বিজয়ের প্রাপ্তি এবং পূর্বাপর প্রত্যাশা

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের দাবিই তুলে ধরলেন। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তার বিরোধের বড় কারণ ছিল ওই পরিপূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি। বামপন্থিদের কোনো কোনো অংশও বুঝেছিল যে, বাঁচতে হলে পূর্ববঙ্গকে অবশ্যই পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার নিগড় থেকে বের হয়ে আসতে হবে

প্রাপ্তির তুলনায় প্রত্যাশার ব্যাপারটি সব সময়েই বড় থাকে। প্রত্যাশার তুলনা দিয়েই প্রাপ্তির বিচার ঘটে এবং দেখা যায় দুয়ের ভেতর ফাঁক রয়েছে। আর ওই যে ব্যবধান সেটাই কারণ হয় অসন্তোষের, নইলে মানুষ সচল থাকত না, সন্তুষ্টচিত্তে অচল হয়ে বসে পড়ত। থেমে যেত অগ্রগতি। বাংলাদেশের যে মুক্তিযুদ্ধ সেক্ষেত্রেও প্রত্যাশাটা ছিল অনেক বড় এবং সেটা এক ধাপেই বড় হয়ে ওঠেনি, ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রথমে ছিল স্বায়ত্তশাসনের দাবি, সেই পর্যায়ে আমরা বলতাম লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন চাই; অর্থাৎ এককেন্দ্রিক নয়, স্বায়ত্তশাসিত দুটি স্বতন্ত্র পাকিস্তান চাই। বিক্ষোভটা ছিল কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে। যে শাসনের মুখ্য ব্যাপারটা ছিল শোষণ, অর্থাৎ লুণ্ঠন ও সম্পদ পাচার। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, লগি্ন পুঁজির বিনিয়োগ, সম্ভব-অসম্ভব সব পথেই পূর্ববঙ্গের নিঃস্বকরণ চলছিল এবং বুঝতে অসুবিধা রইল না যে, পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের উপনিবেশ হতে চলেছে। কথাটা প্রকাশ্যে বললেন মওলানা ভাসানী। তিনি স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের দাবিই তুলে ধরলেন। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তার বিরোধের বড় কারণ ছিল ওই পরিপূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি। বামপন্থিদের কোনো কোনো অংশও বুঝেছিল যে, বাঁচতে হলে পূর্ববঙ্গকে অবশ্যই পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার নিগড় থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ওই পর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমান ভাসানীর সঙ্গে ছিলেন না, ছিলেন বরং সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গেই। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরই তিনি পূর্ববঙ্গের পরিপূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলে ধরে ছয় দফার ঘোষণা দেন। এটা সত্য যে, ছয় দফাতে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির দাবি ছিল না, বরং পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি জেনারেল সরকারের হাতে থাকবে এমনটাই বলা হয়েছিল এবং দেশের অভ্যন্তরে শ্রেণীশোষণের অবসান ঘটানো এমন প্রতিশ্রুতিও ছয় দফা দেয়নি, যে জন্য বামপন্থি মহলের অসন্তোষ ছিল। কিন্তু ছয় দফার শুরুতেই, একেবারে প্রথম দফাতেই যে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোটের ভিত্তিতে সংসদীয় সরকার গঠিত হবে বলা হয়েছিল, তার ভেতরেই কিন্তু উপ্ত ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের পতনের বীজ।

