বুদ্ধদেব বসুর গল্প একটি জীবন

bs-101x150মাহমুদুল বাসার
খবর পেল গুরুদাস, তার ‘বৃহৎবঙ্গীয় শব্দকোষ’ ৫২ খ-ে ছাপা হয়েছে। তার কদর বেড়েছে। বিক্রি হচ্ছে। শুরু করে ছিলেন যৌবনে, এখন মুমূর্ষু বৃদ্ধ, বিছানায় শয্যাশায়ী, মরণাপন্ন। স্বজন হারিয়েছেন, ভিটাবাড়ি হারিয়েছেন, বয়স হারিয়েছেন, স্বপ্নের শব্দকোষ অশ্বত্থবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে গেছে। স্বাধীন ভারতের এক মন্ত্রী গুরুদাসের শব্দকোষের জন্য পুরস্কার নিয়ে এলেন তার পর্ণ কুটিরে। গুরুদাস বিদ্রƒপের হাসি হেসে তা গ্রহণ করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে শুয়ে থাকলেন। মৃত্যুর পর সেই পুরস্কারের টাকা দিয়ে তার শ্রাদ্ধ করা হয়। অসামান্য গল্প। এমন গল্প বাংলা ভাষায় দ্বিতীয়টি নেই।

বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবিদের একজন এবং আধুনিক কবিতার ঈর্ষণীয় সফল আলোচক বলেই ছোটগল্পের স্রষ্টা বুদ্ধদেব বসুর সাফল্যকে আমরা উপলব্ধি করতে চাই না। ‘বুদ্ধদেব বসুর শ্রেষ্ঠ গল্প’ বইটি পড়ে আমি নতুন করে বুদ্ধদেব বসুকে বুঝতে পারলাম, সবচেয়ে সার্থক তিনি ছোটগল্পে। এই মূল্যবান গল্প সঙ্কলনটি থেকে আমি সবচেয়ে অসাধারণ গল্পটি নিয়েছি। নাম ‘একটি জীবন’।
বুদ্ধদেব বসুও যে বাঙালি এমনকি বাঙাল, মধ্যবিত্ত বাঙালি তিনি, তার বাড়ি পূর্ব বাংলায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র ছিলেন। কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ঢাকার কাদামাটিতে বড় হয়ে উঠেছেন, তিনিও যে রবীন্দ্র-নজরুল-শরৎচন্দ্রের বাঙালি আবেগের সংক্রমে আক্রান্ত; তা টের পেলাম ‘বুদ্ধদেব বসুর শ্রেষ্ঠ গল্প’ সঙ্কলনের গল্পগুলো পড়ে।
এতো বড় বিদ্বান হয়েও, বৈশ্বিক হয়েও, বিশ্বসাহিত্যে অত্যুচ্চ জ্ঞান সঞ্চয় করেও আবহমান বাঙালিয়ানার নিজস্ব আবেগ উপেক্ষা করতে পারেননি। হয়তো গল্প বিন্যাসে, প্লট নির্মাণে, বাক্য ও শব্দ চয়নে, দৃষ্টি প্রক্ষেপে রবীন্দ্র-শরতের ভূমি ছেড়ে অনেক আধুনিক সীমায় চলে এসেছেন; কিন্তু বাঙালির মধ্যবিত্ত সুলভ শ্রাবণী মেঘের আবেগ পরিহার করতে পারেননি, প্রতিটি গল্পে তার জীবন্ত প্রমাণ আছে।
‘একটি জীবন’ গল্প, লেখা হয়েছে ১৯৫৭ সালে। ‘একটি জীবন ও কয়েকটি মৃত্যু’ গল্পগ্রন্থে এটি স্থান পেয়েছিল। এ গল্পের পরিবেশ গড়ে উঠেছে খুলনা জেলায়। এ গল্পের মুখ্য চরিত্র গুরুদাস। সংস্কৃত প-িত। খুলনার জগত্তারিণী স্কুলের বাংলা শিক্ষক।
একদিন গুরুদাস নবম শ্রেণীর বাংলা ক্লাস নিতে গিয়ে একটি বাংলা বাক্যের মুখোমুখি হলেন: ‘আমার প্রজাগণ আমার চেয়ে তাহারে বড়ো করি মানেÑ’।
