গজারিয়ায় এপিএস শরীফের দাপট

1256804441_aps-shorif-mahmud1মোস্তফা সারোয়ার বিপ্লব
বছরখানেক আগেও গজারিয়া এলাকায় পুরোপুরি অপরিচিত এসএম শরীফ মাহমুদ বর্তমানে এলাকার সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন চলছে তার ইশারায়। শিল্প-প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারি কাজকর্মে চাঁদাবাজি, অবৈধভাবে বালি উত্তোলন, জমি দখল সব কিছুতেই এসএম শরীফ মাহমুদের দাপট দৃশ্যমান। তার খুঁটির জোর সাংসদ ইদ্রিস আলী।

জানা গেছে, সংসদ সদস্য নিজে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে শরীফ মাহমুদকে তার প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় করে দিয়েছেন। এর ফলে তিনিই এখন অঘোষিত এমপি। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে এলাকার চিহ্নিত চোরকারবারি গিয়াসউদ্দিন। দুজনের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি চক্র। এই চক্রের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। এমনকি স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সাংসদের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করেছে। তাতে অবশ্য অভিযোগকারীদের প্রতিই নাখোশ হয়েছেন সাংসদ।
সাংসদের বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত মুন্সীগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাশেম সাপ্তাহিককে বলেন, ‘আমি নিজে এমপির কাছে শরীফের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ করেছি। আমার মতো দলীয় অনেক নেতাকর্মী এমপির কাছে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু লাভ হয়নি।’

থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন সাপ্তাহিককে বলেন, ‘কোথাকার এক শরীফকে এমপি সাহেব ক্ষমতা দিয়ে পাঠিয়েছেন। তার অত্যাচারে দলীয় নেতাকর্মীরা অসহায়। তিনি আরও বলেন, ‘এবারের সংসদ নির্বাচনে পুরো উপজেলার মাত্র দুই কেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থী এম শামসুল ইসলাম জয়ী হয়েছে। এরমধ্যে একটি গিয়াস উদ্দিনের নিজস্ব গ্রাম ভলাকী ভোটকেন্দ্র। বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে স্মাগলার গিয়াসউদ্দিনের নেতৃত্বে ক্যাডার বাহিনীর বাধায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা কাজ করতে পারেনি। আর সেই স্মাগলারকে কাছে টেনে নিয়েছেন আমাদের এমপির এপিএস।’

দেলোয়ার আরও অভিযোগ করেন এমপির নামে বিভিন্ন বালুমহাল থেকে এপিএস ৩০% হারে কমিশন আদায় করছেন। আর ৩০% কমিশন পেলে যে কোনো অবৈধ কাজকে বৈধ করে দেন শরীফ।

যেভাবে উত্থান

গজারিয়া উপজেলার বাশগাঁও গ্রামের মৃত শাহাব উদ্দিনের ছেলে শরীফ মাহমুদ ১৯৮৯ থেকে ’৯১ পর্যন্ত ফ্রিডম পার্টির উপজেলা শাখার ডেপুটি এরিয়া স্টাফ কো-অর্ডিনেটরের পদে ছিলেন। পরবর্তীতে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হলেও সক্রিয় ছিলেন না। এক পর্যায়ে চাকরি নেন বর্তমান এমপির সহোদরের প্রতিষ্ঠানে। মালিকের আশীর্বাদেই ইদ্রিস আলী সাংসদ হওয়ার পর এপিএস হিসেবে নিয়োগ পান।

বালুমহালের দখল

বর্তমানে অবৈধ আয়ের বড় উৎস তিনটি বালুমহাল চলছে সরাসরি শরীফের তত্ত্বাবধানে। টেন্ডার লিজ বা কোনো বৈধতা না থাকলেও কালিপুরা, চরচাষী, মনারকান্দি – এ তিনটি বালুমহাল থেকে কোটি কোটি টাকার বালি উত্তোলন করছে তার লোকজন। এর ফলে আশপাশের গ্রামগুলো বিলীন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীরা প্রতিরোধ কমিটি করেছেন। মাঝে মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ কমিটির সদস্যরা বালুমহালগুলো বন্ধ করে দিলেও কোনো ফল হয়নি। বরং অল্প সময়ের মধ্যে আবার চালু হয়ে যায়। আর প্রতিবাদকারীদের পুলিশি হয়রানির মুখে পড়তে হয়।

