‘ছিন্নপত্রাবলী’র কয়েকটি জানালা

সরকার মাসুদ
‘ছিন্নপত্রাবলী’কে আমার হাজার দুয়ারি বাড়ির সঙ্গে তুলনা করতে ইচ্ছা করে। তার দরজা হাজারটা, জানালা তার চেয়েও বেশি। তার গোলকধাঁধাময় করিডোর যে কতগুলো তার হিসাব কে রাখে? কিন্তু কে (যারা এই গ্রন্থটি পড়েছেন আগাগোড়া) জানে না এই বাড়ির ভিতর দিয়ে বয়ে গেছে হৃদয়ের কতো বিচিত্র বাতাস, কতো নয়নাভিরাম আলো এবং আজো বয়ে চলেছে!

অল্প কিছু স্থির বিশ্বাস আর অনেক আত্মসংশয়- এই দুয়ে মিলে গড়ে উঠেছে ছিন্নপত্রাবলীর মনোজগৎ। লিখতে চেয়েছিলাম’ ‘শরীর’ মনোজগতের পরিবর্তে। কিন্তু ভেবে দেখলাম, চিঠিপত্রের চেয়ে মনঘনিষ্ঠ বস্তু আর কি আছে? উপরন্তু এই চিঠির ভিতর দিয়েই তো মানুষ গভীর আন্তরিকতা প্রকাশ করতে পারে, অকপটে বলে ফেলতে পারে মনের সব কথা- সবটুকু রঙ-আনন্দ অথবা বিষাদের গুঢ় অনুভূতি। তার কারণ, যার কাছে ব্যক্ত করা হচ্ছে মনোভাব সে তো ঐ মুহূর্তে সামনে বসে নেই।

‘ছিন্নপত্রাবলী’ একাধিকবার পড়ার পর আমার মনে হয়েছে, আরো অনেকবার পড়লেও এর আবেদন ফুরাবে না। তার বিশেষ কারণ এই, নিসর্গমুগ্ধতা, সহজ দার্শনিকতা, গ্রাম জীবনের বিক্ষিপ্ত ছবি, নানা ভাষার খ্যাতিমান লেখা ও তাদের কাজ সম্বন্ধে স্বতঃস্ফূর্ত মন্তব্য, লেখক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের আত্মপ্রশ্ন ও আত্মবিশ্লেষণ জীবনের বিচিত্র সব চালচিত্র এবং খুঁটি-নাটি অনেক জীবনঘনিষ্ঠ উপলব্ধি ও আবেগ অত্যন্ত ব্যক্তিগত কিন্তু আকর্ষণীয় ভাষায় হয়ে উঠেছে বইটিতে স্থান পাওয়া চিঠি-পত্রগুলোতে। এগুলোর মধ্যে অনুভবের জানালা অনেক, অভিভূতিও কম নেই। কিন্তু সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে জীবনোপলব্ধির বিচিত্র ধরন। বিপুল বিশ্বের কতো কিছুতে যে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ এবং সেই আগ্রহ যে কতো রকমভাবে, কতো সৃষ্টিশীল উপায়ে প্রতিভাসিত হয়েছে, ছিন্নপত্রাবলীর ভেতর দিয়ে মানসযাত্রা না করলে তা পুরোপুরি বোঝা যাবে না। যেহেতু এই গ্রন্থের দরজা-জানালা অজস্র, যা দিয়ে আমরা হৃদয়ের নানা ঐশ্বর্য এবং বাইরের পৃথিবীর বহু ভাবধারা অবলোকন করতে পারি; সেজন্য আমরা তার মাত্র কয়েকটি নিচ্ছি আলোচনার সুবিধার্থে- এগুলো হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের দার্শনিকতা, প্রকৃতিমনস্কতা, আত্মরুচি ও আত্মবিশ্লেষণ এবং সাহিত্য প্রসঙ্গ।

