হে স্বাধীনতা/যে স্নাত হয়েছে তোমার প্রজ্বল শিখার আলোয়/তোমাকে ছাড়া সে কীভাবে বেঁচে থাকতে পারে।

বিজয়ের মাস : ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১
বাংলাদেশের স্বীকৃতি: উইল অব দ্য পিপল
মফিদুল হক | তারিখ: ০৬-১২-২০০৯
মুক্তিযুদ্ধের সূচনা থেকে এই দিনটির অধীর অপেক্ষায় ছিল বাংলাদেশ। নৃশংস গণহত্যার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সূচিত হয়েছিল স্বাধীনতার লড়াই, সংবিধানসম্মতভাবে গঠিত হয়েছিল সরকার, সংগঠিতভাবে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধ অধিকারে এনেছিল বিভিন্ন অঞ্চল, কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি কখন মিলবে কে জানত। ভারত ও অন্যান্য বন্ধুরাষ্ট্রকে চলতে হয় রাজনীতি ও কূটনীতির শত বিবেচনা মাথায় রেখে। অন্যদিকে মরণপণ লড়াইরত জাতি ভালোভাবেই জানে, এমন স্বীকৃতি তাদের জোগাবে বিশাল প্রণোদনা, অপসারণ করবে বড় অনেক বাধা। সেই স্বীকৃতির জন্য তাই ছিল নিরন্তর প্রতীক্ষা ও প্রত্যাশা। অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, ৬ ডিসেম্বর ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিল বাংলাদেশকে।

পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও মুক্ত করে সেদিন বীরগঞ্জ ও খানসামার পাক অবস্থানের দিকে এগিয়ে চলছিল মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী। এই বাহিনীর অংশী ছিলেন গেরিলা কমান্ডার মাহবুব আলম, পরে যিনি লিখেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এপিকধর্মী সত্যভাষ্য গেরিলা থেকে সম্মুখযুদ্ধে। তিনি লিখেছেন, “বেলা দুটোর দিকে হঠাত্ করেই ফ্রন্ট জুড়ে হৈচৈ আর আনন্দধ্বনি শুরু হয়ে যায়। ব্যাপার কী? জবাব মিলতে দেরি হয় না। এই হৈচৈ আর উচ্ছল আনন্দ প্রকাশের উত্স বাংলাদেশকে ভারতের স্বীকৃতি প্রদানের ঘটনা। রেডিওতে প্রচারিত হয়েছে এই সংবাদ। বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রদানের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন আজ সত্যি সত্যি বাস্তবে রূপ পেল। কত অধীর প্রহর অপেক্ষা করতে হয়েছে আজকের এই দিনটির জন্য। কত কষ্ট, কত মৃত্যু আর যুদ্ধের এই তাণ্ডব, তার বীভত্সতা, নিষ্ঠুরতা—সবকিছুই একটা দেশের স্বাধীনতার জন্য। একটা স্বাধীন জাতির জন্য, ‘জয় বাংলা’র জন্য। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে ফ্রন্টের আকাশ-বাতাস। আর এ আনন্দ-উচ্ছ্বাসের জোয়ার প্রশমিত হতে সময় লাগে।’

মেজর জলিলের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধারা তখন সাতক্ষীরা মুক্ত করে খুলনার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। তিনি লিখেছেন, “বেলা এগারোটার সময় ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ মারফত ঘোষণা করা হলো যে ভারত বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। দীর্ঘ ন’মাস যাবত্ সাড়ে সাত কোটি বাঙালি অধীর আগ্রহে দিনটির জন্য প্রতীক্ষায় ছিল। সংবাদটা শুনে মন থেকে চিন্তা ও উত্তেজনা দূরীভূত হলো। হঠাত্ স্বীকৃতির এই ঘোষণা শুনে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির বিধ্বস্ত অন্তর গর্বে ফুল উঠল।’

