মিরকাদিমের সম্ভাবনা মুখ থুবড়ে পড়েছে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থায়

mirkadim।। ফারাজী আজমল হোসেন, মুন্সীগঞ্জ থেকে ফিরে ।।
মুন্সীগঞ্জ জেলা শহর থেকে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত মিরকাদিম পৌরসভা। ইছামতি-ধলেশ্বরীর মোহনায় অবস্থিত এই নৌবন্দর শুধু মুন্সীগঞ্জবাসীরই নয়, দেশের অর্থনীতিতেও বিরাট ভূমিকা রাখছে। ১০ দশমিক ৩২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের পৌরসভার লোকসংখ্যা ৭০ হাজার। এরমধ্যে ৪০ হাজার ভোটার। ৩৪টি গ্রাম নিয়ে গঠিত একেবারে গ্রামভিত্তিক এই পৌরসভার প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৯৫ সাল। গত ১৪ বছরে এই পৌরসভা তার শ্রেণীগত অবস্থান পরিবর্তন করেছে। তৃতীয় শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। এতে আগে যেখানে সরকারি বরাদ্দ ছিল ২২ লাখ টাকা এখন সেখানে ৪৪ লাখ টাকা। কিন্তু সেখানকার নাগরিকদের ভাগ্যের তেমন কোন পরিবর্তন হয় নি। এর প্রধান কারণ অর্থাভাব।

সরেজমিন মিরকাদিম পরিদর্শনকালে দেখা যায়, এখানে সাত বছর আগে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে যে নৌ-বন্দর নির্মাণ করা হয়েছিল নদীতে প্রয়োজনীয় ড্রেজিংয়ের অভাবে তা ইতিমধ্যে অকেজো হয়ে পড়েছে। ফলে নৌ-বন্দরের কাজকর্ম এখন বন্ধ। নদীতে ড্রেজিং নেই দীর্ঘদিন। পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় গভীরতার অভাবে বড় কোন নৌ-যানই সেখানে ভীড়তে পারে না। মিরকাদিমে রয়েছে প্রসিদ্ধ কমলাঘাট বন্দর। এ বন্দরকে কেন্দ্র করে সেখানে গড়ে উঠেছে প্রায় দু’শ চাতাল শিল্প এবং এর প্রতিটিতে রয়েছে রাইস মিল। প্রতিদিন এখান থেকে শত শত টন চাল উৎপাদন হয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় এ চাল সরবরাহেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কমলাঘাট আজ পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ নেটওয়ার্কের আওতায় আসেনি। অথচ এই কমলাঘাটের অর্ধ কিলোমিটার দূরেই মানুষ গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ ভোগ করছে।

মিরকাদিম পৌরসভায় পাকা রাস্তা আছে সাড়ে সাত কিলোমিটার। কাঁচা রাস্তা তিন কিলোমিটার। হেরিংবোন আছে ৮ কিলোমিটার। এই রাস্তাঘাটের বেশিরভাগই অপ্রশস্ত, জরাজীর্ণ ও ভাঙ্গাচোরা। রিকশা ও যান্ত্রিক কোন যানবাহন পরস্পর একই গলিতে ঢুকে পড়লে আর কোন উপায়ই থাকে না।

মিরকাদিমে ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলার একমাত্র পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০০৫ সালে। দুই দফা সময় বাড়িয়েও নির্মাণ কাজ এ পর্যন্ত শেষ হয়নি। কবে নাগাদ এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে এটি চালু হবে তা কেউ বলতে পারছে না। জেলা খাদ্য গুদাম ও বিএডিসি’র সার গুদাম এখানে। খাদ্য গুদামের পাশেই রয়েছে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। মিরকাদিম পৌরভবনের সামনে দিয়ে যে রাস্তাটি সার গুদাম, খাদ্য গুদাম ও ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দিকে গেছে তার প্রশস্ততা মাত্র ১৪ ফুট। তদুপরি এই সরু রাস্তা দখল করে বসানো হয়েছে বিদ্যুৎ খুঁটি। ফলে ফায়ার ব্রিগেডের অগ্নিনির্বাপণ গাড়ীগুলো প্রয়োজনে চলাচল করতে পারে না। এ রাস্তা দিয়ে সার ও খাদ্যশস্যবাহী ট্রাক চলাচলেও প্রতিনিয়ত অসুবিধার সৃষ্টি হয়। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা মুন্সীগঞ্জ শহরের মত মিরকাদিমের কপালেও দুর্দশা লেপন করে দিয়েছে। ১৯৮৮ সালে ভয়াবহ বন্যার পর তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু একবার মিরকাদিম এসেছিলেন। তিনি স্থানীয় নাগরিক দুর্দশা দেখে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মিরকাদিম মুন্সীগঞ্জ সড়কটি রক্ষণাবেক্ষণের কাজ সড়ক ও জনপথ বিভাগের হাতে ন্যস্ত করার নির্দেশ দেন। এরপর সড়কটি প্রশস্ত করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে এই সড়কের অবস্থাও বর্তমানে করুণ।

মিরকাদিম নৌবন্দরে সবচেয়ে বেশি সরবরাহ আসে মাছের চালান। দক্ষিণাঞ্চল থেকে মাছের চালান বোঝাই করে কার্গো ও লঞ্চ এই বন্দরে ভিড়ে। সেখানে এই মাছ পাইকারী ও খুচরা বেচা-কেনা চলে। পরে ট্রাক বোঝাই হয়ে তা চলে যায় রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে। কিন্তু যুগ যুগ ধরে কোটি টাকার মাছ যেখানে বেচা-কেনা চলছে সেখানে আজ অবধি কোন ছাউনি গড়ে তোলা হয় নি। উন্মুক্ত আকাশের নিচে চলছে এই মাছের বাণিজ্য। অনেকগুলো তেলের মিলও রয়েছে এখানে। কিন্তু সেসব মিলে উৎপাদন সম্ভাবনা যতটুকু আছে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কারণ বিদ্যুৎ সঙ্কট।

স্থানীয় পৌর মেয়র মোহাম্মদ হোসেন রেনু বললেন, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকারি পর্যায়ে যথাযথ উদ্যোগের অভাবে মিরকাদিমের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

[ad#co-1]