সৃজনশীল ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ সব্যসাচী লেখক। কিন্তু সাংসারিক ক্ষেত্রে তিনি জমিদারপুত্র- কাজ জমিদারি দেখাশোনা করা। তার মানে তিনি একই সঙ্গে কবি ও জমিদার। নিশ্চয়ই তার মনে টানাপোড়েন ছিল। কেননা তিনি যে শ্রেণীর প্রতিনিধি এবং যে শ্রেণীর মানুষদের (শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ) কল্যাণ তিনি চাইতেন, সেই লক্ষ্যে কাজও করতেন বিরামহীন; তার মধ্যে ব্যবধান বিশাল। জমিদার বাড়িতে বড় হয়েও রবীন্দ্রনাথ পরাধীন ভারতবর্ষের কৃষক-শ্রমিক-কামার-কুমোরদের আর্থিক অবস্থার সদর্থক পরিবর্তন চেয়েছিলেন। তিনি এটা বুঝতে পেরেছিলেন যে, এইসব মানুষকে পশ্চাৎপদ অবস্থায় রেখে ভারতের স্বাধীনতার চিন্তা করা খুবই অবাস্তব। এটা high thinking সন্দেহ নেই। কিন্তু যাদের প্রসঙ্গে এরকম ভাবনা এবং যাদের সঙ্গে তার কাজ করতে হবে তারা হচ্ছেন নিম্নবর্গের মানুষ। সেজন্য দরকার সাদাসিধা জীবন অর্থাৎ Plain living নচেৎ জনতার সঙ্গে কম্যুনিস্টে করা অসুবিধাজনক। ছিন্নপত্রাবলী’র ২০৬ নং চিঠিতে তাই, লেখা Plain living, high thinking এর সপক্ষে কথা বলেছেন। কথাটা মূলত ওয়ার্ডসওয়ার্থের। ওয়ার্ডসওয়ার্থ গভীরতাসন্ধ জীবনের স্বার্থে সাধারণভাবে এই ধরনের লাইফস্টাইল বেছে নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথও নিঃসন্দেহে গভীরতা অন্বেষা লেখক। কিন্তু তার বেলায় কথাটিতে ভিন্ন মাত্রা যোজিত হয়েছে। কারণ ভারতবর্ষের হতদরিদ্র মানুষদের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে তাকে।

দার্শনিকতা রবীন্দ্রনাথের সারাজীবনের ভাবনার সঙ্গী। কবিতায় তো বটেই ছোট গল্পগুলোতে এবং সেইসব উপন্যাসে যেখানে ব্যক্তিক সম্পর্কের আড়ালে গজিয়ে উঠেছে বিষবৃক্ষ, আমরা স্বতঃস্ফূর্ত এক ভাবুকের দর্শনচিন্তাকে লতিয়ে উঠতে দেখেছি। ‘ছিন্নপত্রাবলী’র অসংখ্য চিঠিতেও একই জিনিস লক্ষ্য করা যায়। জগৎ-সংসারের বাস্তবতা, আদর্শ জগতের আকাঙক্ষা আর মৃত্যুচিন্তা কীভাবে লেখককে আলোড়িত করেছে দেখা যাক- ‘বস্তুজগৎটা হচ্ছে অটল reality তার মধ্যে আমাদের কল্পনা এবং আমাদের ধর্মবুদ্ধির পরিতৃপ্তি হয় না। তার পরিতৃপ্তিসাধন করতে হলেই একটা ideal জগতের সৃজন করতে হয়, সেই ideal জগৎ স্থাপন করবো কোথায়? মৃত্যু যেখানে এই বস্তুজগতের মধ্যে ফাঁক করে দিয়েছে। সেই মৃত্যুর পারেই আমাদের স্বর্গ, আমাদের দেবতাসম্মিলন, আমাদের সম্পূর্ণতা, আমাদের অমরতা। বস্তুজগৎ যদি অটল কঠিন প্রাচীরে আমাদের ঘিরে রেখে দিত এবং মৃত্যু যদি তার মধ্যে মধ্যে বাতায়ন খুলে না রেখে দিত, তাহলে আমরা যা আছে তারই দ্বারা সম্পূর্ণ বেষ্টিত হয়ে থাকতুম। এছাড়া আর যে কিছু হতে পারে তা আমরা কল্পনাও করতে পারতুম না। মৃত্যু আমাদের কাছে অনন্ত সম্ভাবনার দ্বার খুলে রেখে দিয়েছে। মৃত্যুর পরে কী হতে পারি তার আর সীমা নেই এবং মৃত্যু পুরাতনকে অপসারিত করে দেয় বলেই অনাগত অসীম নতুন আমাদের ideal আশাকে পোষণ করতে থাকে।’ (চিঠি ২২২। সাতারা, ২৪ জুলাই ১৮৯৫)

