বাংলাদেশের মূল এজেন্ডা কী উন্নয়নের জন্যে প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য

নূহ-উল-আলম লেনিন
প্রশ্নটা পুরনো। উত্তরটাও প্রায় স্বতঃসিদ্ধ। উন্নয়ন। কিন্তু তারপরও ঘুরেফিরে এ প্রসঙ্গে ফিরে আসা কেন? এই কেন’র উত্তরটা নিয়েই যতো ইতি-উতি, তর্ক-বিতর্ক এবং ধাঁধা। স্বাধীনতার পর গত ৩৮ বছরে এমন কোনো সরকার নেই, দল নেই এবং ব্যক্তি নেই যারা বা যে উন্নয়নের প্রশ্নে দ্বিমত করবেন। কিন্তু তারপরেও আমরা যে কাঙিক্ষত উন্নয়ন করতে পারিনি, নানাবিধ রাজনৈতিক আলোড়ন ও পতন অভ্যুদয়ের কারণে উন্নয়নের ব্যাপারটি ‘মুখ্য’ বিবেচ্য হয়ে ওঠেনি অথবা বিবেচনায় থাকলেও তা নিষ্কন্টক হয়নি সে ব্যাপারেও সম্ভবত দু’চার জন ছাড়া সবাই একমত হবেন।

আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সমাজের অগ্রণী অর্থনীতিবিদ-বুদ্ধিজীবী এবং তথাকথিত উন্নয়ন সহযোগীদের যার যার মতো করে উল্লিখিত প্রশ্নের নিজস্ব একটা উত্তর আছে। প্রথমত রাজনীতিবিদদের কথায় আসা যাক। আমাদের রাজনীতিবিদগণ স্বভাবতই প্রায় প্রতিটি জাতীয় ইস্যুতে বহুধা বিভক্ত। ‘উন্নয়ন’ যে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক (ঃ) ইস্যু দৃশ্যত এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্ব সহমত পোষণ করলেও উন্নয়নের প্রশ্নে, সকল রাজনৈতিক ভেদাভেদ মুলতবী রেখে একটা জাতীয় ঐকমত্য গড়ার জন্য বললে তারা আর এগিয়ে আসেন না। বরং নানা পূর্ব শর্ত জুড়ে দেন। কেউ বলেন উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি। অতএব, উন্নয়নের জন্যই ‘গণতন্ত্র’ চাই, চাই ভোটাধিকার, নির্বাচিত সরকার, জনগণের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা এবং কার্যকর সংসদ।

কেউ কেউ মনে করেন গণতন্ত্র অর্জিত হলেও কাঙিক্ষত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন কতগুলো মৌলিক বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য। যেমন ধরা যাক জাতিকে বিভক্তকারী ইস্যুগুলোর মীমাংসা না করে জাতীয় ঐকমত্য করা দুরূহ। স্বাধীনতার ঘোষক, বঙ্গবন্ধুর অবদান ও ভূমিকা, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার, চার জাতীয় নেতার হত্যাকাণ্ডের বিচার, বাঙালি জাতীয়তাবাদ বনাম বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এবং সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী প্রভৃতি ইস্যু। বলাই বাহুল্য এই ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশের দলগুলো সুস্পষ্টভাবে দুইভাগে বিভক্ত। এখন আমরা বরং উল্লেখিত ইস্যুগুলোর মেরিট এবং উন্নয়ন প্রশ্নে তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোকপাত করতে পারি।

‘গণতন্ত্র’ ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব কিনা এক কথায় এই প্রশ্নের কোনো সহজ-সরল উত্তর নেই। উন্নয়নের মতোই দরিদ্র ও উন্নয়নকামী দেশগুলোর সামনে গণতন্ত্রের প্রশ্নটিও প্রায় সমান গুরুত্ব বহন করে। এশিয়া আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেকগুলো দেশ এককালে পশ্চিমের উপনিবেশবাদী দেশগুলোর পদানত ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার পতনের ফলে গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে প্রায় সবগুলো দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। সদ্য স্বাধীন এসব দেশ ছিল অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ, দরিদ্র এবং বিদেশ নির্ভর। এসব দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল প্রেরণা ছিল নিজ দেশ ও সম্পদের ওপর সে দেশের জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং পশ্চাৎপদতা ও দারিদ্র্যের অভিশাপ ঝেড়ে ফেলে জনগণের জন্য সুখী সমৃদ্ধ উন্নত জীবন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সেই সঙ্গে এই সদ্য স্বাধীন দেশগুলোয় ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামোর স্থলে জনগণের অংশগ্রহণমূলক একটা গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামো গড়ে তোলাও ছিল জরুরি কর্তব্য। কিন্তু প্রায় অধিকাংশ দেশেই এই দুটি কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে যায়।

