চলে গেলেন কল্যাণমিত্র সাংবাদিক বোরহান আহমেদ

গোলাম কাদের
দীর্ঘ সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি নানা দেশহিতৈষী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এমনকি মানুষের এবং নিজের কমিউনিটির স্বার্থে রাস্তায় নেমেছেন, আন্দোলন করেছেন। তিনি ভোক্তার অধিকার নিয়ে কাজ করতেন, ক্যাবের সভাপতি ছিলেন। আজ যে ক্রেতাদের অধিকার নিয়ে কথা বলা হয়, ক্রেতাদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয় এ সচেতনতা দেশে গড়ে তুলতে তাকে সাংবাদিকতার ফাঁকে ফাঁকে অতিরিক্ত সময় দিতে হয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি সফলও হয়েছেন।

প্রতিদিন কেউ না কেউ যাচ্ছে। কোনো কোনো যাওয়াকে পথ আগলে দাঁড়াতে ইচ্ছা করে। বুক দীর্ণ করে অঝোরধারায় কান্না আসে। সেই কান্নার সঙ্গে যদি প্রকৃতি কাঁদে তখন মনে হয় এ যাওয়া ব্যতিক্রমী। নমস্য সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরীকেও এ রকম বৃষ্টিভেজা এক সন্ধ্যায় বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে রেখে এসেছিলাম গভীর মমতায়। আমাদের প্রিয়, প্রাণপ্রিয় মানবিকগুণসম্পন্ন বোরহানভাইকে বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় যখন কবরের হিমশীতল গহিন গহ্বরে অনন্ত শয়ানে রাখছিলাম তখনও তার প্রিয় পুত্র সাদ্দাম আমার সঙ্গে লাশ জড়িয়ে ধরে তাকে অনন্ত শয়ানে শুইয়ে দিচ্ছিলো। মানুষের এক জীবন খুব অল্প সময়ের। মনে হয় নিবেদিত সাংবাদিকদের জীবনকাল আরো অল্প। সাংবাদিকতা ঝুঁকিপূর্ণ এবং নিত্য টেনশনের পেশা। বিশেষ করে যারা লেটনাইট করে বাড়ি ফেরেন মোদ্দা কথা তারা দেশ ও জনকল্যাণ করে নিজের আয়ুষ্কাল খেয়ে ঘরে ফেরেন। এ পেশার লোকজনের গড় আয়ু অনেকের চেয়ে কম।
তবুও জেনেশুনে বিষ করেছি পানÑ এর মতো উত্তেজনাপূর্ণ এ পেশায় অনেকেই আসেন। বোরহান আহমেদও এসেছেন সাংবাদিকতার টানে। জয়ের নেশায় এ পেশায় অনেকেই আসেন। কেউ পারেন, কেউ জীবনভর সাব-এডিটর থেকে যান, কেউ কেউ সর্বোচ্চ জায়গা এডিটর হয়ে ক্ষান্ত হন। দেশখ্যাত, বরেণ্য হয়ে ওঠেন। তিনিও পেয়েছিলেন। বরেণ্য, দেশখ্যাত সাংবাদিক হয়ে উঠেছিলেন।
তার সাহচর্য, তার সহকর্মী হওয়ার আমারও সৌভাগ্য হয়েছিল। তার পেশাদারিত্ব ও মানবিক গুণাবলী আমাকে আজীবন মুগ্ধ ও ঋণী করে রেখেছে।
১৯৮৮ সালের ২৯ জুলাই শনিবার দৈনিক দেশ থেকে মর্নিং শিফটের সাব-এডিটরের দায়িত্ব শেষে বাসায় ফিরছিলাম। হাতে ছিল পুত্র-কন্যার জন্য পেয়ারা। মিরপুর টোলারবাগের বাসার কাছে পৌঁছতেই খবর পেলাম আমার একমাত্র পুত্র পাঁচ বছরের তরু ইসলাম পানিতে পড়ে গিয়েছে, সবাই তাকে শিশু হাসপাতালে নিয়ে ছুটছে। এরপর আমি নিজেকে আবিষ্কার করি স্কুটারে করে আমাকে শুধু ফেরত আনছে অনেকেই। তরু কোথায়? জিজ্ঞেস করতেই যারা ছিলেন বললেন ভালো আছে। কিন্তু বাসায় পৌঁছেই দেখি প্রিয় পুত্র তরু নেই। কীভাবে তার লাশ আগেই নিয়ে চলে এসেছে এবং কীভাবে জানি আমার সহকর্মীরা এবং ভায়রা আখতারউজ্জামান এসে হাজির হয়েছে (যিনি এখন সপরিবারে ফ্লোরিডায় আছেন)।