মামুলি সুখ ও মনের গভীরের পরিতৃপ্তি- এই দুয়ের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। মামুলি ধরনের সুখ এক জাতের সন্তুষ্টি এনে দেয় বটে, কিন্তু হৃদয়ের গভীরতর প্রশান্তি এনে দিতে পারে একমাত্র অন্তরাত্মার পরিতৃপ্তি। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ কেমন ভাবনা ব্যক্ত করেছেন তা ধরা আছে ২৪১ নং চিঠিতে। চিঠির দ্বিতীয়াংশে লেখক বলছেন, ‘এই সুস্নিগ্ধ অগাধ জনহীনতার মধ্যে প্রথম ঝাঁপ দিয়ে পড়বার সময় অনেকগুলি বন্ধনে টান পড়ে এবং কিছুক্ষণের জন্য বেদনা বোধ হয়- তার পরে অতল সান্ত¡নার মধ্যে যখন একটি অসীম স্নেহের আলিঙ্গন অনুভব করি, অত্যন্ত নিবিড় নিভৃত অন্তরতম আত্মীয়তার উদার বক্ষের মধ্যে নিজেকে ঘনিষ্ঠরূপে আবদ্ধ বোধ করি। তখন অন্তঃকরণের চিরসঞ্চিত উত্তাপ গভীর দীর্ঘনিশ্বাসের সঙ্গে মুক্তি লাভ করে; বুঝতে পারি ‘সুখ অতি সহজ সরল’, যথার্থ পরিতৃপ্তি নিজের অন্তরাত্মার মধ্যে এবং তার থেকে কোনো বিমুখ অদৃষ্ট আমাকে বঞ্চিত করতে পারে না।’(কলকাতা/২৩ নভেম্বর ১৮৯৫)

সাহাজাদপুরে লিখিত ২৪৫নং চিঠির শুরুই হয়েছে গভীর দার্শনিক অনুভবের প্রকাশের ভেতর দিয়ে। এই নিবন্ধের প্রথমদিকে বলেছিলাম, অল্পকিছু স্থির প্রত্যয়ের পাশাপাশি অনেক বিষয়ে সংশয়ের বোধ ‘ছিন্নপত্রাবলী’কে করে তুলেছে সজীব একটি বই। ইংরেজ সমালোচক এল,এ,জি স্ট্রং একটি প্রয়োজনীয় বইকে জীবন্ত মানুষের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তার ভাষায় সেই বই হচ্ছে like a living man” কেননা এ ধরনের বই জীবন্ত মানুষের আশা-ভরসা, চিন্তাধারা, অভিরুচি-অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলে দক্ষতার সঙ্গে। এভাবে দেখলে, ‘ছিন্নপত্রাবলী’ ও living man -এর সমতুল। জীবিত মানুষের মতই এর পাতায় পাতায় উত্থাপিত হয়েছে নানা প্রশ্ন, সংশয়, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের, আশা-নিরাশার সঙ্গে যুক্ত হাজারো প্রসঙ্গ। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে দুলতে, তাই, রবীন্দ্রনাথের কখনো মনো হয়েছে যে, বিশ্বসংসার অনিত্য। আবার কখনোবা মনে হয়েছে, না, ‘সংসারটা নিত্য।’ উপরন্তু তিনি প্রশ্ন তুলেছেন ‘বেদান্ত দর্শন তো মায়ের মন থেকে স্নেহকে উড়িয়ে দিতে পারে না। মৃত্যু যতই অপ্রতিহত ক্ষমতাবান হোক, ভালোবাসার বন্ধন তো কম প্রবল নয়। অনাদিকাল থেকে পদে পদে পরাজয়ের পরেও স্থিরনিশ্চয়ের সঙ্গে বিফল বাসনার এই অনন্ত বিরোধ লেশমাত্র শিথিল হয় না কেন?’

