৬ মাসেও বোর্ড বসেনি কেন?

গোলাম কাদের
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে দেখা গেছে, ২০০০ সালে মাদকাসক্তির কারণে সারা বিশ্বে মৃত্যু ঘটে দুই লাখ লোকের। এ সময় মৃত্যু হয় পাঁচ মিলিয়ন ধূমপায়ীর। মাদকাসক্তির কারণে ঝুঁকি বেড়েছে এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, আমেরিকায় ১৭ শতাংশ এইডস রোগী মাদকদ্রব্য ব্যবহারকারী। মূলত সুই, সিরিঞ্জ ও যৌন মিলনের ফলে এইডস সংক্রমণ হয় এবং সমাজে ছড়িয়ে পড়ে মহামারী আকারে।

মাদকদ্রব্যের করাল গ্রাসে আক্রান্ত আজ বিশ্ব সভ্যতা, এ থেকে আমরাও মুক্ত নই। দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ রাষ্ট্রের অধিকাংশ জনগণই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। অনুন্নত সমাজে নানা সমস্যায় মানুষকে করে হতাশাগ্রস্ত। পরিবারের বাঁধন থাকে না অটুট। ফলে নেশা হয়ে ওঠে ব্যক্তি জীবনের সঙ্গী।

ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশের মাদকাসক্তির সংখ্যা এখন আঁতকে ওঠার মতো। বাংলাদেশে ৫০ লাখ মাদকাসক্তের কথা বলা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াবা ট্যাবলেট বিস্তার দেখে মনে হয় তা অনেক ছাড়িয়ে গেছে। যদিও এ পর্যন্ত কোনো জরিপ হয়নি আমাদের দেশে। প্রতি বছর তামাক ব্যবহারের ফলে ১২ লাখ মানুষ তা ব্যবহারজনিত প্রধান ৮টি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। রোগীদের ২৫% মাত্র হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে ধরে নিয়ে হিসাব করলে দেখা যায়, এর ফলে বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। অপরপক্ষে তামাক খাতে অর্থনীতি বছরে ২৪শ’ কোটি টাকা আয় করে। সুতরাং তামাক ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বছরে ক্ষতির পরিমাণ ২৬শ’ কোটি টাকা। তামাক ব্যবহারের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে প্রতি বছর ৫৭ হাজার ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেন এবং ৩৮ হাজার ২শ’ জন পঙ্গুত্ববরণ করেন।

গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল এবং গোল্ডেন ক্রিসেন্টের সীমানাগত কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের অবৈধ মাদক ব্যবসায়ের পথ হিসেবে আমাদের দেশকে ব্যবহার করছে। ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান এবং নেপাল থেকে ফেনসিডিল, ভাং বিদেশি প্রশান্তি রস, হেরোইন, আইস, আফিম, প্রেনরফিন, ঘুমের ওষুধ, বিভিন্ন কেমিক্যালের ব্যবহার অগ্রগামী তরল রস বাংলাদেশে এসে থাকে। বাংলাদেশে উৎপাদন হচ্ছে অ্যালকোহল, ভাং, প্যাথেডিন, মরফিন, ঘুমের প্রশান্তিদায়ক ওষুধ আর এগুলোর প্রায় সবই অপব্যবহার হচ্ছে এবং মাদকাসক্তির হার আমাদের দেশে ক্রমেই বেড়ে চলেছে। আর এ ব্যবহারকারীর অধিকাংশই পুরুষ এবং যুব সমাজ। এ ব্যাপারে নারীও পিছিয়ে নেই। আর এ ভয়াবহ দিকটি উন্মোচিত হয়েছে ইয়াবা ব্যবসা, গ্রহণকারী, সরবরাহকারীদের পরিচিতি দেখে। বেশ কিছুদিন আগে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২৩ কেজি হেরোইন ধরা পড়েছে। ইয়াবা বিক্রেতা ঘুরে বেড়াচ্ছে শত শত। আটককৃতদের স্বীকারোক্তিতে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে সমাজের উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত-যুব সমাজকে গ্রাস করেছে ব্যাপকভাবে। নীরব ঘাতকের মতো এগিয়ে যাচ্ছে সবার অজান্তে। ২০০০ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় বিশ্বে মাদকের কারণে ১ লাখ ৯৯ হাজার তরুণ খুন হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর একাই মাদক বিষয় জরিপ আজও করতে পারেনি। বেসরকারিভাবে যারা জরিপ করেছেন তাদের মতো মাদকাসক্তির সংখ্যা বাংলাদেশে ৪৭ লাখ থেকে ৫০ লাখ। এরা বছরে কম করে হলেও মাদকের পেছনে খরচ করে ১৭ হাজার কোটি টাকা। দুঃখজনক হলেও সত্য, মাদকের অবৈধ ব্যবহার ও পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস ২৬ জুন, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ঘটা করে সাম্প্রতিক একটি র্যালির ব্যবস্থা করতে পারে না, শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধান অতিথি করে একটি সেমিনার করেন এবং তাদের রুটিন ওয়ার্ক চলে সারা বছর। গণসচেতনতার কাজটি মূলত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গণমাধ্যম করে থাকে। বছরে শুধু ২৬ জন, সবাইকে ডেকে পরামর্শ করা হয়। পরামর্শ সভায় তাদের নানা অপারগতা তুলে ধরে তাদের প্রণীত কর্মসূচি অনুযায়ী সেমিনার ডিটক্সিফিকেশন ক্যাম্প স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো করে থাকে।

বাংলাদেশে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টিকারী সমাজে অধিকাংশই মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী। সরকারের উচিত, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মাদকবিরোধী আন্দোলনকে গতিশীল করা। স্থিতিশীল বাংলাদেশের জন্য মাদকনিরোধ আন্দোলনে রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ততা সৃষ্টি করা, জোরদার করা। জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড বিদ্যমান এখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও বোর্ডের চেয়ারপারসন, ১১ জন মন্ত্রী ও ২ জন সচিব, ৫ জন সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এ বোর্ডের সদস্য। বোর্ডের মূল কাজ দেশে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও চোরাচালান রোধ এবং মাদকবিরোধী গণসচেতনতা সৃষ্টি এবং মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়নে অধিদফতরকে নির্দেশনা দান। এ বোর্ড সারা বছরে পূর্ণাঙ্গভাবে দু’একবারও বসার সুযোগ পায় না। এ সরকার ক্ষমতায় এসেছে ৬ মাস, এর মধ্যে মাদকজনিত আইন-শৃঙ্খলার এত অবনতি হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সভা একবারও হয়নি। অতএব, ডাল মে কুচ কালা হ্যায়।

লেখক : চেয়ারম্যান, অতীশ দীপঙ্কর গবেষণা পরিষদ

[ad#co-1]