চরিত্র

ইমদাদুল হক মিলন

কী খবর কী রবি সাহেব? আছেন কেমন?

ড্রাইভ করতে করতে নিজেকে নিজে এই প্রশ্নটা রবি হঠাৎই করলো। কোনও কারণ নেই, তবু করল।

এটা রবির স্বভাব। হঠাৎ হঠাৎ নিজেকে এই প্রশ্নটা সে করে। জানতে ইচ্ছে করে সে কেমন আছে?

গাড়িতে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজছে। হেমন্ত গেয়ে জনপ্রিয় করিয়েছেন এমন কতগুলো গান শ্রীকান্ত আচার্য গেয়েছেন। এই একটি পুরুষকণ্ঠ অনেকদিন পর রবির খুবই মনে ধরেছে। ভরাট, উদাত্ত গলা। যে কোনও গানই সুন্দর করে গায়। এখন গাইছে,

তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যতদূরে আমি যাই

কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই।

সীডস্টোর বাজারের ভিতর দিয়ে পশ্চিমদিকে একটা রাস্তা ঢুকে গেছে। রাস্তার মুখে রিকশা টে¤েক্সা হেনতেনর বেশ একটা জ্যাম। ভালুকা ময়মনসিংহ ওদিককার কয়েকটা লম্বা লম্বা বাস দাঁড়িয়ে আছে। জায়গাটা পেরুতে সময় লেগে গেল। তারপর একদম ফাঁকা। সুন্দর রাস্তা। দুদিকে সবুজ ধানের ক্ষেত, মানুষের ঘরবাড়ি পুকুর। এদিকটায় বিস্তর কাঁঠালগাছ। পথপাশের কাঁঠালগাছের পাতা গাড়িতে বসেও রবি দেখতে পেল একটু বেশিই যেন সবুজ। অক্টোবরের শেষদিকে কি কাঁঠালপাতা বেশি সবুজ হয়?

মিনিট বিশেক পর আর একটা রাস্তার মুখে এলো রবি। হাতের ডানদিকে ঢুকে গেছে রাস্তা। এখানটায় কিছু দোকানপাট আছে। অষুদের দোকান, চায়ের দোকান, মুদি মনোহারি। এই রা¯া দিয়েই তো ঢুকতে হবে? কাউকে জিজ্ঞেস করবার দরকার আছে?

না কোনও দরকার নেই। এই রা¯ায় রবি এখন ঢুকবে। যদি বাড়িটা খুঁজে না পায় তাহলে ঘুরে আসবে। ঘুরতেই থাকবে। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করবে না। একা একাই খুঁজে বের করবে বাড়ি। সিরাজকে ফোনও করবে না। তাকে বলা হয়েছে এই এলাকার কথা। আর ওরকম বাড়ি, খুঁজে না পাওয়ার তো কোনও কারণ নেই।

রবি ভেবেছিল বাড়ি খুঁজে না পেলে বেশ একটা মজা হবে। চারদিকে বিকেল হয়ে আসা আলো। গাছপালা ধানের মাঠ আর নির্জন বিষণœ রা¯া। এ রকম একটা পরিবেশে গাড়ি নিয়ে একা একা চলতে থাকলেও তো ভালোই লাগবে।

ভালো লাগাটা রবির বেশিক্ষণ থাকলো না। ঠিক রা¯ায়ই ঢুকেছে সে। পাঁচ সাত মিনিট পরই রা¯ার পাশে দেখে বিশাল লোহার গেট। গেটের পাশে শ্বেতপাথরের লেখা ‘হৃদয়পুর’।

হৃদয়পুর!

ভালো নাম।

সিরাজ শালা তো দেখি হাফ কবি। এরকম গ্রামে পয়ষট্টি বিঘা জমি কিনে বাংলো পুকুর গাছপালায় একাকার করে নাম দিয়েছে ‘হৃদয়পুর’। বাপ রে!

ইট রংয়ের গেটটা পুরোপুরি খোলা। রবি গাড়ি নিয়ে ঢুকে গেল। গেট থেকে বাংলো পর্যš রা¯াটা একটানে চলে এলো।

বাংলোর সামনে বেশ বড় সবুজ একখানা মাঠ। কোনও গাছপালা নেই। শুধু ঘাস। এই আইডিয়াটা ভালো লাগল রবির। মনে মনে বলল, মাঠের ধারে বাড়ি।

গাড়িটা মাঠের ধারেই পার্ক করল।

রবির সঙ্গে মাঝারি সাইজের একটা ব্যাগ কয়েকটা বই আর ল্যাপটপ। জিনিসগুলো পিছনের সিটে রাখা আছে। গাড়ি পার্ক করে পিছন দিককার দরজা খুলে ল্যাপটপ আর বইগুলো হাতে নিয়েছে, ব্যাগটা নেবে, কে একজন ব্য¯গলায় বলল, আমারে দেন স্যার।

মানুষটার মুখের দিকে তাকালো রবি। ও আপনি? মানে তুমি হারু?

হারু ব্যাগটা নিল। জ্বি স্যার জ্বি।

বাড়ির কেয়ারটেকার?

জ্বি স্যার জ্বি।

স্যারের সামনে পিছনে দুজায়গায় জ্বি লাগাবার দরকার নেই। একটা লাগালেই চলবে।

জ্বি স্যার জ্বি।

আবার?

হারু লাজুক মুখ করে হাসল। স্যার।

দ্যাটস গুড। শুধু স্যার। শোনো হারু, আমি লেখক হলেও তেমন গুরুগম্ভীর লেখক না। একটু ঠাট্টা মশকরা, হাসিমজা করা মানুষ। চলো।

স্যার।

হারুর পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে রবি বলল, এবার বলো তোমাদের স্যার আমার স¤ক্সর্কে কী বলেছেন?

বলেছেন আমার বন্ধুঃ

বাকিটা রবি নিজেই বলে দিল। রবি হক সাহেব আসবেন। কয়েকদিন থাকবেন। তুমি ভালো মতো তাঁর টেককেয়ার করো।

স্যার।

এবার কিন্তু ‘জ্বি’ টা লাগাতে পারতে।

হারু হাসিমুখে বলল, জ্বি স্যার।

রুমে ঢুকে রবি বলল, হারু, তুমি পানি গরম করতে পারো?

হারু অবাক! কথাটা যেন বুঝতে পারেনি এমন গলায় বলল, কী গরম?

পানি।

পানি গরম?

হ্যাঁ।

পানি গরম করতে পারুম না ক্যান?

ব্যাগ থেকে সুন্দর একটা মগ বের করল রবি। এই মগে একমগ গরম পানি করে আনো।

মগ লাগবে না স্যার। মগ আছে।

আর পানি?

জ্বি স্যার?

পানি আছে তো?

হারু হাসলো। জ্বি স্যার, আছে স্যার। চা কফি সব আছে। কোনও কিছুর কোনও অভাব নাই।

বুঝেছি।

মগটা হারুর হাতে ধরিয়ে দিল রবি। গরম পানিটা এই মগেই আনো। এই মগ ছাড়া আমি খেতে পারি না।

কী খাবেন স্যার?

পরে বলছি।

হারু চিšিত ভঙ্গিতে মগ নিয়ে কিচেনে চলে গেল। রবিকে নিয়ে খুবই চিšায় পড়েছে সে। ওইসব জিনিস তো ঠাণ্ডা পানি বরফ এসব দিয়ে খেতে হয়। এই স্যার গরম পানি দিয়ে খাবেন? খেতে পারেন। স্যারটা তো পাগলা কিসিমের।

হারু চলে যাওয়ার পর ওয়াশরুমে ঢুকলো রবি। হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এলো। এখন আর জামা কাপড় বদলাবে না। ঘুমাবার আগে একবারে বদলে নেবে।

সেও বেরিয়েছে হারুও গরম পানি নিয়ে ঢুকলো।

রবি খুশি। এনেছো?

জ্বি স্যার।

ভালো হয়েছে?

জ্বি?

মানে গরম পানিটা ভালো হয়েছে কী না?

হারুর বলতে ইচ্ছে করল, গরম পানির আবার ভালো মন্দ কী! গরম পানি তো গরম পানিই! গরম পানি কি ডাইল যে ভালো হইছে না মন্দ?

কিন্তু সাহেবের বন্ধুকে এসব কথা বলা যাবে না। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হবে বিনয় করে।

হারু হাসিমুখে বলল, জ্বি স্যার, ভালো হয়েছে।

দ্যাটস গুড।

হারু তখন অপেক্ষা করছে, গরম পানি দিয়ে কী খাওয়া হবে ওটা দেখার জন্য।

ব্যাগ থেকে গ্রীন টির প্যাকেট বের করল রবি। একটা টিব্যাগ নিয়ে মগে দিল। এর নাম গ্রীন টি। দুধ চিনি ছাড়া এই জিনিস আমি ঘণ্টায় ঘণ্টায় খাই।

ভিতরে ভিতরে হতাশ হারু। ও এই কথা নি? আমি ভাবলাম কী, আর সে খায় কী? শালার তো ডায়বিটিস আছে। দুধ চিনি ছাড়া গিরিনটি মিরিনটি খায়। সিউর ডায়বিটিস।

চায়ে চুমুক দিয়ে তীক্ষèচোখে হারুর দিকে তাকালো রবি। তোমার কি ধারণা, আমার ডায়াবেটিস আছে?

হারু চমকালো। শালায় দেখি মনের কথা টের পায়!

মুখে বলল, জ্বি না স্যার। আমি সেইটা বলি নাই।

তাহলে তুমি কী বলেছ?

কই কিছুই তো বলি নাই স্যার।

না বলে ভালো করেছ। আমার ডায়াবেটিস নেই। হারু, তোমার রান্নার স্ট্যান্ডারড কেমন? চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে সুবিধার না।

খুব একটা খারাপও না স্যার।

তার মানে ভালোও না। আমি কিন্তু পচা রান্না খেতে পারি না। ভয় ধরিয়ে দিলাম নাকি?

জ্বি স্যার। ভয় পাচ্ছি।

দ্যাটস গুড। ভয় পাওয়া ভালো। রান্না ভালো হবে। যাও শুরু করো গিয়ে।

কী খাবেন স্যার?

তুমি কী খাওয়াবে?

আমাদের পুকুরে কইমাছ চাষ করা হয়। তেলাপিয়াও হয়।

ধরে রেখেছ?

জ্বি স্যার। কই তেলাপিয়া দুইটাই আছে।

দুটোই রান্না করো। ভাত সবজি ডাল আর দুই পদের মাছ। সঙ্গে আলাদা করে কাঁচা মরিচ পেয়াজ শসা ইত্যাদি। দু টুকরো লেবু। যাও।

হারু আর কথা বলল না। দ্রুত কিচেনের দিকে চলে গেল।

রাতে খেতে বসেছে রবি।

হারু দাঁড়িয়ে আছে অদরে। খাবার কেমন হয়েছে আল্লাই জানেন। ভেতরে ভেতরে ভালো রকমের একটা টেনসানে আছে হারু। স্যারের বন্ধুটা পুরাপুরি ফট্টি নাইন। কথাবার্তার ঠিক নাই। এই প্রথম একটি জ্যাš লেখক দেখছে হারু। নানান পদের মানুষ জীবনে দেখেছে। লেখক দেখছে এই প্রথম। লেখক কবিরা কি একটু পাগলা ধাঁচেরই হয় নাকি!

