যুদ্ধদিনের কিছু কথা

সাদেক হোসেন খোকা
১৯৭১ সালে এপ্রিলের মাঝামাঝি ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন নেতা রুহুল আমীন এবং গোপীবাগের মাসুদ (বুড়া) সহ বেশ কয়েকজন মিলে আগরতলার উদ্দেশে রওনা হই। সেখানে ২ নং সেক্টরের ট্রেনিং ক্যাম্পে ঢাকার মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা প্রশিক্ষণ চলছিল। খালেদ মোশাররফ ছিলেন ওই সেক্টরের কমান্ডার। ক্যাম্পটির নাম ছিল ‘মেলাঘর’। মেলাঘরের পারিপাশর্ি্বক পরিবেশ বসবাসের একেবারেই উপযোগী ছিল না। পাহাড় আর ঘন জঙ্গলে পূর্ণ ছিল চারদিক। লাল মাটির উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ একটু বৃষ্টি হলেই বেশ পিচ্ছিল হয়ে পড়ত।

মেজর হায়দারের অধীনে তিন সপ্তাহ গেরিলা ট্রেনিং শেষে আমাদের সম্মুখ যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ক্যাপ্টেন গাফফারের (পরবর্তীতে জাতীয় পার্টির নেতা) নেতৃত্বাধীন সাব-সেক্টরে পাঠানো হয়। সেখানে ট্রেনিং শেষ করে কসবা-মন্দভাগ (মির্জাপুর) বর্ডার এলাকায় কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেই। এখানে যুদ্ধে করেই মূলত এসএমজি, এসএলার ও চাইনিজ রাইফেলসহ বিভিন্ন অস্ত্র পরিচালনা এবং সরাসরি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করি। সেখানে একটি যুদ্ধে প্রবল সাহসিকতা দেখিয়ে শহীদ হন আমার ঘনিষ্ঠ বল্পুব্দ জাকির হোসেন।

ট্রেনিং শেষে আমাকে একটি গেরিলা গ্রুপের কমান্ডার করে ঢাকায় পাঠানো হয়। এই গ্রুপে আগরতলা থেকে ট্রেনিং নিয়ে আসা যোদ্ধা ছিল ৪০ জন; এবং এখানে এসে আরও ২৫ জন রিক্রুট করি। ঢাকায় আসার আগের দিন মেজর হায়দার গেরিলা যুদ্ধ এবং শক্র এলাকায় অবস্থানকালে কী কী বিষয় অবশ্যই অনুসরণীয়, সেই সম্পর্কে ব্রিফিং দেন। আগরতলা থেকে আমরা প্রথমে আসি নরসিংদীর শিবপুরে। উলেল্গখ্য, মান্নান ভাই (আবদুল মান্নান ভূঁইয়া) তখন নরসিংদীসহ আশপাশের এলাকার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তার গেরিলা রণকৌশলের কাছে হার মেনেছিল পাক হানাদার বাহিনীর সব পরিকল্পনা। ফলে ওই এলাকা মুক্তিযুদ্ধের প্রায় পুরো সময় ছিল মুক্তাঞ্চল। শিবপুরের যশোর বাজারে ক্যাম্প করে কয়েকদিন ধরে খোঁজ-খবর করে আমরা ঢাকায় ঢুকি।

পেঁৗছে দেখি, ঢাকা প্রায় ফাঁকা। পাক বাহিনীর নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে বেশিরভাগ মানুষ গ্রামের দিকে চলে গিয়েছিল। আমাদের আগেও কয়েকটি গ্রুপকে গেরিলা অপারেশনের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। তাদের কেউ কেউ পাকিস্তানি আর্মির হাতে ধরা পড়েছিলেন। অপারেশন শুরু করার আগে আমরা অগ্রবর্তী গ্রুপগুলোর ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করি। প্রথমেই আমার কমান্ডের ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ২০ জন করে দুটি সাব-কমান্ডে ভাগ করি, যার একটি গ্রুপের নেতৃত্ব বর্তায় জনপ্রিয় পপ গায়ক আজম খানের ওপর, অপরটির নেতৃত্বে ছিল মোহাম্মদ শামসুল হুদা। আমাদের অন্য ৩৭ জন সহযোদ্ধার মধ্যে ছিলেন ইকবাল সুফি, আসলাম লস্কর, কাজী মোহাম্মদ হেদায়েত উলল্গাহ (বর্তমানে ব্যাংক কর্মকর্তা), মোহাম্মদ শফি, খুরশিদ (চট্টগ্রাম), খুরশিদ (টাঙ্গাইল), আবদুল মতিন, আবু তাহের, মোহাম্মদ বাশার, খন্দকার আবু জায়িদ জিন্নাহ, ফরহাদ জামিল ফুয়াদ, ড. নিজাম, জাহেদ, নান্টু, মাসুদ, রুপিন, হারুন, মাহফুজ, রুহুল আমিন এবং কচিসহ আরও অনেকে।

