাম। গতকাল ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটা খুবই খুশির খবর। নৌকা ভাড়া করে আমরা গজারিয়া থানার ভাটারচর বাউশিয়া এলাকায় চলে আসি।

৮ ডিসেম্বর, বুধবার
এক বাড়িতে আমাদের গোলাবারুদ, তৈজসপত্র রাখা হলো। আমি অসুস্থ। আমি ঐগুলি পাহারার দায়িত্বে থাকি। লেবু ভাই, নজরুল ইসলাম ও ফজলে এলাহী যৌথভাবে পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়েছেন। আমাদের গ্রুপের সঙ্গে পাকবাহিনী ও রাজাকারদের গুলিবিনিময় হলো কয়েক দফা। লোকজন বেশ সহায়তা করে। মর্টার সেল মারা হয়েছে। পাকিস্তানিরা মর্টার মারায় ভয় পেয়েছে।

৯ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার
আজ আবার যুদ্ধ হলো। গ্রামবাসীদের সহায়তা মনে রাখার মতো। দুধ, কলা, ডিম যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের কছে গিয়ে দিয়ে আসছে। গজারিয়া থানা কমান্ডার নজরুল ইসলাম যুদ্ধ জয়ের শেষ মুহূর্তে মারাত্মকভাবে আহত হয় এবং পরে মারা যায়। এ মৃত্যৃ এত দুঃখ ও বেদনার যে যুদ্ধ জয়ের আনন্দ করতে পারলাম না। ভবেরচর হাই স্কুলে উঠি। গরু জবাই করে আমাদের খাওয়ানো হলো।

১০ ডিসেম্বর, শুক্রবার
সকালে মুন্সীগঞ্জ পৌঁছি। শহীদুল আলম সাঈদসহ সকলে আমাদের অভ্যর্থনা জানলেন। শহীদ ভাই লেবু ভাইকে একটি পিস্তল উপহার দিলেন। হরগঙ্গা কলেজের হোস্টেলে উঠি। আবদুল হাকিম বিক্রমপুরীকে দেখে আমি ক্ষেপে যাই। সবাই আমাকে শান্ত করে। বিকালে ফজলে এলাহীর গ্রামে যাই। রাতে সেখানে থাকি। বহু লোক আমাদের দেখতে আসে। পাকিস্তান বাজারের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ বাজার রাখা হলো।

১১ ডিসেম্বর, শনিবার
সকালে বাংলাদেশ বাজারে মুক্তিযোদ্ধা ও জনতার সমাবেশ হলো। জাতীয় সঙ্গীত ২/৩ জনকে নিয়ে গাইলাম। মুন্সীগঞ্জ হয়ে বাড়ি যাই। শ্রীনগর অনেক আগেই শত্রুমুক্ত হয়েছে। রাতে বাড়ি পৌঁছে প্রথমে মাকে ডাক দেই। মা দরজা খুলে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। দাদা, দাদি, বাবা, ভাই-বোন প্রতিবেশীরা সকলে আমাকে দেখতে ঘর থেকে বাইরে আসেন।

১২ ডিসেম্বর, রবিবার
আমার খবর পেয়ে গ্রামের লোকজন আমাদের বাড়িতে দলে দলে আসতে থাকে। সবাই জানতে চায় কোথায় ট্রেনিং নিয়েছি, কোথায় যুদ্ধ করেছি ইত্যাদি। যুদ্ধ চলছে কতদিন চলবে পাকিস্তানিরা নিশ্চিহ্ন হতে আর কতদিন লাগবে এসবও জানতে চান অনেকে। শ্রীনগর গিয়ে ডাক্তারকে শরীর দেখাই ইনজেকশন ও ওষুধ চালিয়ে যেতে বলেন।

১৩ ডিসেম্বর, সোমবার
আতিকউল্লাহ খান মাসুদ (শ্রীনগর থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার)-এর সঙ্গে দেখা করি। তিনি জানতে চান আমরা তাঁর কাছে রিপোর্ট করছি না কেন? আমি নিজেদের পরিচয় দেয়ার পরে তিনি চুপ করে গেলেন। মজনু মিয়া আমাদের এড়িয়ে চলা শুরু করেছেন। আমাদের গ্রুপের টাকা আত্মসাতের পাপ তাকে এড়িয়ে চলতে পথ দেখাচ্ছে।

১৪ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার
বাচ্চু কাকা আমাদের স্পষ্ট করে বলে দিলেন আমাদের পুরো দলের জন্য ২৬,০০০/- আর আমাদের ৪ জনের জন্য স্পেশাল ২৬০০/- টাকা দেয়া হয়েছে। কিন্তু পুরো দলের জন্য ২৬০০/- দিয়ে অবশিষ্ট ২৬,০০০/- মেরে দিয়েছে। কে মেরেছে তা তিনি সরাসরি বলেননি। তবে আমরা বুঝে নিয়েছি। আমরা শুয়োরের বাচ্চাকে গুলি করতে চাই। টাকা মারা ওকে শিখিয়ে দেব।

১৫ ডিসেম্বর, বুধবার
আজ পাটাভোগ যাই। তালুকদার বাড়ির সবাই আমাদের পেয়ে খুব খুশি। লোটন এসএমজি কেমনে চালায় দেখতে চায়। আমি দেখাতে গিয়ে গুলি চেম্বারে লোড করা ছিল খেয়াল করিনি। অল্পের জন্য রক্ষা ট্রিগারে হাত পড়লে বিপদ হতো।

১৬ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার
আজ পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করে। ঢাকা বেতার থেকে ভারতীয় জেনারেলের ‘হাতিয়ার ঢাল দাও’ ঘোষণা আর নজরুলের ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ কবিতা আবৃত্তি হতে থাকে। দেশ স্বাধীন হওয়ায় আমাদের আনন্দ দেখে কে। পোদ্দারপাড়া হেমন্ত কাকা একটি মিছিল বাইর করেন। আমি এই মিছিলে গিয়ে এসএমজির ফাঁকা ব্রাশ ফায়ার করি। মিছিলের একটিই সেøাগান ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। আজ থেকে বাংলাদেশ পুরোপুরি শত্রুমুক্ত হলো। শ্রীনগরে বিজয় মিছিল শেষ করে রাতে বাড়ি ফিরি। শুরু হলো নতুন আর এক অধ্যায়ের।

[ad#co-1]