পদ্মার চরে, ঘুড়ি উৎসবে

wali_1মীর ওয়ালীউজ্জামান
মার্চের শেষ। বিষ্যুৎবার বিকেল। সারাদিন খবর লেখার কাজ করে ক্লান্তিতে যখন ঘুম আসছে, তখন শুনি বিডিনিউজ ইন্টারন্যাশন্যালের তপু বুলবুলকে বলছে, তাহলে কাল আমাদের পদ্মায় যাওয়া হচ্ছে তো? আমি তো যাচ্ছি, বুলবুল আমার দিকে তাকাল, একটা দিন একটু নড়েচড়ে ঘুরে ফিরে আসিগে। ওয়ালি ভাই, যাবেন নাকি? তপুর আহবান এবার আমার দিকে ভেসে এল। দেখি রাশিদাকে বলে, যদি স্বাধীনতা দিবসের ছুটি আমি আগাম কাটিয়ে আসতে পারি। রাশিদা আমার প্রস্তাবে সানন্দ সম্মতি দিল। বাড়িতে ফোন করে রুবিকে বললাম। কাল যাচ্ছি পদ্মায় বেড়াতে আর কে যাবে, জেনে জানাও, তপুকে জানাতে হবে। মিনিট দশেকে আমাদের আটজনের একটা নতুন গ্রুপ দাঁড়িয়ে গেল।

তপু অফিস ছাড়ার আগে বলে গেল, রাতে ফোন করে সব বিশদ জানাবে। সন্ধে থেকে ওকে ছবির হাটে গানের আসরে পাওয়া যাবে। আমি অফিস থেকে সাড়ে চারটে নাগাদ বেরিয়ে ট্যাক্সি ধরে শেরাটনের আঙিনায় ইউনিসেফ অফিসে গেলাম। ওখানকার কাজ সেরে বেরিয়ে একবার ভাবলাম, ছবির হাটের দিকে যাই। কিন্তু এই রোদ্দুরে কি আড্ডা-গান জমবে এক্ষুনি? মনে হয় না। অতএব বাড়ি ফেরাই সমীচীন মনে হল।

padma_2
শিশুরা পদ্মার চরে আনন্দে দিশেহারা

রাতে ‘বার্বিকিউ কুয়াকাটা সৈকতে’ লিখতে লিখতে ফোন পেলাম। ওয়ালি ভাই, তপুর কণ্ঠ ভেসে এল বাউল গানের ফাঁকে ফাঁকে, আমাদের যাত্রারম্ভের সময়ে একটু রদবদল হয়েছে। ১০টার পরিবর্তে আমরা ছবির হাট থেকে ন’টায় রওনা হয়ে যাব। তাহলে লৌহজং পৌঁছে হাতে অনেক সময় পাওয়া যাবে। কেমন? ঠিকাছে, আমি বলি, আমার শ্যালিকা সোমাও এইমাত্র কনফার্ম করল, ওরা যাবে। অতএব, আমরা সেই আটজন ঠিক রইলাম। সুচিত্রা বলেছে, তপু আবার জানালো, ওয়ালি ভাই-ভাবি গেলে আমিও যাব। আমাকে ফেলে যেও না তপু। বাহ্, ভালই তো, ঠিকাছে তপু, কাল সকালে দেখা হচ্ছে। রুবিকে বললাম, আমাদের মেয়েজামাই আর সোমা-শ্যামলকে বিস্তারিত জানিয়ে দাও যাত্রারম্ভের বৃত্তান্ত।

