প্রমত্তা পদ্মার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে শ্রীনগরের ভাগ্যকুল ও বাঘরা

ভাঙা ঘরগুলোর পাশে বসে আছেন সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ ঈমান আলী শেখ ও তার ভাবী আমেনা খাতুন। বৃদ্ধ ঈমান আলী শেখ বলেন, ‘৩৫ বছরের বসতি। গাঙ যে ভাঙবো কেউই জানত না। আট-দশটা ঘরের ভিটাও গেছেগা। একটা ভিটায় কোনরকমে থাকতাছি। এখন ভাঙা ঘরগুলো উঠানোর এক ছটাকও জায়গা নাই।’ আমেনা খাতুন বলেন, ‘গোয়ালঘরের ছাপড়াডাও গেছেগা গাঙে। সংসার চলে গাভীর টাকায়। এখন গাভী রাখারও জায়গা নাই। রাস্তার ওই পাশে কোনরকমে বাইন্দা রাখছি।’

একটু দূরেই পদ্মার ভাঙনের শিকার ভ্যানচালক মোসলেম হাওলাদারের (৭০) বসতভিটা। একটি মাত্র বসতঘরের ৩ ফুট সামনে প্রমত্তা পদ্মার বিরামহীন গর্জন। তীর ঘেঁষে খোলা আকাশের নিচেই তার স্ত্রী সখিনা বেগম (৫৫) রান্না করছেন। সাড়ে ৩ শতাংশের বসতভিটার বেশিরভাগই পদ্মা কেড়ে নিয়েছে। বাকি আধা শতাংশ পরিবারটির শেষ ঠিকানা। একই অবস্থার শিকার পাশের বাড়ির বৃদ্ধ সখিনা জানান, ‘একদিনের মধ্যে ঘরবাড়ি পদ্মায় কাইড়া নিছে। এখন অন্যের বাইত্তে কোনরকমে আছি। সেই বাড়িডাও এখন পদ্মার মুখে, এরপর আমরা কই যামু।’

বুধবার সরেজমিন মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ভাঙনকবলিত ভাগ্যকুল ও বাঘরা এলাকায় গিয়ে এসব চিত্র দেখা গেছে। বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পদ্মায় অব্যাহতভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার এ দুটি ইউনিয়নে নদীভাঙন প্রকট আকার ধারণ করেছে। পদ্মার ভাঙনে এরই মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে কয়েক সহস্রাধিক গাছপালা, শত শত বসতভিটাসহ বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। একই সঙ্গে নদীভাঙনের শিকার হয়ে বাড়িঘর অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা। নদী তীরবর্তী ভাগ্যকুল, মান্দ্রা, চারিপাড়া, উত্তর কামারগাঁও, মাঘডাল, কেদারপুর, বাঘড়া ও কবুতরখোলা গ্রামের শতাধিক বাড়িঘর নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা সার্জেন্ট (অব.) মতিউর রহমান সারেং (৫৫) জানান, নদীভাঙন প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা না নেয়া হলে যে কোন মুহূর্তে ঢাকা-দোহার সড়ক হুমকির মুখে পড়বে। গত কয়েক বছরে দোহার ও ফরিদপুরের সদরপুর এলাকার পদ্মায় ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে এ ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে স্থানীয় প্রশাসন ভাগ্যকুল ও বাঘড়া বাজার রক্ষায় সরকারিভাবে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিলেও ভাঙনকবলিত গ্রামগুলো রক্ষায় এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। গ্রামবাসী নানা পন্থায় বাঁশের বেড়া বেঁধে ভাঙন ঠেকাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। হুমকির মুখে পড়েছে ভাগ্যকুল পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট, মান্দ্রা মোড়ল বাড়ি জামে মসজিদ, চারিপাড়া খানকায়ে শরিফ, হরেন্দ্রলাল উচ্চ বিদ্যালয়, স্বরূপচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, বাঘড়া বাসুদেব মন্দিরসহ বাঘড়া ও ভাগ্যকুল বাজারের ৭ শতাধিক দোকানপাট এবং দুই সহস্রাধিক বাড়িঘর।

জানা গেছে, উপজেলার ভয়াবহ নদীভাঙন রোধে কবুতরখোলা, ভাগ্যকুল ও বাঘড়া এলাকায় ৪৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণ করার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। শিগগিরই তা একনেকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সম্প্রতি পানিসম্পদ মন্ত্রী রমেশচন্দ্র সেন ভাঙন এলাকা পরিদর্শনকালে ভাঙন রোধে যথাযথ ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়েছেন। তার এ ঘোষণার প্রতিফলনের প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে ভাঙনকবলিত এলাকার পরিবারগুলো।

[ad#co-1]