এইটা তো পুরা পাগল।

কই মাছের ঝোল ভাতে মাখিয়ে পর পর দুবার মুখে দিল রবি। প্লেটে তোলা মাছের কিছুটা ভেঙে খেল। খাওয়া শুরুর আগেই চামচে করে একচামচ সবজি তুলে মুখে দিয়েছে, ডাল মুখে দিয়েছে। যাই মুখে দিচ্ছে সেটা মুখে দিয়েই এমন করে তাকাচ্ছে হারুর দিকে, ওই তাকানোতে হারুর বুকের ধুগধুগনি বেড়ে যাচ্ছিল। একটু একটু পেচ্ছাপের ে ব্যাগও হচ্ছিল।

এটা হারুর স্বভাব।

ভয় পেলে, টেনসানে থাকলে বার বার পেচ্ছাপ চাপে।

তিনবার ভাত মুখে দেয়ার পর মুখ খুললো রবি। না, সুবিধার না।

হারু কোনও রকমে বলল, জ্বি স্যার।

কী জ্বি স্যার?

ওই যে আপনে বললেন সুবিধার না। ওইটা।

মানে?

মানি হইতছে আমার রান্না সুবিধার হয় নাই।

নিজেই বুঝেছ?

জ্বি স্যার।

দ্যাটস গুড। নিজের যোগ্যতা নিজের বোঝা ভালো। তবে হারু, তোমার এই রকম রান্না খেতে হলে এখানে আমি থাকবো না। আমি সিরাজকে বলেছি আমি তোর বাংলোয় থেকে কয়েকদিন রেস্ট নেব। একা থাকবো। ইচ্ছে হলে লিখবো, না হলে লিখবো না। তুই ব্যবস্থা কর। আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি এই ধরনের বাংলোর বাবুর্চিরা রান্না খুব ভালো করে। তোমার অবস্থা এমন কেন?

আমি স্যার বাবুর্চি না।

সেটা আমি জানি। একজন বাবুর্চি তোমাদের ছিল। ভালো রান্না করতো। সেটা ভেগেছে।

জ্বি স্যার জ্বি।

আবার দুটো জ্বি?

স্যার।

ওটার রান্না কেমন ছিল?

ভালো স্যার।

কোথায় ভেগেছে জানো?

না স্যার।

আহা। জানলে সুবিধা হতো।

কী রকম স্যার।

তোমাকে পাঠিয়ে ওটাকে ধরে আনতাম। হাতে কিছু টাকা পয়সা ধরিয়ে দিয়ে বলতাম, আমি যে কদিন থাকবো, রান্না করে খাওয়াও।

সে রকম একটা ব্যবস্থা স্যার আমি করতে পারি।

কী রকম ব্যবস্থা?

আমাদের বাংলোর কাছে এক মহিলা আছে। খুব ভালো রান্না করে।

তাই নাকি?

জ্বি স্যার জ্বি।

এক্ষুণি ডেকে নিয়ে আসো। এক্ষুণি।

হারু আমতা গলায় বলল, এত রাত্রেঃ

ও তাই তো! রাত তো অনেক হয়েছে। না না তাহলে এক্ষুণি ডাকবার দরকার নেই। সকালবেলা ডাকো। আমি যে কদিন থাকবো, তিনবেলা আমাকে রান্না করে খাওয়াবে। আমি পে করে দেব। রান্না করে যা পায় তারচে’ বেশিই দেব।

জ্বি স্যার জ্বি।

শোনো হারু, লেখক হলেও আমি কিন্তু আসলে পেটুক।

জ্বি স্যার জ্বি।

জ্বি মানে?

মানে আমি বুজছি স্যার।

রবি অবাক! বুঝেছ?

জ্বি স্যার।

দ্যাটস গুড। আমি যে পেটুক এটা তুমি বুঝে গেছ।

রবি হা হা করে হাসতে লাগল। হারুর মুখেও লাজুক টাইপের একটা হাসি।

খাওয়া শেষ করে বেসিনে হাত ধুতে ধুতে রবি বলল, গরম পানি দাও।

হারু অবাক! গরম পানি?

হ্যাঁ গরম পানি।

এত রাত্রে চা খাবেন স্যার?

আরে! তোমাকে না বললাম আমি ঘণ্টায় ঘণ্টায়ঃ। যাও।

জ্বি স্যার জ্বি।

হারু চলে যাওয়ার পর রবি মনে মনে বলল, কত পদের মানুষ যে আমাদের চারপাশে। এই হারুটাও একটা পদ। ওর পদের নাম ‘জ্বি স্যার জ্বি’।

মতি পিছন ফিরে শুয়ে আছে।

হতদরিদ্র বিছানার পাশে, মাটির দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে রাখা দুটো স¯া ধরনের ক্রাচ। সকালবেলার রোদ অনেক আগেই ঘরে ঢুকেছে দরজা জানালা দিয়ে। মতির ঘুম ভেঙেছে অনেক আগে, তারপরও বিছানা ছাড়েনি। শরীর জুড়ে অলসতা। নড়তে ইচ্ছেই করে না।

এক সময় মুখ ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকালো। ক্লাš গলায় ডাকলো, ছায়া, ছায়া।

ছায়ার সাড়া এলো না।

অতিকষ্টে উঠে বসল মতি। আবার ডাকলো। ছায়া, ছায়া। কোথায় তুমি?

ছায়া ছিল রান্নাচালার ওদিকে। মতির ডাক কানে গেল তার। প্রায় ছুটে এলো। কী হইল?

না হয় নাই কিছু।

পানি খাইবা?

না। তুমি বসো। তুমি একটু আমার পাশে বসো।

ছায়া মতির পাশে বসল। খারাপ লাগতাছে?

মতির দশাসই শরীর বেশ ভেঙেছে। মুখে দশ বারো দিনের দাড়িগোঁফ। তারপরও দেখতে ভালো লাগে তাকে। মাথায় সুন্দর ঝাকরা চুল। গায়ের রং ফর্সা। চেহারা সুন্দর। পাঁচ সাত বছর আগেও দেখতে রাজপুত্রের মতো ছিল। এখন যে এত অসুস্থ তারপরও ভালোই লাগে তাকে। অšত ছায়ার কাছে। সময় পেলেই স্বামীর মুখটা সে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে।

পাশে বসে স্বামীর বুকে হাত বুলাতে লাগল ছায়া। আবার বলল, তোমার কি খারাপ লাগতাছে?

মতি দুঃখি, ক্লাš গলায় বলল, কত আর খারাপ লাগবে, বলো? খারাপের তো আর শেষ নাই। প্রায় দেড়বছর বিছানায় পইড়া আছি। ধীরে ধীরে পঙ্গু হইতেছি। এখন ক্রাচ ছাড়া হাঁটতেও পারি না। একজন তরতাজা মানুষের এই অবস্থা হইলে খারাপের আর বাকি থাকে কী?

ছায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চেষ্টা তো কম করা হইল না। কত ডাক্তার, কত চিকিৎসা। জায়গা স¤ক্সত্তি যেটুকু বাকি ছিল সব তোমার চিকিৎসায় গেল। দুই চাইরদিন পর তো সংসারই চলবো না।

আমি জানি। আমি সব জানি। মায় এখন এই বাড়িটা বিক্রির চেষ্টায় আছে। না, আমার আর বাইচা থাকতে ইচ্ছা করে না।

ছায়া হাহাকারের গলায় বলল, না না এইভাবে বইলো না। এইভাবে বইলো না তুমি। ব্যবস্থা কিছু একটা হইবই। তুমি, তুমি ভালো হইয়া যাইবা।

মতি বলল, চরম ডায়াবেটিস। সঙ্গে নানান পদের অসুখ। ভালো হবো কেমনে? চিকিৎসার টাকা আসবে কোথায় থেকে?

এত হতাশ হইয়ো না। শোও, শুইয়া থাকো। আমি তোমার বুকে হাত বুলাইয়া দেই। মাথায় হাত বুলাইয়া দেই।

এ কথার ধার দিয়েও গেল না মতি। বলল, তোমার জন্যও আমার খুব কষ্ট। আমি তোমারে কিছুই দিতে পারলাম না। আমার সংসারে আইসা অভাব আর দুঃখকষ্ট ছাড়া কিছুই পাইলা না তুমি। স্বামীও অসুস্থ।

মতির কাঁধের কাছে মাথাটা রাখল ছায়া। অসুস্থ হও আর যাই হও, তোমার মতন স্বামী পাইছি এতেই আমি খুশি।

কী যে কও তুমি?

ঠিকই কই। মা বাপ মরা এতিম একটা মেয়ে আমি। গরিব মামার সংসারে বড় হইছি। তুমি যখন আমারে বিবাহ কইরা আনলা, তখন তুমি রাজপুত্রের মতন। এই বাড়িতে বড় বড় ঘর। কত ঝি চাকর। গোয়ালে আট দশটা গরু। মাঠে কত ধানের জমি। পুবদিককার ঘরের গোলা দুইটা ভরা সব সময় ধান আর ধান।

থাউক, এইসব কথা আর বইলো না।

সঙ্গে সঙ্গে কথা ঘুরালো ছায়া। অসুস্থ হইলে কী হইব, তুমি এখনও অনেক সুন্দর। তুমি যখন ঘুমাইয়া থাকো, আমি তাকাইয়া তাকাইয়া তোমার মুখটা দেখি।

মতি কেঁদে ফেলল। আমার জীবনটা এমন হইল ক্যান, ছায়া?

দুহাতে স্বামীর মাথাটা বুকে জড়িয়ে ধরল ছায়া। কান্নাকাটি কইরো না। তোমারে কাঁদতে দেখলে আমার কইলজাটা ফাইটা যায়।

ছায়া নিজেও কেঁদে ফেলল।

এই বাড়িতে আরেকজন মানুষ আছে, মতির মা। তার নাম আমেনা। অনেক সকালে আজ ঘুম থেকে উঠেছেন আমেনা। ফজরের নামাজ পড়ে নিঃশব্দে বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন। এই বয়সে পা তেমন চলে না। একদা বনেদী বাড়ির বউ ছিলেন। হাঁটাচলায় সেই বনেদীআনা এখনও কিছুটা রয়ে গেছে। তবু বাড়ি থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে পা চালিয়েছেন। বাংলো বাড়িটায় এসে যখন ঢুকেছেন তখন বেলা অনেকখানি। তিনি কিছুটা ক্লাšও হয়েছেন। বাড়িতে ঢুকে একটু দাঁড়ালেন, একটু জিরিয়ে নিলেন। তারপর হারুর খোঁজে কিচেনের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তিনি এসেছেন হারুর কাছে। যখন কিচেনের কাছাকাছি এসেছেন, হারু ব্য¯ ভঙ্গিতে ঠিক তখনই বেরিয়ে এলো। আমেনাকে দেখে মুখ উজ্জ্বল করে হাসল। কী আশ্চর্য কাণ্ড!

আমেনা অবাক! আশ্চর্য কাণ্ড মানে?

এই যে তুমি আসছো।

এইটা আশ্চর্য কাণ্ড হবে কেন? আমি তোর কাছেই আসছি বাবা।

সেইটাই তো আশ্চর্য কাণ্ড। আমি যাইতেছিলাম তোমার কাছে, তুমি আইছো আমার কাছে।

আমেনা জানেন হারু একটু বেশি কথা বলে। আসল কথার ধার দিয়ে যাওয়ার আগে অন্য কথা বলে কানের পোকা খসিয়ে ফেলে। হারুর কথার ধার দিয়ে তিনি গেলেন না। বললেন, একটা কিছু ব্যবস্থা কইরা দে বাজান।

কী ব্যবস্থা?