শুক্কুরবার ভোরে উঠে তৈরি হয়ে প্রাতরাশ সেরে সাড়ে আটটায় বেরিয়ে পড়লাম। রিকশা না পেয়ে কালো ট্যাক্সিতে চেপে দশ মিনিটে চারুকলা ইন্সটিটিউটের উল্টোবাগে ছবির হাটে পৌঁছে গেলাম। উৎসবধারীদের মধ্যে তরুণতর ক’জন আগেই পৌঁছে গেছে। খানিক বাদেই হ্যাপি-তপু এসে গেল, বুলবুল এল, একে একে আমাদের ছেলেমেয়েরা চলে এল, শ্যামল নামল এসে সপরিবারে। সোমার দুই মেয়ে অনন্যা আর উপমা সেজেগুজে এসেছে। আসলে বাচ্চাদের জন্য এসব আউটিং তো অপার রহস্য, অনাবিল আনন্দ সংবাদ বয়ে আনে। ন’টা বাজতেই তপু আমাদের বলল, আপনারা বাসে উঠে বসেন, না হলে তরুণেরা আড্ডা ভেঙে উঠবে না। অতএব, বাসে উঠে আরাম করে বসলাম। টুক্‌টাক আলাপ, পরিচিতির ছোট ছোট পালা চলতে লাগল। অবশেষে বাসের আসন সব ভর্তি হলে আমাদের বাসটা ছেড়ে দিল। আমাদের পেছনেই তপু আর বুলবুল বসেছে। বাস বুড়িগঙ্গা সেতুর এপারে তখন। ইংলিশ রোড, নয়াবাজার এলাকা পেরুচ্ছে।

ছেলেবেলায় আমাদের বাসা ছিল গোয়ালনগর লেইনে। তাঁতিবাজারেও আমার ক্লাসমেইট বাস করত ক’জনা। ইসলামপুরে পাহ্‌লোয়ানের দোকানে মোরগ-পোলাও খেতে যেতাম দলবেঁধে। গল্প চললো। সেতু পেরিয়ে গেলাম। কেরানিগঞ্জ। তপু এখানেই না আমাদের মুহম্মদ খসরুর বাড়ি? হ্যাঁ, তবে এখন উনি ওপার অর্থাৎ ঢাকা শহরেই থাকেন। তপু জানে না এখন যে আমাদের খসরু ভাই স্বভূমে ফেরত গেছেন।

বাস একটু পরেই বাঁয়ে ঘুরল, কানেক্‌টর সড়ক ধরে সোজা চলে আবার হাইওয়েতে উঠল, ধলেশ্বরী সেতু ১, ২ পার হয়ে স্যাটাস্যাট্ মাওয়া পৌঁছে গেল। এক ঘণ্টায়। আমরা অবাক। বাস ওখান থেকে করল কি—বাঁয়ে গোঁত্তা খেয়ে লৌহজং-এর রাস্তায় পড়ে আবার যেন ঢাকামুখো হল। অবশেষে মিনিট বিশেক পরেই ঘোড়দৌড়ের বাজারে গুদারাঘাটে চাক্কা জ্যাম।

হৈ হৈ করে সব নেমে পড়ে কচি ডাবের পানি, চা, ঘোল ইত্যাদি পানীয়ের সদ্ব্যবহারে ব্যাপৃত হল। ধূমপায়ীরা ফাঁকায় দাঁড়িয়ে ধূমপানে মনোযোগী হল বহুক্ষণ বাদে। দু’চারজন অবশ্য বাসে পেছনদিকে বসে বড় তামাকের ধোঁয়া টেনেছে, টের পেয়েছিলাম। সামনেই পদ্মার পাঁচশ’ গজ চওড়া সোঁতা। তারপর প্রকাণ্ড চর। চর পেরোলে পদ্মার মূল নদীখাত, বিশাল প্রসারে, ৮-১০ কিমি চওড়া খল্‌বলে জলস্রোতে মানুষকে ত্রস্ত করে বর্ষাকালে।