শুধু তাই-ই নয়, উন্নয়নকামী বেশকিছু দেশে নানা মাত্রার সামরিক-অসামরিক স্বৈরশাসন জেঁকে বসে। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেন সেনাবাহিনী এবং একনায়কতন্ত্রী স্বৈরশাসকরা। এসব দেশে দীর্ঘদিন এক ধরনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও বিরাজ করে। দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, আলজেরিয়া, সুদান ও ইথিওপিয়া প্রভৃতি দেশ ওই গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। এই প্রতিটি দেশেরই রয়েছে নিজস্ব অভিজ্ঞতা, ঐতিহ্য ও জাতীয় বৈশিষ্ট্য। কার্যকর গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার উন্নতি সদ্য স্বাধীন সব দেশকে ছাড়িয়ে যায়। উদীয়মান ব্যাঘ্র বলে খ্যাত এই দেশগুলো এখন আর অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ নয় বরং মাঝারি মাপের উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত। প্রশ্ন হচ্ছে, তা হলে কী প্রমাণ হয় যে, ‘গণতন্ত্র’ ছাড়াও ‘উন্নয়ন’ সম্ভব?

আমাদের বিবেচনায় আপেক্ষিকভাবে সম্ভব হলেও চূড়ান্ত বিচারে সম্ভব নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্ট্রাটেজিক স্বার্থে এসব দেশে সামরিক উপস্থিতির পাশাপাশি বিপুল সাহায্য অনুদান ও ঋণ-বিনিয়োগ দিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীনা বিপ্লব, কোরিয়া যুদ্ধ ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের পটভূমিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান এবং সিঙ্গাপুরকে যেভাবে সাহায্য সহযোগিতা দেয় তার ফলে এসব দেশের উন্নয়নের একটা প্রাথমিক ভিত্তি রচিত হয়। কিন্তু ওই আপেক্ষিক উন্নতির পরেই এসব দেশের মানুষ গণতন্ত্রের সংগ্রামে নামে। দক্ষিণ কোরিয়ার লৌহমানব পার্ক চুং হির পতন ঘটে। টানাপড়েন সত্ত্বেও দেশটি গণতন্ত্রের পথ ধরে। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াতেও স্বৈরশাসনের স্থলাভিষিক্ত হয় নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। বস্তুত গত দুই দশকের গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর শাসনামলেই এই দেশগুলোর উন্নয়নে নতুন গতিবেগ সঞ্চারিত হয়। মার্কিন স্ট্রাটেজিক স্বার্থের আনুকূল্য ছাড়াও বর্তমানে এসব দেশ উন্নত দেশগুলোর পঙক্তিভুক্ত হতে চলেছে। ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না স্থিতিশীল গণতন্ত্রের জন্য এসব দেশের জনগণকে এখনো সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হয়েছে।

