অস্তিত্ব সংকটের এক বিষণ্ন দলিল

jdজীবনানন্দ দাশের ‘ক্যাম্পে’
মনতোষ কুমার দে
মানবঅস্তিত্ব বরাবরই গভীর সংকটে ক্রমনিমজ্জমান। কিন্তু তবুও মানুষ বাঁচে। বাঁচে বিপন্নতা নিয়ে, সংশয় নিয়ে, নিঃসহায়তা নিয়ে, অবিশ্বাস নিয়ে। আর এর পরও শূন্যতার বোধে বিলীন হয়ে, কিংবা হতাশার গর্ভে হারিয়ে গিয়ে মানুষ জীবনকেই খোঁজে তীব্র আকুলতায়। অবিশ্বাসের মধ্যে বারবার স্খলিত হয়েও জড়িয়ে নিতে চায় বিশ্বাসের বসনকে। সংশয়ের মেঘে আচ্ছন্ন থেকেও সারাক্ষণ প্রত্যাশায় উন্মুখ থাকে সূর্যকরোজ্জ্বল দিনের জন্য। বিপন্নতা ক্লি্লষ্ট আর্ত শব্দাবলি আর নিঃসহায়তা পীড়িত নৈঃশব্দ্যের মধ্যেও শুনতে পায় কলরব, মানুষের-স্বজনের। ডাক শোনে, প্রণয়ের মিলনের। শিহরিত হয় পিপাসা-কাতর হৃদয়ের ভয়ার্ত সুন্দর দারুণ রোমাঞ্চে। জীবনানন্দের কবিতায় অস্তিত্ব সংকটের বিষয়টি বোধহয় এই প্রবল জীবনবোধকে অবলম্বন করে প্রসারিত হয়েছে ঊর্ধ্বর্মুখে। বিশেষ করে তাঁর বহুল আলোচিত এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘ক্যাম্পে’ এই সংকটকে ধারণ করে বেঁচে আছে জীবনবাস্তবের বহুমাত্রিক আঙিনায়।

এক

কোনো তত্ত্ব বা দর্শনকে চিন্তার কসরতের মাধ্যমে কবিতায় তুলে ধরা কবিতার জন্য মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। পক্ষান্তরে আবেগ ও কল্পনার দূরতম আভাস থেকে রস ও সৌন্দর্যকে আহরণ করা কবিতার অভিপ্রেত প্রসঙ্গ। ভাব কবিতার প্রাণসম্পদ হলেও আবেগ ও কল্পনা তাকে গতিময়তা দান করে। নির্মাণ করে জীবনব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যা কোনো কোনো সময় দার্শনিকের তত্ত্বের মতো মনে হলেও তা কিন্তু হুবহু কোনো দর্শন বা তত্ত্ব নয়। দার্শনিকের তত্ত্বে নিরেট তত্ত্বটাই মুখ্য, কিন্তু কবিতায় মুখ্য রস ও সৌন্দর্য। তত্ত্বটা মামুলি, উপরি পাওনার মতো। কবিতায় ছড়িয়ে থাকে জীবন উপলব্ধির আলো-ছায়াময় নানা অনুভব। আনন্দ-বিষাদ আর সম্ভাবনা-সংকটে আশ্চর্য এক সৃজনধারা কবিতা। অন্যদিকে দর্শনে এই সৃজন প্রক্রিয়ার নিদারুণ অনুপস্থিতি তাত্তি্বক জটিলতায় ক্লিষ্ট করে। কিন্তু কবিতা মুক্তপক্ষ বিহঙ্গের মতো ভারমুক্তভাবে এগিয়ে যায়। তত্ত্ব বা দর্শন যদি কোনো প্রসঙ্গে এসেও যায় তা তত্ত্ব বা দর্শনের জন্য নয়, কবিতার জন্য-রসোপলব্ধির জন্য।