আমি পরে জেনে অবাক হয়েছি, নমস্য সাংবাদিক দৈনিক দেশ পত্রিকার নিউজ এডিটর দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার সেই বিখ্যাত ভেসপাটি চেপে চলে এসেছিলেন। এবং আমার পুত্রের কাফন, দাফন, জানাজা সব আয়োজনে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমার পাশে থেকে আয়োজন করেছিলেন এজন্যই বলেছি তার কাছে আমি ঋণী। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া, ব্যাংকার এম এ ওয়াহেদ, সানাউল্লাহ নূরীসহ যারা তখন কবি গোলাম কাদেরের একমাত্র পুত্রশোকে সমবেদনা জানিয়েছেন তাদের কাছে আজীবন নিজেকে ঋণী মনে হয়। বোরহান আহমেদকে একটু বেশিই মনে হতো। চার দিনের দিন বোরহান আহমেদ এবং ভাবী গুলশান আহমেদও মিলাদ-দোয়া মাহফিলে শরিক হয়েছিলেন।
বোরহান আহমেদ ছিলেন এক লাজুক অক্টোপাসের মতো। কথা বলতেন কম, বিনয় ও দয়ায় ছিলেন মহান। নিজে কষ্ট স্বীকার করে অন্যের কল্যাণ করতে চেষ্টা করতেন। সাংবাদিকতার এথিকস ভাঙতে চেষ্টা করেননি তিনি। সাংবাদিকদের কল্যাণেই সাংবাদিকদের জড়িয়ে ধরতেন তিনি। তিনি ছিলেন কল্যাণমিত্র। তিনি দেশ, মানুষ, সমাজের কল্যাণের জন্য কাজ করে গেছেন। তিনি বিখ্যাত আজাদ পত্রিকা দিয়ে শুরু করে চরমপত্র, দৈনিক দেশ, জনপদ, পূর্ব দেশসহ জনকণ্ঠের মতো পত্রিকায়ও দীর্ঘ ১৫ বছর প্রায় নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
এখনো মনে পড়ে, আজ যেখানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এই ভবনটি ছিল দৈনিক দেশের কার্যালয়। ভবনটির নিচতলায় দক্ষিণ-পশ্চিমের একটি রুমে বসতেন তিনি। ১১টার মধ্যেই চলে আসতেন। মিটিংয়ের পর ভেসপা নিয়ে চলে যেতেন প্রেসক্লাব অথবা পাশের ক্যাব অফিসে, তারপর মনিপুরীপাড়ার বাসায় আবার সন্ধ্যায় মোটরসাইকেলযোগে অফিসে। গভীর রাতে ফেরা। খুব মনে পড়ে, আজ কী লিড করা যায়, কী করা যায় ভাবতে ভাবতে মোটরসাইকেলের হলুদাভ চাবিটি দিয়ে তার রাজকীয় কপালে খোঁচাতেন অথবা চেপে ধরতেন চাবিটি। দীর্ঘদিন পরও আমার তা খুব মনে পড়ে।
তিনি লিখতেন। তিনি লেখক-সাংবাদিক ছিলেন। তার বেশকিছু খুব জনপ্রিয় বই বাজারে আছে। আর থাকবেই না কেন? পাকিস্তান আমলের বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি লাইব্রেরির কর্ণধার ছিলেন তার পিতা কমরুদ্দীন আহমেদ। বাংলার মুসলিম রেনেসাঁর অগ্রপথিক মুন্সী মেহেরুল্লাহর প্রিয় সহচর অগাধ পা-িত্যের অধিকারী সমাজ সংস্কারক মুন্সী তাজউদ্দিনের বংশধর তিনি। মানিকগঞ্জের গড়পাড়ার খোলা গ্রাম তার পৈতৃক নিবাস। ১৯৪৪ সালের ১ জুলাই তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এমএ পাস করেন। পড়াশোনা সমাপ্ত করে সাংবাদিকতা পেশায় ঢুকে পড়েন এবং বিক্রমপুরের আরেক বিখ্যাত পরিবারের তারই সহপাঠিনীকে বিয়ে করেন। গুলশান আহমেদ দীর্ঘদিন শহীদ আনোয়ারা গার্লস স্কুলের শিক্ষকতা করেছেন। সম্প্রতি তিনিও অবসরে এসেছেন। এক কন্যা ডা. রুমানা ও পুত্র সাদ্দামকে রেখে ৬৫ বছর বয়সেই চলে গেলেন সাংবাদিক জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র সবার প্রিয় বোরহানভাই। দীর্ঘ সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি নানা দেশহিতৈষী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এমনকি মানুষের এবং নিজের কমিউনিটির স্বার্থে রাস্তায় নেমেছেন, আন্দোলন করেছেন। তিনি ভোক্তার অধিকার নিয়ে কাজ করতেন, ক্যাবের সভাপতি ছিলেন। আজ যে ক্রেতাদের অধিকার নিয়ে কথা বলা হয়, ক্রেতাদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয় এ সচেতনতা দেশে গড়ে তুলতে তাকে সাংবাদিকতার ফাঁকে ফাঁকে অতিরিক্ত সময় দিতে হয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি সফলও হয়েছেন। মানুষ এখন এক্ষেত্রে অনেক সচেতন। এ বিষয়টি নিয়ে এখন সরকার ভাবে এবং মাঝে মধ্যে ভাবনায় পড়ে যায়।
এছাড়া বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও জাতীয় প্রেসক্লাবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তার নিজ এলাকায় বহু উন্নয়নমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়েছিলেন। শেকড়ের টানে প্রতিনিয়ত গ্রামে ছুটে যেতেন। গড়পাড়া দীঘি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, মসজিদ নির্মাণ ও বিভিন্ন ইউনিয়নের কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ ব্যাপারেও বোরহান আহমেদ বিশেষ অবদান রেখেছেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল অনন্য। হাঙ্গার প্রজেক্টের সহায়তায় মানিকগঞ্জের অসংখ্য বেকার শিক্ষিত তরুণ-তরুণীকে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সাংবাদিকতা, সমাজসেবা ও সাংগঠনিক কাজের জন্য অনেক সম্মাননা ও পদকে ভূষিত হয়েছেন। এছাড়া এ কাজের জন্যও তিনি বিদেশে আমন্ত্রিত হয়েছেন, শ্রীলংকা, ভারত, ফ্রান্স, পেনাং সফর করেছেন।
শুধু সাংবাদিক, সমাজকর্মী নন; তিনি বহু অমূল্য গ্রন্থের রচয়িতাও। গ্রন্থগুলো হলো (১) কারাগারের দিনগুলো (২) ভিন্ন দেশে (ভ্রমণ কাহিনী) (৩) গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও বিএনপি-আওয়ামী লীগের রাজনীতি (৪) গণতন্ত্রের পাঁচ বছর (৫) বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শাসনকাল (৬) আওয়ামী শাসনে বিএনপির আন্দোলন (৭) ছোটদের জিয়া (৮) সমকালীন প্রেমের গল্প। এছাড়া রূপসী নামে একটি পত্রিকা প্রকাশনার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তিনি দৃঢ়চেতা সাংবাদিক ছিলেন বলেই ’৯০-এর গণআন্দোলন ও ’৯৪ সালে ফতোয়াবাজদের বিরুদ্ধে কর্মতৎপরতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনে কারাবরণ করেছিলেন।
সাংবাদিকদের প্রথম সারির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র দেশ-সমাজের এক কল্যাণমিত্র সাংবাদিক বোরহান আহমেদ ২৪ সেপ্টেম্বর সকালে মহাপ্রয়াণে চলে গেলেন। সাংবাদিকতার বর্ণাঢ্য জীবন যুগ যুগ তাকে আমাদের মাঝে, নতুন প্রজন্মের কাছে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে অমরত্বের মর্যাদায় অধিষ্ঠান দেবে। তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। তার পরিজনদের শান্তি কামনা করি।

গোলাম কাদের: সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সংগঠক।
Quadergolam@gmail.com