সাপ

তখন আমরা থাকতাম বিক্রমপুরে। নিচু এলাকা। সামান্য বর্ষাতেই পথঘাট সব ডুবে যায়। তখন চলাচলের একমাত্র বাহন হয় নৌকা। এমনি এক বর্ষার রাতে সবাই যখন ঘুমে, হঠাৎ আমার বাথরুমে চাপল। কৃষ্ণপক্ষের বর্ষণহীন রাত। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। গরমও পড়েছে বেশ। বিদ্যুৎ তো থেকেও নেই। হারিকেন হাতে বের হলাম। ফেরার পথে হঠাৎ কী একটা রাবারের মতো নরম জিনিসে আমার পা পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে তীব্র ব্যথায় আমার শরীর কেঁপে উঠল। নরম জিনিসটা আমার পায়ে ছোবল দিয়েছে। হারিকেনের আবছা আলোয় দেখলাম, লম্বামতো জিনিসটা সড়সড় করে চলে যাচ্ছে। হতভম্ব হয়ে আমি কয়েক সেকেন্ড ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। বুঝতে পারছিলাম না কী করব। দুই হাতে পা চেপে ধরে আমি চিৎকার করে আব্বাকে ডাকতে লাগলাম। কয়েকবার ডাকার পর আব্বা-আম্মা দুজনেই বেরিয়ে এলেন। আমি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললাম, ‘আব্বা, আমারে সাপে কামড় দিছে।’ আম্মা কাঁদতে শুরু করলেন। আব্বা আমাকে অনেকটা কোলে তোলার মতো করে এনে খাটে শুইয়ে দিলেন। আম্মা তাড়াতাড়ি একটা কাপড় ছিঁড়ে আমার পা বেঁধে দিলেন। আশপাশের বাড়ি থেকে কয়েকজনকে ডেকে তুলে আব্বা তড়িঘড়ি করে আমাকে নিয়ে বাজারের দিকে রওনা দিলেন।

কোত্থেকে যেন একটা হ্যাজাকও জোগাড় করা হলো। যখন আমাকে নৌকায় ওঠানো হচ্ছিল, তখন আম্মা কাঁদছিলেন। দুজন নৌকা বাইছে। আব্বা আমার মাথার কাছে বসা। আমার সারা শরীর ঝিমঝিম করছিল। মনে হচ্ছিল আমি মরে যাব। ভয়ে আমি শুধু কলেমা পড়ছিলাম। বাজারে দু-একজন চিকিৎসক ফার্মেসিতেই রাত যাপন করেন। বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব বলে কিছু ভ্যাকসিনও রাখেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, একজন চিকিৎসককেও আমরা পেলাম না। রাত বাজে তিনটা। আমাদের সবচেয়ে কাছের হাসপাতালটিও বহুদুরে। অধিকাংশ রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। এ অন্ধকার রাতে নৌকায় এতটুকু পথ পাড়ি দেওয়া প্রায় অসম্ভব। নিরুপায় হয়ে আমরা শরণাপন্ন হলাম বাজারের পাশে দফাদারপাড়ার খালেক ওঝার। যদি কিছু হয়। ওঝা আব্বার পূর্ব পরিচিত ছিলেন। ডাক শুনে তাই ধড়মড় করে উঠে বসলেন।

আমাদের দেখে ওঝা তাড়াতাড়ি একটা পাটি বিছিয়ে আমাকে শুইয়ে দিলেন। একটু পর ওঝা তাঁর পুরোনো বাক্স থেকে কী একটা বের করলেন। কয়েনের মতো গোল, আরও বড়। বিড়বিড় করে অস্পষ্ট কিছু পড়ে সেটা আমার পায়ের দিকে গড়িয়ে দিলেন। একবার, দুইবার, তিনবার, কিন্তু একবারও সেটা আমার পায়ের কাছে পৌঁছাল না। এবার ওঝার মুখে হাসি ফুটল। আমার দিকে তাকিয়ে পানখাওয়া দাঁত দেখিয়ে হেসে বললেন, ‘বাজান, ডরাইছিলেন! ডরের কিছু নাই। আপনেরে কাল সাপে কামুড় দেয় নাই, ঢোঁড়াসাপে কামুড় দিছিল।’ আব্বাকে বললেন, ‘বাজান রে বাইত্তে লইয়া যান! আর ডর নাই।’
ওঝারা সত্যিই কিছু জানে কি না জানি না, তবে সেদিন খালেক ওঝা সত্যি বলেছিলেন। যার প্রমাণ আমি এখনো বেঁচে আছি।
মুহাম্মদ তাওহীদুল আলম
মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

[ad#co-1]