গণতন্ত্রের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার তো নিতান্তই স্বাভাবিক দাবি। ব্রিটিশ সরকার এটা দেয়নি, কিন্তু তারা তো ছিল দখলদার শক্তি। দেখা গেল পাকিস্তান সরকারও ওই ভোটাধিকার মানতে প্রস্তুত নয়। ১৯৫৪ সালে পূর্ববঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে যে নির্বাচন হয়, তাতে মুসলিম লীগের যে দুর্দশা ঘটে তাতেই শাসকরা বুঝে ফেলে যে, সর্বজনীন ভোটাধিকার দিলে সারা পাকিস্তানেও তাদের একই দশা ঘটবে। তার প্রধান কারণ পূর্ববঙ্গ তো বিপক্ষে যাবেই, পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাববিরোধী প্রদেশগুলোও যে পক্ষে থাকবে এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন দিতে তারা প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর ওই শাসকদের পক্ষে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের দাবি মেনে না নিলে পূর্ববঙ্গে তো বটেই, পশ্চিম পাকিস্তানেও মানুষকে শান্ত করার উপায় ছিল না। ইয়াহিয়া খান তাই ওই দাবি মেনে নিয়েছিল। যত লোক তত ভোট, এই দাবি মেনে নিলে পূর্ব পাকিস্তানের আসনসংখ্যা যে বৃদ্ধি পাবে এবং তার ফলে শতকরা ৫৬ জন পাকিস্তানি নাগরিকের বাসভূমি পূর্ববঙ্গ পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর কর্তৃত্ব করবে, এই আশঙ্কাটা তাদের জন্য অবশ্যই আতঙ্কের জ্বলন্ত কারণ ছিল। তবু নিতান্ত নিরুপায় হয়ে এবং এই আশা নিয়ে যে পূর্ববঙ্গে ভোট ভাগাভাগি হয়ে যাবে। তারা প্রাপ্তবয়স্কদের মাথাপিছু ভোটের দাবি মেনে নিয়েছিল।

কিন্তু ওই মেনে নেওয়াটাই তাদের জন্য শেষ পর্যন্ত কাল হলো। দুরাশা সফল হলো না, আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হলো। এর পেছনে বাস্তবিক কারণ ছিল। প্রথমত মওলানা ভাসানী নির্বাচনে প্রার্থী দিলেন না। না দেওয়ার কারণ তিনি চাইছিলেন ভোট ভাগাভাগি না হয়ে নির্বাচনের ভেতর দিয়ে পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতার পক্ষে একটি সর্বজনীন রায় বেরিয়ে আসুক। দ্বিতীয়ত পূর্ববঙ্গের মানুষ তখন এতই মোহমুক্ত হয়ে পড়েছিল যে, তারা আর পাকিস্তানে থাকতেই চায়নি, বরঞ্চ ওই রাষ্ট্রের সামরিক বেষ্টনী থেকে বের হয়ে আসতে চেয়েছে, ছয় দফাকে তারা স্বাধীনতার এক দফায় পরিণত করতে চেয়েছিল, যে জন্য সব ভোট তারা ছয় দফার বাক্সেই ফেলেছে, এদিক-ওদিক না তাকিয়ে। সামরিক বাহিনীর লোকরা অবশ্য চেষ্টা করছিল ইসলামপছন্দ মার্কাদের জিতিয়ে আনতে, এ জন্য তারা অর্থ সরবরাহ করা থেকেও বিরত থাকেনি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি, রায় বেরিয়ে এসেছে ছয় দফার পক্ষে। এমনভাবে বেরিয়ে এলো যে, বোঝা গেল লোকে স্বায়ত্তশাসন নয়_ স্বাধীনতাই চায়; এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে এই গণরায়কে অমান্য করার কোনো উপায়ই ছিল না।

পূর্ববঙ্গবাসীর পক্ষে তাই প্রত্যাশাটা দাঁড়িয়ে গেল স্বাধীনতারই। তারপর এলো যুদ্ধ এবং যুদ্ধের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো এই সত্য যে, ওই যুদ্ধ কেবল সাতচলি্লশে পাওয়া স্বাধীনতার মতো একটি নতুন রাষ্ট্রের প্রত্যাশাকে ধারণ করছে না, সে লালন করছে মুক্তির স্বপ্নকে। মুক্তির মাত্রা ও বিস্তৃতি সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা তখন গড়ে ওঠেনি এটা ঠিক; কিন্তু যুদ্ধটা যে মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল এবং এটা যে প্রচলিত সামরিক যুদ্ধ থাকেনি, রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল একটি রাজনৈতিক জনযুদ্ধে, এই দুটি বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকেনি।