কথাটা হেড প-িত গুরুদাসের কানে খটকা লাগলো। ‘চেয়ে’ শব্দটি তার কানের পর্দায় আছাড় খেতে লাগলো। কী অর্থ ব্যজ্জিত্যুত হচ্ছে শব্দটি দিয়ে? গভীরভাবে ভাবতে লাগলো গুরুদাস।
শব্দটি একদিকে অনুসর্গ, তৃতীয়া বিভক্তি, আবার এর নানা প্রকার অর্থও হতে পারে। প-িত মনে করলেন, হয়তো অর্থ হতে পারে দৃষ্টিপাত করাÑ না হয় আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করা। একজন ছাত্র সাহস করে বললো, স্যার, বাক্যে ভুল নেই। ইংরেজি ঃযধহ শব্দ দিয়ে যা বোঝানো হয়, ‘চেয়ে’ও তাই। আর একজন ছাত্র রবীন্দ্রনাথের কবিতার বিখ্যাত একটি চরণ আবৃত্তি করলো, ‘ইহার চেয়ে হতেম যদি আবার বেদুঈন’।
হেড প-িত গুরুদাসের মনটা বড়ই দমে গেল। মনের কোণে অনুশোচনার কাঁটা ফুটলোÑ ছেলেরা অর্থটা ধরতে পারলো আর তিনি পারলেন না! তার মনে পড়লো, সে-তো সংস্কৃত প-িত, বাংলা ভাষার প্রাজ্ঞ কেউ নন। তিনি গেলেন স্কুলের গ্রন্থাগারে। কয়েকটি অভিধান ঘাঁটলেন। কিন্তু ‘চেয়ে’ শব্দটি কোনো অর্থ, বুৎপত্তি, গঠন প্রকৃতি কিছুই পেলেন না। তিনি বুঝতে পারলেন, খাঁটি বাংলা অভিধান নেই, রচিতই হয়নি। তিনি গভীর মর্মবেদনার সঙ্গে অনুধাবন করলেন, জাতে বাঙালি হয়েও বাংলা ভাষার কিছুই জানেন না। তিনি উপলব্ধি করলেন,
“বাংলা ভাষা সংস্কৃত ভাষা না, এমনকি সংস্কৃতের একটা অপভ্রংশও তাকে বলা যায় নাÑ সে একটা আস্ত, সজীব, পরিবর্তনশীল, বিবর্ধমান, স্বাধীন ভাষা, সাত কোটি মানুষের কথ্য ভাষা, মাতৃভাষা। জীবিত ভাষা-মাতৃভাষাÑ মনে মনে কয়েকবার উচ্চারণ করলেন কথাটা। কিন্তু মাতৃভাষা হ’লেই দক্ষতা জন্মায় না; তার জন্য প্রযতœ চাই।”
প-িত গুরুদাস মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেনÑ দৃঢ় প্রতিজ্ঞাÑ তিনি একটি খাঁটি বাংলা অভিধান লিখবেন। নেমে পড়লেন তিনি এই কাজে।
গুরুদাস পৈতৃক সূত্রে কিন্তু একেবারে কম জমিজমা ভাগে পাননি। ২৫ বিঘা সম্পত্তি পেয়েছেন। তার দেশ নন্দীগ্রামে। সংসারে একটি ছেলে, নাম নবেন্দু। একটি মেয়ে, নাম শিবানী। বড় মেয়ে ভবানীর বিয়ে হয়ে গেছে মাদারীপুর। স্ত্রী হরিমোহিনী, স্বামী পরায়ণা, সরলা। স্কুলে দিনের সবটুকু শেষ করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলেন গুরুদাস। স্ত্রীকে বললেন, তিনি একটি বাংলা অভিধান লিখবেন। তার জন্য জমিজমাও বিক্রি করা লাগতে পারে। স্ত্রী বললেন, মেয়ে বিয়ের যোগ্য। তার জন্য চিন্তা না করে বই লেখার চিন্তা করছো? গুরুদাস স্ত্রীকে বোঝালেন,
‘শব্দকোষ। বাংলা ভাষার সমুদয় শব্দ, শব্দার্থ, শব্দের ব্যবহার ইত্যাদি। এ রকম গ্রন্থ একখানাও নেই, জানো তো?’