তখন পাকিস্তানি শাসকরা বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে বলে দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছিল। আমরা সংকল্প করলাম, বড় কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাদের প্রচারণার অসত্যতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরব।
ঢাকায় আসার আগে মেজর হায়দার যে ব্রিফিং দিয়েছিলেন, তা যুদ্ধকালে যথাযথভাবে মেনে চলেছি। একক সিদ্ধান্ত না নিয়ে সঙ্গীদের সঙ্গে আলোচনা-পর্যালোচনা করে অগ্রসর হয়েছি। তাই আমাদের সব অভিযানই সফলতা পেয়েছিল। গেরিলা যুদ্ধের রণকৌশল মেনে চলেছি; যেমন_ হিট অ্যান্ড রান, জনগণের মধ্যে থেকে যুদ্ধ করা, শত্রুপক্ষকে সব সময় অস্থির রাখা, সাফল্য নিয়ে বেশি উৎফুলল্গ না হওয়া, নিজেদের নিরাপত্তার কথা স্মরণে রাখা, যুদ্ধে নিজেরা যতটা সম্ভব কম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, শত্রুর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করা, প্রমাণাদি একেবারেই সঙ্গে না রাখা ইত্যাদি।

এমনসব জায়গায় আমরা সফল অপারেশন করেছি, যা ভাবলে আজও শরীর শিউরে ওঠে। আমরা অপারেশন টার্গেট নির্ধারণ করেছিলাম প্রচারের গুরুত্ব বিবেচনা করে, যাতে মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার পায় এবং শত্রুও আতঙ্কগ্রস্ত হয়। প্রতিটি অপারেশনে আমরা আক্রমণ চালিয়েই সরে পড়েছি এবং জনগণের মধ্যে থেকে ফলাফল বা প্রতিক্রিয়া উপভোগ করেছি। অনেক রোমাঞ্চকর অপারেশনের মধ্য থেকে সংক্ষেপে কয়েকটি শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের কথা বলা যায়…

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুলল্গাহ হলের কাছে বিমানবাহিনীর একটি রিত্রুক্রটিং অফিস ছিল। এর সামান্য পূর্ব দিকে বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ি। পরিকল্পনা মতো আমি, লস্কর ও সুফি একটি বেবিট্যাক্সিতে ব্যাগভর্তি ২০ পাউন্ড বিস্ফোরকসহ সেখানে যাই। সিদ্ধান্ত ছিল_ লস্কর ভেন্টিলেটর দিয়ে বিস্ফোরক যথাস্থানে রেখে আসবে, সুফি আর আমি গাড়িতে বসে কভার দেব। লস্কর বেচারা ছিলেন আমার মতো খাটো। ভেন্টিলেটরের নাগাল পেতে তাঁর খুব অসুবিধা হচ্ছিল। অবস্থা দেখে সুফি এগিয়ে গিয়ে তাকে সাহায্য করে। আমি ব্যাগের মধ্যে স্টেনগান নিয়ে বেবিট্যাক্সিতে বসে ছিলাম। ড্রাইভার বিষয়টি বুঝতে পেরে বিচলিত হয়ে ওঠে। ধমক দিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করি। স্কুটার নিয়ে মেডিকেল কলেজের বর্তমান ইমার্জেন্সি গেটে আসতেই বিস্ফোরণে পুরো এলাকা ধোঁয়া ও ধুলায় অন্ধকার হয়ে যায়। আমরা বেবিট্যাক্সি ছেড়ে মেডিকেল কলেজের ভেতরে ঢুকে আবার পশ্চিম দিকের গেট দিয়ে বেরিয়ে রিকশা নিয়ে বুয়েটের হলে চলে যাই। ওই হলেই থাকত সঙ্গী আমসাল লস্কর। ওর রুমে ঢুকে দ্রুত কাপড় বদলে ফিরে যাই ঘটনাস্থলের কাছাকাছি। সেখানে পেঁৗছে দেখি, হুলস্থূল অবস্থা। আশপাশের এলাকা আর্মি, মিলিটারি পুলিশ, বিমানসেনা ও পুলিশ ঘিরে ফেলেছে এবং নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এই অপারেশনটি মে মাসের শেষ দিকে অথবা জুনের প্রথম দিকে চালিয়েছিলাম।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে (নভেম্বর) আমাদের আরেকটি সফল অপারেশন ছিল বিডিআরের গেটে। এই অভিযানে অনেক প্রাণহানি হয়েছিল। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দ্য ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড এখানে সেই সময় সার্ভের কাজ করছিল। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মজিদ সাহেব ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মানুষ। এই ঠিকাদার ফার্মটির ইঞ্জিনিয়ার মান্নান এবং ইঞ্জিনিয়ার আনিসুল ইসলাম আমাদের সহায়তা করেন। তাদের সহায়তায় দিনমজুর সেজে পিলখানার অভ্যন্তরে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যাই। দিনমজুরদের যে দলটির সঙ্গে আমি ভেতরে যেতাম, সেই দলের একজন ছাড়া কেউ আমার আসল পরিচয় জানত না। একদিন কাদামাটি গায়ে জিগাতলার গেট দিয়ে বের হচ্ছি। এমন সময় মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন এনএসএফের তৎকালীন নেতা মাহবুবুল হক দোলন আমাকে চিনে ফেলেন। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘খোকা না? একি হাল?’ আমার তখন ভয় ও বিব্রতকর অবস্থা। সংক্ষেপে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর দ্রুত মিশে গেলাম জনতার মধ্যে। এভাবে বেশ কয়েকদিন পিলখানার অভ্যন্তরে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যাই। আমি উত্তেজনা নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পিলখানার অভ্যন্তরের সবকিছু দেখে নিচ্ছি। কোথায় কোথায় অবজার্ভেশন পোস্ট আছে, পরখ করে নিই। যদিও আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল পিলখানার অভ্যন্তরে বিস্ফোরণ ঘটানো, সম্ভব হলে তাদের অস্ত্র ভাণ্ডারের কাছাকাছি, কিন্তু সার্ভের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় ভেতরে বিস্ফোরক নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে আজিমপুর কবরস্থান সংলগ্ন গেট এলাকায় আমরা প্রচণ্ড গ্রেনেড হামলা চালিয়ে তৎকালীন ইপিআর বাহিনীর বেশ ক্ষয়ক্ষতি করেছিলাম। রাতে পরিচালিত এই হামলার সময় একটি গুলি দেয়ালে লেগে ডিরেকশন চেঞ্জ হয়ে আমার পায়ে এসে লাগে। দু’দিন পর একটি ক্লিনিকে গিয়ে সেটা অপারেশন করে তুলতে হয়।