টাঙ্গাইলের মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান আনোয়ারুল আলম শহীদ তখন সখীপুরের মুক্তাঞ্চলে, তাঁদের নিয়ন্ত্রণাধীন মুক্ত এলাকার পরিসর ক্রমাগত বেড়ে চলছে। সহকারী নূরুন্নবী যোগাযোগ রাখছেন ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে, একান্ত গোপনে চলছে পরিকল্পনা উপযুক্ত সময়ে ভারতীয় ছত্রীসেনা অবতরণের। যোদ্ধাদল প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারতীয় বাহিনী এলাকায় পৌঁছালে কীভাবে তাদের সহযোগিতা করা হবে। চেষ্টা করছে জামালপুর থেকে মধুপুর ও মুক্তাগাছা থেকে মধুপুর হয়ে টাঙ্গাইল পর্যন্ত সড়ক শত্রুমুক্ত রাখতে, যেন টাঙ্গাইল ও জামালপুরের পাকিস্তানি সেনাদল ঢাকায় ফিরে পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করতে না পারে। আনোয়ারুল আলম শহীদ লিখেছেন সেদিনের স্মৃতি, সখীপুর ও আশপাশের মানুষ সবাই সমবেত হয়েছিল বাজারে, সেখানে আলী পাগলা, শাহানশাহ গান ধরলেন, ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘জনগণ বাইরে আনন্দ করছে। তাই আমরা আর কার্যালয়ে বসে থাকতে পারলাম না। বেরিয়ে আসতেই মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের কাঁধে তুলে নিল। কোনো রকমে নেমে জনতার উদ্দেশে ভাষণ দিলাম। বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে জনগণকে তাদের সহযোগিতা ও সাহসের জন্য ধন্যবাদ জানালাম। আসলে টাঙ্গাইলের পাহাড়িয়া অঞ্চলের জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা না পেলে টাঙ্গাইলে মুক্তিবাহিনী এতাসাফল্য অর্জন করতে পারত না।’