তুই তো সবই জানছ। এখন আর চোখে কোনও পথ দেখতেছি না। ওইটুকু বাড়িছাড়া আর কিছু নাই।

আরে এইসব তো আমি জানিই।

যেমনে হোক বাড়িটা বিক্রির ব্যবস্থা কইরা দে হারু। নাইলে আমি আমার মতিরে বাঁচাইতে পারুম না।

হারু ব্য¯ গলায় বলল, এইসব কথা পরে হইবো নে। এখন মন দিয়া শোনো, তোমারে অন্য একটা কথা কই।

কী কথা?

কয়েকদিনের জন্য তোমারে একটা রোজগারের ব্যবস্থা কইরা দিতে পারি।

কিসের রোজগার? কীভাবে?

খুবই সহজভাবে।

পরিষ্কার কইরা ক বাজান।

আসো আমার সঙ্গে, কইতাছি।

হারুর পিছু পিছু কিচেনে এসে ঢুকলেন আমেনা।

হারু বলল, এইটা হইল তোমার রোজগারের জায়গা।

ব্যাপারটা বুঝলেন আমেনা। রান্না করতে হইব?

হারু মজাদার গলায় বলল, জ্বি। রান্না করতে হইব।

কয়জনের?

একজনই। সাহেবের বন্ধু। কয়দিন এখানে থাকবে। লেখক। তয় একটু পেটুক ধরনের। আমার রান্না খাইয়া খুবই বিরক্ত। কথায় কথায় তোমার কথা তারে কইছি। শোনার সঙ্গে সঙ্গে বলল, ডাইকা নিয়া আসো। পারলে রাইত দুপুরেই তোমার বাড়িতে আমারে পাঠায়। একটু পাগলা জুইতের সাহেব আর কী!

বুজছি। পাগলা জুইতের সাহেব টাকা পয়সা দিব তো? নাকি ভালো রান্না খাইয়া টাকার কথা ভুইলা যাইবো?

আরে না। সেইটা হইব না। আমি আছি না?

তয় ঠিক আছে।

তুমি রান্নাবান্না শুরু করো।

আগে কি সকালের নাশতা বানামু?

বানাও।

কী বানামু?

হারু একটু ভাবলো। পরোটা সবজি হালুয়া ডিম, এইসব করো।

আইচ্ছা।

নাশতা বানাতে বসে আমেনা বললেন, এই রান্নাবান্নার কাজ আর কয়দিনের হারু? কয় টাকাই বা পাওয়া যাইবো? তুই আমার বাড়িটা বিক্রির ব্যবস্থা কইর দে।

হারু মাতাব্বরের ভঙ্গিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বলল, আমি লোক দেখতাছি খালা। তুমি এত চিšা কইরো না।

একটা কাজ কর বাবা, তগো অবস্থা তো খারাপ না, তোরাই বাড়িটা কিনা ফালা।

তুমি যে কী কও খালা?

ক্যান, খারাপ কইলাম নি?

খারাপই কইছো, বাড়ি কিনার মতন অবস্থা আমগ নাই।

তাইলে বাজান তগো মালিকের লগে কথা ক। তার এই বাংলোর কাছেই বাড়ি। সে কিনলে তার লাভই হইব।

আইচ্ছা দেখুম নে। তুমি মন দিয়া রান্ধো। তয় খালা, রান্না ভালো না হইলে তোমার কিছুই হইব না, আমার কিন্তু খবর আছে। পাগলা সাহেব আমার জান খাইয়া ফালাইবো।

রান্না লইয়া তুই চিšা করিছ না।

তুমিও বাড়ি বিক্রি লইয়া কোনও চিšা কইরো না। আমি দেখি, পাগলা সাহেব করে কী।

হারু চলে যাওয়ার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আমেনা।

দুপুরবেলা টেবিলে খাবার সাজিয়েছে হারু, রবি এসে ঢুকল।

তার পরনে জিনস আর সাদা টিশার্ট। টেবিল ভর্তি খাবার দেখে মুখের খুবই মজাদার একটা ভঙ্গি করল সে। বসতে বসতে বলল, খাদ্যের চেহারা ভালো।

হারু বিগলিত গলায় বলল, জ্বি স্যার জ্বি।

আবার জ্বি স্যার জ্বি?

স্যার।

আচ্ছা ঠিক আছে। যতবার ইচ্ছা জ্বি লাগাও আমার কোনও আপত্তি নেই।

স্যার।

কিন্তু খাদ্যের স্বাদ ভালো হয়েছে তো?

জ্বি হয়েছে স্যার।

রবি চিšিত মুখে হারুর দিকে তাকালো। তার মানে তুমি চেখে দেখেছো?

হারু হতভম্ব। জ্বি স্যার?

না মানে তোমার পদের কোনও কোনও লোকের নেচার হচ্ছে ভালো খাবার দাবার দেখলেই টুক করে একটু মুখে দেয়া। কোনটা কোনটা মুখে দিয়েছ?

হারু গম্ভীর গলায় বলল, কোনওটাই দেই নাই স্যার।

তাহলে বললে কী করে?

আন্দাজে বলছি স্যার।

ততক্ষণে ভাতের সঙ্গে একচামচ সবজি মুখে দিয়েছে রবি। দিয়েই মুগ্ধ। তোমার আন্দাজ সঠিক হয়েছে হারু।

জ্বি স্যার।

খাবার ভালো হয়েছে। খুবই ভালো হয়েছে। ভালো সবজি রান্না খুবই কঠিন কাজ।

হারুর মুখে স্ব¯ি ফিরল।

ডাকো।

কাকে ডাকবো স্যার?

যে রান্না করেছে তাকে।

কেন স্যার?

যার প্রশংসা তাকেই করি। তোমার মতো একটা ইয়ের প্রশংসা করে কী লাভ?

জ্বি স্যার, ডাকছি স্যার।

প্রায় ছুটে কিচেনে এসে ঢুকল হারু। তাড়াতাড়ি আসো খালা। তাড়াতাড়ি।

আমেনা বসেছিলেন কিচেনের মেঝেতে। হারুর তাড়ায় উঠে দাঁড়ালেন। কই যামু?

তোমারে ডাকতেছে।

কে?

আরে ওই পাগলা সাহেব।

আমেনা ভয় পেয়ে গেলেন। আমারে ডাকতেছে?

হ।

ক্যান?

সেইটা আমারে বলে নাই।

রান্না খারাপ হইছে?

আরে আমি কিছুই জানি না। তাড়াতাড়ি আসো।

হারুর পিছু পিছু মাত্র পা বাড়িয়েছেন আমেনা, হারু থামলো। তুমি যাও খালা। আমি অর সামনে যামু না।

ক্যান?

আমার স¤ক্সর্কে মনে হয় ধারণা খারাপ হইয়া গেছে।

আমেনা আর কথা বললেন না, ডাইনিংরুমে এসে ঢুকলেন।

রবি তখন খুবই মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছে। মুখে গভীর পরিতৃপ্তি। কোনও দিকে তাকাচ্ছে না।

খানিক দাঁড়িয়ে আমেনা তাকে দেখলেন তারপর বিনীত গলায় বললেন, আমারে ডাকছেন বাবা?

রবি চমকে আমেনার দিকে তাকালো। খাবার ভুলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর খুবই বিনয়ের গলায় বলল, আপনি, আপনি রান্না করেছেন?

জ্বি বাবা। রান্না কিঃ

আরে না। অসাধারণ রান্না হয়েছে, অসাধারণ। একদম আমার মায়ের হাতের রান্না। একদম।

আমেনার মুখে স্ব¯ি ফিরল। গোপনে একটা হাঁপ ছাড়লেন তিনি।

রবি হাসি হাসি মুখ করে বলল, মা মারা গেছে বহু বছর। তারপর এত ভালো রান্না আমি আর খাইনি।

আমেনা মাথা নিচু করলেন।

রবি বলল, কিন্তু আপনি, মানে আপনাকে দেখে মনেই হয় না আপনি এইসব রান্নাবান্নার কাজ করেন।

আমেনা মুখ তুলে একবার রবিকে দেখলেন। তারপর মাথা নিচু করে বললেন, ভাগ্য েেদাষে করছি বাবা। ভাগ্য েেদাষে।

তাহলে ভাগ্য েেদাষে আমাকে একটু তুলেও খাওয়ান।

জ্বি?

না মানে মায়ের হাতের রান্না, মা তুলে না খাওয়ালে কি পেট ভরে?

বড় একটা তেলাপিয়া দেখিয়ে বলল, ওই মাছটা পুরোটা তুলে দিন।

প্রথমে একটু সংকোচ হলো আমেনার। পর মুহর্তেই সেই সংকোচ ঝেড়ে রবির প্লেটে মাছটা তুলে দিলেন।

বিকালবেলা উঠোনে পুরনো আমলের কাঠের হাতলঅলা চেয়ারটা এনে উঠানে রেখেছে ছায়া। তারপর ঘরে এসে ঢুকেছে।

মতি আধশোয়া হয়ে আছে বিছানায়। ছায়া এসে তার হাত ধরল। নামো।

কই যামু?

উঠানে চলো।

ক্যান?

এমনিতেই। সারাদিন ঘরে বইসা থাকো, তোমার ভালো লাগার কথা না।

ভালো আমার লাগেও না।

এইজন্যই মাঝে মাঝে ঘর থিকা বাইর হইতে হয়।

ঠিকই বলছো।

ছায়ার কাঁধে ভর দিয়ে বিছানা থেকে নামলো মতি। তারপর ক্রাচ ধরতে গেল। ছায়া বলল, লাগবো না। তুমি আমার কাঁধে ভর দিয়া হাঁটো।

মতি আর ক্রাচ ধরলো না। ছায়ার কাঁধে ভর দিয়ে পা দুটো টানতে টানতে ঘর থেকে বেরুলো। বেরুতে বেরুতে বলল, তুমি আমারে নিয়া এইভাবে কষ্ট করো ক্যান?

কী কষ্ট?

এই যে আমারে টানতাছো।

এইটা কোনও কষ্ট না।

অবশ্যই কষ্ট। আমি তো ক্রাচে ভর দিয়াই হাঁটতে পারি।

তোমারে ক্রাচে ভর দিতে দেখলে আমার ভালো লাগে না। তারচে’ আমার কান্ধে ভর দিয়াই হাঁটো।

উঠানে রাখা চেয়ারটায় বসল মতি।

তার পরনে এখন গার্মেন্টেসের বাতিল হয়ে যাওয়া ডোরাকাটা একটা স¯া ধরনের সতি ট্রটাউজার্স আর ঢোলাঢালা একটা টিশার্ট। টিশার্টও ট্রটাউজার্সের মতোই বাতিল হওয়া জিনিস। বছর দুতিনেক আগে কিনেছিল। এখনও কাজ চলছে।

নিজের দিকে একবার তাকালো মতি। তোমার কষ্টটা আমি বুঝি। স্বামী পঙ্গু হইয়া যাইতাছে এই দৃশ্য কোনও বউরই ভালো লাগবো না।

কিন্তু আমার মন বলে অন্য কথা।

কী কথা?