আমরা এবং ঢাকায় যুদ্ধরত অন্য গ্রুপগুলো একের পর এক আক্রমণে তটস্থ করে তুলেছিল পাকিস্তানি বাহিনীকে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধারা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তবুও পাকিস্তানিদের মিথ্যা প্রচারণা চলছিল। তখন সিনেমা হলগুলোতে ‘শো’র আগে ‘চিত্রে পাকিস্তানি খবর’ শিরোনামে ডকুমেন্টারি দেখানো হতো। এতে হানাদাররা প্রমাণ করতে চাইত, দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। ডিএফপিতে এই ডকুমেন্টারিগুলো তৈরি হতো। একদিন বায়তুল মোকাররম মার্কেটের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি, সেখানে শুটিং হচ্ছে, মার্কেটে কেনাকাটা করছে নারী-পুরুষ। লোক ভাড়া করে এনে এসব চিত্র ধারণ করা হচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিলাম, ডিএফপি উড়িয়ে দেব। শান্তিনগরস্থ সেন্সর বোর্ডের বর্তমান অফিসই ছিল ডিএফপি অফিস। ডিএফপির তখনকার চিফ ক্যামেরাম্যানের সঙ্গে গিয়ে সহযোদ্ধা নান্টু ভাই পুরো অফিসের হাল-হকিকত দেখে আসেন। এ ভবন কী পরিমাণ বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যাবে, সেই বিষয়ে পরামর্শ দিলেন সঙ্গী মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল আহমেদ সুফির পিতা প্রকৌশলী এসপি আহমেদ। উলেল্গখ্য, যখনই আমাদের প্রয়োজন হতো, এসপি আহমেদ তার গাড়ি ও টাকা দিয়ে আমাদের সহায়তা করতেন। তার মালিবাগের বাসা মুক্তিযোদ্ধাদের ঢাকার অলিখিত সদর দফতর হয়ে উঠেছিল।