জীবনানন্দের কবিতায় কোনো কোনো সময় দর্শন বা তত্ত্বের সমাবেশ ঘটেছে। তবে তা ঘটেছে কবিতা প্রসঙ্গে। কবিতার ভাব ও সৌন্দর্য ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে। এছাড়া কবিতায় উপস্থাপিত তত্ত্ব বা দর্শণের সঙ্গে দার্শনিকের তত্ত্ব খুব একটা মেলে না। কারণ সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জীবনকে দেখার যে মহত্তম অনুভব তা সাধারণ চিন্তার চর্চা থেকে ভিন্ন হবে বৈকি। দার্শনিক যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয় তার মূলে রয়েছে ভাবনা। অপরদিকে কবির উপলব্ধির জগতে একমাত্র আশ্রয় হলো বোধ। বোধের গভীরে সঞ্চরণ আর সৃষ্টির বিপুল বৈচিত্র্যে অবগাহন কবিতার মধ্যে পরিবেশিত দর্শনকে তাত্তি্বক কঠিন্যে নয়, সি্নগ্ধ সুষমায় রমণীয় করে। দার্শনিকেরা কার্যকারণের মধ্যেই সবকিছুর সন্ধান করেন। কবিতা এ থেকে মুক্ত। নির্দিষ্ট কোনো শৃঙ্খলার মধ্যে বন্দি থেকে জীবনকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস আপাত সঠিক বলে। বিবেচিত হলেও তার মধ্যে থাকে নিয়মের কড়াকড়ি। আর যেখানেই নিয়মের শৃঙ্খল সেখানে মুক্ত বিচরণ হয় বাধাগ্রস্ত। ব্যাহত হয় চিত্তের স্বাধীন বিকাশ। সংকুচিত হয়ে পড়ে রস, সৌন্দর্য ও রহস্যের জগৎ। কবিতায় রহস্যময়তা থাকবে না, থাকবে না রস ও সৌন্দর্যের আকর্ষণ, এমন কল্পনা করতে কষ্ট হয়। রহস্য ভেদ করার প্রচেষ্টায় মানুষ পুনরায় রহস্যাবর্তে নিমজ্জিত হয়, এই তো নিয়তি। এ থেকে উদ্ধার নেই, পরিত্রাণ নেই। তবুও একে অস্বীকার করা যায়না। একে অস্বীকার করতে যাওয়া মানে জীবনকেই অস্বীকার করা। আর জীবনে সৌন্দর্যের শক্তি এমনই যা বিনাশকেও তুচ্ছ বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ করে। কবিতা এই সৌন্দর্যের শক্তিতে লাবণ্যময় আর রহস্যময়তায় দার্ঢ্য হয়ে ওঠে। মানবস্বভাবের যে চিরন্তন সত্তা এবং জীবনের যে গভীর তলদেশ তাকে স্পর্শ করতে পারে একমাত্র কবিতা।

কবিতায় এক ধরনের নিমগ্নতা থাকে, থাকে নিবিষ্টতাও। এই নিবিষ্টতাই কবিতাকে মহৎ সৃষ্টিকর্মের বিষয় করে তোলে। ফলে কবিতা হয়ে ওঠে অনুভূতির প্রগাঢ়তায় ঋদ্ধ ও সৃজনশীলতায় ভাস্কর অনুপম শব্দাবলির ছন্দময় ও আলোকময় লীলাতরঙ্গ। অন্ধকারে বিচ্ছুরিত হীরকের দ্যুতির মতো কবিতা উজ্জ্বলতা ছড়ায়। জাগায় রহস্য উন্মোচনের অভিযান-আকাঙ্ক্ষা। নিয়ে যায় সংকটের গভীরে। রচনা করে শাশ্বত মানববৃত্তান্ত। শুধু কি তাই? প্রাণী সাধারণের অস্তিত্বের মধ্যে যে টান তারও নিদারুণ আলেখ্য রচিত হয় কবিতায়। আর এজন্যই জগৎ ও জীবন সংশ্লিষ্ট সবকিছু এমনকি ব্রহ্মা-ের নানা জিজ্ঞাসার অভিনিবেশী অনুধ্যানে কবিতা সন্ধান করে তার শক্তির। জীবনানন্দের নিজের ভাষায় :

‘কবিতা এই পৃথিবীর এই জীবনের যত নিকটে, কোনো আলাদা জগৎ বলতে যা বোঝায় তার নিকটে ততটা নয়; কবিতা জীবনের থেকে কিছুটা দূরে-সেটা লক্ষিত করে রাখবার জন্য নিজের বা পাঠকের মনে কোনো সমান্তরাল রেখা অাঁকা দরকার মনে করে আলোচক অযথা আনুষ্ঠানিক হয়ে উঠতে পারেন; কারণ জীবনের যত কাছে কবিতা ও তার সংজ্ঞাকে নিয়ে আসতে পারা যায় তত তাকে শিল্পপ্রসাদে শুদ্ধ করা সম্ভব, নিছক শিল্পের কাছে নিয়ে গেলে সেরকমভাবে সম্ভব হয় না।’