তুমি একদিন পুরাপুরি ভালো হইয়া যাইবা।

মতি চোখ তুলে ছায়ার দিকে তাকালো। দুপুরের কাজটাজ সেরে গোসল করেছে ছায়া। কাল দুপুর থেকে পরে থাকা শাড়ি বদলে ফিরোজা রংয়ের বেশ পুরনো একটা সুতি শাড়ি পরেছে। মাথার ঘন লম্বা চুল কোনও রকমে খোপা করে রেখেছে গ্রীবার কাছে। শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে স¯া ধরনের ব্লাউজ পরেছে। কানে ইমিটেশানের দুটো ফুল। নাকে ছোট্ট নাকফুল। শ্যামলা মিষ্টি মুখখানি এত দুঃখ বেদনার পরও তেমন ম্লান হয়নি। এই মুখের দিকে তাকালে বুকটা হু হু করে ওঠে মতির।

এখনও করল।

অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ছায়ার আগের কথার রেশ ধরে বলল, ভুল।

ছায়া চমকালো। কিসের ভুল?

মানে ভুল কথা বলে তোমার মন।

ছায়া একটু চুপ করে রইল। তারপর আচমকা বলল, চা খাইবা?

মতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুঝলাম।

কী বুঝলা?

তুমি কথা ঘুরাইতাছো।

আরে না।

আমি ঠিকই বুজছি। ঠিক আছে ঘুরাও। আমি এখন চা খাবো না। পরে খাবো। কিন্তু সকাল থিকা মারে দেখতাছি না। মায় কই?

সেইটা তো আমিও বলতে পারি না। কোথায় যে গেল?

বুঝছি। বাড়ি বিক্রির আশায় ঘুরতাছে।

আমারও মনে হয়। কিন্তু সারাটা দিন কাইটা গেল! দুপুরে কোথায় খাইলো। না কি না খাইয়া ঘুরতাছে।

না খাইয়াই ঘুরতাছে। তারে আর কে খাওয়াইবো।

এই বয়সে এইভাবে না খাইয়া ঘুরলে শরিল তো তারও খারাপ হইব।

তাতো হইবই।

আমার মনে হয় কোথাও খাইয়া নিছে। নাইহলে এতক্ষণে বাড়িতে চইলা আসতো। সেইটা হইলে তো ভালোই।

মতির পিঠের কাছে দাঁড়িয়ে তার মাথায় গলার কাছটায় হাত বুলাতে লাগল ছায়া।

মতি বলল, কিন্তু বাড়ি বিক্রি হইয়া গেলে আমরা থাকবো কোথায়? অর্থাৎ তুমি আর মায় থাকবা কোথায়?

খালি আমার আর আম্মার কথা কও ক্যান? তোমার কথাও কও।

আমি তো থাকবো না।

কোথায় যাইবা তুমি?

বোঝো নাই কোথায় যামু?

ছায়ার বুকটা কেঁপে উঠল। চোখ দুটো ছল ছল করে উঠল। তুমি শুধু এইসব কথা বলো ক্যান? ক্যান এইসব কথা বইলা আমারে কষ্ট দেও।

এইটাই সত্য কথা।

ছায়া আঁচলে চোখ মুছল।

পিছন দিকে হাত বাড়িয়ে ছায়ার একটা হাত ধরল মতি। আসো, আমার কাছে আসো।

ছায়া মতির সামনের দিকে ঘুরে এলো। দুহাতে মতি তার দুহাত ধরল। আমার জন্য কষ্ট পাইয়ো না ছায়া। মন শক্ত করো। আমার সময় ঘনাইয়া আসতাছে।

মতিরও তখন চোখ ছল ছল করছে। নিজেকে সামলাবার জন্য বলল, ঠিক আছে, দেও এককাপ চা।

তুমি না বললা পরে খাইবা।

দেও এখনই খাই।

ছায়া চা করতে চলে গেল রান্নাচালার দিকে।

বিকেলবেলার রোদ তখন আ¯ে ধীরে কমে আসছে। উঠান ছেড়ে রোদ উঠে গেছে ঘরের চালায়, গাছপালার মাথায়। একটা দুটো পাখি ডাকছে। হাওয়ায় শীতের অতি মৃদু, চোরা একটা টান। কী যে ভালো লাগে এই সময়টা। মরে গেলে এরকম বিকেলগুলো আর দেখা হবে না। মাথার ওপরকার আকাশ, পায়ের তলার মাটি, গাছপালা হাওয়া আর পাখির ডাক সব মুছে দেবে মৃত্যু।

মৃত্যুর কথা ভেবে বুক ঠেলে গভীর কষ্টের এক কান্না উঠল মতির।

এই, তোমার চুরির অভ্যাস কেমন?

হারু হতভম্ব। খানিক আগে রাতের রান্না শেষ করেছেন আমেনা। এখন প্রায় সন্ধ্যা। আমেনা বলেছেন, সাহেবরে তুইই খাওয়াবি রাত্রে। আমি থাকতে পারবো না। আমি এখন চলে যাবো।

হারু কথা বলবার আগেই বারান্দার দিক থেকে রবির ডাক ভেসে এলো। হারু, হারু।

আমেনার সঙ্গে কথা না বলেই একটা দৌড় দিল হারু। রবির সামনে এসে বলল, স্যার।

তখনই রবির ওই কথা।

কথাটা বুঝতে পারলো না হারু। বলল, জ্বি স্যার?

রবি হারুর মুখের দিকে তাকালো। না মানে ওই ভদ্রমহিলার জন্য আমি যদি ধরো এক হাজার টাকা দেই সেখান থেকে তুমি কতো মেরে দেবে?

হারু সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল। ওইসব মারামারির অভ্যাস আমার নাই স্যার। থাকলে এতদিনে আমি বড়লোক হইয়া যাইতাম।

তাই নাকি?

জ্বি।

কীভাবে?

সাহেবের এই বাংলোর চার্জে আমি। আরও তিনজন কর্মচারি আছে। তাগো টিকিটাও আপনে দেখবেন না। এক ফাঁকে ফুটুস কইরা আসে, এক ফাঁকে ফুটুস কইরা চইলা যায়। আমার জন্য একটা পাতাও চুরি করতে পারে না।

তার মানে তুমি ওদের চুরিটা ঠেকিয়ে রাখো।

জ্বি।

কেন?

কেন মানি? আমি থাকতে চুরি ওরা কেন করবো?

তুমিই বা এটা কেমন কথা বলো। চুরি না করলে ওরা খাবে কী?

কেন, স্যারে অগো বেতন দিতাছে না?

কত বেতন দেয়?

তিন হাজার কইরা।

লোকগুলোর বউবাচ্চা আছে না?

জ্বি আছে।

কার কতজন?

প্রত্যেকেরই তিন চাইরজন কইরা।

মা ভাইবোনও তো আছে কারও কারও।

জ্বি আছে।

তিন হাজার টাকায় এতগুলো লোকের চলে কী করে?

হারু একটু চিšিত হলো। তা ঠিক।

এখন বলছো ঠিক, আবার চুরিও করতে দিচ্ছো না। চুরি না করলে ওরা খাবে কী? সিরাজের এই বাংলোতে কাল থেকে চুরি ফ্রি।

জ্বি?

জ্বি। তুমি ওই তিনজনকে বলবে, সাহেবের বন্ধু রবি হক সাহেব তোমাদের চুরি জায়েজ করে দিয়েছেন। যে যেভাবে পারো চুরি করো।

একটু থামলো রবি। তারপর বলল, তোমার খবর কী?

কোন খবর স্যার?

বউবাচ্চা? মা বাবা ভাইবোন?

বউবাচ্চা নাই। মা বাবা ভাইবোন আছে।

বউবাচ্চা নাই কেন?

বিয়ে না করলে স্যারঃ

বুঝেছি। করোনি কেন? আরে ভাই বিয়েটা করে ফেল। প্রতি বছর একটা, পারলে দুটো করে বাচ্চা হওয়াও। ঘর কিলবিল করবে বাচ্চায়। সন্ধ্যাবেলা গুনে গুনে ঘরে তুলবে। তুমি এখানে বেতন পাও কতো?

চাইর হাজার।

চার হাজার? চার হাজারে কিচ্ছু হবে না। সিরাজ তো দুচার মাসেও এক আধবার আসে না। ধুমিয়ে চুরি করতে থাকো। প্রথমে টুকটাক টুকটাক। এই ধরো গাছের ডালটা অথবা একটা আ¯ গাছ, একদিন পুকুর থেকে তুলে কিছু কই আর তেলাপিয়া বিক্রি করলে। এইভাবে চুরিটা ধরে ফেল হারু। পারলে ওই বাংলোটা চুরি করে বিক্রি করে ফেল।

কী যে বলেন স্যার।

খারাপ বললাম নাকি?

অবশ্যই খারাপ বলেছেন।

কেমন?

গরিব মানুষ হইলেই তারা চোর হয় না। চোর হয় বড়লোকরা। যতবড় টাকাঅলা ততবড় চোর।

রবি মুগ্ধ। আরে! তুমি তো ফাইন ডায়ালগ দাও। একদম শাহরুখ খান টাইপ। সিনেমায় নামছো না কেন? আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের কী দুরাবস্থা। ভালো অভিনেতা পাওয়াই যাচ্ছে না। তুমি এফডিসিতে যাও। সিমেনমায় ট্রাই করো। ডায়ালগ রাইটার হিসেবেও নেমে যেতে পারো।

পকেট থেকে পাঁচশো টাকার দুটো নোট বের করল রবি। ধরো। এই এক হাজার টাকা ওই ভদ্রমহিলাকে দিয়ে দাও।

হারু গম্ভীর গলায় বলল, আমি পারবো না স্যার।

কেন?

আপনি নিজ হাতে দেন।

আমিও পারবো না।

ক্যান, আপনের অসুবিধা কী?

আমার লজ্জা করে।

লজ্জা করে?

হ্যাঁ।

বলেন কী? এইটা কেমুন লজ্জা।

আমার স¤ক্সর্কে তোমার আসলে কোনও ধারণা নেই। তুমি তো জানো না, আমি মেয়েদের চেয়েও লাজুক। এই এক হাজার থেকে তুমি দুতিনশো মেরে দিলেও আমি লজ্জায় তোমাকে বলতে পারবো না। নাও ধরো। যাও।

হারু খুবই মুখ কালো করে টাকাটা ধরল। মাত্র পা বাড়িয়েছে কিচেনের দিকে, রবি গম্ভীর গলায় ডাকলো, হারু।

হারু দাঁড়ালো। বলেন?

বলো ‘জ্বি স্যার জ্বি’। বলো।

হারু বলল, ‘জ্বি স্যার জ্বি’।

দ্যাটস গুড।

এগিয়ে এসে হারুর কাঁধে হাত দিল রবি। বলেছিলাম না আমি একটু ঠাট্টা মশকরা করি। সবই ওই ছিল। ঠাট্টা এবং মশকরা। তুমি কিছু মনে করো না। ভদ্রমহিলাকে টাকাটা দাও। বলবে এটা এডভান্স। তার হাতের রান্না খাওয়ার লোভে আমি এখানে বেশ কয়েকদিন থাকবো। চলে যাওয়ার সময় আরও কিছু টাকা তাঁকে দিয়ে যাবো। ঠিক আছে?