ভারতের পার্লামেন্টের বিশেষ অধিবেশনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের প্রস্তাব উত্থাপন করে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, “বাংলাদেশের সব মানুষের ঐক্যবদ্ধ বিদ্রোহ এবং সেই সংগ্রামের সাফল্য এটা ক্রমান্বয়ে স্পষ্ট করে তুলেছে যে তথাকথিত মাতৃরাষ্ট্র পাকিস্তান বাংলাদেশের মানুষকে স্বীয় নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতে সম্পূর্ণ অসমর্থ। বাংলাদেশ সরকারের বৈধতা সম্পর্কে বলা যায়, গোটা বিশ্ব এখন সচেতন যে তারা জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়, জনগণকে প্রতিনিধিত্বকারী অনেক সরকারই যেমনটা দাবি করতে পারবে না। গভর্নর মরিসের প্রতি জেফারসনের বহু খ্যাত উক্তি অনুসারে বাংলাদেশের সরকার সমর্থিত হচ্ছে ‘পরিপূর্ণভাবে প্রকাশিত জাতির আকাঙ্ক্ষা বা উইল অব দ্য নেশন’ দ্বারা। এই বিচারে পাকিস্তানের সামরিক সরকার, যাদের তোষণ করতে অনেক দেশই বিশেষ উদগ্রীব, এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণেরও প্রতিনিধিত্ব করে না।”
ইন্দিরা গান্ধী এই প্রস্তাবের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো বিভিন্ন পত্র সংযুক্ত করেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্বীকৃতির আহ্বান জানিয়ে প্রথম পত্র পাঠানো হয় ২৪ এপ্রিল, ১৯৭১। এই পত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যা পঠিত হয়েছিল। এ ছাড়া ছিল আইনের ধারাবাহিকতা-সম্পর্কিত আদেশনামা, যা ২৬ মার্চ থেকে প্রযোজ্য হিসেবে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করেছিলেন। আরও ছিল নবগঠিত মন্ত্রিপরিষদের তালিকা। এরপর রয়েছে ১৫ অক্টোবর ১৯৭১ প্রদত্ত পত্র। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্বাক্ষরিত এই পত্রে বলা হয়, ‘আমরা আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, এই সংগ্রাম (অর্থাত্ মুক্তিযুদ্ধ) ফলবতী হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী এখন দেশের অর্ধেক এলাকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা আরও নিশ্চিত করছি যে, মুক্ত অঞ্চলে কার্যকর বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা সুষ্ঠুভাবে কাজ করছে। এই প্রয়াসকে আমাদের জনগণ কেবল স্বাগতই জানায়নি, সরকারের প্রচেষ্টা আমাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও বিপুল সমর্থনও লাভ করেছে।’ এর পরিপ্রেক্ষিতে ‘স্বাধীন এবং যথাযথভাবে সংগঠিত’ বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আবেদন জানানো হয়। এরপর রয়েছে ২৩ নভেম্বর ১৯৭১ মুজিবনগর সরকারের প্রদত্ত আরেক পত্র। সুদীর্ঘ এই পত্রে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌল নীতিমালা ব্যাখ্যা করে পরিস্থিতির মূল্যায়ন তুলে ধরা হয় এবং আবেদন জানানো হয় স্বীকৃতির। সবশেষে ভারত-পাকিস্তান সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর পরপর ৪ নভেম্বর পাঠানো সংক্ষিপ্ত পত্র যুক্ত হয়, সেখানে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ সূত্রে উভয় দেশের মধ্যে বিকশিত নতুন বন্ধনের উল্লেখ করে স্বীকৃতি প্রদানের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত হয়।
পার্লামেন্টে সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃতি প্রস্তাব গ্রহণের আলোচনায় সাংসদ মধু দণ্ডবতে বলেছিলেন, ‘আজ বাংলাদেশের শহীদেরা ও মুক্তিযোদ্ধারা নিশ্চয় মহান কবির সেই পঙিক্তগুলো স্মরণ করবে, হে স্বাধীনতা/যে স্নাত হয়েছে তোমার প্রজ্বল শিখার আলোয়/তোমাকে ছাড়া সে কীভাবে বেঁচে থাকতে পারে।/কোনো পীড়ন, দণ্ডভার ও কারাগার বন্দি করতে পারে না তোমাকে/পারে না তোমাকে পাওয়ার মহান স্পৃহাকে দমাতে।’

কাশ্মীর থেকে নির্বাচিত সাংসদ এম এ শামিম তাঁর ভাষণে বলেন, ‘১৯৪৭ সালে এই আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান জন্ম নিয়েছিল যে ধর্ম মানুষের মধ্যে ফারাক তৈরি করে এবং ধর্মের ভিত্তিতে চিহ্নিত হয়েছিল সীমানা। আজ বাংলাদেশে একজন মুসলিম কমান্ডার সেনাবাহিনী পরিচালনা করছেন, ধর্মপরিচয় ছাপিয়ে তিনি স্মরণ করছেন যে মানবিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ হচ্ছে সবচেয়ে তাত্পর্যময়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এবং এ দেশের রাজনৈতিক বাতাবরণে সেই আদর্শ প্রয়োগের জন্য আমরা যেন সচেষ্ট হই।’

ভারতের স্বীকৃতি প্রদানকে গোটা জাতির পক্ষ থেকে অভিনন্দিত করে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের দিগন্ত আজ স্বাধীনতার পুণ্য আলোকে উদ্ভাসিত।’

৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয়েছিল অশেষ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিজয়, যা সম্ভব হয়েছিল যুদ্ধের মাঠে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সদস্যদের আত্মোত্সর্গকারী ভূমিকা পালনের মাধ্যমে, সম্ভব হয়েছিল সব চক্রান্তের জাল ছিন্নকারী উইল অব দ্য পিপল বা জনগণের আকাঙ্ক্ষার শক্তিময়তা দ্বারা।

মফিদুল হক : প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মী।

[ad#co-1]