ভাব ও বিষয়ের ঐশ্বর্যে কবিতায় যেমন সমুদ্রের অতলান্তিক গভীরতা ছড়িয়ে থাকে, তেমনি ভাষা ও রীতির বৈচিত্র্যে এতে অনুভূত হয় রূপময় ও ধ্বনিময় সঙ্গীতের আবেশ করা শ্রুতিমাধুর্য। এ কারণে কবিতাজননে ভাবের গভীরতা ও রীতির অভিনবত্ব দুইই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া স্বকীয়তা কবিতার এক পবিত্র অঙ্গীকার। কারও বা কোনোকিছুর অনুসরণে, প্রভাবে অথবা ছায়ায় কবিতা বাঁচে না। সূর্যালোকের মতো সত্যের মহিমরশ্মিতেই তার বেঁচে থাকার শক্তি নিহিত। বৃক্ষের মতোই নিজশক্তি বলে শেকড় দিয়ে রস সংগ্রহ করে কবিতা নিজের মতো করে বাঁচে। আর এই নিজের মতো করে বাঁচতে গিয়েই কবিতাকে হতে হয় অতলস্পর্শী, সর্বব্যাপী ও জীবনঅভিমুখী। তাই এর জন্য চাই শ্রম ও মেধার নিরলস অনুশীলন সহ আবেগ-কল্পনার ভিন্নতর উজ্জীবন। কেননা কবিতা এখন আর স্বয়ম্ভু নয়। তা আপনা-আপনি জন্মায় না, বেড়েও ওঠে না। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর বিখ্যাত ‘কাব্যের মুক্তি’ প্রবন্ধে বলেছেন :

‘কিন্তু বিশ্বের সেই আদিম উর্বরতা আজ আর নেই। এখন সারা ব্রহ্মা- খুঁজে বীজ (১৩-এর পৃষ্ঠার পর)

সংগ্রহ না করলে, কাব্যের কল্পতরু জন্মায় না। তারপর বহু পরিচর্যার ফলে হয়তো তাতে অঙ্কুর দেখা দেয়, কিন্তু কবি নিশ্বাস নেওয়ার সময় পায় না, তখনও উনি্নদ্র যত্নে সেই অনিকাম বৃদ্ধির রক্ষণাবেক্ষণ তার অবশ্য কর্তব্য; এবং এই অসামান্য আত্মোৎসর্গের প্রতিদানে কবি আর কিছুর প্রত্যাশা রাখে না, সে শুধু চায় কাব্যের অক্ষয় বট কেবল তাকে আতপতাপ থেকে বাঁচাবে না, সকল শরণাগতকে অনুরূপ আশ্রিত বাৎসল্য দেখাবে।

সৃষ্টির মধ্যে, প্রকৃতির মধ্যে যে রহস্য ছড়িয়ে থাকে, যা অনুদঘাটিত এবং অউন্মোচিত তাকে তাৎপর্যয়ে ইঙ্গিতময় করে তোলে কবিতা। কবিতা প্রশ্নবিদ্ধ করে প্রচলিত সাধারণ জীবনকেও। প্রথাবিরুদ্ধ ধারায় শামিল করে কবিতা সবাইকে জীবন উপভোগের নতুন ভুবন উপহার দেয়। তাই কবিতা আবিষ্ট করে, আবার ভাবায়ও। উদ্বুদ্ধ করে, প্রাণিত করে, আবার বিপন্নতায় বিচলিতও করে। নতুন চিন্তা ও ভাবনার সানি্নধ্যে কবিতা আমাদের সাহসীও করে। তবে অর্থময়তার মধ্যে দিয়ে একটা মীমাংসায় উপনীত হওয়া কবিতার লক্ষ্য নয়। বরং জগৎ ও জীবনের সত্যের নানারূপ এবং অনতিক্রম্য সংকটকে নিঃসহায়তার বোধে উপস্থাপন করে জীবনের ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি করা কবিতার এক সাহসী কাজ। জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘ক্যাম্পে’ কবিতায় এই সাহসী কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন করেছেন।