হারুর গলায় গাম্ভীর্য আর রইল না। বলল, জ্বি ঠিক আছে স্যার।

চৌকিতে পা ঝুলিয়ে বসে আছে মতি।

দরজার সামনে একটা কুপি জ্বলছে। সেই আলোয় আমেনাকে দেখা গেল মতির ঘরে এসে ঢুকছেন। মতি চোখ তুলে মায়ের দিকে তাকালো। সারাটা দিন কোথায় কোথায় ঘুরলা মা? না খাইয়া এইভাবে ঘুরলে আমার আগে তুমিইঃ

মতির কথা শেষ হওয়ার আগেই আমেনা বললেন, এইসব কথা বলিস না বাবা। ছেলের মুখে এইসব কথা কোনও মা শুনতে পারে না।

কিন্তু কথা তো সত্য।

চুপ কর।

আমেনা ছেলের পাশে বসলেন।

ছায়া গিয়েছিল রাতের খাবার গরম করতে। এই বাড়িতে দুপুর আর রাতের ভাত তরকারি একবারেই রান্না হয়। দুপুরবেলা। রাতেরবেলা শুধু তরকারিটা গরম করতে হয়। ভাত গরম করতে হয় না। হাড়ির ঠাণ্ডা ভাতের সঙ্গে গরম তরকারি।

হাতের কাজ শেষ করে এই ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল ছায়া। আমেনাকে দেখে বলল, আসছেন আম্মা?

হ মা, আসছি।

তয় হাতমুখ ধুইয়া আসেন। আমি ভাত বাড়ি।

আমার জইন্য বাড়তে হইব না মা।

ক্যান?

আমি খাইয়া আসছি।

মতি বলল, কই খাইছো তুমি?

বাংলোয়।

বাংলোয়?

হ। এক আধা পাগলা সাহেব আইছে। গেছি হারুর কাছে, হারু দিছে সাহেবের রান্নার কাজ।

তাই নাকি?

হ। দুপুরে ওখানেই খাইছি। এখনও ওখানেই খাইয়া আসছি।

আঁচলের গিঁট খুলে দুটো পাঁচশো টাকার নোট বের করলেন আমেনা। ছায়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, এইটা রাখো মা।

ছায়া অবাক! এত টাকাঃ

সাহেব দিছেন। তিনি যেই কয়দিন থাকবেনঃ

মতি বলল, সেই কয়দিন তার রান্না তোমার করন লাগবো?

হ।

এই বয়সে তুমি তিনবেলা রান্না করলে, আবার ওই কথাটা আমি কইতাছি মা। আমার আগে তুমিই মরবা।

না বাজান, আমার কিছু হইব না। আমারে লইয়া তুই চিšা করিছ না।

আমেনা উঠলেন। ক্লাš ভঙ্গিতে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। ছায়া তাকিয়ে তাকিয়ে তাঁর চলে যাওয়া দেখলো। হাঁটার ভঙ্গি দেখে বোঝা যায় শরীর আর টানতে পারছেন না তিনি। কাল কাজে যেতে পারবেন তো?

ছায়ার অনুমানই ঠিক হলো।

সকালবেলা আমেনার ঘরে ঢুকে ছায়া দেখে তিনি তখনও শুয়ে আছেন। বাইরে বেলা বাড়ছে। উঠোন আঙিনা ভরে গেছে সকালবেলার রোদে। এতক্ষণে তো আমেনার রান্না করতে চলে যাওয়ার কথা। এখনও না গেলে সাহেবের নাশতা বানাবেন কখন?

ছায়া বলল, এখনও শুইয়া আছেন? আম্মা, আপনের শরিল খারাপ?

আমেনা অতিকষ্টে উঠে বসলেন। হ মা, শরিলটা ভালো লাগতাছে না।

কাইল রাইত্রে আপেনেরে দেইখাই আমার মনে হইছিল, আপনের শরিল খারাপ হইয়া গেছে।

অনেকদিন পর কাইল সারাদিন রান্নাবান্না করছি। রাত্রে ঘুম খারাপ হয় নাই। তয় এখন তো আর উইঠা দাঁড়াইতে পারতাছি না।

কিন্তু ওইদিকে যেঃ

হ রান্নার কাজ।

এক হাজার টাকা এডভান্স দিছে।

কী করবো কিছু বুঝতে পারতাছি না।

এই শরিল নিয়া রান্না করতে গেলে রান্না ভালো হইব?

তাও তো কথা।

চুলার গরমে যদি শরিল বেশি খারাপ হয়ঃ

হ সেইটা হইতে পারে।

তখন কী করবেন?

কিছুই বুঝতাছি না।

চিšার কথা।

একটু চুপ করে থেকে ছায়া বলল, একটা কাজ করবো।

কী কাজ মা?

আমি যাবো রান্না করতে?

আমেনা চমকালেন। কী?

আমারে আপনে একদম আপনের মতন রান্না শিখাইছেন। কোনটা আপনের রান্না, কোনটা আমার রান্না কেউ বুঝতে পারবো না।

হ সেইটা বুঝতে পারবো না।

আর হারু ভাই লোকও ভালো। আমারে বইন বইলা কথা কয়।

হারুরে লইয়া আমি চিšা করতাছি না। চিšা হইল দুইটা। সাহেবটারে সামনে বসাইয়া খাওয়াইতে হয়।

তাই নাকি?

হ। একটু পাগলা কিসিমের। তবে লোক ভালো।

আমি হারু ভাইরে বলব, আপনের শরিল খারাপ। হারু ভাই তারে ম্যানেজ করবো।

বুঝলাম। আর এইদিকে? মতিরে ম্যানেজ করবো কে?

সেইটাই কথা।

তোমার কথা জিজ্ঞাসা করলে কী বলবো?

এইটা আমি বুঝতে পারতাছি না। এমনিতেই অসুস্থ, হঠাৎ রাগ হইয়া গেলে শরিল বেশি খারাপ হইয়া যাইবো।

থাউক এত ঝামেলার কাম নাই। কষ্ট হইলে হইবো, আমিই যাইতাছি।

চৌকি থেকে নেমে মেঝেতে মাত্র দাঁড়িয়েছেন আমেনা, মাথাটা এমন চক্কর দিল! টলে পড়ে যেতে যেতে কোনও রকমে ছায়াকে ধরলেন।

ছায়া ভয় পেয়ে গেল। কী হইল আম্মা? কী হইল? এমন করতাছেন ক্যান?

ততক্ষণে চৌকিতে বসে পড়েছেন আমেনা। কোনও রকমে বললেন, মাথাটা ঘুইরা উঠল মা। মনে হইল ফিট হইয়া যামু।

শুইয়া পড়েন, আপনে শুইয়া পড়েন।

কিন্তু সাহেবের রান্নাঃ

এত চিšার কাম নাই। আমি সব ম্যানেজ করতাছি।

আমেনাকে শুইয়ে দিল ছায়া। আপনে আর নইড়েন চইড়েন না। শুইয়া থাকেন।

আমেনার ঘর থেকে বেরিয়ে ছায়া দেখে মতি তার ঘরের দরজা দিয়ে ক্রাচে ভর দিয়ে বেরুচ্ছে। ছায়া ছুটে এসে তার সামনে দাঁড়াল। তুমি কোথায় যাইতেছো?

মার ঘরে।

ক্যান?

মার কি শরিল খারাপ? তোমার কেমন আওয়াজ পাইলাম!

না তেমন কিছু না।

আমার কাছে লুকায়ো না।

মানে এত রান্নাবান্নার কাজ করছেঃ। বয়স হইছে না?

এইটা আমি কাইলই বুঝছিলাম।

তুমি চিšা কইরো না।

কী কও তুমি? চিšা করুম না? এক হাজার টাকা এডভান্স দিছে। মায় যদি রান্না করতে যাইতে না পারে?

হ সেইটা তো ভালো হইব না।

আমি যাই।

কই যাইবা তুমি?

বাংলোয় যাই। গিয়া টাকাটা ফিরত দিয়া আসি। তুমি যা বললা তাতে মায় মনে হয় যাইতে পারবো না।

হ সেইটা পারবো না। দাঁড়াইতে গিয়া মাথা ঘুইরা গেছে।

তয়?

কিন্তু ঘরে তো কোনও টাকা পয়সা নাই। সংসার চলবো কেমনে?

মতি অস্থির গলায় বলল, এতকিছু এখন ভাবা যাবে না।

সংসারের কথা ভাবতে হইব না?

না ভাবতে হইব না। দরকার হলে না খেয়ে থাকবো। আমি অসুস্থ, কাজ করতে গিয়া মায়ও যদি অসুস্থ হইয়া যায় তাইলে বিপদের আর সীমা থাকবো না।

মতির একটা হাত ধরল ছায়া। তোমারে একটা কথা বলব?

মতি ছায়ার চোখের দিকে তাকালো। কী?

ছায়া কথা বলবার আগেই বলল, তুমি গিয়া রান্না কইরা দিয়া আসতে চাও।

ছায়া আ¯ে করে বলল, হ।

না, ওইটা হইব না। টাকা বাইর করো। আমি যাই, টাকা ফিরত দিয়া আসি।

এই শরিল নিয়া তোমার কষ্ট করার দরকার নাই। আমি গিয়া টাকাটা হারু ভাইর কাছে ফিরত দিয়া আসি।

মতি নরম হলো। হ সেইটা তুমি যাইতে পারো। তবে মায় য্যান কিছু টের না পায়।

না না টের পাইবো না।

ঘরে ঢুকে পুরনো আলমারি থেকে পাঁচশো টাকার নোট দুটো বের করে আঁচলে বাঁধলো ছায়া।

ডাইনিং েেটবিলের দিকে তীক্ষèচোখে তাকালো রবি।

হারু দাঁড়িয়ে আছে টেবিলের সামনে। টেবিলে পরোটা সবজি, দুটো পোচ করা ডিম, হালুয়া। হারুর মুখটা গম্ভীর।

রবি কী বুঝলো কে জানে। আচমকা বলল, নাশতার চেহারা তোমার মতো কেন?

এরকম কথা বুঝতে পারার কথা না কারও। হারুও বুঝলো না। বলল, জ্বি?

রবি চেয়ারে বসে বলল, না কিছু না।

পরোটা ছিঁড়ে সবজির পেয়ালা থেকে সবজি নিয়ে মুখে দিল। দিয়েই মুখের হাস্যকর একটা ভঙ্গি করল। সেই ভঙ্গি দেখে হারুর বারোটা বেজে গেল।

রবি নির্বিকার গলায় বলল, লবণ বলে যে একটা জিনিস আছে সেটা সবজিতে দেয়া হয়নি।

হারু ভয়ার্ত গলায় বলল, জ্বি?

জ্বি। এই জিনিস না খেয়ে ঘাস খাওয়া অনেক ভালো। ডাকো।

কাকে ডাকবো স্যার?

বোঝনি?

এবার বুঝলো হারু। বলল, জ্বি বুঝেছি স্যার।

তাহলে দাঁড়িয়ে আছো কেন?

সে তো আসে নাই স্যার।

আসেনি?

জ্বি।

তার মানে নাশতা তুমি বানিয়েছ?

জ্বি।

যেন এটা খুবই আনন্দের কথার এমন ভঙ্গিতে হাসলো রবি। তাই তো বলি, নাশতার চেহারা তোমার মতো কেন? আমার হচ্ছে গিয়ে লেখকের চোখ। কিন্তু সে, না না, মানে তিনি, তিনি আসেননি কেন?