সবাই জানেন, রবীন্দ্রসাহিত্যের বিরাট জায়গা জুড়ে আছে প্রকৃতি ও প্রকৃতি ভাবনা। এই ভাবনা এমন এক কবির যিনি ভেতরে ভেতরে উঁচুমানের দার্শনিক। ফলে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিপাঠ পরিপূর্ণতা পেয়েছে তারই দার্শনিকসুলভ ভাবনার বলয়ে। ‘পোস্টমাস্টার’, ‘ছুটি’, ‘বলাই’-এর মতো অসাধারণ ছোটগল্পগুলো যে ধরনের জীবনদর্শনের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত তা স্ফূর্তি পেয়েছে ঐ নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশের আনুকূল্যেই। ‘ছিন্নপত্রাবলী’র চিঠির পর চিঠিতে, বিশেষ করে শিলাইদহ-সাজাদপুর-পতিসর-বোলপুর পর্বের চিঠিসমূহে, আমরা এক নিসর্গনিমগ্ন ভাববিহ্বল রবীন্দ্রনাথকে পাই। বোটযাত্রী এই রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিপ্রেমী, ভাবাতুর, সৃজনশীল।

তারই চোখ দিয়ে একটু দেখে নেয়া যাক তারই বর্ণিত জলস্থল ছবি- (ক) ঃ.‘তারপর বিকেলে পদ্মার ধারে আমাদের নারকোল-বনের মধ্যে সূর্যাস্ত হলো। আমি নদীর ধারে উঠে আস্তে আস্তে বেড়াচ্ছিলুম। আমার সামনের দিকে দূরে আমবাগানে সন্ধের ছায়া পড়ে আসছে এবং আমার ফেরবার মুখে নারকোল গাছগুলির পেছনে আকাশ সোনায় সোনালি হয়ে উঠেছে। পৃথিবী যে কী আশ্চর্য সুন্দরী এবং কী প্রশস্ত প্রাণ এবং গভীরভাবে পরিপূর্ণ তা এইখানে না এলে মনে পড়ে না। যখন সন্ধে বেলা বোটের উপর চুপ করে বসে থাকি, জল স্তব্ধ থাকে, তীর আবছায়া হয় আসে এবং আকাশের প্রান্তে সূর্যাস্তের দীপ্তি ক্রমে ক্রমে ম্লান হয়ে যায়, তখন আমার সর্বাঙ্গে এবং সমস্ত মনের ওপর নিস্তব্ধ নতনেত্র প্রকৃতির কী একটা বৃহৎ উদার বাক্যহীন স্পর্শ অনুভব করি!’ (শিলাইদহ/১ অক্টোবর, ১৮৯১/৩১নং চিঠি)

(খ) ‘এখানে যেমন আমার মনে লেখবার ভাব এবং লেখবার ইচ্ছা আসে এমন আর কোথাও না। বাইরের জগতের একটা জীবন্ত প্রভাব আমার সমস্ত মুক্ত দ্বার দিয়ে অবাধে প্রবেশ করতে থাকে- আলোতে আকাশে-বাতাসে শব্দে-গন্ধে সবুজ হিল্লোলে এবং আমার মনের নেশায় মিশিয়ে অনেকরকম গল্প তৈরি হয়ে উঠতে থাকে। বিশেষত এখানকার দুপুরবেলাকার মধ্যে বড় একটি নিবিড় মোহ আছে। রৌদ্রের উত্তাপ, নিস্তব্ধতা, নির্জনতা, পাখিদের বিশেষত কাকের ডাক এবং সুদীর্ঘ সুন্দর অবসর-সবশুদ্ধ জড়িয়ে আমাকে ভারী উদাস এবং আকুল করে। কেন জানিনে, মনে হয় এইরকম সোনালি-রৌদ্রে ভরা দুপুর বেলা দিয়ে আরব্য উপন্যাস তৈরি হয়েছে।’ (১৪৯নং চিঠি। ৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৪/সাজাদপুর)