‘ক্যাম্পে’ জীবনানন্দ দাশের এমন একটি কবিতা, যাকে নিয়ে আলোচনা হয়েছে প্রচুর, বিতর্কের ঝড়ও রয়েছে অনেক। আর এসব আলোচনা ও বিতর্কে যতটা না কবিতার শিল্প-সৌন্দর্য ব্যাখ্যার চেষ্টা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি হয়েছে অহেতুক বিষয়ের অবতারণা। অযথা জটিল ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্যে কবিতাটির উপর একটা তুচ্ছতা ও ইতরতা আরোপ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু এসব অনাকাঙ্ক্ষিত আলোচনা ও মন্তব্যে বর্তমানে পাঠকশ্রেণীর তেমন আগ্রহ নেই। পক্ষান্তরে কবিতাটির উৎকর্য বিষয়ে বিশেষ কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে তাদের মধ্যে। কবিতাটিতে উচ্চারিত জীবনসত্য উপলব্ধি এবং এর রস-সৌন্দর্য আস্বাদন বর্তমানে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। ‘ক্যাম্পে’র কাব্যমূল্য এবং এর প্রকরণগত দিকের অভিনবত্ব কবিতাটি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাচ্ছে। সেই সঙ্গে ‘ক্যাম্পে’ জীবনানন্দের কাব্যসৃষ্টির ধারায় প্রথম অস্তিত্ববাদী চেতনার প্রতিফলন হওয়ায় তা পাঠকের বিশেষ মনোযোগও কেড়েছে।

দুই

বর্তমান আলোচনায় আমরা মূলত অস্তিত্ববাদী চেতনার আলোকে ‘ক্যাম্পে’ কবিতায় বিধৃত মানবঅস্তিত্বের নিদারুণ ও শাশ্বত সংকটকে বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরতে সচেষ্ট হব। আর এ লক্ষ্যেই শুরুতে অস্তিত্ববাদ বিষয়ে কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা উপস্থাপন করা খুবই জরুরি। কিন্তু কাজটি খুব একটা সহজসাধ্য নয়। কেননা অস্তিত্ববাদ শব্দটি যত অনায়াসে উচ্চারিত হয়, তত সহজে এর ব্যাখ্যা করা যায় না। আর এর প্রধান কারণ হলো শব্দটির প্রসারতা। বিভিন্নজন এ শব্দটির এত বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, এগুলো একত্রিত করে এর কোনো সুস্পষ্ট সংজ্ঞা উদ্ধার করা খুবই দুরূহ। তবুও অস্তিত্ববাদ কী’-এ প্রশ্নের সহজ মীমাংসার জন্য, যাঁর নামের সঙ্গে এই শব্দটি বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে সেই ফরাসি অস্তিত্ববাদী দার্শনিক জ্যাঁ-পল সার্ত্রের মত উদ্ধৃত করা প্রয়োজন। তিনি বলেছেন :

‘যে মতবাদ মানব জীবনকে সম্ভবপর করে তোলে; এবং যে মতবাদ অনুযায়ী প্রতিটি সত্য এবং প্রতিটি কর্মপরিবেশ ও মানুষের আত্মিকতা উভয়কেই বোঝায়।’

তাকেই অস্তিত্ববাদ বলে। সার্ত্রের এই সংজ্ঞাটি পরিপূর্ণ না হলেও এর মধ্যে যে গুরুত্বপুর্ণ বিষয়টির উল্লেখ আছে তা হলো ‘আত্মিকতা’।

‘আত্মিকতাই অস্তিত্ববাদের প্রারম্ভিক সূত্র। সে আত্মিকতা অবশ্য ভাববাদী আত্মিকতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ……।’

অর্থাৎ মানুষের সার্বিক অস্তিত্ব নয়, ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্বই অস্তিত্ববাদের অন্তর্ভুক্ত বিষয়।