হরিমোহিনীর সরল অকপট মনে দাগ কাটলো, হয়তো দেবদেবীর নামও তাতে থাকবে। তিনি রাজি হলেন, স্বামীকে আরো উৎসাহ দিলেন।
গুরুদাস, জগত্তারিণী স্কুলের লাইব্রেরি, কলেজের লাইব্রেরি সমুদয় ঘাঁটলেন। মনমতো অভিধান পেলেন না। পেলেন শহরের ইম্পিরিয়াল বইয়ের দোকানে। দুটি অভিধান কিনলেন। একটি বাংলা, অন্যটি অক্সফোর্ড ডিকশনারি। এর আগে আশপাশের গ্রন্থাগারগুলো তন্নতন্ন করেও খুঁজে পেলেন না খাঁটি বাংলা অভিধান। ভাবছেন এভাবে তিনি,
‘নাÑ পেলেন না, যা খুঁজছেন তা পাওয়া গেল না কোথাও। সম্পূর্ণ একটা বাংলা অভিধান কি হয় নাÑ যাতে সংস্কৃত আর দেশজ শব্দ সবই স্থান পেয়েছে, দেখানো হয়েছে সব শব্দবন্ধ, বিভিন্ন ব্যবহার, লৌকিক প্রয়োগ, যা থেকে বাংলা ভাষা শেখা যাবে? বোঝা যাবে তার প্রকৃতি, বোঝা যাবে তার সৃষ্টিশীল প্রতিভা?’
না, গুরুদাস এমন একটি বাংলা অভিধান খুঁজে পেলেন না। এই অভাব মোচন করার দূরাকাক্সক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন, রচনা করবেন তিনি ‘বৃহৎবঙ্গীয় শব্দকোষ’।
ভেতর থেকে যেন মহাকবি বাল্মিকীর মতো হিমাদ্রি শিখরতুল্য আবেগ অনুভব করছেন অভিধান রচনার উপাদান সংগ্রহের কাজে। মনে মনে স্থির করলেন, তার অভিধানের ধরন হবে এমন,
“কোনটা বিশ্বকোষের বিষয় আর কোনটা অভিধানের, তা স্থির করা চাই। সংস্কৃত শব্দের মধ্যে বাংলা ক’াল গ্রাহ্য কোনগুলো? ব্রজবুলির কী হবে? ‘বাংলা ভাষা’ এ ধারণার লক্ষণ কী কী? যেসব শব্দ প্রচলিত নেই, অথচ প্রয়োজন হতে পারে, তাও রচনা করে দিতে হবে কি না। অনেক ভাববার আছে।”
ছোটবেলায় পুরি দেখতে গিয়ে সমুদ্র দর্শন করেছিলেন। কল্পনায় সেই সমুদ্রের ঢেউ যেন হৃদয়ে উছলে উঠলো। তিনি বঙ্গীয় শব্দকোষ রচনা করবেনÑ যা এখনো বাংলা ভাষায় লেখা হয়নি, বেদনার সঙ্গে ভাবলেন, একখানা বাংলা শব্দকোষও আজ অবধি কেউ রচনা করেননি।
পূজার ছুটিতে গেলেন নন্দীগ্রামে। বিক্রি করলেন দু’বিঘা ফসলের জমি। পেলেন দেড়শ’ টাকা। তাই নিয়ে ছুটলেন মহানগর কলকাতায়। একটা চেনা মেসে উঠলেন। থাকলেন তিনদিন। বইয়ের দোকান ঘেঁটে কিনলেন ড. সুনীতি কুমারের বই, রবীন্দ্রনাথের শব্দতত্ত্ব, সংস্কৃত-বাংলা অভিধান, সাহেবদের লেখা বাংলা ব্যাকরণ, কালীপ্রসন্ন সিংহের হুতোম প্যাঁচার নক্সা ও মহাভারত এবং নানা ধরনের বাংলা বই। এতে তার খরচ হয়ে গেল ৫০ টাকা। ফিরে এলেন বাড়ি। স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণে যতো বাংলা বর্ণমালা আছে, ততোটা বর্ণের ওপর শব্দকোষ লিখবেন মনস্থ করলেন। প্রতিদিন লেখেন, প্রতিদিন পড়েন, ঘাঁটেন। বিরাম নেই, বাহ্যজ্ঞান নেই। ইংরেজি তেমন জানেন না, প্রয়োজনের তাগিদে কাজ চালানোর মতো তাও শিখলেন।
স্কুল করেন, টিউশনি করেন, বাজার করেন আবার পড়েন এবং লেখেন। ছাত্রছাত্রীদের খাতাও দেখেন। ভরসা তার বড় বড় ছুটির দিন।