মুক্তির ওই স্বপ্নের ভেতর কয়েকটি প্রত্যাশা তো অবশ্যই ছিল। সবচেয়ে বড় প্রত্যাশাটিই দাঁড়িয়েছিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার। পাকিস্তান ছিল ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের মতোই পরিপূর্ণরূপে একটি আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র; মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রাকারে ওই রাষ্ট্রের পুনরুত্থান চাইনি, স্বপ্ন দেখেছি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এবং তার অভ্যন্তরে একটি গণতান্ত্রিক সমাজের। এই যে নতুন রাষ্ট্র ও সমাজের প্রত্যাশা, এর ভেতরে অবশ্যই আরও অনেক প্রত্যাশা কার্যকর ছিল; যেমন রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ অর্থাৎ রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের কোনো প্রকার সম্পর্ক থাকবে না। সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত হবে এও ছিল প্রত্যাশা। সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হলো ইহজাগতিকতা। প্রত্যাশার মধ্যে ছিল এটাও যে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা তো হবেই, উচ্চস্তরে শিক্ষাও দেওয়া হবে মাতৃভাষার মাধ্যমে, উচ্চতর আদালতের ভাষাও হবে বাংলা। তিন ধারার শিক্ষা পাকিস্তানে ছিল সেটা থাকবে না, সবাই শিক্ষা পাবে এবং সেটি পাওয়া যাবে একটি অভিন্ন সর্বজনীন ধারার ভেতর দিয়ে। দেশে যা সম্পদ আছে তাকে বিকশিত, উত্তোলিত ও বিতরণ করা হবে। শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। দেশীয় পুঁজির বিনিয়োগ ঘটবে। বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর বিশ্বে শোনা যাবে এবং সেই কণ্ঠে নিপীড়িত বিশ্বের বাণী ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হবে। এসবই ছিল প্রত্যাশার অংশ।

নয় মাসের যুদ্ধে আমরা জয়ী হলাম। রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বাধীনতা পাওয়া গেল। আধুনিককালের ইতিহাসে বাঙালি এই প্রথম একটি নিজস্ব রাষ্ট্র স্থাপন করল, যার রাষ্ট্রভাষা হলো বাংলা। দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের নাম ছড়িয়ে পড়ল। যুদ্ধ করে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটেছে, তাই বাঙালির সম্মান তখন অসাধারণ উচ্চতায় পেঁৗছেছে। কেবল বাংলাদেশের মানুষ বলে নয়, পৃথিবীর যে দেশে যত বাঙালি আছে সবাই পূর্ববঙ্গের এ অসামান্য অর্জনে গৌরববোধের সুযোগ পেয়েছে পাকিস্তানি নয়, ভারতীয়ও নয়, বাঙালি নিজেকে বাঙালি বলেই পরিচয় দেওয়ার অধিকার অর্জন করেছে।
সব পুঁজিবাদী ও মুসলিম বিশ্বের সমর্থনপুষ্ট এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রেশস্ত্রে সুসজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে বাংলার মাটিতে গেরিলা আক্রমণের দ্বারা বিপর্যস্ত এবং আত্মসমর্পণে বাধ্য করার যে মনস্তাত্তি্বক তাৎপর্য সেটাও সামান্য নয়। এর মধ্য দিয়ে আমাদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার বোধ দুটিই বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরাও যে পারি এটা বুঝিয়ে দিতে পেরেছি এবং আমাদের আঘাত করলে প্রত্যাঘাত যে প্রাপ্য হবে এটাও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। মতাদর্শিকভাবে পাকিস্তানি ধ্যানধারণা অর্থাৎ তথাকথিত দ্বিজাতিতত্ত্ব এবং ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা প্রত্যাখ্যাত ও পরাভূত হয়েছে। এমনটা তারা আশা করেনি। এ তো কেবল রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর পরাজয় নয়, এ হচ্ছে রাষ্ট্রের যে ভিত্তি সেটাই নাকচ হয়ে যাওয়া। পাকিস্তান অবশ্য কোনো মতাদর্শের জোরে টিকে ছিল না, তার টিকে থাকার ভিত্তিটা মূলত ছিল সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা এবং পুঁজিবাদী বিশ্বের সমর্থন।

