সংগীত অন্য হাবিব

পার্থ সরকার
গাড়িবারান্দা পার হতেই ছোট্ট লোহার সিঁড়ি। উঠে গেছে একদম চিলেকোঠা পর্যন্ত। নামে চিলেকোঠা হলেও ভেতরের ঘরগুলো বেশ বড়সড়, পরিপাটি। এখানেই হাবিবের নতুন স্টুডিও। ‘গুলশানের স্টুডিওতে টানা কাজ করতে করতে মাঝেমধ্যে হাঁপিয়ে উঠি। তাই ধানমন্ডিতে এই নতুন স্টুডিওটা করলাম। যখন যেখানে ইচ্ছা করে, এখন সেখানেই কাজ করি।’ বলছিলেন হাবিব। এখানেও যখন হাঁপিয়ে উঠবেন, তখন? ‘এ জন্যই তো কক্সবাজারে একটা অ্যাপার্টমেন্ট বুকিং দিলাম কয়েক দিন আগে। ধানমন্ডি, গুলশানে ভালো না লাগলে চলে যাব কক্সবাজার। ওখানেই হবে আমার তিন নম্বর স্টুডিও। নিজের গান শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে গেলে সাগরের গান শুনব।’

হাবিব এমনই। চলেন নিজের ইচ্ছামতো। কে কী মনে করল তাতে কিছু যায়-আসে না। তাই বলে কাউকে কষ্ট দিয়ে নিজের কাজ করবেন, তাও না। ‘আমার মন যা বলে, আমি তা-ই করি। সেভাবেই চলি। কোনো লুকোছাপা নেই। ভেতর-বাইরে একই রকম।’

ধানমন্ডির বাড়িটা হাবিবের জন্য বিশেষ কিছু। এখানেই কেটেছে তাঁর শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো। এখানে বসেই গানের সঙ্গে প্রথম ভালোবাসা। তাঁর কাছে শুনতে চাই সেই দিনগুলোর কথা। ‘বাবা তখন দাপটের সঙ্গে গান গেয়ে বেড়াচ্ছেন। নিয়মিত চর্চা করছেন এ বাসাতেই। আমার বয়স তখন চার কি পাঁচ। চর্চার ফাঁকে ফাঁকে আমি গিয়ে কি-বোর্ড বাজানোর চেষ্টা করতাম। সাদা-কালো বোতামগুলো দারুণ টানত আমাকে। বাজাতে বাজাতে একদিন বাবার গাওয়া একটা গান তুলে ফেললাম কি-বোর্ডে। এখনো যখন ভাবি, অবাক হয়ে যাই। ওই বয়সে কীভাবে পেরেছিলাম স্রেফ শুনে শুনে গান তুলে ফেলতে!’ বলেন হাবিব।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাবিব রক মিউজিকের খুব ভক্ত হয়ে গেলেন। ‘তখন আমি সারা দিন দেশি-বিদেশি নানা গান শুনতাম। এলআরবি, মাইলস, আর্ক—এসব ব্যান্ডের ভক্ত ছিলাম। কনসার্ট হলেই চলে যেতাম গান শুনতে। বালাম ভাইয়েরা তখন একটা ব্যান্ড করল রেনেগেটস নামে। চর্চা করত আমাদের পাশের বাসায়। মাঝেমধ্যেই সেখান থেকে গানের শব্দ ভেসে আসত। ওদের ব্যান্ডের জন্য ওরা তখন একজন কি-বোর্ডিস্ট খুঁজছিল। বাবার এক মিউজিশিয়ানের মাধ্যমে ওরা আমার খোঁজ পায়। আমাকে দেখা করতে বলল। একদিন ভয়ে ভয়ে গেলাম ওদের ওখানে। আমার বয়স তখন বারো কি তেরো, আর বালাম ভাইয়েরা ছিল কলেজপড়ুয়া। প্রথমে কিছুটা ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু ওরা আমাকে বেশ ভালোভাবেই গ্রহণ করল। পরবর্তী সময়ে ওদের হাত ধরেই আমার প্রথম সিগারেট খাওয়া। আরও কত স্মৃতি! সেই সময়টা ছিল দারুণ!’ এরপর হাবিবের সামনে সুযোগ আসে আর্কে অতিথি শিল্পী হিসেবে কি-বোর্ড বাজানোর। ‘তখন আমাকে আর পায় কে! যে দলের মহা ভক্ত আমি, সেই ব্যান্ডেই আমি কি-বোর্ড বাজাব! ভাবুন অবস্থাটা।’ এর এক বছর পরই হাবিব মিউজিক নিয়ে পড়তে চলে যান লন্ডনে। ‘লন্ডনে আমি স্থানীয় বাঙালি বন্ু্লবান্ধবের মাধ্যমে দারুণভাবে লোকগানের সংস্পর্শে আসি।’ এরপর গানের জগতে হাবিবের উত্থানের ইতিহাস তো সবারই জানা। নতুন করে বলার কিছু নেই।