আবার এলেন কলকাতায়। আরো বই কিনতে হবে। ঢুকলেন ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরিতে। তার চোখ বড় হয়ে গেল। তুলনামূলক শব্দতত্ত্বের পথ চিনে নিতে হিমশিম খেলেন। তার চেয়েও বড় প-িতরা অভিধান লিখেছেন, যেখানে জার্মান, লাতিন, গথিক ভাষার ছড়াছড়ি। পারসিক ভাষার উল্লেখও আছে। দমলেন না গুরুদাস। খাতা ভরে নোট নিলেন। অভিধানের ভেতর দিয়ে যেন বৃহৎ বিশ্বের সঙ্গে পরম আত্মীয়তা বোধ করলেন। ঘাঁটলেন ইংরেজি সংস্কৃত অভিধান, স্কিটের বৃহৎ বুৎপত্তিমূলক শব্দকোষ।
ছুটিতে আবার এলেন কলকাতায়। বই ঘাঁটবেন এবং কিনবেন। দুরন্ত নেশায় পেয়েছে গুরুদাসকে। ঢুকলেন সেই ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরিতেই। শুধু যে রেফারেন্স ঘাঁটলেন তা নয়, অপেক্ষা করলেন বিদ্বানদের সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য। কেউই ফুরসত পেলেন না, সবাই কড়ি কামাতে ব্যস্ত।
একদিন কলেজ স্কয়ারের বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একটি তরতাজা যুবকের কথা শুনে স্তম্ভিত হলেন। যুবকটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস খুঁজছিলেন। ক্রোধান্বিত স্বরে বললেন,
“মরা! সব মরা! বাসি হয়ে পচে গ’লে পোকায় কিলবিল করছে। আর তাই খুঁটে-খুঁটে খাচ্ছে প্রোফেসরের পাল। জ্যান্ত সাহিত্য দেখলে আঁৎকে ফিট হয়ে পড়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ বৃথাই জন্মালেন।”
যুবকের নাম সুব্রত সেন। প্রাণবন্ত লেখক। গুরুদাসের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠলো। তার অভিধানও যেন মরা, পচা, বাসি, যান্ত্রিক না হয়। কেমন হবে? হবে,
“ছাত্রদের ‘মানে বই’ নয়, তালিকা নয়, ভা-ার নয়, অচল অনড় দুর্বহ কোনো পদার্থ নয় অভিধান। তারও আসল কথাটা স্রোত, গতি, ভবিষ্যতের জন্য নির্দেশ, ভাষায় যে সৃষ্টিকর্ম লেখকেরা অনবরত ক’রে যাচ্ছেন, তা-ই থেকে আহরণ ক’রে তাকেই আবার এগিয়ে দিতে হবে। তারা থাকবে আভাসে, ইঙ্গিতে, পরামর্শে, এমনকি কল্পনায় ঝরনা চলতে চলতে আলো লেগে ঝলকে উঠে। সাহিত্য পড়া চাই, জীবিত সাহিত্য, বর্তমান, পরিবর্তমান সাহিত্যÑ বাংলা ভাষায় যা কিছু লেখা হচ্ছে, পড়া হচ্ছে, বলা হচ্ছে, শোনা হচ্ছে, সবই তার উপাদান।”
গুরুদাসের ভেতরটা হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে ভরে উঠলো। অভিধানকে করতে হবে জীবন্ত। লোকজভিত্তিক, যাতে বাঙালি জাতির বিকাশের দিকনির্দেশনা থাকে। তিনি সব শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মিশতে লাগলেন, এমনকি তিনি মুসলমান চাষীদের সঙ্গেও কথা বলতে শুরু করলেন। এরই মধ্যে গুরুদাসের সংসারে বড় বিপত্তি ঘটে গেল। তার মেয়ে শিবানীর বিয়ে ঠিক হওয়ার পরও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে করুণ মৃত্যুর শিকার হলো। সংসারে শোকের ছায়া নেমে এলো।
অভিধান লেখার কাজেও যেন ভাটা লাগলো। যা ছিল প্রেরণার শিখা, শিবানীর মৃত্যুর পর তা হলো দুর্বহ দায়িত্ব। তবুও লেখা এগিয়ে চললো। এর মধ্যে গুরুদাসের সুখবর হলো তার স্কুলের বেতন বাড়লো। পাশাপাশি দুঃসংবাদ হলো, বড় মেয়ে ভবানী বিধবা হয়ে তিনটি ছেলেমেয়ে নিয়ে আবার সংসারে বিষণœ চেহারায় ফিরে এলো।