স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে বাঙালির পক্ষে বাঙালি পরিচয় নিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার। সুযোগ এসেছে মাতৃভাষাকে শিক্ষা, প্রশাসনিক কাজকর্ম ও আদালতের ভাষা হিসেবে কার্যকর করার। বাংলাভাষার ভবিষ্যৎ যে পূর্ববঙ্গেই নিহিত_ এটা সত্য হয়ে উঠেছে। আগামী দিনে ঢাকাই হবে বাংলা সাহিত্যের রাজধানী এমন কথাও উঠেছে এবং এটি যে কোনো অমূলক ধারণা, তাও নয়।

কিন্তু এসবই হলো প্রত্যাশার রেখাবয়ব। আসল প্রত্যাশা ছিল ভেতরে। যেমন ধরা যাক সমাজকে গণতান্ত্রিক করা। সে জন্য যা আবশ্যক তা হলো একটি সমাজ বিপ্লব। সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সমাজ বড় হয়ে উঠবে রাষ্ট্রের চেয়ে, সেখানে শোষণ-নিপীড়ন থাকবে না এই ছিল প্রত্যাশা। রাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়নও সমাজ বিপ্লবের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে পারত। সমাজে গণতন্ত্র না থাকলে রাষ্ট্রে থাকবে কী করে? কিন্তু তেমনটা ঘটেনি। ব্রিটিশের তৈরি আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের কাঠামো পাকিস্তানিরা ভাঙেনি, কেননা ভাঙার প্রয়োজন দেখা দেয়নি, রাষ্ট্রের ওই সংগঠন এবং চরিত্র তাদের নিপীড়নমূলক ও জনবিচ্ছিন্ন কার্যকলাপকে পরিপূর্ণরূপে সহায়তা দান করেছে। কথা ছিল স্বাধীন হলে ওই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আমরা ভেঙে ফেলব। বড় পাকিস্তান ভেঙে তুলনায় কিছুটা ছোট আরেকটি রাষ্ট্র আমরা কায়েম করব না। মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী চরিত্রে পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা জেগে উঠেছিল; কিন্তু সে সম্ভাবনা তো বাস্তবায়ন হয়নি। বরঞ্চ রাষ্ট্রের নাম, আয়তন, সংবিধান, জাতীয় পতাকা_ অনেক কিছুই বদলালেও তার অন্তর্গত আমলতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী মর্মবস্তু অক্ষুণ্নই রয়ে গেছে। সেখানে আছে আমলাতন্ত্রের শাসন এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাছে পরিপূর্ণ রূপে আত্মসমর্পণ। বাংলাদেশে দুর্নীতি কী পরিমাণে আছে সেটা মেপে দেখার জন্য বিদেশি সংস্থার সাহায্যপ্রার্থী হওয়ার প্রয়োজন নেই। দুর্নীতি তো এ দেশের সব নাগরিকেরই মর্মান্তিক দুর্ভোগ এবং যে রাষ্ট্রে সব ক্ষমতা আমলাদের হাতে, অর্থাৎ তাদের হাতে যাদের নেই কোনো জবাবদিহিতার দায় এবং যারা পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতার মধ্য দিয়ে কাজ করে এবং যেখানে সব কিছুর মূল্য নির্ধারিত হয় টাকার মাপে সেখানে ঘুষ ছাড়া কাজ হবে কী করে? কে-কাকে শাস্তি দেবে? কার কাছে বিচার পাওয়া যাবে?