(গ) ‘চারিদিকে কেবল মাঠ ধূ-ধূ করছে- মাঠের শস্য কেটে নিয়ে গেছে, কেবল কাটা ধানের অবশিষ্ট হলদে বিছিলিতে সমস্ত মাঠ আচ্ছন্ন। সমস্ত দিনের পর সূর্যাস্তের সময় এই মাঠে কাল একবার বেড়াতে বেরিয়েছিলুমঃ সূর্য ক্রমেই রক্তবর্ণ হয়ে একেবারে পৃথিবীর শেষ রেখার অন্তরালে অন্তর্হিত হয়ে গেল। চারিদিক কী যে সুন্দর হয়ে উঠলো সে আর কী বলব!’ (১০নং চিঠি, পতিসর কাছারি। ১৭ জানুয়ারি, ১৮৮৯)

রবীন্দ্রনাথ ভাবুকের চোখ দিয়ে যেমন তাকিয়েছেন বাইরে, নিসর্গের দিকে; তেমনি ভেতরেও অর্থাৎ নিজের ভেতরেও তাকিয়ে দেখেছেন বারবার। কখনো এই দুটি ব্যাপার একসূত্রে এসে মিলেছে, কখনো মেলেনি। কিন্তু মিলুক বা না মিলুক, লেখকের আত্মবিশ্লেষণ এবং দ্বন্দ্বময় মনের স্বরূপটি কিন্তু চমৎকারভাবেই ফুটে উঠেছে বিভিন্ন চিঠিপত্রে।

যেমন ২৩০ নং পত্রে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘আমার মন এক শ্রেণীর ঘোড়ার মতো যারা প্রথম গাড়িতে জোড়ামাত্র লাথি ছুঁড়ে পিছন হঠতে থাকে, কিন্তু একবার যদি মেরে-কেটে বাপু-বাছা বলে দুই পা এগিয়ে দেওয়া যায় তাহলে বাকি রাস্তাটা একেবারে চার পা তুলে ছুটতে থাকে।’

একই চিঠির শেষাংশে তিনি বলছেনঃ ‘এই কল্পনালোকের মধ্যে আমার বাস্তবলোক প্রকৃতভাবে মিশে আছে। লিখতে গিয়ে আপনার নিগূঢ় মানসরাজ্যের মধ্যে গভীরভাবে প্রবেশলাভ হতে থাকে এবং যেখানে গিয়ে দেখি, জীবনে আমার বাঞ্ছিত পুষ্প থেকে যতো মধু আহরণ করেছিলুম তার অধিকাংশই সেখানে সঞ্চিত হয়ে আছে। মনের সেই নিত্যরাজ্যের মধ্যে প্রবেশ করবার দ্বার সব সময়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। (শিলাইদহ/২১ সেপ্টেম্বর/১৮৯৫)

লেখার কাজটিকে রবীন্দ্রনাথ যে কতোখানি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন, জমিদারি দেখাশোনার পাশাপাশি নিজের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি তাকে কতটা মানসবৈভব এনে দিয়েছিল তা বোঝা যায় তারই স্বীকারোক্তি থেকে। এ রকম দুটি স্বীকারোক্তি হচ্ছে- ক. ‘লেখার চেয়ে প্রবলতর কর্তব্য আমার আর কিছুই নেই। আমার অন্তঃকরণের ভেতরে এই অনুশাসনটি গ্রহণ করে আমি সংসারক্ষেত্রে এসেছি’-

খ. সম্প্রতি জমিদারি কাজ দেখছি, ঃকোনোমতে ঘাড় ধরে নিজেকে একবার লেখার স্রোতের মাঝখানে টেনে এনে ফেলতে পারলে আমি আর জগৎ সংসারকে কেয়ার করিনে-তখন আমার জগৎ আমার নিজেরই জগৎ, সেখানে আমি একমাত্র রাজা, সেখানে আমি সমস্ত সুখ-দুঃখ সৌন্দযের বিধাতাপুরুষ।’