সেটা বলতে পারবো না স্যার। তার দেরি দেইখা আমি আপনার জন্য নাশতা বানাইয়া ফালাইছি।

এই জিনিস না বানালেও কোনও ক্ষতিবৃদ্ধি হতো না। এই হারু, তোমার কি মনে হয় এক হাজার টাকা নিয়ে তিনি উধাও হয়ে গেলেন? আমার তো তাঁর চেহারা দেখে মনে হয়নি মাত্র এক হাজার টাকা নিয়ে তিনি কেটে পড়বেন।

আমি গিয়া খবর নিয়া আসবো?

রবি হাত গুটিয়ে নিয়েছে। নাশতা আর মুখে দেয়নি। হারুর কথা শুনে বলল, তার আগে গরম পানিটা দিয়ে যাও।

জ্বি স্যার জ্বি।

গরম পানি আনবে দু মগ। আমার মগের এক মগ আর তোমাদের এখানকার মগের এক মগ।

এক সঙ্গে দুই মগ চা খাইবেন স্যার?

না। আমার মগে গ্রীন টি বানাবো আর অন্য মগের পানিটা তোমার মাথায় ঢালবো।

একটু থামলো রবি। ভয় পেলে নাকি?

স্যার।

ভয়ের কিছু নেই। ফাজলামো করলাম।

হারু চলে যাওয়ার পর নাশতার কথা ভুলে গেল রবি। তার মনে পড়ল ভদ্রমহিলার কথা। তিনি যে আসেননি ওই নিয়ে তার মাথায় আর কিছু এলোই না। মনে মনে বলল, ভদ্রমহিলাকে দেখে আমি অবাক হয়েছি। বেশ বনেদী ধরনের চেহারা। কী অসাধারণ রান্না করেন। ঠিক আমার মায়ের মতো। তাঁকে দেখে অনেকদিন পর মায়ের কথা খুব মনে পড়ল। এরকম একজন মহিলা নিশ্চয় অভাবে পড়ে রান্নার কাজ করছেন। আহা, কত মানুষ যে কত কষ্টে আছে!

হারু গরম পানি নিয়ে আসার পর গ্রীন টির ব্যাগ মগে ফেলে ডাইনিংরুম থেকে বেরিয়ে এলো রবি। গেটের ওদিককার মাঠের কোণে বকুলগাছটার তলায় সুন্দর একটা বেঞ্চ, সেই বেঞ্চে বসে চায়ে চুমুক দিল।

ঠিক তখুনি ছায়া এসে ঢুকল বাংলোয়।

ঘোমটার একপ্রাš দাঁতে কামড়ে রেখেছে ছায়া। হাঁটছিল বড় বড় পা ফেলে। রবি তাকে দেখে একপলক তাকালো। ছায়া বুঝলো এই হচ্ছে পাগলা কিসিমের সাহেবটি। মুহহূর্তকাল কিছু ভাবলো সে, তারপর রবির সামনে এসে দাঁড়াল।

চায়ের মগ হাতে রবি উঠে দাঁড়াল। হাসিমুখে বলল, তুমি করেই বলি।

ছায়া সরল গলায় বলল, বলেন।

না না অন্য কোনও কারণ নেই। তুমি অসম্মান বোধ করবে না। আমার একমাত্র ছোটবোনটি আমার চে’ দশ বছরের ছোট। আমেরিকায় থাকে। তুমি তারচে’ ছোট হবে।

ছায়া হাসল। আমি আপনেরে চিনছি।

টিভিতে দেখেছো? টকশোতে?

জ্বি না। আমাদের বাড়িতে টিভি নাই।

তার মানে তুমি ওই, মানে আমার মায়ের মতো দেখতে ভদ্রমহিলারঃ

মেয়ে না, ছেলের বউ।

তুমি খুব সুন্দর।

জ্বি?

আমার ছোট বোনটার মতো।

রবি একটু উদাস হলো। আহা কতদিন বোনটাকে দেখি না। তোমাকে দেখে তাকে দেখা হলো।

একটু থামলো রবি। তারপর আচমকা বলল, টাকা ফেরত দিতে আসছো?

ছায়া অবাক! কেমনে বুঝলেন?

লেখকের চোখ। তার মানে তোমার শাশুড়ি অসুস্থ। রান্না করতে পারবেন না।

জ্বি।

সঙ্গে সঙ্গে হাঁটা দিল রবি। চলো।

কোথায়?

তাঁকে দেখে আসি। এই চায়ের মগ হাতে নিয়ে গেলে অসুবিধা হবে? অনেকখানি চা রয়ে গেছে।

ছায়া কোনও রকমে বলল, না নাঃ

কী না না! অসুস্থ মানুষ দেখতে যেতে হবে না?

সেইটার দরকার নাই। আপনের টাকাটাঃ

আঁচলের গিঁট থেকে ভাঁজ করা পাঁচশো টাকার নোট দুটো বের করল ছায়া।

চায়ের মগে বড় করে চুমুক দিল রবি। টাকা ফেরত না নিলে তোমরা খুব মাইন্ড করবে। এটা আমি বুঝি। মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্ট। ঠিক আছে দাও।

হাত বাড়িয়ে ছায়ার হাত থেকে টাকাটা নিলো রবি। নিয়ে হন হন করে বাংলোর দিকে চলে গেল। ছায়া অবাক হয়ে রবির দিকে তাকিয়ে রইল!

দুপুরের মুখে মুখে বাড়ি ফিরে এলো ছায়া।

এসে সোজা ঢুকল আমেনার রুমে। আমেনা কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে গভীর ঘুমে। ছায়ার কী রকম একটু সন্দেহ হলো। বিছানার পাশে বসে আলতো করে হাত রাখল শাশুড়ির কপালে। হাত রেখেই চমকালো। হায় হায় অনেক জ্বর আসছে তো!

আমেনা চোখ খুললেন। জ্বরক্লাš গলায় বললেন, হ মা, জ্বর আইসা পড়ছে।

কখন জ্বর আসলো?

তুমি মতির ঘরে গেলা, আমার মনে হয় তারপর থিকাই। ওই যে মাথাটা চক্কর দিলঃ

মাথায় পানি দিয়া যামু?

এখন লাগবো না। পরে দিও।

আইচ্ছা।

ওইদিকে তুমি কিছু ব্যবস্থা করতে পারছো?

না আম্মা।

কী হইল?

সব উল্টা হইয়া গেছে। টাকা ফিরত দিয়া আসছি।

আমেনা একেবারে ভেঙে পড়লেন। তয় এখন সংসার চলবো কেমনে?

ছায়া হতাশ গলায় বলল, কী যে হইব কিছুই বুঝতাছি না।

তারপরও শাশুড়িকে ভরসা দিল ছায়া। আপনে চিšা কইরেন না আম্মা। আমি দেখতাছি।

তুমি কী দেখবা মা?

ছায়া কথা ঘুরালো। জ্বর কিন্তু অনেক। মাথায় পানি দিয়া দেই।

না। দিতে হইলে আমি তোমারে বলবো।

তয় আপনে চুপচাপ শুইয়া থাকেন।

আইচ্ছা।

চলে যেতে গিয়েও ফিরে এলো ছায়া। আপনে তো সকাল থিকা কিছু খান নাই। রুটি আর চা দিমু?

এখন খামু না মা। পরে দিও।

ছায়া তারপর নিজেদের ঘরে এসে ঢুকল।

মতি অসহায় ভঙ্গিতে বসে আছে বিছানায়। মাথার কাছে খোলা জানালা। জানালার বাইরে কিছু গাছপালা। জানালা দিয়ে উদাস ভঙ্গিতে গাছপালার দিকে তাকিয়ে আছে। ছায়ার পায়ের আওয়াজ পেয়ে তার দিকে মুখ ফেরালো। দিয়া আসছো?

হ।

ভালো করছো।

এইদিকে আম্মার তো খুব জ্বর।

মতি বিস্মিত হলো। জ্বর?

হ।

জ্বর আসলো কখন?

আমি চইলা যাওয়ার পর।

জ্বর যে আসবো এইটা আমি আগেই বুঝছিলাম।

খুব জ্বর। মনে হয় ডাক্তার দেখাইতে হইব। আবুল ডাক্তাররে খবর দিমু?

খবর দিলে তার ভিজিট দিতে হইব না? অষুদের দাম দিতে হইব না?

একথার সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড রেগে গেল ছায়া। তয় কি সে জ্বরে মইরা যাইবো? ঘরে তো কিচ্ছু নাই। তুমিও তো না খাইয়া মইরা যাইবা। ডাইবিটিসের রুগির বার বার খাইতে হয়। খাওয়া না পাইলে মরণ। এত ত্যাজ দেখানের কাম আছিল কী? আমি রান্না কইরা দিয়া আসলে কী ক্ষতি হইত? এক হাজার টাকায় কয়েকটা দিন ভালো মতন চলতে পারতাম। হয়তো সে আরও টাকা দিত।

কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলল ছায়া। এখন দুইজন মানুষরে বিনা চিকিৎসায়, না খাইয়া মরতে দেখতে হইব।

মতির মুখটা পাথরের মতো হয়ে আছে। বরফের মতো শীতল গলায় বলল, আমগ লগে তুমিও মরবা।

ছায়া আর কথা বলল না। চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে গেল।

রান্নাচালায় এসে অনেকক্ষণ কাঁদলো মেয়েটি। তারপর চোখ মুছে শাশুড়ির জন্য আটার রুটি বানালো, এককাপ চা বানালো। আটার রুটি আর চা নিয়ে আমেনার রুমে এসে ঢুকল।

আমেনা আগের মতোই অচেতন ভঙ্গিতে শুয়ে আছেন।

ছায়া ডাকলো, ওঠেন আম্মা। কষ্ট কইরা একটু খান।

আমেনা অতিকষ্টে উঠে বসলেন। মতি খাইছে?

না। তার খাওন একটু পরে দিতাছি। সে তো ভাত খাইবো। আপনের জ্বর, আপনি চা রুটি খান।

আমেনা চায়ে রুটি ভিজিয়ে খেতে লাগলেন।

ছায়া খানিক দাঁড়িয়ে থেকে বলল, আম্মা, আপনেরে একটা কথা বলতে চাই।

কী কথা মা?

আমি রান্নার কাজটায় যাইতে চাই। কাইল সকাল থিকা যাইতে চাই।

আমেনা চোখ তুলে ছায়ার দিকে তাকালেন। মতি এইটা মাইনা নিবো না।

সে না মানলেও আমি যাবো।

কী?

হ। শাশুড়িরে আর স্বামীরে বিনা চিকিৎসায় অনাহারে আমি মরতে দিব না।

ছায়ার কথা শুনে খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল আমেনার। চোখ ফেটে নামল গভীর কষ্টের কান্না। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, কী কপাল আমার! বাড়ির বউ ঝিয়ের কাজ কইরা আমারে আর আমার ছেলেরে বাঁচাইতে চায়।

ছায়া তাঁকে সাš¡না দিল। এইসব ভাইবা মন খারাপ কইরেন না আম্মা। আগে আমরা বাঁচার চেষ্টা করি।

পাশের ঘর থেকে মতির ডাক ভেসে এলো এসময়। ছায়া, ছায়া।

ছায়া সাড়া দিল। আসতাছি।

তারপর আমেনাকে বলল, আমি গেলাম আম্মা।

মতি এখন চৌকিতে বসে আছে পা ঝুলিয়ে। ছায়াকে দেখে বলল, মার জ্বর কমছে?