এ পর্যন্ত গুরুদাস যতোটা অভিধান রচনা করেছেন, তা নিয়ে গেলেন কলকাতায়। ছাপাতে হবে। গেলেন ভারত প্রেসে। মালিক বিপিনবাবু বললেন, কেমন হয়েছে তার সুপারিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছ থেকে আনতে হবে। পাঁচদিন অপেক্ষা করে গুরুদাস সেই সুপারিশ আনলেন। কঠিন ধৈর্য। অটল প্রতিজ্ঞা। অভিধান ছাপানোর শর্তও জটিল, “ছোট ছোট খ-ে পাঁচশো ক’রে কপি ছাপা হবে, এক টাকা ক’রে দাম। বাঁধাই হবে না। খরচ উঠে গিয়ে যা থাকবে তার অর্ধেক গ্রন্থাকারের, কিন্তু এক বছরের মধ্যে খরচ না উঠলে গ্রন্থাকার প্রকাশককে খেসারৎ দেবেন।”
এই শর্তেই বিপিনবাবুর কাছে পা-ুলিপি রেখে দিলেন। লেখা হয়েছে স্বরবর্ণ পর্যন্ত। কিন্তু বিপিন বাবু বললেন, সামনের খ-গুলো ছাপতে হলে অর্ধেক খরচ দিতে হবে। তাতেই রাজি হলেন গুরুদাস। ২৫ বিঘে সম্পত্তির সমুদয় বিক্রি করলেন, শেষ পর্যন্ত ভদ্রাসনটুকুও। তবুও থামলেন। ছেলে নবেন্দু রেলওয়েতে চাকরি পেয়েছিল, তাতে রক্ষা। বিধবা মেয়ের তিনটি ছেলেমেয়ে। বর্ষায় বাড়ি ধসে পড়লো, সাপ-ব্যাঙ-কেঁচোতে ভরে গেল। ছেলেটির বিয়ে দিলেন বড়ই শখ করে। কপালের দোষ, বিয়ের পর নতুন বউ মারা গেল, ছেলেটি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যায়।
এরই মধ্যে এলো ভারত বিভাগের দুঃসময়। অন্যান্য শরণার্থীর মতো গুরুদাসও স্ত্রী, বিধবা মেয়ে, তিন নাতি-নাতনি নিয়ে অতিকষ্টে, চূড়ান্ত ভোগান্তির ভেতর দিয়ে খুলনা ছেড়ে এলেন কলকাতায়। শরণার্থী ক্যাম্প থেকে একটা জীর্ণদশার ভগ্নবাড়িতে উঠলেন। বুড়ো হয়েছে হরিমোহিনী, চুল পেকেছে, দাঁত পড়েছে, শোকে শোকে বুক চুরমার হয়ে গেছে। এক সময় সে কু-ুলি পাকিয়ে মৃত্যুর দুয়ারে হাজিরা দিয়েছে।
খবর পেল গুরুদাস, তার ‘বৃহৎবঙ্গীয় শব্দকোষ’ ৫২ খ-ে ছাপা হয়েছে। তার কদর বেড়েছে। বিক্রি হচ্ছে। শুরু করে ছিলেন যৌবনে, এখন মুমূর্ষু বৃদ্ধ, বিছানায় শয্যাশায়ী, মরণাপন্ন। স্বজন হারিয়েছেন, ভিটাবাড়ি হারিয়েছেন, বয়স হারিয়েছেন, স্বপ্নের শব্দকোষ অশ্বত্থবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে গেছে। স্বাধীন ভারতের এক মন্ত্রী গুরুদাসের শব্দকোষের জন্য পুরস্কার নিয়ে এলেন তার পর্ণ কুটিরে। গুরুদাস বিদ্রƒপের হাসি হেসে তা গ্রহণ করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে শুয়ে থাকলেন। মৃত্যুর পর সেই পুরস্কারের টাকা দিয়ে তার শ্রাদ্ধ করা হয়।
অসামান্য গল্প। এমন গল্প বাংলা ভাষায় দ্বিতীয়টি নেই।
বুদ্ধদেব বসুর অনেক গল্প-উপন্যাসে সাহিত্যিক-লেখক-কবি চরিত্র আছে। এ গল্পে বুদ্ধদেব বসু নিজেকেই কৌশলে উপস্থাপন করেছেন, কতোটা ত্যাগ স্বীকার করেছেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য দেখিয়েছেন, জীবন্ত-প্রাণবন্ত বাংলা ভাষার স্বরূপ কেমন তার বৈশিষ্ট্য।
গল্পের এক পর্যায়ে সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের কুফলের মর্মান্তিক চিত্র অঙ্কন করেছেন, এতে গল্পটি অধিকতর সমৃদ্ধ হয়েছে।

http://www.munshigonj.com/Special/Basu100/BasarBasu.html

[ad#co-1]