লেখা ও লেখা ভাবনার যে লিপ্ততা রবীন্দ্রনাথকে ব্যস্ত রাখতো সারাদিন। সেই বিষয়টিই আবার তার ভেতর অন্যরকম অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল। নিজের লেখাজোখার প্রতি তার যেমন প্রকৃত শিল্পীসুলভ সংশয় ছিল তেমনি খ্যাতির বিড়ম্বনা তাকে ‘সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে লোকের ভিড় ঠেলেঠুলে, নিজ বাসস্থানের ‘নিভৃত কোণে’ ঢুকতে প্রণোদিতও করেছিল। আপন সাহিত্যিক যোগ্যতা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ কী লিখেছেন দেখুন-‘প্রথমত লোকের খ্যাতি পেলেই নিজের যোগ্যতা সম্বন্ধে একটা অবিশ্বাস জন্মে, তারপরে সেই অনেকখানি মিথ্যা জিনিস ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছি বলে ভারী একটা অসন্তোষের উদয় হয়- অথচ আমি যে বাংলার পাঠক সাধারণের অনাদরের যোগ্য তাও আমার আন্তরিক বিশ্বাস নয়, এই এক আশ্চর্য ব্যাপার।’ (২২৩ নং চিঠি। কলকাতা। ৩ আগস্ট/১৮৯৫)

এবার পাঠক রবীন্দ্রনাথের একটু পরিচয় দেয়া যাক। জুন ১৮৮৯-এ কলকাতা থেকে লেখা চিঠিতে (৪নং পত্র) দেখতে পাচ্ছি ’ Anna karenina’ ’র উল্লেখ। লেখক বলেছেন, ‘Anna karenina’ পড়তে গেলুম, এমনি বিশ্রী লাগল যে, পড়তে পারলুম না- এরকম সব Sickly বই পড়ে কী সুখ বুঝতে পারি নে।’ লিও টলস্তয়ের এই বইটিকে রবীন্দ্রনাথ ’ Sickly ’ বলেছেন! এটা তো পারিবারিক সংকট, আরো নির্দিষ্ট করে বললে ব্যক্তিগত সংকট-প্রেম, অবহেলা, ভুল বোঝাবুঝি এইসব নিয়ে রচিত এক অনবদ্য উপন্যাস। আসলে রবীন্দ্রনাথের জীবনে যদিও খুব তিক্ত অভিজ্ঞতা এসেছে বেশ কয়েকবার, তা সত্ত্বেও তিনি মূলত প্রশান্তি ও সমাহিতির জগতের মানুষ। সেজন্য যে ধরনের মানসিক টানাপোড়েন মানুষকে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয় সেই সব থিম নিয়ে রচিত সাহিত্য তার পছন্দ নাও হতে পারে। তিনি বরঞ্চ আত্মীয়তা অনুভব করেছেন কীটস বা শেলির মতো লেখকদের সঙ্গে- ২৫১ নং চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘আজকাল আমি আমার লেখা এবং আলস্যের মাঝে মাঝে কবি কীটসের একটি ক্ষুদ্র জীবনচরিত অল্প অল্প পাঠ করি।ঃ.আমি যত ইংরাজ কবি জানি সবচেয়ে কীটসের সঙ্গে আমার আত্মীয়তা আমি বেশি করে অনুভব করি। তার চেয়ে অনেক বড় কবি থাকতে পারে, অমন মনের মতো কবি আর নেই।’ একই চিঠির অন্যত্র তিনি ‘ টেনিসন সুইনর্বন প্রভৃতি’ কবি সম্বন্ধে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। বলেছেন যে তাদের ‘অধিকাংশ কবিতার মধ্যে একটা পাথরে খোদা ভাব আছে- তারা কবিত্ব করে লেখে এবং সে লেখার প্রচুর সৌন্দর্য আছে কিন্তু কবির অন্তর্যামী সে লেখার মধ্যে নিজের স্বাক্ষর করা সত্যপাঠ লিখে দেয় না।’ (শিলাইদহ, ১৪ ডিসেম্বর, ১৮৯৫)