পুরা কমে নাই।

এত তাড়াতাড়ি কমবো না।

হ। আজকের দিনটা গেলে বুঝা যাইবো এই জ্বর কয়দিন থাকবো।

কীভাবে বুঝা যাইবো?

বুঝা যায়। আমার মনে হয় আম্মার এই জ্বর চাইর পাঁচদিন থাকবো। অষুদ না খাইলে বেশিদিনও থাকতে পারে।

মতি কোনও কথা বলল না।

পরদিন সকালবেলাও জ্বর কমলো না আমেনার। শাশুড়িকে চা রুটি খাওয়ালো ছায়া। স্বামীকে খাওয়ালো। তারপর বলল, শোনো, তুমি একটু আম্মার দিকে খেয়াল রাইখো।

মতি অবাক। তুমি কই যাইতাছো?

ছায়া নির্বিকার গলায় বলল, বাংলোয় রান্না করতে যাবো।

কথাটা যেন বুঝতে পারল না মতি। কী?

হ।

বলো কী তুমি?

খারাপ কী বললাম।

আমি না করার পরওঃ

ছায়া কঠিন গলায় বলল, তোমার না আমি শুনবো না।

কী বললা?

ঠিকই বলছি। তিনজন মানুষের সংসারের দুইজন অসুস্থ। সেই দুইজনরে বাঁচানো আমার দায়িত্ব। তুমি আম্মার দিকে খেয়াল রাইখো।

দরজার দিকে পা বাড়িয়েছে ছায়া, মতি কঠিন গলায় বলল, তুমি কিন্তু সীমা ছাড়ায়া যাইতাছো ছায়া।

তোমার যা মনে হয় তুমি বলতে পারো। আমি তোমার কথা শুনবো না।

ছায়া আর দাঁড়ালো না।

ছায়া বেরিয়ে যাওয়ার পর চায়ের কাপটা প্রচণ্ড ক্রোধে ছুঁড়ে ফেলে দিল মতি। সেই শব্দ পেল ছায়া। সে ফিরেও তাকালো না। হন হন করে বাংলোর দিকে হাঁটতে লাগল।

হারুর মুখ থেকে পরিবারটি স¤ক্সর্কে আমি সব শুনেছি। শুনে টাকা ফেরত দেয়ার ঘটনায় একটুও অবাক হইনি। আমাদের মধ্যবিত্ত মানসিকতা তো এমনই। মরে যাবে তবু সম্মান নষ্ট করবে না। কারও কাছে ছোট হবে না। কিন্তু এই মানসিকতা বদলানো উচিত। উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করা উচিত। যে যার অবস্থান থেকে কাজ করে বেঁচে থাকা উচিত। কাজই মানুষকে সম্মানিত করে।

কালরাত থেকে এই কথাগুলো বার বার মনে হচ্ছে রবির।

সকালবেলা হারুর তৈরি নাশতাই খেতে হয়েছে। তারপর চায়ের মগ নিয়ে মাঠের ধারের সেই বেঞ্চটায় এসে বসেছে। উদাস আনমনা ভঙ্গিতে চা খাচ্ছে। হন হন করে হেঁটে ছায়া এসে তার সামনে দাঁড়াল। কোনও ভনিতা ছাড়াই বলল, ওই এক হাজার টাকা দেন।

রবি সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠল। দ্যাটস দ্যা ¯িক্সরিট।

তারপরই চিšিত হলো। কিন্তু কেন দেব?

আপনে যে কয়দিন থাকবেন, রান্নার কাজটা আমি করব।

স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া লাগাবার ব্যবস্থাটা তো করে ফেলেছো।

এইটা ছাড়া আমার আর কিছু করার নাই।

তোমার রান্না মুখে দেয়া যাবে?

তারপরই সরল মুখ করে হাসল রবি। মজা করলাম। মুখ দেখে বুঝতে পারছি তুমি খুবই কনফিডেন্ট। এই বিষয়ে আমি কি একটা লেকচার দেব?

লেকচারের দরকার নাই। টাকাটা দেন।

না তারপরও লেকচার একটু দিতেই হবে। তুমি যে দুজন মানুষকে বাঁচাবার জন্য কাজ করতে চাইছো, এটাই হওয়া উচিত।

প্যান্টের পকেট থেকে ওয়ালেট বের করল রবি। পাঁচশো টাকার দুটো নোট বের করে ছায়ার হাতে দিল। বুঝলে, কাজই মানুষকে বাঁচায়। মরে অলসরা।

টাকাটা হাতে নিয়ে কিচেনের দিকে পা বাড়িয়েছে ছায়া, রবি ডাকলো, শোনো।

ছায়া দাঁড়াল। বলেন।

লেকচারটা কেমন হয়েছে?

ছায়া একটু বিরক্ত হয়ে রবির দিকে তাকালো। কথা বলল না, কিচেনের দিকে চলে গেল।

রবি মুখ বিকৃত করে বলল, মনে হয় সুবিধার হয়নি।

কিচেনে ঢুকে ছায়া দেখে হারু দুপুরের রান্নার আয়োজন করছে। ছায়াকে দেখে অবাক হলো। তুমি আবার বাংলোতে আসছো? খবর কী বইন?

ছায়া বলল, আম্মার খুব জ্বর। এইজন্য রান্নার কাজটা আমি করব।

রান্নার কাজ তুমি করবা?

হ।

তয় কাইল আইসা সাহেবের টাকা ফিরত দিয়া গেছ ক্যান?

ভুল কইরা ফালাইছিলাম। আইজ আবার টাকাটা নিছি।

তাই নাকি?

হ।

ভালো করছ। আরে এই সাহেব তো আমার রান্না মুখেই দিতে চায় না।

হারুর এসব কথার ধার দিয়েও গেল না ছায়া। বলল, আপনে আমার একটা কাজ কইরা দেন হারুভাই।

কী কাজ বইন?

হাতের মুঠো থেকে একটা পাঁচশো টাকার নোট হারুর হাতে দিল ছায়া। বাড়িতে বাজার নাই। বাজার কইরা দিয়া আসেন। আর আবুল ডাক্তাররেও একটু খবর দিয়েন। তারে বলবেন আমগ বাড়িতে গিয়া আম্মারে য্যান দেইখা আসে। তার ভিজিট আর অষুদের টাকা দিয়া দিয়েন।

আন্দাজে অষুদের দাম কেমনে দিমু?

আন্দাজেই দিয়েন। পাওনা হইলে বাকিটা পরে দিয়া দিমু।

ঠিক আছে। তয় তুমি এই দিকটা সামলাও।

সেইটা সামলাইতাছি। এই দিক নিয়া আপনে ভাইবেন না। আপনে যান।

যাইতাছি।

হারু চলে যাওয়ার পর নিশ্চিš মনে রান্না নিয়ে পড়ল ছায়া। খুবই মন দিয়ে রান্নাটা সে করল। খেতে বসে রবি মুগ্ধ গলায় বলল, আমার সঙ্গে ঢাকায় চলো।

ছায়া অবাক। জ্বি?

তোমার রান্না তোমার শাশুড়ির মতোই।

তিনিই আমারে শিখাইছেন।

এইজন্যই তো বলছি ঢাকায় চলো। তোমাদের দুজনকে নিয়ে যদি একটা বাংলা খাবারের রেস্টুরেন্ট করা যায় তাহলে লক্ষ লক্ষ টাকা রোজগার করা যাবে। আমি মালিক আর তোমার স্বামী হবে রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার।

ছায়া চুপ করে রইল।

রবি খেতে খেতে ছায়ার দিকে তাকাল। কথা বলছো না কেন?

কী বলবো?

আমার উদ্দেশ্যটা তুমি মনে হয় বুঝে গেছ।

মাঝে মাঝে রবির কথায় খুবই বিভ্রাš হচ্ছে ছায়া। এখনও হলো। বলল, জ্বি?

ওরকম রেস্টুরেন্ট করলে সব খাবার আমি একা খেয়েই শেষ করে ফেলব। রেস্টুরেন্টে লালবাতি জ্বলে যেতে সময় লাগবে না। হা হা।

রবির প্রাণখোলা হাসিটা খুবই মজা লাগল ছায়ার। কিন্তু তার মুখে কোনও হাসি নেই। বলল, আপনে বই লেইখা অনেক টাকা রোজগার করেন?

অনেকই বলতে পারো। বিয়েশাদি করিনি, বাচ্চাকাচ্চা নেই। একা মানুষ, বিরাট আরামের জীবন। এই, তুমি আমার জন্য একটা মেয়ে দেখো তো। জীবনে একটা বিয়ে অšত করি। তবে শর্ত হচ্ছে রান্না ভালো হতে হবে। পচা রান্না হলে চলবে না।

এসব কথার ধার দিয়েও গেল না ছায়া। বলল, আমি ঢাকায় যাইতে চাই।

রবি তার স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে বলল, দ্যাটস দ্যা ¯িক্সরিট।

তারপরই বোকার মতো বলল, কেন যাবে? রেস্টুরেন্ট করতে?

না।

তবে?

আমার স্বামীরে বাঁচাইতে।

রবি গম্ভীর হলো। আমি সেটা বুঝেছি।

আপনে আমারে সাহায্য করেন।

কী সাহায্য করতে পারি।

সেইটা আমি জানি না।

ছায়ার মুখের দিকে বেশ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল রবি। তারপর বলল, তোমার স্বামীকে বলো আমার সঙ্গে কথা বলতে।

জ্বি আইচ্ছা।

রাতেরবেলা বাড়ি ফিরে ছায়া দেখে মতি গম্ভীর মুখ করে বসে আছে। দরজার কাছে কুপি জ্বলছে। মতি নিজেই হয়তো কুপি জ্বালিয়েছে। আমেনার যে অবস্থা দেখে গেছে তাতে তিনি উঠে কোনও কাজ করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না।

এসব কথা ছায়া জানতে চাইলো না। খুবই আšরিক গলায় বলল, হারু ভাই বাজার কইরা দিয়া গেছে?

মতি কথা বলল না। ছায়ার দিকে তাকালোও না।

ডাক্তার আসছিল?

মতি কথা বলল না। আগের মতোই অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।

তুমি খাইছো?

এবারও ছায়ার দিকে তাকালো না মতি, তবে কথা বলল। আমি তোমার কোনও কথার জবাব দিমু না।

ক্যান অযথা আমার উপর রাগ করো।

তুমি অনেক রাগের কাম করছো।

কী করছি?

জানো না, কী করছো?

না, জানি না।

এই বাড়ির বউ রান্নার কাজ করতে যাইতে পারে না।

এই বাড়ির মা পারে?

মতি কঠিন চোখে ছায়ার দিকে তাকালো। তুমি আমার লগে তর্ক কইরো না।

তর্ক না। আমি তোমারে বাঁচাইতে চাই।

মতির একটা হাত ধরল ছায়া। শোনোঃ

ঝটকা মেরে তার হাত ছাড়িয়ে দিল মতি। আমারে তুমি ধরবা না। আমি তোমার কথা শুশোনবো না।

লেখক সাহেব খুব ভালো লোক। আমি তার সঙ্গে কথা বলছি। সে আমারে সাহায্য করবো। আমি তোমারে ঢাকায় লইয়া যামু।

এইসব ফালতু কথা আমারে বলবা না। আমি এই ঘরে বইসা বইসা মইরা যামু। তোমার যা ইচ্ছা তুমি করো গিয়া।

ছায়া হঠাৎ করে প্রচণ্ড রেগে গেল। হ আমার যা ইচ্ছা তা আমি করুম। আমি তোমারে ঢাকায় লইয়া যামু। আমি তোমারে বাঁচামু। আমার কথা তোমার শোনন লাগবো।

মতি চিৎকার করে বলল, না শুনুম না। আমি তোমার কোনও কথা শুনুম না। তুমি যাও। বাইর হও এই ঘর থিকা।

ছায়া মতির দিকে খানিক তাকিয়ে রইল। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে আমেনার ঘরে এসে ঢুকল।

আমেনা তখন ঘর থেকে বেরুচ্ছিলেন। ছায়াকে দেখে বললেন, কী হইছে মা, মতি চিল্লায় ক্যান?