সাজ্জাদ সবাইকে ডাবের পানি খাইয়ে, শূন্য ডাবের পেট চিরিয়ে নরম শাঁস আঁচড়ে তুলিয়ে রুবির রোলের বাটিতে ভরে নিয়েছে। রোলগুলো আমরা বাসেই সাবাড় করেছিলাম। পদ্মা রিজর্টে যেতে আমাদের এই সোঁতা পেরোতে হবে। নৌকায় ঘুড়ি, লাটাই, ফানুসের সরঞ্জাম, খাবারদাবার, পানির জার সব তোলা হল। আমরা উঠে বসলাম। নৌকা ছাড়লে একটি অতিপ্রগল্‌ভা তরুণী একধারে বসে, পা ঝুলিয়ে দু’লে দু’লে নিচের জল ছুঁয়ে দেবার চেষ্টা করছিল। যারা দেখছিল, ভয় পাচ্ছিল, মেয়েটা যদি ব্যালান্স হারিয়ে জলে পড়ে যায়, তাহলে আরেক কেলো হবে তখন! আমার শ্যালিকা সোমা ব্যক্তিত্বময়ী। দশাসই চেহারার জাঁদরেল শিক্ষিকা। মেয়েটির কাণ্ড দেখে থাকতে না পেরে সে বকুনি দিল, এই মেয়ে, তুমি পা তুলে ঘুরে বোস আমাদের দিকে মুখ করে। একটা দুর্ঘটনা ঘটলে এখন সবার আনন্দ মাটি হবে। তুমি নিশ্চয়ই সেটা চাও না! মেয়েটি পা তুলে বসল ঠিকই, তবে মুখ ফিরিয়ে রইল।

ওপারে নেমে উঁচু পাড়ে উঠে সামান্য হাঁটলেই রিজর্টের সীমানা শুরু। চারদিক কাঁটাতারে ঘেরা। দুঃখ পেলাম, একটি সবুজবেষ্টনি তৈরি করা হল না কেন, সেটা বুঝতে, মানতে না পেরে। অপারগতার কষ্ট আর কি। ঢাকায় ফিরে রিজর্টের কর্ণধার মারুফকে বলব একথা। লোকজন এসেছে ভালই। ঢাকা থেকে বৌদ্ধ কৃষ্টি সংঘের নারীপুরুষ, শিশুরা উঠেছে অনেকগুলো কটেজে। আমাদের দু’টো কটেজের নাম কার্ত্তিক ও অগ্রহায়ণ। বাংলা বারো মাস এবং ছয় ঋতুর নাম এই আঠারোটি কটেজকে চিহ্নিত, গৌরবান্বিত করেছে। দৃষ্টিনন্দন কাঠ বাঁশ ইত্যাকার দেশজ নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে তৈরি কটেজগুলো দোতলা। নিচে বসার ব্যবস্থা, ওপরে শোবার। দেড়তলার উচ্চতায় বারান্দা। চমৎকার। পুরো কাঠামো বালুময় চরের লেভেল থেকে অন্তত দুই-আড়াই ফুট ওপরে খুঁটির ওপর বসানো। বর্ষায় কটেজের নিচে এবং চরাচর জুড়ে বেনোজল খেলা করে। আহ্, চোখ বুঁজে ভাবলেই শান্তি!

padma_9
ঘুড়ি ওড়ানোর প্রস্তুতি

কেন যে এরা চারদিকে সীমানা চিহ্নিত করে, বাইরে ও ভেতরের উঠোন-আঙিনায় গাছ লাগায়নি, সেটা বোধগম্য হচ্ছে না মোটেও। ঠ্যাঙামারার ড. হোসনে আরাকে খবর দেবার কথা ভাবছিলাম। টিএমএসএস উত্তরবঙ্গে ধানক্ষেতে পরিসর বুঝে বাঁশবন, খেজুর বাগান পর্যন্ত তৈরি করেছে। ‘কার্তিক’ কটেজে বসে সোমা, রুবি ইতোমধ্যে মিনি লাঞ্চ লাগিয়ে দিয়েছে। প্রচুর সব্‌জি-ডিম দিয়ে অতি চিকন নুডুল্‌স লালচে করে ভাজা, এগরোল, দোমালা ডাবের শাঁস যা দিয়ে অনায়াসে খাসি মোরগের দুর্দান্ত রান-টাগ্‌রান রান্না করা যায় আর ফ্লাস্কভর্তি চা আর কালো কফি। কফি খেতে খেতে মোস্তফা মামুনের ম্যাজিক বয় বের করলাম ঝোলা থেকে। বেড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে আজ বইটি পড়ে ফেলতে হবে।

