আত্মনিবেদিত জগদীশ চন্দ্রের পথে আমরা

69108_Jb-Receiverআমানুল ইসলাম
জগদীশ চন্দ্র বসুর আবিষ্কৃত রেডিও ট্রান্সমিশন ও রিসিভিং যন্ত্র
জর্জ বার্নার্ডশ জগদীশ চন্দ্রকে তৎকালীন জীববিজ্ঞানীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হিসেবে অভিহিত করেছেন। আলবার্ট আইনস্টাইন তার সম্পর্কে বলেছেন, তিনি বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য যতো তথ্য দান করেছেন তার প্রতিটি আবিষ্কারের জন্য স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা উচিত। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘অধিকাংশ মানুষেরই যতোটুকু গোচর তার বেশি আর ব্যঞ্জনা নেই, অর্থাৎ মাটির প্রদীপ দেখা যায়, আলো দেখা যায় না। সে আমার বন্ধু, আমি তার মাঝে আলো দেখেছিলাম।’ আলোকিত এই মানুষটির নাম বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু। তার জন্মকাল ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলায়। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ঠিক পরের বছর। দু’শ বছরের ইংরেজ শাসনের পরও যেসব বঙ্গীয় সন্তান বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চাকে সবসময়ই প্রাধান্য দিয়ে সারাজীবন বিজ্ঞানচর্চায় নিবেদিত ছিলেন তিনি তাদের অন্যতম।

আন্তর্জাতিক বেতার বিজ্ঞান সংস্থার (URSI) অন্তর্গত ৯টি বিভিন্ন কমিশনের ৭টি ক্ষেত্রেই জগদীশচন্দ্রের অবদান উল্লেখযোগ্য। সামান্য উপকরণকে কাজে লাগিয়ে সূক্ষ্ম কাজের উপযোগী অথচ সরল যন্ত্র নির্মাণে তিনি ছিলেন বিরল প্রতিভার অধিকারী। তিনিই প্রথম প্রস্তুত করেন মানুষের স্মৃতিশক্তির যান্ত্রিক মডেল। এরপর তিনি বৈদ্যুতিক উত্তেজনায় উদ্ভিদের সাড়া জাগানোর বিষয়ে গবেষণা করেন এবং এসব গবেষণার জন্য ক্রেস্কোগ্রাফ, স্ফিগমোগ্রাফ, পোটোমিটার, ফটোসিনথেটিক, রেজোনান্ট রেকর্ডার আবিষ্কার করেন। যদিও সে সময় অর্থ, যন্ত্রপাতি কোনোটাই সুলভ ছিল না। তার কথায়, ‘বিলাতের মতো এ দেশে পরীক্ষাগার নেই, সূক্ষ্ম যন্ত্র নির্মাণও এ দেশে কোনো দিনই হতে পারে না, তাহাও কত শুনিয়াছি। তখন মনে হইল, যে ব্যক্তি জৌলুস হারাইয়াছে, কেবল সেইই বৃথা পরিতাপ করে।’ দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের বিজ্ঞানাগারগুলো ঘুরে দেখা গেছে সেগুলোর হতদরিদ্র চেহারা। হাতেগোনা কয়েকটির কথা বাদ দিলে কোথাও সেগুলোকে বিজ্ঞানাগার বলা চলে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কারণটা অর্থনৈতিক, বিজ্ঞানাগারের উপকরণগুলোর বেজায় দাম, তাও আবার সব জায়গায় পাওয়া যায় না। তাই আজ জগদীশ চন্দ্র বসুকে বারবার স্মরণ করতে হচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, পরীক্ষা করার জন্য যন্ত্রপাতি না থাকলে সেটি বানিয়ে নাও। সে কথাকে মনে রেখে মাঠে নামলে হয়তো দেশের হতদরিদ্র বিজ্ঞানাগারগুলোর চেহারা পরিবর্তিত হতে পারে। এর জন্য অর্থের চেয়ে বেশি দরকার স্বপ্ন আর অসম্ভবকে সম্ভব করার মানসিকতা, যেমনটি ছিল বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর।

পাশ্চাত্যে ভারতীয় বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠা ও স্বীয় বিজ্ঞানের আবিষ্কারের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে বন্ধুর পথ। অদম্য মনোবল, নিষ্ঠা, ধৈর্যই তাকে সব বাধা পেরোতে সহায়তা করেছিল। আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু সচেতনভাবে মন্দিরের চিরায়ত ধারণাকে ভেঙেছিলেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এক বিজ্ঞান মন্দিরের। ১৯১৭ সালে ভারতে বসু বিজ্ঞান মন্দিরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। বসু বিজ্ঞান মন্দিরটি বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সাগর। যার ভিত্তি বিশ্বাস নয়, প্রতিষ্ঠিত ছিল বৈজ্ঞানিক কর্মপদ্ধতির ওপর যা অজ্ঞতাকে দূরীভূত করে। তার একটি নোটবই ছিল যেটিতে তিনি তরুণ প্রজন্মের জন্য ১১টি মূল্যবান নির্দেশনা লিখে গেছেন। এগুলো হচ্ছে
১. জীবনের একটা উদ্দেশ্য রাখবে।
২. অসুবিধা দেখলে ঘাবড়ে যাবে না। বাধা আসবে তোমার শক্তি পরীক্ষা করার জন্য।
৩. সব কিছু তোমার অনুকূলে, তুমি সফল। এ সাফল্যে বাহাদুরি নেই কোনো। বরং বীরের মতো বল পারিপার্শ্বিক অবস্থার কোনো তোয়াক্কা করি না।
৪. এমন কিছু রচনা কর যা কেউ কখনো করেনি।
৫. জগতের কাছে প্রমাণ করো তার প্রগতিতে তোমারও একটা আবশ্যক ভূমিকা আছে।
৬. এই জগৎ যন্ত্রণারই একটা ধারাবাহিকতা। জেনে রেখ, সর্বত্রই বৈষম্য আর অন্যায় অবিচার।
৭. সর্বহারাদের সঙ্গী হও যেমন মহাত্মা গান্ধী হয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। কথা নয় অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগেই যতো অবিচার দূর করা যায়।
৮. জগতের শক্তির অক্ষয় ভা-ারে বাগাড়ম্বরে কালক্ষেপণ করো না। চিন্তাশীল হও।
৯. চিন্তাকে কাজে পরিণত করো।
১০. যা কিছু করবে, করবে বিরাট হওয়ার সাধনায়। আইনজ্ঞ তো বিশাল আইনজ্ঞ, বিজ্ঞানী তো বিরাট বিজ্ঞানী।
১১. ক্রমাগত চিন্তার মাধ্যমে জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে নাও।
নির্দেশনাগুলো আমাদের জন্য, তরুণদের জন্য, যে তরুণরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কারিগর হিসেবে কাজ করবে। যাতে তরুণরা আত্মসম্মানবোধ, স্বজাতি ও দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে দেশকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

জগদীশ চন্দ্র বসু

[ad#co-1]