বাংলার বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু

jcboseবাংলার বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু আবিষ্কার করেন গাছেরও জীবন আছে এবং তার বয়োবৃদ্ধি ঘটে। ৩০ নভেম্বর ছিল তার ১৫০তম জন্মদিন, তার জন্মস্থান ঘুরে এসে লিখেছেন তরুণ বিজ্ঞানী এম. আর. রাসেল।

ঢাকা-শ্রীনগর-দোহার সড়ক ধরে ৩৫ কিলোমিটার গেলেই চোখে পড়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর ঐতিহ্যের এক মিলন মেলা। চমৎকার এক গ্রামীণ পরিবেশে চোখ রেখেই দেখতে পেলাম জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর বাড়ি। মনোমুগ্ধকর পরিবেশের কারণে মুন্সীগঞ্জের রাঢ়ীখালের বসু বিজ্ঞান মন্দিরটি এখন একরকম বলতে গেলে পিকনিক স্পটে পরিণত হয়েছে। অবসরে অনেকেই রাজধানী ঢাকাসহ নানা জায়গা থেকে ছুটে আসেন আমাদের অহঙ্কার বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর স্মৃতি সান্নিধ্যে একটু অবকাশ যাপনের জন্য। এখানে রয়েছে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর একটি মনোমুগ্ধকর ভাস্কর্য। সিমেন্টের তৈরি এ ভাস্কর্যের পেছনেই রয়েছে প্রায় ২০০ বছরের পুরনো পারিবারিক ভবনটি। জরাজীর্ণ এ ভবনের একাংশ এখন বিজ্ঞান জাদুঘর হিসেবে পরিচিত। ছায়া-সুনিবিড় পরিবেশের এ বসু বাড়িতে বিজ্ঞানীর তেমন কোনো স্মৃতি বা আবিষ্কারের চিহ্ন না থাকলেও বিজ্ঞানমনস্ক কৌতূহলী অনেকেরই ভিড় লেগে থাকে এখানে।

শ্রীনগরের রাঢ়ীখালের এ বাড়িতে শুধু স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু ইন্সটিটিউশন ও কলেজ থাকলেও ভারতে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোডে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষণাগার বসু বিজ্ঞান মন্দির (Bose Institute) যার ওয়েব ঠিকানা www.boseinst.ernet.in । বর্তমানে সেখানে প্রতিনিয়ত ৬০০ থেকে ৭০০ গবেষক বিজ্ঞানের নানা শাখায় উচ্চতর গবেষণা করছেন। সে অর্থে মুন্সীগঞ্জের রাঢ়ীখালে বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা না থাকলেও দেখা যাবে চারদিকে সবুজের সমারোহ। বিজ্ঞানীর এ মাতৃভূমিতে দেখা যাবে আরো সুন্দর এক সবুজ মেলার মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আরো কয়েকটি ভবন, অনেক পুরনো এসব ভবনের পাশে তুলসী গাছের শ্বেত পাথরের বেদি। পাশে রয়েছে আম বাগান। বিজ্ঞানীর বংশধরদের বাড়িটিতে এখন ইন্সটিটিউটের শিক্ষকদের থাকার জায়গা। এটিসহ পুরো বসু বাড়ির ২৫ একর ভূমিই স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু ইন্সটিটিউশনের। গোটা বাড়ি জুড়ে রয়েছে আটটি স্বচ্ছ জলের পুকুর। আর অধিকাংশ জায়গা জুড়েই নানা জাতের উদ্ভিদ। জগদীশ চন্দ্র বসুর এ বাড়িটিতে ১৯২১ সালে ইন্সটিটিউশন প্রতিষ্ঠিত হয়। আর কলেজ শাখা চালু হয় ১৯৯৪ সালে। কিন্তু বর্তমানে নানা প্রতিকূলতার কারণে ১ম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি চলছে অবহেলা আর অনাদরে। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর জন্মভূমির বাড়ির অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা এ মহান বিজ্ঞানীকে এখন ভুলতে বসেছি। অথচ এ কথা এখন প্রমাণিত যে, রেডিওর আবিষ্কারক মার্কনি নয়, এটির আবিষ্কারক ছিলেন বাংলার শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। আর এ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক বেতার সংস্থাই। আমরা কজনইবা জানি যে, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের অন্যতম অংশ ডায়ডের আবিষ্কারকও বাংলার এ বিজ্ঞানী।

