অতীশ দীপঙ্করের অনুসারী তিনি

মনজুরুল হক
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক একটি সংবাদ এই দূরে বসে আমাকে কিছুটা চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। সংবাদটি হলো, পুলিশ একটি ছবি প্রদর্শনীর আয়োজন ভেস্তে দিয়েছে। প্রদর্শনীর মূল বিষয়বস্তু ছিল তিব্বতের জনগণের প্রত্যাশা। এবং আমরা ধরে নিতে পারি, শুরু হতে না পারা সেই প্রদর্শনীর বড় এক অংশজুড়ে মুখ্য যে ব্যক্তিত্বের ওপর আলোকপাত করা হয়ে থাকবে, তিনি হলেন ভারতে নির্বাসিত তিব্বতের আধ্যাতিক নেতা চতুর্দশ দালাই লামা। হঠাত্ করে আমাদের প্রশাসন আর পুলিশের তিব্বত ও দালাই লামার ওপর এতটা খেপে ওঠার কারণ কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছে না, বিশেষ করে এমন একসময়ে যখন কিনা তিব্বতি নেতার ভারতের অরুণাচল প্রদেশে অবস্থিত তাওয়াং বৌদ্ধ মঠ ভ্রমণে নতুন দিল্লির কাছ থেকে তাঁর অনুমতি লাভ করার পর গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের নেতারা রীতিমতো ক্ষিপ্ত। তবে কি আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি এখন চীনের দিকে হেলে পড়ছে?

দূরে বসে ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আঁচ করে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ আপাতত আমাদের সামনে খোলা নেই। ফলে ধরেই নিচ্ছি চীনকে নাখোশ করতে আমাদের সরকার আর নেতারা নারাজ। আর তাই আসল দালাই লামাকে কাছে না পেলেও তাঁর ছবিকে লাঠিপেটা করেই না হয় তুলে ধরা যাক আমাদের মধ্যে সদ্য জেগে ওঠা এই চীনপ্রীতির প্রমাণ! ধানমন্ডি থানার ওসি সাহেব অবশ্য কিছুটা সদয় হয়ে ছবিকে ক্রসফায়ারে নিয়ে যাননি। এর বদলে প্রদর্শনী ভবনে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে চাবিটি তিনি সঙ্গে নিয়ে গেছেন। আর যাই হোক না কেন, তপ্ত অর্থনীতির কারণে চীন নামের দেশটির পকেট যে এখন বেশ গরম। ফলে গরম সেই পকেটকে খেপিয়ে দিয়ে উপরি কিছু পাওনা হাতছাড়া করে ফেলা নিশ্চয় বুদ্ধিমানের কাজ নয়, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক রাজনীতির এখনকার এই সময়ে ভালোমন্দের মাপকাঠি যখন অনেকটাই নির্ভর করছে পকেট ভারী থাকা-না থাকার ওপর।
আমাদের দেশে তিব্বত আর দালাই লামার ছবিকে নিয়ে পুলিশের যখন এতটা হইচই, ঠিক সে রকম এক সময়ে গত শনিবার টোকিও ঘুরে গেলেন তিব্বতের এই নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী আধ্যাত্মিক নেতা। ব্যস্ত সময়সূচির এক ফাঁকে টোকিওর বিদেশি সাংবাদিকদের প্রেসক্লাবে উপচে পড়া ভিড়ের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বক্তব্য রেখেছেন। যুক্তিতর্ক আর বাচনভঙ্গির মধ্য দিয়ে জনতাকে মোহাবিষ্ট করে রাখতে সক্ষম এই ধর্মীয় নেতা জাপানেও সাংবাদিকদের নজর কেড়ে নিতে সক্ষম হন। ক্লাবের বর্তমান সভাপতি হিসেবে সম্মানিত সেই অতিথিকে স্বাগত জানানো ও তাঁর সংবাদ সম্মেলন পরিচালনার দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপর। এবারই প্রথম কাছে থেকে নমস্য সেই ব্যক্তিত্বকে আমার দেখা। বলতে বাধা নেই, তাঁর সঙ্গে কথা বলে আর তাঁর ভাষণ শুনে অন্য সবার মতোই আমিও রীতিমতো মুগ্ধ। আর এ কারণেই আমাদের পুলিশ কেন তার ছবির ওপর চড়াও হলো, তা ভেবে কোনো কূলকিনারা আমি একেবারেই পাচ্ছি না। তবে সেই বিতর্কে না গিয়ে বরং কোন কথা দালাই লামার সঙ্গে সেদিন আমার হয়েছে এবং কোন বক্তব্যই বা তিনি সংবাদ সম্মেলনে রেখেছেন, সে বিষয়গুলো এখানে আমি তুলে ধরতে আগ্রহী, যা কিনা নিঃসন্দেহে বলে দিতে সক্ষম— একজন মানুষ হিসেবে কতটা ওপরে তার অবস্থান।

রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কোনো কোনো মহলে বিতর্কিত হয়ে ওঠা দালাই লামা তার বক্তব্যের শুরুতেই বলেছিলেন রাজনীতির মানুষ তিনি নন এবং একজন ধর্মীয় নেতা হিসেবে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করতে পারাই তাঁর ব্রত। ফলে তিব্বতের জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানানোর বিষয়টিকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি দেখছেন না। তবে ধর্মের কথা বলে গেলেও ধর্মবিশ্বাসের দিক থেকে দালাই লামা যে খুবই আধুনিক চিন্তাভাবনার মানুষ, সেই প্রমাণ আমরা পেয়ে যাই তাঁর দেওয়া সেই ভাষণে ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা শুনে। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির উল্লেখ প্রসঙ্গে যে বিষয়টি তিনি সাংবাদিকদের স্মরণ করিয়ে দেন তা হচ্ছে, ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মহীনতা নয়, বরং তা হলো সব ধর্ম আর সব রকম বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। সেদিক থেকে ধর্মে যাদের বিশ্বাস নেই, সে রকম অজ্ঞেয়-অবিশ্বাসীও ধর্মনিরপেক্ষ নীতিমালার আওতায় শ্রদ্ধা পাওয়ার দাবি রাখে। তিব্বতের এই আধ্যাত্মিক নেতা মনে করেন, ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান থেকে মানুষের সরে আসার কারণেই বিশ্বজুড়ে এতটা অশান্তি, এত বেশি হানাহানি আজ বিরাজমান।

ভেবে অবাক হতে হয় যে নিজে একজন ধর্মীয় নেতা হওয়া সত্ত্বেও ধর্মনিরপেক্ষতার এতটা বলিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যা তিনি সেদিন দিয়েছেন। সেদিক থেকে প্রিয় পাঠক একবার ভেবে দেখুন, আমাদের ধর্মীয় লেবাসধারী রাজনৈতিক নেতাদের আচার-আচরণ। বুঝে নিতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে মানুষ হওয়ার শিক্ষা গ্রহণের জন্য দেশ থেকে খুব বেশি দূরের পথে যাওয়ার প্রয়োজন একেবারেই তাদের নেই। ঘরের পাশেই যে আছে সেই আরশিনগর!
সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্নোত্তর পর্বে শুরুতে দালাই লামার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তাঁর আসন্ন তাওয়াং মঠ সফরের পরিকল্পনাকে ঘিরে চীনের জানানো প্রতিবাদকে তিনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। দালাই লামার পরিষ্কার জবাব ছিল, যেহেতু চীনে তিনি যাচ্ছেন না, ফলে বিষয়টি নিয়ে বেইজিংয়ের অযথা হইচই করা অর্থহীন। সাংবাদিকদের তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে যেখানেই তিনি যাচ্ছেন, চীন এর প্রতিবাদ করছে। তাঁর সাম্প্রতিক তাইওয়ান সফরকে কেন্দ্র করে জানানো প্রতিবাদ অনেকের কাছে অর্থবহ মনে হলেও সামুদ্রিক ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জানানো ছিল তাঁর সেই সফরের উদ্দেশ্য।