পপ, রক, ব্যান্ডসংগীতের পর লোকগান—জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে একেক ধরনের গান শুনেছেন আপনি। এর কোনো প্রভাব পড়ে না আপনার ওপর? হাবিবকে আমাদের প্রশ্ন। ‘আমি যখন যে গান শুনেছি, হূদয় দিয়ে অনুভব করে শুনেছি। এখন কাজ করতে গিয়ে টের পাচ্ছি, সেই বিষয়গুলো আমাকে অনেক সাহায্য করে।’

অনেকেই অভিযোগ করেন হাবিবের উচ্চ পারিশ্রমিক নিয়ে। কেউ কেউ এও বলেন, অডিওশিল্পের প্রতি কোনো দায়িত্ব না দেখিয়ে হাবিব শুধু নিজের লাভটাই দেখছেন। হাবিব বলেন, ‘দেখুন, সৃষ্টিকর্তা সবাইকে সুর করার, গান গাওয়ার ক্ষমতা দেন না। যাদের তিনি এই ক্ষমতার এক ফোঁটা দেন, তারা বিশেষ আশীর্বাদপ্রাপ্ত। তাদের তো টাকা-পয়সা নিয়ে চিন্তা করার কথা না। তাদের ঘরে টাকার স্তূপ হয়ে যাওয়ার কথা। আপনি এলভিস প্রিসলির দিকে তাকান। মৃত্যুর এত বছর পর এখনো অ্যালবাম বিক্রির টাকা পেয়ে যাচ্ছেন। এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ধনী শিল্পীদের অন্যতম একজন তিনি। আমি খুবই সৌভাগ্যবান যে এই বিরল ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা আমাকে দিয়েছেন। কিন্তু পাশাপাশি এমন একটা দেশে জন্মেছি যেখানে আমার প্রাপ্য সন্মান তো দূরের কথা, যা পাচ্ছি তারও যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হচ্ছে। একটা সিডি যেখানে ষাট টাকা করে বিক্রি হয়, সেখানে প্রতি সিডিতে দশ টাকা করে আশা করলে সেটা কি খুব বেশি হয়ে যায়? আমার তো মনে হয়, আমরা শিল্পীরা নিজেদের প্রাপ্য সম্মানীর দশ ভাগও পাচ্ছি না।’

চলচ্চিত্রে অনেক দিন ধরে গান করলেও এবারই প্রথম পুরো চলচ্চিত্রের জন্য গান করলেন হাবিব। এ ছাড়া জিংগেল, অডিও অ্যালবামের জন্যও কাজ করে যাচ্ছেন। তবে সব মাধ্যম ছাপিয়ে হাবিবের পছন্দ বড় পর্দা। ‘চলচ্চিত্রে গান করার মজাই আলাদা। অনেক মাথা খাটিয়ে দৃশ্য অনুযায়ী গান তৈরি করতে হয়। সৃষ্টির যে মজা এখানে পাওয়া যায়, তা অন্য ক্ষেত্রে ঠিক পাওয়া যায় না। আমি তো চলচ্চিত্রে আরও বেশি বেশি কাজ করতে চাই। এই তো প্রেম ছবির গানের অ্যালবামটি যেমন আমি কয়েক মাস ধরে একটু একটু করে করেছি। জীবিকার জন্য আমাকে এখন অনেক গান করতে হয়। সে রকম হলে সবকিছু ছেড়ে আমি আরও সময় নিয়ে কাজ করতে চাই। কাজের মান তাতে আরও বাড়বে।’

অনেকেই হাবিবকে ডাকে ‘নিশাচর’ বলে। হাবিব বলেন, ‘আমার আসলে নিরিবিলি পরিবেশ পছন্দ। ভিড় একদমই সহ্য করতে পারি না। তাই তো দিনের বেলা জ্যামের ভয়ে বাসা থেকে বেরই হই না। সব কাজ তাই করতে চেষ্টা করি একটু রাতের দিকে। আর রাতের নিস্তব্ধতা আমার কাজ করার জন্য আদর্শ বলে মনে হয়।’
আর হাবিবের ভালোবাসা, প্রেম? ‘গানের সঙ্গেই আমার যত প্রেম, যত ভালোবাসা।’ খানিকটা হেঁয়ালি করে উত্তর দেন তিনি, “ভক্তদের কাছে আমি ‘গানের হাবিব’। আমার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলো না হয় থাকুক আমার কাছেই। ভক্তদের জন্য আমার গান তো আছেই।”

[ad#co-1]