চরচাষী গ্রামের যুবলীগ কর্মী লিটন সাপ্তাহিককে বলেন, ‘এমপির এপিএস আমাদের গ্রামকে গ্রাম কেটে ফেলছে। আমরা এমপি ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করেও কোনো ফল পাইনি।’ একই ধরনের অভিযোগ কাশেম মেম্বারসহ স্থানীয় অনেকের।

সাপ্তাহিক-এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিদিন ৮-১০টি ড্রেজার দিয়ে চাষী, গুয়াগাছিয়া এলাকাসংলগ্ন নদীতে এপিএস শরীফের মদদে বালি উত্তোলন চলছে। চলতি বছর শিকদার এন্টারপ্রাইজ নামক একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৮৫ লাখ টাকায় বালুমহালটি ইজারা পেলেও এপিএস শরীফের প্রভাবে বুঝে নিতে পারেননি দীর্ঘ ৯ মাসেও। একইভাবে মনারকান্দি চরবাউশিয়া বালুমহালটি ৯১ লাখ টাকায় ডাক নিয়েও এপিএসের প্রভাবে বালি কাটতে পারছে না বৈধ ইজারাদার। আর কালিপুর এলাকায় সরকারি খাতায় বালুমহালের কোনো অস্তিত্ব নেই। কিন্তু এপিএস শরীফ মাহমুদ নিজ ক্ষমতায় নিরীহ মানুষদের জমি কেটে নামকরণ করেছেন কালিপুরা বালুমহাল।

নিজে বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও অনেককে টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে বালি কাটার অনুমতি দিয়েছেন এসএম শরীফ মাহমুদ। কিন্তু অনেকের কাছে অগ্রিম টাকা নিয়েও কথামতো কাজ না করে টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে।

শরীফের প্রতারণার শিকার অনেকের মধ্যে একজন কামাল। জানা গেছে, কামাল সিন্ডিকেট গত ছয় মাস ধরে সরকারকে কোনো টাকা না দিয়েই মনারকান্দি গ্রামে সরাসরি নদী থেকে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালি উত্তোলন করছে। গত এক মাসের ব্যবধানে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে দুবার অভিযানে কামালের ড্রেজার আটক করা হয় এবং থানায় মামলা হয়। কিন্তু কোনো মামলায় অবৈধ বালি কাটার মূল হোতাকে আসামি করা হয়নি। প্রতি ঘনফুট বালিতে ৬০ পয়সা এপিএস শরীফের নামে বরাদ্দ দিয়ে বালি কাটার কথা শিকার করেছেন সিন্ডিকেটপ্রধান কামাল। তবে কামাল দাবি করেছেন, এমপির নামেই শরীফকে এ পর্যন্ত পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছি। কামাল আরও অভিযোগ করেন এত টাকা দেয়ার পরও পুলিশ আমাদের ড্রেজারটি দুবার আটক করেছে।

কামাল সাপ্তাহিককে আরও জানান, প্রথমবার ড্রেজার আটকের সময় তাদের তিন শ্রমিককেও গ্রেপ্তার করা হয়। থানা পুলিশ থেকে ড্রেজার ও আসামি ছাড়ানো বাবদ এপিএস শরীফকে এক লাখ টাকা দেয়া হয়েছে বলে কামাল জানান। কিন্তু টাকা নিলেও শরীফ কোনো কাজ করেনি। পরবর্তীতে আদালত থেকে গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা ও ড্রেজার ছাড়া পায়।