সামরিক ও স্বৈরশাসনের জালে আবদ্ধ ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, মায়ানমার অথবা সামরিক-অসামরিক স্বৈরশাসনে জোয়ালে আবদ্ধ (নির্বাচিত স্বৈরশাসন) মিশর, সিরিয়া, আলজেরিয়া, সুদান বা ইথিওপিয়ার অভিজ্ঞতা কিন্তু মধুর নয়। প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও এসব দেশে কাঙিক্ষত উন্নয়ন হয়নি। পক্ষান্তরে তৈল সম্পদে সমৃদ্ধ আরব অঞ্চলে রাজতন্ত্রী-চরম ও প্রতিক্রিয়াশীল কতিপয় রাষ্ট্র যে ‘উন্নতি’ করেছে তাকেও স্বাভাবিক উন্নতি বলা যাবে না। স্বল্প জনসংখ্যা অধ্যুষিত এসব দেশ কোনো অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর অধিকাংশ নব্য স্বাধীন দেশই ক্ষুধা, দারিদ্র্য, পশ্চাৎপদতা, অনুন্নয়ন, গণতন্ত্রহীনতা, রাজনৈতিক ও জাতিসত্তাগত সংঘাতের ফলে চক্রাকার অস্থিতিশীলতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। ব্যতিক্রম দুটি বৃহৎ দেশ (তিনটিও বলা যেতে পারে)। চীন ও ভারত। ব্রাজিলকে হয়তো অচিরেই এই পঙক্তিভুক্ত করা যাবে। চীনে বহুদলীয় গণতন্ত্র অনুপস্থিত। বস্তুত চীনে যে বিস্ময়কর উন্নতি হচ্ছে তা, ‘সমাজতন্ত্র’ বলে যতোই বিজ্ঞাপিত করা হোক না কেন, আমাদের মতে একে বলা যেতো সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদ। মাও জে দং-এর পিপলস ডেমোক্রেসি বা জনগণতন্ত্রের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে ‘পিপলস ক্যাপিটালিজম’। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পিত পুঁজিবাদী বিকাশের এমন নজীর সম্ভবত দুনিয়ায় আর নেই। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য ত্যাগ করেনি, গণতান্ত্রিক স্বাধীনতাও ফিরিয়ে দেয়নি, আবার ক্লাসিক্যাল কমিউনিজমও নির্মাণ করছে না। শ্রম ও পুঁজির সাযুজ্য ঘটিয়ে বাজার অর্থনীতির যে পরিকল্পিত বিকাশ তারা ঘটিয়েছে, ইতোমধ্যে তা সমগ্র বিশ্বের কাছে চমকপ্রদ নজীর হিসেবে আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি আমি বেইজিং ও সাংহাইয়ে ভ্রমণ করতে গিয়ে যে বিস্ময়কর উন্নতি, কেবল রাস্তাঘাট, দালানকোঠা বা শিল্প-কারখানাই নয়, জনগণের জীবনযাত্রায় যে সচ্ছলতার অভিপ্রকাশ দেখেছি তাতে মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। তবে গণতন্ত্রের প্রশ্নটি এবং আখেরে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত পুঁজিবাদী বিকাশের ভবিষ্যৎ কী দাঁড়ায় তার জন্য আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারত। চীনা বিপ্লবের (১৯৪৫) আগে ভারত স্বাধীনতা (১৯৪৭) অর্জন করে। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রয়েছে অভিন্ন ইতিহাস। কিন্তু ১৯৪৭-এর পর দেশভাগের পর ৬২ বছর অতিক্রান্ত হলেও ভারত ঠিক চীনের পর্যায়ে উন্নতি করতে সক্ষম হয়নি। আশির দশক পর্যন্ত চীন ও ভারত উন্নয়ন দৌড়ে একই সমতলে প্রায় কাছাকাছি ছিল। কিন্তু মাওযুগের অবসান এবং দেং জিয়াও পিং-এবং তার উত্তরাধিকারীদের মাধ্যমে সূচিত ‘খোলাদুয়ার’ নীতি গ্রহণ তথা পরিকল্পিত পুঁজিবাদী বিকাশের পথে যাত্রা শুরু করার পর চীন গত বিশ-পচিশ বছরে অভাবিত উন্নতি করেছে। প্রায় একই সময়ে ভারতও সমাজতন্ত্রমুখীন মিশ্র অর্থনীতি ত্যাগ করে খোলা দুয়ারনীতি বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও ব্যবসার জন্য ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার বহুজাতিক কোম্পানি ও উন্নত ধনবাদী দেশগুলোর জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার নীতি গ্রহণ করলেও উন্নয়ন দৌড়ে চীনের পেছনে পড়ে যায়। চীনে প্রবৃদ্ধির হার যেখানে ১১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, ভারতে তা ৬/৭ শতাংশে সীমিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে প্রবৃদ্ধির হারে গতি সঞ্চারিত হয়েছে এবং ইতোমধ্যে ৯ শতাংশ অতিক্রম করেছে। তবে চীন ও ভারতে উন্নয়নের একটি জায়গায় বড় ধরনের ‘ফারাক’ রয়ে গেছে। চীনে দারিদ্র্য হ্রাস এবং সাধারণ মানুষের জীবনমানের যতোটা উন্নতি হয়েছে, ভারতে তা এখনো অর্জিত হয়নি। অবশ্য ভারতে বর্তমান বিকাশের যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে ভারতও অনতিকাল পরে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। চীনের তুলনায় চমকপ্রদ এবং অনুসরণীয় সাফল্য রয়েছে এই বহুজাতিক, বহুভাষিক দেশটির বহুদলীয় প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের সংহত বিকাশে।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে একটি কথা স্পষ্ট যে, গণতন্ত্র যেমন উন্নয়নের অনুষঙ্গ তেমনি আপেক্ষিক উন্নতি এবং একটা পর্যায় পর্যন্ত ‘উন্নয়নে’ গণতন্ত্র পূর্বশর্ত নয়। তবে একে সাধারণ সর্বজনীন অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরলে সরলীকরণ করা হবে। চূড়ান্ত বিচারে একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে সে দেশের জনগণের অভিপ্রায়, সংগঠিত ও পরিকল্পিত ভূমিকা এবং দেশটির ইতিহাস-ঐতিহ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক বিকাশের মাত্রার ওপর।