আমার উপরে রাগ করছে।

অযথা রাগ করে। তুমিই ঠিক আছো।

আম্মা, তারে আপনে বুঝান।

কী বুঝামু?

লেখক সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। তিনি হারু ভাইর কাছ থিকা সব শুনছেন। আমিও বলছি।

কী বলছো?

বলছি, আমি আমার স্বামীরে বাঁচাইতে চাই। আপনে আমারে সাহায্য করেন। তিনি আপনার ছেলেরে দেখা করতে বলছেন।

শাশুড়ির হাত ধরে কেঁদে ফেলল ছায়া। আম্মা, আপনের ছেলে আর আপনেরে নিয়া আমি বাঁইচা থাকতে চাই। আগে সে সুস্থ হোক তারপর কাজের পথ বাইর হইব। আপনে তারে বুঝান।

ছায়ার কথা শুনে মনটা ভরে গেল আমেনার। গভীর মমতায় বউয়ের মাথায় একটা হাত রাখলেন তিনি। মুগ্ধ গলায় বললেন, আল্লাহ তোমার মনের আশা পপূরণ করুক মা। আমি মতির সঙ্গে কথা বলতেছি।

অসুস্থ শরীর টেনে টেনে ছেলের ঘরে এসে ঢুকলেন আমেনা।

মাকে দেখে অবাক মতি। তুমি এই শরিল নিয়া বাইর হইছো ক্যান মা?

আমেনা বললেন, এখন জ্বর নাই। আবুল ডাক্তার অষুদ দিয়া গেছে। দুইবার খাইছি। তাতে জ্বর কমছে।

মতির পাশে বসলেন আমেনা। ছেলের কাঁধের কাছে একটা হাত রাখলেন। বাবা, আমার কথা শোন।

মতি রাগি গলায় বলল, বউর পক্ষ লইছো? বউর পক্ষ লইয়া কথা কইবা?

বউর পক্ষই তো লওন উচিত। বউ তো ভালো পথ বাইর করছে। লেখক সাহেব তোরে সাহায্য করবেন।

কেউর সাহায্য আমার লাগবো না। আমি মইরা যাইতে চাই।

এত রাগ করিছ না বাবা। আমার কথা শোন।

তোমরা কী মনে করছো? এই বাড়ির মা বউ ঝিয়ের কাম করবো আর আমি তাকায়া তাকায়া দেখবো?

ছেলের কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে তাকে বেশ বড় রকমের একটা ধমক দিলেন আমেনা। খরবদার এত বড় বড় কথা কবি না। আমার সংসারের এই দশা হইছে তোর জইন্য। তোর বাবায় জায়গা স¤ক্সত্তি কম রাইখা যায় নাই। তুই এক ছেলে, রাজার হালে জীবন কাটাইতে পারতি। তুই তো কোনও কাজ করছ নাই। জমি বিক্রি করছস আর বইসা বইসা খাইছস। এই জইন্য ডায়বিটিস হইয়া তোর অহন এই দশা। নিজে মরতাছস, আমগও মারতাছস।

আমেনা আর বসলেন না, রাগি ভঙ্গিতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। মতির মুখে তখন কী রকম একটা চিšা খেলা করছে।

১০

বাংলোর বারান্দায় পায়চারি করছে রবি।

এখন প্রায় দুপুর। চারদিক ঝিম ঝিম করছে রোদে। অতি মোলায়েম একটা হাওয়া আছে। গাছপালার দিকে তাকালে সেই হাওয়ার অ¯িত্ব টের পাওয়া যায়। পাতায় পাতায় মৃদু একটা কাঁপন।

ক্রাচে ভর দিয়ে মতি এসে দাঁড়াল বারান্দার অদরে।

পায়চারি করতে করতেই মতিকে দেখল রবি। দেখে প্রথমে পায়ের দিকে তাকালো তারপর ধীরে ধীরে চোখ তুলল ওউপরের দিকে।

মতি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলছে না।

রবি বলল, তোমার চেহারা তো নায়কদের মতো। এমন দশাসই ফিগার, গতির অভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

রবির কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না মতি। বলল, জ্বি?

রবি হাসিমুখে বলল, মতি, তোমার নেই গতি। এই গতি উপায় অর্থে না, ¯িক্সড অর্থে। তোমার কোনও ¯িক্সড নেই।

কেমনে বুঝলেন? ছায়া বলছে?

না।

তাইলে?

আমার হচ্ছে লেখকের চোখ। এই চোখ দিয়ে অনেক কিছু দেখতে পাই, অনেক কিছু বুঝতে পারি।

তারপর বলল, এই বয়সে ডায়াবেটিস হয়েছে কেন?

বাবার ছিল।

এখন ডায়াবেটিসের সঙ্গে নিশ্চয় আরও অনেক কিছু যুক্ত হয়েছে?

জ্বি।

চোখে দেখতে পাও?

মতি কথা বলবার আগেই রবি বলল, আরে তার আগে তো আরেকটা কথা বলতে হয়।

কী কথা?

তোমাকে যে তুমি করে বলছি, মাইন্ড করো না। আমার কোনও ছোট ভাই নেই। থাকলে তোমার সমান থাকতো।

না না আমি কিছু মনে করি নাই।

দ্যাটস গুড। তার মানে তুমি এখন চোখে কম দেখো। হাঁটাচলা না করার ফলে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছো। কিডনিতে প্রবলেম দেখা দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। দুদিন পর হার্টের প্রবলেম হবে। ডায়াবেটিস হচ্ছে ঘুনপোকা। ভেতর থেকে তোমাকে খেয়ে ফেলবে।

সেইটা অনেকখানি খাইয়া ফালাইছে।

এসো, বারান্দায় এসো। বসো এখানে।

বারান্দায় দুটো সুন্দর চেয়ার রাখা। একটা চেয়ারে বসল রবি। মতি এসে বসল অন্য চেয়ারটায়।

রবি বলল, আমি তোমার জন্য কী করতে পারি, মতি?

মতি মাথা নিচু করে বলল, সেইটা তো আমি জানি না। আপনে ছায়ারে বলেছেন, আমি য্যান আপনের সঙ্গে দেখা করিঃ

মতির চোখের দিকে তাকিয়ে রবি বলল, তুমি অযথা অহংকারি।

জ্বি?

না না এটা তোমার দোষ না। এটাই আমাদের মধ্যবিত্ত মানসিকতা। তোমার মা এবং স্ত্র¯ীর চেষ্টা আছে। তারা কিছু করতে চায়। তুমি চাও না। লেকচার হয়ে যাচ্ছে, না? ঠিক আছে, বাদ দিলাম। ঢাকা চলো।

জ্বি?

ডায়াবেটিস হাসপাতালে ভর্তি করে দেব। তোমার ছয় মাসের দায়িত্ব আমার। না না শুধু তোমার না। তোমার মা এবং স্ত্র¯ীরও। ছয় মাসের মধ্যে ভালো হয়ে গ্রামে ফিরে আসবে।

তারপর চলবো কীভাবে? খাবো কী?

কাজ করে খাবে?

কী কাজ?

চোখ খুলে চারপাশে তাকাও, দেখবে কাজের কোনও অভাব নেই। যে কোনও একটা কাজ শুরু করবে, দেখবে ধীরে ধীরে দাঁড়াচ্ছো।

কিন্তু আপনে আমার জন্য এতকিছু করবেন ক্যান? আপনের স্বার্থ কী?

রবি মতির চোখের দিকে তাকালো। আমি এই প্রশ্নটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। জানতাম প্রশ্নটা তুমি করবে? কেন আমি তোমাদেরকে হেল্প করতে চাইছি। আমার স্বার্থ কী? এটা আসলে কোনও হেল্প না।

তাহলে?

লেখক হিসেবে আমার একটুখানি নামটাম আছে। লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। যদি আমার সামান্য চেষ্টায় একটা পরিবার বেঁচে যায়, আর কিছু বলবার দরকার আছে?

মতি ধীর গলায় বলল, জ্বি না। দরকার নাই।

তোমার মা এবং বউটিকে দেখে, তোমাকে দেখে মনে হলো, আমি যদি এই পরিবারের বড়ছেলে হতাম তাহলে আমার দায়িত্ব কী হতো?

একটু থামলো রবি। আমি এইভাবে ভেবেছি।

মতি বলল, আপনে লোক ভালো।

মুখের খুবই মজাদার একটা ভঙ্গি করল রবি। তাতো বটেই। আমি লোক খুবই ভালো।

তারপর হাসলো। নিজের প্রতিভায় নিজেই মুগ্ধ, বুঝলে।

এবার মতিও হাসলো।

মতি চলে যাওয়ার পর রবি তার বন্ধু ডাক্তার রিয়াজ মোবারককে ফোন করল। রিয়াজ, শোনো ভাই। তুমি তো বড় ডাক্তার। আমাকে একটু হেল্প করো। আরে না না, আমার কোনও অসুখ বিসুখ নাই। আমার একজন ডায়াবেটিস রোগিকে ছয় মাসের ফ্রি চিকিৎসা দিয়েঃ বুঝাতে পারলাম? দ্যাটস গুড। আমি জানি তুমি আমার কাজটা করবে। ভালো থেকো ভাই।

ফোন রেখে রবি মনে মনে বলল, আমাদের চারপাশে ভালো মানুষের সংখ্যাই বেশি। আমার চোখে তো খারাপ মানুষ পড়েই না।

তারপর চিৎকার করে হারুকে ডাকলো রবি। হারু, গরম পানি দাও।

পরদিন ভোরবেলা আমেনা মতি আর ছায়া এসে দাঁড়াল রবির গাড়ির সামনে। সঙ্গে পুরনো দুটো ব্যাগ। রবি তৈরি হয়েই ছিল। তার জিনিসপত্র আগেই তুলে রেখেছে কেরিয়ারে। মতিদের গুলোও রাখল। রেখে আমেনার দিকে তাকিয়ে বলল, পুরো পরিবারটিকে নিয়ে যাচ্ছি। মতির সঙ্গে ছায়া থাকবে হাসপাতালে আর আপনি থাকবেন আমার ফ্ল্যাটে। রান্না করতে হবে না। বুয়া আছে।

আমেনা কৃতজ্ঞ গলায় বললেন, আপনার অনেক দয়া বাবা।

আপনি না, তুমি। আর দয়া না, দায়িত্ব। মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব। গাড়ির দরজা খুলে বলল, ছায়া, ওঠো।

ছায়া বলল, জ্বি ভাইজান।

রবি খুশি। দ্যাটস গুড। ভাইজান।

গাড়ি স্টার্ট দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রীকাšের সেই সিডিটাও চালিয়ে দিল রবি।

তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যতদূরে আমি ধাই

কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই।

natundara

[ad#co-1]