এদিকে এপিএস শরীফ কামালের প্রতিপক্ষ মান্নান সিন্ডিকেটের কাছ থেকে এক লাখ টাকা নিয়ে আরেকটি ড্রেজার লাগানোর মৌখিক অনুমতি দেয় একই গ্রামে। তবে স্থানীয়দের বাধায় মান্নান সিন্ডিকেট ড্রেজার চালু করতে পারেনি।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর জেলা পুলিশের বিশেষ টিম কামালের ড্রেজারটি আটক করে। সঙ্গে আটক করা হয় নোঙ্গর করা মান্নান সিন্ডিকেটের বন্ধ ড্রেজারটিও। এ ব্যাপারে গজারিয়া ভূমি অফিসের কর্মকর্তা বাদী হয়ে গজারিয়ায় থানায় মামলা করেন। মামলা নম্বর ১৮। আসামি করা হয়েছে ড্রেজার মালিক সেলিমকে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গজারিয়া থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক তারিফ সাপ্তাহিককে জানান, প্রায় দেড়-দুই কোটি ঘনফুট বালি মনারকান্দি নদী থেকে চুরি করে তোলার অভিযোগ উঠেছে আসামিদের বিরুদ্ধে। তিনি আরও জানান, মনারকান্দি গ্রামের চার পাঁচজন বালি চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এদের বিরুদ্ধে খুব শিগগিরই চার্জশিট দেয়া হবে।

এদিকে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মনারকান্দি গ্রামের ধনাঢ্য আলি মিয়া হাজীর জলাশয় ভরাট করতে কয়েক লাখ ঘনফুট বালি নদী থেকে উত্তোলন করা হয়েছে। একইভাবে তার ভাতিজা কামালের জলাশয়ও ভরাট করা হয়েছে। কামাল এগুলো করেছে এপিএস শরীফ মাহমুদের ক্ষমতা বলে।

মনারকান্দি গ্রাম সংলগ্ন টেকপাড়া গ্রামের দুলাল সাপ্তাহিককে বলেন, ছয় মাস ধরে নদী থেকে এরা বালি তুলছে। কিন্তু উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও স্থানীয় পুলিশ কিছু করে না। তবে এলাকাবাসী ও জেলা প্রশাসকের প্রতিরোধে আপাতত বালি উত্তোলন বন্ধ। কারণ, মুন্সীগঞ্জ জেলা আদালত থেকে ২টি ড্রেজারেই জামিন না মঞ্জুর হয়েছে।

এখন উচ্চ আদালত থেকে ড্রেজারের জামিন করে দেয়ার কথা বলে কামালের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা নেয়ার অভিযোগ উঠেছে শরীফের বিরুদ্ধে। এদিকে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তাকে এপিএস চাপ প্রয়োগ করেছে। এছাড়া এপিএসের ক্ষমতার প্রভাবে বালি চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত আলি মিয়া হাজী ও কামালকে পুলিশ গ্রেপ্তার করছে না। এলাকায় প্রকাশ্যে দেখা যায় চাচা ভাতিজাকে।

মুন্সীগঞ্জ পুলিশ সুপার সফিকুল ইসলাম সাপ্তাহিককে বলেন, মনাইর কান্দি গ্রামের অবৈধ বালি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তদন্তে বের হয়ে আসবে জড়িতদের নাম ঠিকানা। ইতোমধ্যে গজারিয়া থানায় নতুন ওসি যোগ দিয়েছে। তাকে বলা হয়েছে অবৈধ বালি কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার।

শরীফের লম্বা হাত

শুধু বালি নয়, উপজেলার প্রায় সব কাজেই রয়েছে শরীফের হস্তক্ষেপ। এমনকি থানা পুলিশের কাছ থেকেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শরীফকে আর্থিক সুবিধা না দেয়ায় বদলি হতে হয়েছে অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে । এদের একজন ভবেরচর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট আবদুস সালাম। শরীফের কথামতো কাজ না করায় মাস পাঁচেক আগে তাকে বদলি করা হয়েছে সাভারে।

জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ভবেরচর হাইওয়ে পুলিশ গাড়ি তল্লাশি করে ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ভারতীয় পণ্য আটক করে। পরে তা স্থানীয় চোরাকারবারিদের কাছে বিক্রি করে দেয়। কিন্তু মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ সকল আটককৃত পণ্য বিশেষ করে ফেনসিডিল ক্রয়ের ইচ্ছা পোষণ করেন শরীফ। তিনি এমপির নামে সার্জেন্টের কাছ থেকে নিয়মিত বিদেশি মদের বোতলও নিতে থাকেন। খবরটি স্থানীয় নেতাকর্মীরা জেনে গেলে তা সাংসদের কাছেও চলে যায়। নিজের বিপদ সামলাতে সাংসদকে ভুল বুঝিয়ে সার্জেন্ট সালামকে বদলি করা হয়। এর পরেই ভবেরচর পুলিশ ফাঁড়িতে শরীফ আসা বন্ধ করে দেয়। তবে তার প্রতিনিধি মাসোহারা নিয়ে যায়।
গজারিয়া থানায় পুলিশের কার্যক্রম চলছে শরীফের ইচ্ছামতো। সাধারণ ডায়েরি, মামলা, পাল্টা মামলা, ফাইনাল রিপোর্ট, চার্জশিট দেয়া না দেয়া সব কিছু চলে শরীফের মতামতে। তার অজান্তে কোনো সিদ্ধান্তই নেয়া হয় না। এমনকি মামলার নকলের কপিও দিতে হয় শরীফকে জানিয়ে।

সাপ্তাহিক-এর অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শরীফ নিজে একটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী বাহিনীও গঠন করেছেন। গিয়াসউদ্দিন নেতৃত্ব দিচ্ছে এই বাহিনীর। গত ৮ সেপ্টেম্বর শরীফের সন্ত্রাসী বাহিনী বাউশিয়াঘাট সংলগ্ন এলাকার কাজী ফার্মের উৎপাদন ও পণ্য ওঠা-নামা বন্ধ করে দেয়। কাজী ফার্ম সূত্রে জানা গেছে, খামারে প্রতিদিন ১ কোটি ৮২ লাখ টাকার পোল্ট্রি খাবার উৎপাদন হয়। প্রায় দেড় দিন বন্ধ থাকার পর আবার শরীফের সঙ্গে সমঝোতায় মিলের উৎপাদন শুরু হয়।

জানা গেছে, গজারিয়া থানা ছাত্রলীগের নামে কাজী ফার্মের পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজটি নেয়ার জন্য মালিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছিল। কিন্তু শরীফ ও গিয়াস বাহিনী মিলের উৎপাদন বন্ধ করে দেয় কাজ পেতে। মিল বন্ধের পরের দিন বিকালে শরীফের মালিকানাধীন শরীফ এন্টারপ্রাইজ নামে কার্যাদেশ দেয়ার পরে মিলের উৎপাদন চালু হয়।

নেপথ্যে সাংসদ!
এলাকাবাসী অনেকেরই অভিযোগ, সাংসদকে হাত করেই শরীফ এ সব কার্যকলাপ করছে। এ ছাড়া শরীফের হাত ঘুরে কমিশনের টাকা সাংসদের কাছেও যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।

এ প্রসঙ্গে সাংসদ ইদ্রিস আলী সাপ্তাহিককে বলেন, ‘বিক্ষিপ্তভাবে কিছু অভিযোগ আমার কানে এলেও সরাসরি কেউ অভিযোগ করেনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি দলীয় নেতাকর্মীদের বলে দিয়েছে সুনির্দিষ্টভাবে কেউ অভিযোগ করলে অবশ্যই শরীফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে’।

অন্যদিকে এপিএস শরীফ মাহমুদ সাপ্তাহিককে বলেন, ‘আমি যা করছি সব কিছুই এমপি সাহেব জানেন। তার নির্দেশ ছাড়া আমি থানার কনেস্টেবলের কাছেও ফোন করি না। তবে আমার বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ উঠছে এগুলো সত্য নয়।’

[ad#co-1]