সংবিধানে এখন ধর্মনিরপেক্ষতা নেই, সমাজতন্ত্রের স্বপ্নকে বিতাড়িত করা হয়েছে। শিক্ষার ধারা একটি নয়_ তিনটি এবং কারও সাধ্য নেই যে, তিন ধারাকে এক করবে, কেননা ধারা তিনটি দাঁড়িয়ে আছে শ্রেণীবিভাজনের ওপর ভর করে এবং শ্রেণীদূরত্ব মোটেই কমছে না বরঞ্চ বাড়ছে এবং তিন ধারার শিক্ষা ওই দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। শিক্ষা সামাজিক ঐক্য আনবে কী, বরঞ্চ উল্টো কাজ করে চলেছে। মাতৃভাষার চর্চা যেমন হওয়া উচিত ছিল সেভাবে হয়নি; উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা প্রচলনের যে চ্যালেঞ্জ ছিল সেটাকে ঠিকমতো গ্রহণই করা হয়নি, বাকিটা তো পরের কথা। উচ্চ আদালতে কার্যক্রম কবে বাংলায় চালু হবে বা আদৌ হবে কি-না সেটা কেউ বলতে পারে না। পুঁজিবাদী মূল্যবোধ মানুষকে পরস্পরবিচ্ছিন্ন, সমাজবিমুখ ও ভোগবাদী করে তুলেছে। প্রত্যাশা থেকে এই প্রাপ্তিটা যে কত দূরে তা বুঝিয়ে বলাটা প্রায় অসম্ভব বৈকি।

একটি নতুন এবং বড়মাপের বিপদ তো ইতিমধ্যে এসে জুটেছে। সেটা হলো জলবায়ু পরিবর্তন। এই পরিবর্তন অনেক দেশকেই আঘাত করবে, ইতিমধ্যে আঘাত শুরু হয়েও গেছে বৈকি; কিন্তু বাংলাদেশের দুর্ভোগটাই হবে সবচেয়ে কঠিন বলে ধারণা। কেননা আমাদের দেশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ ও দরিদ্র, তদুপরি ওটি একটি বদ্বীপ। ফলে প্লাবন, খরা, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস যা কিছুই আমাদের আঘাত করছে তা-ই আমাদের পক্ষে সহ্য করা কঠিন হবে। এখনই হচ্ছে। আর দেশের একাংশ যদি সমুদ্রের নিচে চলে যায় তবে অবস্থা যে কী দাঁড়াবে তা কল্পনা করাও কঠিন।

বাংলাদেশের নিজস্ব কণ্ঠ আছে, সেই কণ্ঠে এই বিপদের কথাটা অত্যন্ত প্রবলভাবে ধ্বনিত হওয়া আবশ্যক। দোষটা আমাদের নয়, দোষ করেছে পুঁজিবাদী বিশ্ব, ভুক্তভোগী হচ্ছি আমরা। পুঁজিবাদী বিশ্বকে তাই অভিযুক্ত করা চাই, তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে; কিন্তু আরও বড় কাজ যেটা সেটা হলো, পুঁজিবাদকে প্রতিহত করা দরকার যাতে তারা মানুষের ভবিষ্যৎকে এভাবে বিপন্ন করে তুলতে না পারে। কাজটা চলছে। আন্তর্জাতিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে, তাতে আমরা যোগ দেব_ প্রত্যাশা এটাও। কিন্তু প্রত্যাশাগুলো পূরণ হবে না, যদি না দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক মানুষ এগিয়ে আসেন এবং জনগণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আন্দোলন গড়ে না তোলেন, যেমনটা তারা অতীতে করেছিলেন এবং করেছিলেন বলেই মুক্তিযুদ্ধের মতো ঘটনা ঘটেছিল।

[ad#co-1]