এমনি বহু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের আবিষ্কারক বাঙালি কৃতী বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। আর তাই তো তার এ সব আবিষ্কার দেখে মুগ্ধ হয়ে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছিলেন, জগদীশের প্রতিটি আবিষ্কারের জন্য একটি করে স্তম্ভ তৈরি করা উচিত। বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের দেয়া এ মন্তব্যই প্রমাণ করে দেয় সভ্যতার উন্মোচনে বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর আবিষ্কারসমূহ কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এ বিজ্ঞানীর জন্মস্থানটি নিয়ে এতো অবহেলা ও অযতœ সম্পর্কে বিশ্ববাসী কি কিছু জানে? জগদীশ চন্দ্র বসুর ১৫০তম জন্মবার্ষিকী ৩০ নভেম্বর ২০০৯ এবং ৭১তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল ২৩ নভেম্বর। এ দুটি বিশেষ দিনেও চেখে পড়ার মতো তেমন কোনো কর্মসূচিই ছিল না স্থানীয় কিংবা রাষ্ট্রীয়ভাবে। নানা পুরস্কারে ভূষিত বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর জন্ম হয় ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর ঢাকা জেলায় (বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ)। তার পিতা ভগবান চন্দ্র বসু ছিলেন ফরিদপুরের ডেপুটি মেজিস্ট্র্রেট, মাতা ছিলেন বামা সুন্দরী। ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কীর্তিমান এ বিজ্ঞানীর কোনো সন্তান ছিল না। তার স্ত্রী অবলা বসু মারা যান ১৯৫১ সালে। জগদীশ চন্দ্র বসু ১৮৮০ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়তে লন্ডনে যান। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে চিকিৎসা বিজ্ঞান ছেড়ে ক্যামব্রিজে ক্রাইস্ট কলেজে ভর্তি হন এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে ট্রাইপোস পাস করেন। একইসঙ্গে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি পাস করেন। ১৮৮৫ সালে দেশে ফিরে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অস্থায়ী অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু তৎকালীন সময়ে এদেশ বৃটিশদের আধিপত্যে থাকায় বাঙালি হওয়ার কারণে তার বেতন নির্ধারিত হয় ইউরোপিয়ানদের অর্ধেক। প্রতিবাদে বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু এ অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদস্বরূপ বেশ ক’বছর পর্যন্ত বেতন না নিয়ে অধ্যাপনা ও গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন। কর্তৃপক্ষ তার অধ্যাপনায় আশ্চর্য হয়ে বকেয়া বেতনসহ পূর্ণ বেতনে তাকে নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়। বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু আবিষ্কার করেন উদ্ভিদের বৃদ্ধিমাপক যন্ত্র ক্রেস্কোগ্রাফ, উদ্ভিদের দেহের উত্তেজনার বেগ নিরূপক সমতল তরুলিপি যন্ত্র, রিজোনান্ট রেকর্ডার। এছাড়াও ১৮৯৫ সালে তারবিহীন বার্তা প্রেরণ তথা রেডিও যন্ত্রের তত্ত্ব এবং গ্যালেনা ক্রিস্টাল যন্ত্র আবিষ্কার করেন। আজ রেডিও আবিষ্কারের যে সম্মানটি মার্কনির মাথায়, সে মুকুটটি হয়তো আমাদের বাঙালি বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর মাথায় শোভা পেতো, যদি ওই সময় তিনি কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা পেতেন। তবে মার্কনি নয়, বাঙালি জগদীশ চন্দ্রই সর্বপ্রথম বার্তা প্রেরণ ও গ্রহণ যন্ত্র আবিষ্কার করেন এবং তিনি মাত্র ১৮ মাসে বিদ্যুতের মতো একটি জটিল বিষয়ে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকর্ম সম্পন্ন করেন। বাংলার ই সফল বিজ্ঞানী ১৯১৬ সালে নাইটহুড ও ১৯২০ সালে রয়াল সোসাইটির ফেলো ভূষিত হন।

বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু আমাদের অহঙ্কার আমাদের গর্ব। আমরা এ কৃতীমান বিজ্ঞানীর সব স্মৃতি চিহ্নের সঠিক সংরক্ষণ ও তার যথাযথ মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সদাশয় সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে আশা রাখি।

জগদীশ চন্দ্র বসু

[ad#co-1]