বাংলাদেশের কথায় ফেরা যাক। আমাদের দেশে সামরিক শাসন, অসামরিক পোশাকে স্বৈরশাসন, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের কাঠামোয় নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রসহ সব অভিজ্ঞতাই রয়েছে। এমন কী স্বল্পকালীন একদলীয় শাসনের অভিজ্ঞতাও আছে। বাংলাদেশের এই ৩৮ বছরের উন্নয়ন ইতিহাসকে নির্মোহভাবে বিচার করলে একটি চমকপ্রদ তথ্য বের হয়ে আসে। আর তা হচ্ছে বাংলাদেশে তুলনামূলক উন্নয়ন বা সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে। আরো স্পষ্ট করে বলা যায়, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। তবে ঐ হারে যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের জন্য হওয়ায় ওটিকে আমরা স্বাভাবিক উন্নতির হার বলি না। কিন্তু জিয়া, এরশাদ এবং খালেদা জিয়ার দুইবারের শাসনামলের তুলনায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রথম সরকারের (১৯৯৬-২০০১) পাঁচ বছরের প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল স্বাভাবিক সময়ের সর্বোচ্চ হার। পরিসংখ্যান জালিয়াতির কারিগর প্রয়াত সাইফুর রহমানের চেষ্টা সত্ত্বেও এই হারকে ৫.৫০ শতাংশের নিচে নামানো সম্ভব হয়নি, যদিও প্রকৃত হার ছিল ৬.২ শতাংশ। দ্বিতীয়ত গত ৩৮ বছরে বঙ্গবন্ধুর সরকারের যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের সময়টুকু বাদ দিলেও একমাত্র শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলেই এ দেশে দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে সর্বোচ্চ ১.৫০ শতাংশ হারে। অথচ অতীতে বা পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে এই হার ছিল মাত্র ০.৫০ শতাংশ। অর্থাৎ কেবল জিডিপি এর হারই নয়, হত-দরিদ্রদের উন্নতি এবং জনগণের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নেও গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক সরকার একটা প্রধান উপাদান হিসেবে তার কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। এই অভিজ্ঞতা থেকেও আমরা বলব না ‘গণতন্ত্র’ উন্নয়নের পূর্বশর্ত। আমি বরং বলব আমাদের দেশের অভিজ্ঞতায় উন্নয়ন ও গণতন্ত্র অথবা গণতন্ত্র ও উন্নয়ন একটি সাধারণ প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ, পরস্পরের পরিপূরক। আমি যাকে বলেছি উন্নয়নের অনুষঙ্গ হচ্ছে গণতন্ত্র। আমাদের দেশের কাঙিক্ষত বা সম্ভবপর উন্নতি যেমন হয়নি, তেমনি গণতন্ত্র অর্জিত হলেও তা স্থায়ী ভিত্তির ওপর সংহত এবং নিষ্কন্টক হয়নি। তবে শত বাধা-বিপত্তি, গণতন্ত্র চর্চায় নানা টানাপোড়েন এবং সবলতা-দুর্বলতা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্রমেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ গ্রহণ করছে; সংহত হচ্ছে। বর্তমান মেয়াদে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার সামরিক শাসকদের সংবিধান সংশোধন ও বিকৃতির কলঙ্ক মোচন এবং সংবিধানকে আরো যুগোপযোগী করতে সক্ষম হলে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আরো সংহত হবে। এ ব্যাপারে পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় কার্যকর করলেই মহাজোটের কাজ অনেক সহজ হয়ে যাবে। অনেক বিতর্ক ও কৃত্রিম সংকটের সমাধান হবে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকেও অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে গণতন্ত্র অনুশীলনে এবং জাতীয় সংসদকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত যেসব প্রশ্নে ‘জাতীয় ঐকমত্য’ উন্নয়নের পূর্বশর্ত বলে অনেকে মনে করছেন, আমরা তা খুব বাস্তবসম্মত মনে করি না। পাকিস্তানী সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের দ্বারা প্রভাবিত বিএনপি অথবা তার সহযোগী সাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়াত ইসলামীর পক্ষে ‘অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ও ধর্মনিরপেক্ষতা গ্রহণ, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচারের রায় কার্যকর করার বিষয়ে সমর্থন জানানো অথবা জিয়াকে কৃত্রিমভাবে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বানানোর মতো হাস্যকর কিন্তু বিএনপির জন্য অপরিহার্য রাজনৈতিক পুঁজি বিসর্জন দেয়া অসম্ভব। বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক হিসেবে মেনে নেয়া বা বঙ্গবন্ধুর ডাকেই মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে এসব ঐতিহাসিক সত্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া বিএনপি ও তার সহযোগী দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর জন্য প্রায় অসম্ভব। অতএব এসব প্রশ্নে রাজনৈতিক দল পর্যায়ে কোনো জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এসব প্রশ্নে ঐকমত্য না হলে ‘উন্নয়ন’ মুখ্য এজেন্ডা হবে না সেটাও আমরা সঠিক মনে করি না।