শেলির সম্বন্ধেও রবীন্দ্রনাথ কুক্তাহীন প্রশংসা ব্যক্ত করেছেন। এই কবির সৃষ্টিশীল স্বভাবের নিজস্ব সৌন্দর্যের কথা বলেছেন, বলেছেন তার চরিত্রর দৃঢ়তার কথা – ‘ওর চরিত্রে কোনোরকম দ্বিধা ছিল না, ও কাউকে আপনাকে কিংবা আর কাউকে বিশ্লেষণ করে দেখেনি- ওর এক রকম অখণ্ড প্রকৃতি।’

রাজশাহীর বোয়ালিয়া অঞ্চল থেকে লিখিত এক চিঠি (১৫৪নং পত্র, ২২ সেপ্টেম্বর/১৮৯৪) শেষ হয়েছে এভাবে ‘আকাশও দুই হাত বাড়িয়ে ডাকে এবং গৃহও দুই হাত ধরে টেনে নিয়ে আসে। উভচর জীব হয়ে আমি ভারী মুশকিলে পড়েছি। সকল বিষয়েই আমি উভচর-মানসজগৎ এবং বস্তুজগৎ দুইয়ের মধ্যেই আমার সমান বন্ধন।’

এই বন্ধনকে কাটিয়ে ওঠার অভিপ্রায়েই যেন তার শিল্পকলায় আত্মনিবেদন। কিন্তু শিল্প-সাহিত্যও যেন এক প্রপঞ্চ। নাহলে রবীন্দ্রনাথ বলবেন কেন ‘আবশ্যকের শত লক্ষ্য দাসত্ববন্ধন থেকে আমাদের মুক্তি দেবার জন্য কবিতা মিথ্যে ভান করছে?’ আরেকটি চিঠিতে (২২২ নং পত্র, ২০ জুলাই/ কলকাতা/ ১৮৯৫) তিনি real ও ideal জগতের ভেতরের সম্পর্কের কথা বলার পর উৎকৃষ্ট কবিতার সারাৎসার সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন ‘ভালো কবিতার প্রধান কবিত্ব হচ্ছে তার Suggestiveness। জগৎ রচনার মধ্যে সেই Suggestiveness মৃত্যুর মধ্যে- সেইখানেই আমরা অনুভব করে থাকি যে, আরো ঢের আছে এবং আরো ঢের হতে পারে।’

এরকম কথার অর্থ এই যে, কবিতা বা অন্য কোনো শিল্পকলার বৈশিষ্ট্য নিরূপণ কিংবা মূল্যবিচার করতে বসেও রবীন্দ্রনাথ স্বভাবসুলভ দক্ষতায় তার দার্শনিকসুলভ ভাবনার সঙ্গে সেগুলোকে মিলিয়ে দেখতে পছন্দ করেন।

এখন আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, গৃহী রবীন্দ্রনাথ ও বাউলস্বভাবী রবীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত একটা জায়গায় এসে মিলিত হয়েছেন। সেই মিলনসূত্রটা হচ্ছে বিশ্বজগৎ ও মানব প্রকৃতিকে একান্ত নিজের মতো করে বুঝতে চাওয়া। বিচিত্র সব অনুভব ও জীবনাভিজ্ঞতা অর্জনের গরজেই তো তিনি একদিন বেরিয়ে পড়েছিলেন জলে-স্থলে। রুঢ় সত্যকে রবীন্দ্রনাথ ভালোবেসেছিলেন। তারচেয়েও বেশি ভালোবেসেছেন সৌন্দর্য এবং জ্ঞান যদি সত্যদ্রষ্টা হয় তাহলে সেই জ্ঞানের সাধনার আনন্দও অপরিসীম। সত্য, সৌন্দর্য আর জ্ঞান- এই তিনটি জিনিসই আমরা খুব আন্তরিকভাবে, খুব ঘনিষ্টভাবে পাই ছিন্নপত্রাবলী’তে। এ এমনই এক বই যার পাঠ কখনো ফুরোবে না, নিঃশেষিতও হবে না তার অভাবনীয় পাঠাভিজ্ঞতা।

[ad#co-1]