ভেদবুদ্ধির ঊর্ধ্বে বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম

গোলাম কাদের
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য পথে-প্রান্তরে গেয়ে বেড়িয়েছেন। পথকে তিনি ঘর বানিয়েছেন, উজানধল কালনী নদীকে দেহ আর ধমনি বানিয়ে নিয়েছিলেন। তাই কোনো মোহই তাকে তার গ্রাম আর নদী এবং প্রকৃতি ছাড়া করতে পারেনি। তার প্রাণশক্তি ও আধ্যাত্মিকতায় মানুষকেই তার কাছে যেতে হয়েছে। এ যে কতো শক্তি, অমরত্বের কতো বড় সঞ্জীবনী বলে প্রকাশ করা যাবে না।

মাটি ও মানুষের খুব কাছের মানুষ ছিলেন শাহ আবদুল করিম। ভেদবুদ্ধির ঊর্ধ্বে উঠে তিনি সাধনা করেছেন। সফল হয়েছেন। রাখাল বালক থেকে বাউলসম্রাট। ৯৩ বছরের জীবন-সাধনায় ক্ষতবিক্ষত অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দিনের পর দিন গান রচনা করেছেন, গেয়েছেন। মানুষকে পাগল বানিয়েছেন, আমোদিত করেছেন, নিজে গানপাগল হয়ে আমোদিত হয়েছেন, সুখ-স্বপ্নের হাতছানি উপেক্ষা করে ভাটি অঞ্চলে রয়ে গেছেন। উজানধল গ্রাম এবং কালনী নদী তার প্রিয়তর বিষয়-আশয়। দেশ এবং পৃথিবীর দেশে দেশে প্রবাসী বাঙালিদের তিনি উজানধল গ্রামে আধ্যাত্মিক টানে নিতে পেরেছেন। মানুষের ঢল তাকে মহিমান্বিত করেছে। শাহ আবদুল করিমের এখানে সার্থকতা তার গানের সুর, কথা, কবিতার ছন্দময়তা, সরল কথার বিন্যাস, বক্তব্যে প্রাঞ্জলতা ও দৃঢ়তা তাকে লালন শাহ, পাঞ্জুশাহ দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন বলে মনে হয়। বাংলা মায়ের প্রকৃতির সন্তান শাহ আবদুল করিম মানুষে মানুষে ভেদ বিচার করেননি, তাই দৃঢ়, প্রাঞ্জল ও উদাত্ত কণ্ঠে গাইতে পেরেছেনÑ গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান আর মুরশিদী গাইতাম… আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম। অসাম্প্রদায়িক এবং মানুষের কবি, গীতিকার শাহ আবদুল করিম জীবনের শেষ পর্যন্ত নিজের অসাম্প্রদায়িক মনোভাব ও বাউল দর্শন নিয়ে অসংখ্য গান রচনা করে গেছেন। প্রায় সাত দশক পর্যন্ত এই বাউল দর্শন বৃটিশবিরোধী আন্দোলন, কাগমারি সম্মেলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে প্রতিবাদী শাহ আবদুল করিম বাউলসম্রাট হয়ে ওঠেন। মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্য তাকে আরো মহৎ ও কীর্তিমান করেছে। এমনকি প্রয়াত আবদুস সামাদ আজাদ তার নির্বাচনী অনুষ্ঠানে তাকে দিয়ে গান গাইয়েছেন, অভিনন্দিত করেছেন।
তিনি খুব শিক্ষিত ছিলেন না, কিন্তু প্রকৃতির শিক্ষায় তিনি ছিলেন অনেক ঊর্ধ্বের মানুষ। তার গীত বা বাউল সঙ্গীত প্রায় ১ হাজার ৬০০। হারিয়ে যাওয়া, চুরি হয়ে যাওয়া গান বাদে এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা সাতটি। আফতাব সঙ্গীত (১৯৪৮), গণসঙ্গীত (১৯৫৭), কালনীর ঢেউ (১৯৮১), ধলমেলা (১৯৯০), ভাটির চিঠি (১৯৯৮), কালনীর কূলে (২০০১) ও শাহ আবদুল করিম রচনা সমগ্র (২০০৯)। তাকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে কয়েকটি প্রামাণ্য চিত্র। ভাটির পুরুষ ২০০৫ সালে পাঁচ বছর ধরে তৈরি করেন শাকুর মজিদ। ‘গণ মানুষের মরমিয়া কবি শাহ আবদুল করিম’ নামে তোফাজ্জল হোসেন আরো একটি প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ করেন। শেকড় নামেও ২৬ মিনিটের একটি প্রামাণ্য চিত্র নির্মিত হয়।
২০০১ সালে শাহ আবদুল করিমকে তার কালজয়ী সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে একুশে পদক দেয়া হয়। এছাড়া বহু সংগঠন তাকে নানা সম্মাননায় ভূষিত করে। সম্প্রতি প্রতি বছর তাকে নিয়ে উজানধল গ্রামে বাউল মেলার আয়োজন হয়ে আসছিল। আশা করি আয়োজকরা তা চালিয়ে যাবেন।