আমি, সুফি ও লস্কর ২০ পাউন্ড বিস্ফোরক ব্যাগভর্তি করে নিয়ে ডিএফপির দারোয়ানকে বললাম, এক সাহেবের কিছু মালামাল এতে আছে। সেদিন অর্ধবেলা অফিস ছিল। তাই দারোয়ান ছাড়া অন্য কেউ অফিসে ছিল না। রুমের মধ্যে নিয়ে দারোয়ানকে অস্ত্র দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসি। এরপর তাকে বলি, ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধা; বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভবন উড়িয়ে দেব।’ দারোয়ানের পরিবার ওই ভবনেই থাকত। তাকে স্ত্রী, শিশু সন্তান ও হাঁড়ি-পাতিল সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিই। নিয়ম হলো, বিস্ফোরক যত চাপের মধ্যে থাকবে, তার ধ্বংসের ক্ষমতা ততই বাড়বে। সেজন্য টার্গেটকৃত জায়গায় ওটা রেখে দুটি স্টিলের আলমারি দিয়ে চাপা দেই। এতে বিস্ফোরণটি এত বিকট হয়েছিল যে, ডিএফপি ভবনের উত্তর দিকের অংশটি উড়ে গিয়েছিল। সেই ভবন সংলগ্ন ১০০ গজের মধ্যে থাকা অন্যান্য বাড়ির জানালার কাচ ভেঙে পড়ে যায়। এই বিস্ফোরণের খবর ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আকাশ বাণী, বিবিসি এবং ভয়েস অব আমেরিকাসহ পৃথিবীর বহু প্রচার মাধ্যম বার বার গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে সেই খবর। পাকিস্তানিদের মিথ্যা প্রচারণার স্বরূপ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় বিশ্ববাসী। স্থানীয়ভাবে রিত্রুক্রট বিজু এই অভিযানের পুরো সময় আমাদের সঙ্গে ছিল।

সঠিক দিন-তারিখ মনে না পড়লেও রোজার মাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন চালিয়েছিলাম তৎকালীন নির্বাচন কমিশন অফিসে। যেসব জাতীয় সংসদ সদস্য ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মুক্তাঞ্চলে চলে গিয়েছিলেন, তাদের আসন শূন্য ঘোষণা করে সেগুলোতে উপনির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছিল কমিশনে। এটা ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উল্টো দিকে মোমেনবাগের দুটি ভাড়া বাড়িতে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা কাশেম (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী) আমাদের বিশেষভাবে সহায়তা করেন। তার আত্মীয় পরিচয় দিয়ে ৩ দিন তিনি আমাকে ওই অফিসে নিয়ে যান। সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখে অপারেশনের পরিকল্পনা করি। অপারেশনের দিন প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল বলে রাস্তাঘাটে লোক কম ছিল। আমি, সুফি, লস্কর, হেদায়েত উলল্গাহ, নান্টু ও বাশার তিনজন করে দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দুই ভবনে বিস্ফোরক স্থাপন করি। এখানেও প্রথমেই অস্ত্র দেখিয়ে দারোয়ানদের আয়ত্তে আনি। তাদের কুপোকাত করে সবাইকে ভবন থেকে সরিয়ে দিই। বিস্ফোরণে একটি ভবনের একাংশ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়।

সফল এই অভিযান শেষে দেখি, কাছাকাছি আত্মগোপন করার কোনো জায়গা নেই। তখন আমরা শান্তিবাগের গুলবাগস্থ ওয়াপদা অফিসের কর্মচারীদের একটি মেসে গিয়ে ডাক দেই। তারা দরজা খুলে দিতেই অস্ত্র দেখিয়ে তাদের জিম্মি করে ফেলি। তাদের বলি, ‘কিছুক্ষণ আগে যে বিস্ফোরণ হয়েছে, তা আমরা ঘটিয়েছি। আমরা মুক্তিযোদ্ধা।’ এগুলো শুনে তারা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের কথা শুনেছে, কিন্তু এত কাছ থেকে দেখতে পেরে তাদের এই অনুভূতি জন্মে। অপরিচিত মেস মেম্বাররা আমাদের মতো অনাহূত মেহমানদের যথেষ্ট সহায়তা ও খাতির-যত্ন করেন। সাফল্যের উত্তেজনার রাতে ঘুম আসছিল না বলে নিজেদের মধ্যে নানা কথা বলছিলাম। মেসের লোকজন ছিল সত্যিই ভালো। তারা খুব ভোরে আমাদের নাশতা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। আসার সময় আমাদের অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে আনার জন্য ব্যাগ দিয়ে সহযোগিতা করেন।

ট্রেনিংয়ের সময় আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কোনো প্রমাণ সঙ্গে রাখা যাবে না। ডায়েরি মেইন্টেইন করা যাবে না। অন্যসব নির্দেশের মতোই এগুলোও আমরা যথাযথভাবে মেনে চলেছি। তাই কোনো ঘটনারই দিন-তারিখ সঠিকভাবে বলতে পারছি না। যুদ্ধের ৯ মাসই আমাদের জীবনে প্রতিদিন এক বা একাধিক ঘটনা ঘটেছে। সেসব বর্ণিল স্মৃতি ফিরে ফিরে মনের আয়নায় ভেসে ওঠে। স্বল্প পরিসরে সেগুলো লেখা সম্ভব নয়।

[ad#co-1]