পেছনের আঙিনায় বসার ব্যবস্থা রয়েছে নানারকম। তপু ছোটাছুটি করছে বাচ্চাদের খাবার-ফ্রুট জুস ইত্যাদি গছানোর তালে। বললাম, তপু, বুলবুলকে নিয়ে রুবির ওখানে রিপোর্ট করেন, সামান্য জলযোগের ব্যবস্থা রয়েছে। ওক্কে, বলেই তপু বারান্দায় কাঠের রেল টপ্‌কে নিচের সবুজ ঘাসে পড়ে একবার ডিগবাজি খেল, তারপর আঙিনার সব বাচ্চাকে ডেকে ডেকে ম্যাংগোজুস আর চিপ্‌স বিলি করতে লাগল। দোলনা-টোল্‌না পার হয়ে আমি এককোণে ছোট্ট চন্দ্রাতপতলে গিয়ে বসলাম। মামুনের কাহিনী বেশ দানাদার হয়ে উঠছে। আমলকি চিবুচ্ছি, পড়ছি, মাঝে মাঝে চারদিকে ঘুরে সবুজ দেখছি, সিগ্রেট খাচ্ছি, পানি খাচ্ছি। ভালই কেটে যাচ্ছে দুপুর।

তপুর ফোন এল। ‘কার্তিকে’র দোতলায় একটু আসবেন? অবশ্যই, বলে বই মুড়ে, টুপি মাথায়, ঝোলাকাঁধে উঠলাম। সবাই ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। আমার মেয়ে, জামাই, অনন্যা, উপমা—সবাই এক-একটি ঘুড়ি আর লাটাই বাগিয়ে তখন আকাশটাকে খানিকটা বাগে আনার চেষ্টায় রত। অনন্যার ঘুড়িটা আমি উড়িয়ে দিতে চাইলাম। কিন্তু ফিট দশেক উঠেই ঘুড়িব্যাটা নোজডাইভ করে বালুতে গেঁথে গেল। আত্মবিশ্বাসের কুতুব মিনার আমার ভেঙে পড়ার উপক্রম। বললাম, কী জান অনন্যা, খুব জোর না হলেও কিছু বাতাস অন্ততঃ দরকার আমাদের, বিশেষ করে, ঘুড়িদের আকাশে উড়বার জন্য। এখন ঘুড়ির পালে একটুও বাতাস পাচ্ছে না, কাজেই আমি এখন চলি, কেমন? আমার ব্যাখ্যা শুনে লক্ষ্মী মেয়ে অনন্যা এতটাই ঘাড় কাত করে সম্মতি জানাতে গেল যে, ওকে আমি ধরে সোজা করে না দিলে লাটাই-ঘুড়ি আর ও জড়াজড়ি করে বালুশয্যা নিত। সম্মানজনকভাবে ঘুড়ি ওড়ানোর চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করে আমি আর ডান-বাঁ কোনো দিকে না তাকিয়ে টুপিটার বারান্দা টেনে চোখ প্রায় ঢেকে নিয়ে, হোঁচট খেতে খেতে বালুভূমি ছেড়ে কটেজের ব্রিজে উঠে পড়লাম।

হন্‌ হন্ করে ‘কার্তিক’ লক্ষ্য করে চলতে চলতে আমাদের দলের অনেকের সঙ্গেই কলিশ্যন হতে হতে বেঁচেবর্তে শেষে সুচিত্রার সঙ্গে মুখোমুখি হলাম। ওরা নাকি দ্বিতীয় বাসটায় চড়ে এক্ষুনি এসে পৌঁছেছে। বেশ, বেশ, তা ভাল করে হাতমুখপা ধুয়েটুয়ে বসে নদীর বাতাসে গা জুড়োন, আমি একটু ওপরে যাচ্ছি। আপনার বন্ধু তপু কেন যেন খবর দিল একটু আগে, বলে আমি দোতলার কাঠের সিঁড়িতে পা দিলাম। আমি কি আসতে পারি, সুচিত্রার সুভদ্র জিজ্ঞাসা আমার পা আটকে দিল। হ্যাঁ-অ্যা-অ্যা। না, দাঁড়ান, তপুকে জিজ্ঞেস করে বলছি। বলেই আমি এবারে ধনুর্ভঙ্গ গোঁ নিয়ে, আর কারো কোনো কথাই শুনছি না, সিদ্ধান্ত নিয়ে ওপরে উঠে গেলাম। ঘরে সেঁধিয়ে আহলাদে নেচে উঠতে ইচ্ছে হল। কিন্তু সংযত, সংহত হয়ে সৌম্য আমি বিছানায় উঠে গদীনশীন হলাম।