দালাই লামা মনে করেন, তাওয়াংকে ঘিরে নতুন করে মাঠ গরম করে তোলা চীনের জন্য এ কারণে অর্থহীন যে ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের সময় গণমুক্তি বাহিনী ওই অঞ্চলটি দখলে নেওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর চীনা সেনা সেখান থেকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এর অর্থ হচ্ছে, ভারত ও চীনের মধ্যে বিভক্তি টেনে দেওয়া ম্যাকমোহন লাইনের বাস্তবতা চীন সেই ১৯৬২ সালের পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই মেনে নিয়েছিল। ফলে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া একটি বিষয় নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টির পাঁয়তারা শুভ লক্ষণ হতে পারে না বলেই দালাই লামা মনে করেন।

তবে ভাষণের সবচেয়ে আবেগপ্রবণ অংশটি ছিল তিব্বতি নেতার দেওয়া করুণা বা সমবেদনার ব্যাখ্যা। শুত্রুর প্রতি সেই করুণার মনোভাব ছড়িয়ে দিয়ে শত্রুর মনকে জয় করার ব্রত গ্রহণের যে বাণী তিনি তাঁর ভাষণে শুনিয়েছেন, উপস্থিত সাংবাদিকদের অনেকের মনকেই তা স্পর্শ করে যায়। তিব্বতি নেতার ভাষণ শোনার দুই দিন পর এক জার্মান সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন, স্বপ্নের মধ্যেও আবারও তিনি শুনতে পেয়েছেন দালাই লামার করুণা প্রদর্শনের সেই বাণী এবং এতে সাড়া দিতে এখন তিনি প্রস্তুত।

সেদিনের সেই অনুষ্ঠানে ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রাপ্তি ছিল দালাই লামার নিজের মুখ থেকে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের প্রশংসা শোনা। সংবাদ সম্মেলন শুরু হওয়ার আগে অল্পসময়ের একান্ত আলাপকালে আমার বাংলাদেশি পরিচয় সম্পর্কে জানার পর তিনি নিজেই বলেছিলেন অতীশ দীপঙ্করের কথা। পরে সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে সম্মানিত অতিথির পরিচয় তুলে ধরার সময় অতীশ দীপঙ্কর প্রসঙ্গে আমি তার বাংলাদেশি পরিচয় উল্লেখ করলে দালাই লামা আমার সেই ভুল শুধরে দিয়ে বলেছিলেন, বর্তমান বাংলাদেশ উল্লেখ করা বোধ হয় অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হবে। দালাই লামা তাঁর মূল ভাষণেও একপর্যায়ে নিজের দেশত্যাগী হওয়ার সঙ্গে তুলনা করে আবারও বাংলার সেই বৌদ্ধ পণ্ডিতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেছিলেন, বৌদ্ধ ধর্মের তান্ত্রিক শিক্ষার পাঠ গ্রহণ করতে একসময় একালের ইন্দোনেশিয়ায় তিনি গিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তিনি রাখেন। সমবেত সাংবাদিকদের তিনি মনে করিয়ে দিতে ভোলেন নি যে তিনি হচ্ছেন অতীশ দীপঙ্করের একনিষ্ঠ একজন অনুসারী।

সেই অতীশ দীপঙ্করের বাংলায় তাঁর পদার্পণ করা হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে অনুষ্ঠান শেষে তাঁর কাছে আমি জানতে চেয়েছিলাম। প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত যে উত্তর তিনি দিয়েছিলেন তা হলো, সময় এখন অনুকূলে নয়। সময় যে অনুকূলে নেই, আমাদের প্রশাসন অনেকটা যেন চোখে আঙুল দিয়ে আবারও তা দেখিয়ে দিল দালাই লামার টোকিও ছেড়ে চলে যাওয়ার একদিন পর দূর বাংলাদেশে তিব্বতের আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন যেখানে করা হয়েছে, সেই ভবনটিতে পুলিশের তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে। ফলে করুণার বাণী ছড়িয়ে দিয়েই আমরা জানাতে পারি এর প্রতিবাদ।

টোকিও ৩ নভেম্বর ২০০৯
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

[ad#co-1]