অস্তিত্ববাদকে অনেকেই একটি দার্শনিক আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বোঝাতে চেয়েছেন অস্তিত্ববাদ ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা করে। তবে তা সাধারণ অর্থে নয়, বিশেষ অর্থে। অস্তিত্ববাদ কোনো বিমূর্ত, কাল্পনিক বা বস্তুগত ধারণা নয়। মূর্ত ও বাস্তব ধারণার আলোকেই অস্তিত্ববাদ বিকাশোন্মুখ থাকে। ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্বের নিরিখে বিচার হয় বলে তা সামগ্রিক মানবসত্তাকে বিবেচনা করে বিশিষ্ট সত্তার অনুগামী হিসেবে। অর্থাৎ এ মতাবাদের মূল কথা হলো ব্যক্তিসত্তা বা ব্যক্তিমানুষ সার্বিক সত্তা বা সারধর্মের পূর্বগামী। সার্বিক অস্তিত্ব নির্ধারিত হয় ব্যক্তির অস্তিত্বের প্রশ্নকে বিবেচনা করেই। তাই অস্তিত্ববাদ বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিসম্পর্কিত। মানুষ সম্পর্কে ভাবলে বা চিন্তা করলেই কোনো দার্শনিক মতবাদ অস্তিত্ববাদী হয় না। দেখতে হবে এই ভাবনায় ব্যক্তিসত্তার স্থান কতটুকু। কারণ ব্যক্তিমানুষের নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও সমস্যা-সংকট জাগতিক জটিলতায় বিপন্নতার সৃষ্টি করে অস্তিত্বকে নাড়া দেয়। আর এজন্যই ব্যক্তিকে কেন্দ্র করেই অস্তিত্ব অর্থপূর্ণ হয়। মানবঅস্তিত্ব ব্যক্তি মানুষের স্বাতন্ত্র্যময় নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পূর্ণতার পথ এগিয়ে যায়।

এই স্বাতন্ত্র্য বলতে বিচ্ছিন্ন হওয়াকে বোঝায় না। মনে রাখতে হবে মানুষ যখন কোনো কিছু নির্বাচন করবে তখন তার সেই নির্বাচন (ঈযড়রপব) তার নিজের জন্য নয় বরং অন্য সকল মানুষের জন্যেও ভালো হতে পারে না। এভাবে মানুষ তার কাজের জন্য যখন দায়ী হয়, তখন তার সে দায়িত্ব শুধু তার নিজের জন্য নয়। বরং সকল মানুষের জন্য। সার্ত্রে তাই বলেন :

ডযবহ বি ংধু ঃযব সধহ রং ৎবংঢ়ড়হংরনষব ভড়ৎ যরসংবষভ, বি ফড় হড়ঃ সবধহ ঃযধঃ যব রং ৎবংঢ়ড়হংরনষব ড়হষু ভড়ৎ যরং ড়হি রহফরারফঁধষরঃু, নঁঃ ঃযধঃ যব রং ৎবংঢ়ড়হংরনষব ভড়ৎ ধষষ সবহ. ডযবহ বি ংধু ঃযধঃ সধহ পযড়ড়ংবং যরসংবষভ, বি ফড় সবধহ ……. ঃযধঃ রং পযড়ড়ংরহম ভড়ৎ যরসংবষভ যব পযড়ড়ংবং ভড়ৎ ধষষ সবহ.চ্

আহার নিদ্রা-মৈথুন-এই ধারায় মানুষের যে টিকে থাকা তা ব্যক্তিসত্তার স্বাতন্ত্র্যের পরিচায়ক নয়। তাইতো সার্ত্রে মনে করেন :

‘যে মানুষ পশুর মতো দায়িত্বহীনভাবে জীবন-যাপন করে সে শুধু বেঁচেই থাকে, সে অস্তিত্বশীল হয় না। একমাত্র সচেতন ও স্বাধীনভাবে দায়িত্বশীল মানুষই অস্তিত্বশীল।’

এ কারণেই বিমূর্ত বা অতিন্দ্রীয় সত্তার প্রতি অহেতুক গুরুত্ব না দিয়ে সার্ত্রে ব্যক্তিমর্যাদা ও ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি অনুগত থাকার কথা বলেছেন। তাই অস্তিত্ববাদ বিষয়টির সঙ্গে স্বাধীনতার রয়েছে এক অচ্ছেদ্য সম্পর্ক। মানুষ সম্পর্কে সার্ত্রের অভিমত হলো,

‘মানুষ এবং স্বাধীনতা এক জিনিস-মানুষ হওয়া আর স্বাধীন হওয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। অন্য কথায় মানুষ হওয়া মানেই হলো স্বাধীন হওয়া বা স্বাধীন হওয়ার অর্থই হলো মানুষ হওয়া।’