তপুর আপ্যায়ন দক্ষতা ঈর্ষণীয়। সুমেরু মুখার্জি আমার সঙ্গে ঐকমত্য প্রকাশ করলেন নির্দ্বিধায়, অকপটে, মৃদুস্বরে। আর ছিলেন সহকর্মী কলমযোদ্ধা বুলবুল আর ছবির হাটকেন্দ্রিক আড্ডার মধ্যমনি সালেহ্। আলাপ-পরিচয় সাঙ্গ হলে তপু সবার হাতে তুলে দিল লেবুর রসজারিত রুশীয় নামধারী এক পানীয়। ঘুড়ি উৎসবের প্রাণপুরুষ সালেহ্ শোনালেন সেন্ট মার্টিনের দ্বীপে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঘুড়ি ওড়ানোর ওপর আয়োজিত কর্মশালার বিশদ বৃত্তান্ত। মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম সবাই, সুচিত্রা আর তপুর গিন্নি ব্যবহারজীবী সুখি (ওর নাম আসলে হ্যাপি) অনেকগুলো বিরিয়ানির কৌটো এনে আমাদের পরিবেশন করলো। চমৎকার স্বাদু খাবার। পুরনো ঢাকার নান্না বাবুর্চির চিকেন বিরিয়ানি, কাবাব। অতখানি ভাতভাজা আমি আগে কখনো এক সিটিং-এ উদরস্থ করতে পেরেছি কিনা জানি না। আড্ডা, খাওয়ার দ্বিপ্রাহরিক পর্ব শেষ হতে নিচে নেমে গিয়ে আবার খোলা প্রান্তরে সবুজ ঘাসে পাতা চেয়ারে আধশোয়া হলাম। ম্যাজিক বয় আমার দখল নিল আবার।

রুবি এসে পাশে বসলো। ছেলেমেয়েরা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। কোন ফাঁকে যেন খেয়ে নিয়েছে ওরা, রুবি জানালো। ছোটরা অত্যন্ত স্বচ্ছন্দবোধ করছে, পরিবেশটাই এমন অবারিত যেখানে। আরেকটি পরিবার এসে বসলো। ওদের ছেলে রাইয়ান কেবল ছুটে ছুটে যায় কোনো ঘুড়ির পেছনে, আর মা-বাবা হা হা করে ছোটে ওকে ফেরত আনতে। প্রচণ্ড বাতাস এলোমেলো। এক কাপ সুগন্ধি চা পেলে হত। বুলবুলকে বলেছিলাম, চায়ের সন্ধান পেলে আমাকে ডেকে নিতে। তা বুলবুল গেল পদ্মায় স্নান সারতে আরো অনেকের সঙ্গে। ভায়রা শ্যামল এসে ডাকলো, দুলাভাই, চলেন, চায়ের খোঁজে যাই, ওদিকে ক্যাফেটোরিয়া আছে শুনলাম। উঠলাম।

তপুর সঙ্গে দেখা। ওকেও চায়ের নেমন্তন্নে ডাকা হল। ক্যাফেটেরিয়ায় ঢুকে মনে হল, তপুই ওটার পরিচালক, আমাদের টেবিলে বসিয়ে চলে গেল রিসেপশনে। ওখানে তুমুল গোলমাল চলছে তখন। বৌদ্ধ অতিথিরা চটেমটে লাল। পানি নেই, কারণ বিদ্যুৎ নেই। কিনে খাবে, সেরকম বোতলজাত পানিও নেই। এটা একটা কাজ হল? আমিও আশ্চর্য হলাম। এত বড় রিজর্ট, সেখানে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা নেই, খাবার জল নেই। তাহলে কি রইল আর? সেই গল্পের মতো আবার না হয়… সেই যে… তাইলে কী করমু আফনেই কন ছাছা। কী-ও করতে ফারবি না হারামজাদা, ছুপ্।