প্রশ্ন হচ্ছে ওসব প্রশ্নে প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণের মনোভাব কী? জনগণ চায় এসব বিতর্ক সত্ত্বেও দেশের উন্নতি। উন্নতির জন্য জাতীয় ঐকমত্য। বাস্তবতা হচ্ছে ২০০৮ সালের অবাধ নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে একটা জাতীয় ঐকমত্য কিন্তু গড়ে উঠেছে। ১৯৭৩-এর নির্বাচনের পর এবারই প্রথম আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগীরা কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নয়, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নিরঙ্কুশ সমর্থন পেয়েছে। নির্বাচনে ৫৫.০৬ শতাংশ ভোট এবং জাতীয় সংসদের তিন-চতুর্থাংশ আসন লাভ করেছে। নির্বাচনের এই রায়কে নির্দ্বিধায় জনগণের মধ্যে গড়ে ওঠা ‘জাতীয় ঐকমত্য’ হিসেবেই আমরা গণ্য করতে পারি। দেশবাসী ক্ষমতাবদলের জন্য নয়, তারা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার- দিন বদলের সনদের প্রতিও তাদের নিরঙ্কুশ সমর্থন ব্যক্ত করেছে।

আওয়ামী লীগের এবারের নির্বাচনী ইশতেহারটি অতীতের মতো কোনো গতানুগতিক অঙ্গীকার নয়। এই ইশতেহারে ২২ দফা সময় নির্ধারিত অঙ্গীকার এবং ২০১১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তোলার রূপকল্প (ভিশন-২০১১) উপস্থাপন করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনে প্রায় ১ কোটি নতুন ভোটারসহ তরুণ প্রজন্ম আওয়ামী লীগের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার ে াগান, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকার সর্বোপরি ‘দিন বদলের’ প্রত্যয়ের প্রতি সক্রিয় সমর্থন জানিয়েছে। বলা যেতে পারে অনেকদিন পর বাংলাদেশের মানুষ আবার ‘স্বপ্ন’ দেখতে শুরু করেছে।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রতি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রায় এবং দিন বদলের কর্মসূচির প্রতি সোৎসাহ সমর্থনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে কার্যত ‘উন্নয়ন’ই প্রধান জাতীয় কর্তব্যে পরিণত হয়েছে। বস্তুত ২০০৮ সালের নির্বাচনের ভেতর দিয়েই বাংলাদেশের মুখ্য এজেন্ডা যে ‘উন্নয়ন’ জনগণই তা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

[লেখক: রাজনীতিক]

[ad#co-1]