আর ব্যক্তি মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করার দর্শনই হলো অস্তিত্ববাদ। সার্ত্রে এও বলেছেন যে, প্রত্যেক মানুষ স্বতন্ত্র এবং অন্য সবার থেকে ভিন্ন। অর্থাৎ প্রত্যেকেই বিশেষ ও অদ্বিতীয়। পূর্বনির্দিষ্ট কোনো কিছুর সঙ্গে তাকে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে কিংবা পূর্বনির্ধারিত কোনো নিয়ম মেনে চলতে হবে তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কেননা সে স্বাধীন চিন্তা প্রয়োগের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়। আর এভাবে সে নিজের ধারায় জীবন-যাপন করে জীবনকে মূল্যবান বা মূল্যহীন করে। সে নিজের স্বভাবকে তৈরি করে এবং নিজের নৈতিক মানদ- সৃষ্টি করে তার আলোকে সবকিছুর মূল্যায়ন করে। তাই স্বাধীনভাবে কোনো কিছু করা মানে অস্তিত্বশীল হওয়া। প্রকৃতপক্ষে ‘অস্তিত্ব’, ‘আত্মিকতা’ ও ‘স্বাধীনতা’-এ তিনটি হলো অস্তিত্ববাদী দর্শনের মূল বিষয়। অস্তিত্ব এ দর্শনের বিষয়বস্তু হলেও ‘আত্মিকতা’ এর পদ্ধতি এবং ‘স্বাধীনতা’ এর পরিচালক। ব্যক্তি মানুষের বাস্তব অস্তিত্ব স্বাধীনতার আলোকে নির্ধারিত ও পরিচালিত হয়।

তাই মানুষের অস্তিত্বকে সামান্য বিবেচনা করা, ব্যক্তি সত্তাকে গুরুত্ব না দেওয়া, মর্যাদাকে তুচ্ছ বিবেচনা করা ও তার স্বাধীনতাকে অবহেলা করার প্রতিবাদ স্বরূপই জন্ম হয়েছে অস্তিত্ববাদের। এজন্য অস্তিত্ববাদ একটি বিপ্লবী দর্শন বা আদর্শ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এ বিপ্লব কোনো রাষ্ট্রীয় একনায়কের বিরুদ্ধে বা সামাজিক শোষণ অত্যাচারের বিরুদ্ধে নয়। এ বিপ্লব মূলত ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্বের প্রতি অবহেলাকারী কিংবা তার স্বাধীনতা ও মর্যাদা ক্ষুণ্নকারী যেকোনো মতবাদ ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

অস্তিত্ববাদ বিষয়টি সামপ্রতিক ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হলেও এবং এর পরিচিতি সার্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেও এ চিন্তার বীজ ছড়িয়ে ছিল দাস যুগের গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসসহ অনেকের চিন্তার মধ্যে। ক্রমে এই বীজ অঙ্কুরিত হয়ে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের যুগে কিয়ের্কেগার্দ, নীটশে, ইয়েসপার্স, মার্সেল, হাইডেগার, কাম্যু ও কাফকাসহ বিভিন্ন দার্শনিক ও সাহিত্যিকের আশ্রয়ে বর্ধিত হয়। তাঁরা মানুষের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতা বিষয়ে বিশদ আলোচনা ও সমীক্ষা চালান। সচেষ্ট হন নানা দিক থেকে অস্তিত্ববাদের স্বরূপ অন্বেষণে। আর এভাবেই তাঁরা পরিচিত হয়ে ওঠেন অস্তিত্ববাদী হিসেবে। তবে অস্তিত্ববাদ বিষয়টি ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে।