padma_7
padma_8
সন্ধ্যে নামতেই ফানুস ওড়ানোর পালা

সে যাক্‌গে শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ অতিথিদের ক্ষিপ্ত হতে দেখে খারাপই লাগল। তপু এরি মধ্যে আমাদের জন্য চা নিয়ে এল। অজস্র ধন্যবাদ, তপু। আপনার চা? একটু আগেই খেয়ে গেছি আমি। চা খেয়ে বাইরে বেরিয়ে আমরা ঘুড়ি ওড়ানো দেখলাম কিছুক্ষণ। তারপর পদ্মার ধারে হাঁটতে গেলাম। ঘাটে বাঁধা ডিঙিতে বসে নদীর জলে পা ডুবিয়ে দুর্দান্ত গল্পকার সুমেরু। চেঁচিয়ে বলি, লবস্টার মুখার্জি, রোদে বসে টুক্‌টুকে লাল গলদাটি হয়ে গেছেন যে, সে খেয়াল আছে? মুখার্জি ঠিকই শুনতে পেয়েছে, দাঁড়িয়ে বলল, স্মোক করে নিন দাদা এই বেলা, বেঁচে যাই তা’লে। সমবেত হাসির রোল পড়ে গেল। দুই-তিন কিলোমিটার যাবার পর খেয়াল হল, কেউ জলের বোতল নিইনি। বিরিয়ানি আর চা মিলে পেটে আটাকামা মরুভূমির সূত্রপাত করেছে, সেখানে বইছে সিম্যূম। সাঁঝের মায়া আমাদের সকলকে অধিকার করে ম্লান, বিষণ্ন মেন্হিরে রূপান্তরিত করল প্রায়। বড়তামাকেরও ভূমিকা ছিল অবশ্য তাতে।

ফিরে এসে দেখলাম, ফানুস ওড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। জলযোগ করে আবার চা খেতে গেলাম—নিলয়, সুচিত্রা আর আমি। সন্ধ্যের ঘোর লেগেছে। ঐ উড়ে যায় ফানুস। সবাই হাততালি দিল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে অগুনতি। আমরাও হাততালি দিলাম ক্যাফেটেরিয়ার টেরাসে বসে, চাপ চাপ আঁধার চেপে আসছে চারদিক থেকে, অনুভব করলাম। সুচিত্রা নিরবতা ভাঙল, যেতে ইচ্ছে করছে না এখান থেকে। নিলয় বলল, পরের বারে এসে থেকে যাব। যে ক’দিন ভাল লাগে, আমি যোগ করি। আমরা উঠে পড়ি। যাবার সময় হল।

padma_11
অতিকায় রঙিন গঙ্গা ফড়িং?

বুলবুল আর আমি দুই প্রায়ান্ধজন হাত ধরাধরি করে ফার্স্ট বোটে পদ্মা পাড়ি দিলাম ঘুট্ঘুটে আঁধারে। আমি প্রকৃতপক্ষে চোখ বুঁজে থাকলেই পারতাম। কারণ, কিছুই দেখছিলাম না। এপারে বাজারে বিজলিবাতির আলোয় চক্ষুষ্মান হয়ে ফোন করলাম রুবিকে। ওরা তপুদের সঙ্গে আসছে। আমি, বুলবুল বাসে উঠে বসে রইলাম। অবশেষে সবাই এল। রাত সাড়ে আটটা। বাস ছেড়ে দিল। সাড়ে ন’টায় চারুকলার ফটকে। তিনটে রিকশায় আমরা চারজন বাড়ি ফিরলাম। ঘুড়ি উৎসব ফুরলো। গল্পের নটে গাছটি কিন্তু মুড়োয়নি।

৮ এপ্রিল ২০০৯
mir.waliuzzaman@bdnews24.com

[ad#co-1]