ক্ষণজন্মা এই পুরুষ একজন চারণ রাখাল বালক থেকে শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর পথে পথে তার সুরেলা সঙ্গীত ছড়িয়ে দিয়ে দেশকে অন্যধারায় পরিচিত করে তুলে এনেছেন। আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি যে শক্তিশালী, শাহ আবদুল করিম আরেকবার তা প্রমাণ করলেন। বাংলা একাডেমী তার কয়েকটি গান ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে মাত্র। আমরা আশা করবো বাংলা একাডেমী তার রচনা সমগ্র থেকে বাছাই করা গানগুলো নিয়ে অনুবাদ করে তার দর্শন পৃথিবীর পথে পথে ছড়িয়ে দেবেন।
আরেকটি কথা না বললেই নয়, আমাদের নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে এখন শাহ আবদুল করিম উঠে আসছে অসামান্য তারুণ্য নিয়ে।
আমাদের তারুণ্যের মধ্যে, তাদের কণ্ঠে যদি তার সেই বিখ্যাত গান ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান গাইতাম… আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম ব্যাপক হারে প্রচার করা হয় এবং মানুষের মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে পারে তবে সমাজে দাঙ্গা, হানাহানি, রাহাজানি সমাজের নানা অবক্ষয় থেকে আমরা রক্ষা পেতাম এবং এতে পরস্পর সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় হতো। ইসলামের ভাষায় পড়শির হক আদায় হতো। পড়শি যে-ই হোক, যে ধর্মের হোক, তারা নির্যাতিত হতো না। শাহ আবদুল করিম ৯৩ বছর বয়সে এ ধরনের অনেক দাঙ্গা দেখেছেন, নির্যাতন দেখেছেন আর শিখেছেন, লিখেছেন, গেয়েছেন। এ জন্য ব্যক্তিজীবনেও তাকে অনেক সময় একঘরে হয়ে থাকতে হয়েছে। কিন্তু তিনি তার দর্শন নিয়ে ছিলেন দৃঢ়চেতা।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য পথে-প্রান্তরে গেয়ে বেড়িয়েছেন। পথকে তিনি ঘর বানিয়েছেন, উজানধল কালনী নদীকে দেহ আর ধমনি বানিয়ে নিয়েছিলেন। তাই কোনো মোহই তাকে তার গ্রাম আর নদী এবং প্রকৃতি ছাড়া করতে পারেনি। তার প্রাণশক্তি ও আধ্যাত্মিকতায় মানুষকেই তার কাছে যেতে হয়েছে। এ যে কতো শক্তি, অমরত্বের কতো বড় সঞ্জীবনী বলে প্রকাশ করা যাবে না।
৯৩ বছরের ন্যুব্জ দেহ নিয়ে যখন আর পারছিলেন না, তখন তার সেই গানকে সত্য করে তিনি চলে গেলেনÑ গাড়ি চলে না চলে না চলে না রে…।
ভেদ বিচার। জাতভেদ করেননি বলে তাকে অনেক দুঃখ পেতে হয়েছে জীবনে। তার দুঃখ ছিল তার শিষ্য এবং স্ত্রী সরলার জানাজা পড়তে কেউ আসেনি। তিনি বলতেন, আমি গান গেয়ে পেট চালাই। আমি তো ধর্ম বিক্রি করে পেট চালাই না। সেই ধর্ম বিক্রেতারা দেখলো শাহ আবদুল করিমের অমরত্বের পথে তার জানাজায় লাখো মানুষের শেষ শ্রদ্ধা। শেষ ভালোবাসা। তার গানের মূল সুরই ছিল মানবপ্রেম।
তার বিখ্যাত বেশ কয়েকটি গানÑ কেমনে ভুলিবো আমি বাঁচি না তারে ছাড়া, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম, আমার কূলহারা কলঙ্কিনী, গাড়ি চলে না চলে না চলে না রে, বন্ধে মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে, গান গাই আমার মনরে বোঝাই মন থাকে পাগলপারা, আসি বলে গেল বন্ধে আইল না, মন কান্দে প্রাণ কান্দেরে, বসন্ত বাতাসে সই গো বসন্ত বাতাসে। এ রকম শত শত গান লোকপ্রিয়তা পেয়ে বাউলসম্রাট চারণ গীতিকার শাহ আবদুল করিম বাংলাদেশি, বাংলা প্রবাসীদের ‘মাতাইয়া’ রাখবেন। তিনি ধর্মান্ধদের দৃষ্টির অন্তরাল থেকে শুধু দেখবেন।

গোলাম কাদের: সাহিত্যিক, সংগঠক ও সাংবাদিক।