একটি বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই অস্তিত্ববাদী চিন্তার উদ্ভব। আর সেই প্রেক্ষাপটটি হলো যান্ত্রিক সভ্যতার প্রেক্ষাপট। আধুনিক যুগে যান্ত্রিক সভ্যতা কবলিত মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার উপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কারে এবং প্রযুক্তির নানাবিধ সহায়তায় সে স্বাচ্ছন্দ্যের অধিকারী হলেও হারিয়ে ফেলে নিজেকে। অর্থাৎ যন্ত্র আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে খর্ব করে এবং স্বাধীনতার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। প্রযুক্তিবিদ্যার প্রভুত্ব বিস্তারের ফলে সে যন্ত্রের ক্রীতাদাসে পরিণত হয়। কিন্তু মানুষ তো যন্ত্র নয়। যন্ত্রের নিয়মে সে চলে না বা চলতে পারে না। ব্যক্তিসত্তার নির্দেশেই সে চালিত হয়। কিন্তু যন্ত্রের কাছে এই ব্যক্তিসত্তার বা অত্মিকতার কোনো মূল্য নেই। তাই যন্ত্রযুগে ব্যক্তির অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও মর্যাদা দারুণভাবে উপেক্ষিত। অস্তিত্বের চেয়ে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে প্রযুক্তির কল্যাণে প্রাপ্ত নানা সামগ্রী। যেমন কলকারখানা, গাড়ি, রেডিও, টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল প্রভৃতি। এ সবের মধ্যে ডুবে গিয়ে মানুষ নিজেকে ভুলে যায় এবং তার জীবনে সৃষ্টি হয় নিদারুণ শূন্যতা। আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজ মানুষের কল্যাণের কথা বললেও তাদের কাছে ব্যক্তিমানুষ থাকে অবহেলিত। রাষ্ট্র মানুষকে মূল্যায়ন করে একটা সামষ্টিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। তাই সে হয়ে ওঠে কেবলই নাগরিক, প্রজা, ভোটার বা করদাতা। তার ওহফরারফঁধষ বা ব্যক্তিসত্তাটি চাপা পড়ে যায়। একইভাবে সমাজ এমনকি পরিবারেও এই ওহফরারফঁধষরঃু এর কোনো মূল্য দেওয়া হয় না। তার মূল্য নির্ধারিত হয় অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কার্যাবলি বা অবদানের নিরিখে। প্রাতিস্বিক হওয়ার সুযোগ অল্পই থাকে যেখানে। তাই বলা যায়, রাষ্ট্র সমাজ বা পরিবারের আরোপিত বিধিবিধান মানুষকে সাধারণীকরণ করে মূল্যহীন করে। মানুষ তো এত সামান বা মূল্যহীন নয়। ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল ও নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন এক আসাধারণ বোধের আধিকারী হলো মানুষ। সে তার ‘আমি’র নিয়ন্তা এবং স্বভাবের স্রষ্টা।

আর এজন্য দু’দুটি বিশ্বযুদ্ধের তা-বলীলায় যখন মানুষের জীবন অসহায় ও বিপন্ন হয়ে পড়লো, যুদ্ধের নৃশংসতায় প্রাণ হারালো অসংখ্য মানুষ, অত্যাচারিত ও পদদলিত হয়ে নিদারুণ লাঞ্ছনা, অসহ্য যন্ত্রণা ও চরম কষ্ট ভোগ করতে লাগলো, অপমৃত্যু ঘটতে শুরু করলো মানবতাবাদ, ভ্রাতৃত্ববোধ ও আদর্শবাদের, আসন্ন হয়ে উঠলো চূড়ান্ত বিপর্যয়-তখনই দার্শনিকেরা ব্যক্তিমানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে তার ব্যক্তিসত্তা ও মূল্যবোধকে রক্ষা করার চিন্তায় জন্ম দিলেন এই বিপ্লবী দর্শনের। অগণিত নির্মম মৃৃত্যুর মধ্যে তাদের কাছে সত্য হয়ে উঠলো নিজের অস্তিত্ব-ব্যক্তিমানুষের সেই গূঢ় অস্তিত্ব। একটা বিপর্যয় বা একটা ধ্বংসের কিনারে পেঁৗছেও প্রতিবাদী চেতনায় অস্তিত্বের উপলব্ধিকে অনুভব করলেন তাঁরা। বিপন্নতা তাড়িত এই উপলব্ধি বা বোধ ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্ব তার স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে চিনে নেবার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দান করলো। উন্মোচিত হলো দর্শন-সাহিত্যে জীবন ব্যাখ্যার এক নতুন পথ। অস্তিত্ববাদের এই পথটি ধরে সাহিত্যের স্রষ্টারা জীবনের গলি-ঘুঁজিতে আলো ফেলতে শুরু করলেন।

[ad#co-1]