বিপরীত স্রোতের সাংবাদিক সারোয়ার জাহান চলে গেলেন

saroar-135x150গোলাম কাদের
বিশেষ করে নিরন্ন মানুষের জন্য তার ভেতরে একটা কষ্টের হাহাকার ছিল। তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্যও তার লেখনী ছিল সতেজ। নিয়ত তিনি তাদের সুখ-দুঃখের কড়চা তুলে আনতেন। অকালে চলে গেলেন অনেক কষ্টের কথা বুকে চেপে, যা আমি অনুভব করি।

কিছুদিন আগে দেখা ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকার নিচতলায়। শেষ দেখা সোনারগাঁও হোটেলে প্রথম গেটের ফুটপাথে যাচ্ছেন নতুন কর্মস্থলে। হাতে হাত রেখে কথা হলো অমায়িক, মৃদুভাষী সারোয়ার জাহান ভাইয়ের সঙ্গে। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতায় আছেন, সাংবাদিকদের সংগঠনের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ ছিল, সাংবাদিকদের স্বার্থ নিয়ে বহুবার কথা বলতে দেখেছি। তিনি সাংবাদিকতার এথিকস মেনে চলতেন, এ জন্যই হয়তো মালিক কর্তৃপক্ষ অথবা সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা সাংবাদিকের সঙ্গে বিরোধ বেধে যেতো। সৎ সাংবাদিকের স্বার্থের পক্ষের লোক হিসেবে দীর্ঘদিন দৈনিক দেশের সহকর্মী হিসেবে সারোয়ার ভাই আমার শ্রদ্ধাজন ছিলেনÑ আছেন, থাকবেন।
তিনি শুধু সাংবাদিকের অধিকার নিয়েই সংগ্রাম করতেন, তা-ই নয়। মানুষের, সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়েও কথা বলতেন।
ভোক্তার অধিকার নিয়ে কথা বলতেন। দীর্ঘদিন ক্যাবের কর্মকর্তাও দেখেছি তাকে। সাংগঠনিক কর্মী হিসেবেও ছিলেন তিনি অদ্বিতীয়।
বেকার যুবাদের নিয়ে তিনি ভাবতেন। দৈনিক দেশে তার একটি কলাম ছিলÑ ‘আপন জীবন আপন হাত’। পুঁজিবিহীন ছোট প্রজেক্ট করে যারা সাফল্য অর্জন করেছেন, তাদের সাফল্যগাথা তুলে ধরতেন।
কীভাবে জুতার ফিতার একটি কারখানা করে অল্প পুঁজিতে সাফল্য পেয়েছেন, কীভাবে বলপেনের সীস বাঁশের কঞ্চির ভেতরে ভরে সুদৃশ্য দামি পেন তৈরি করা যায়। অথচ এ কাজটি করে কোন বেকার যুবক লাখপতি হয়েছেন, প্রায় প্রতি সপ্তাহে এ রকমের নানা ছোট ছোট প্রজেক্ট উপস্থাপন করতেন। তাও তো প্রায় ১৫ বছর আগের ঘটনা। বেকার যুবকদের শুধু চাকরির দিকে তাকিয়ে না থেকে আপন হাত আপন জীবন নিয়ে কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়ার উৎসাহ দিতেন। বেইলি রোডের সন্নিকটেই তার আবাসস্থল ছিল। বাইরে তাকে হাঁটাচলাই বেশি দেখতাম। ভোক্তার অধিকার নিয়ে, আইন নিয়ে লিখতেন, সভায় ভালো বলতে পারতেন। হতদরিদ্র মানুষের জন্য তার ভেতর একটি কান্না ছিল, বেকার যুবকদের ভেতর তিনি এক অমিত সম্ভাবনা দেখেছিলেন। তার এ স্বপ্ন অনেকাংশেই আজ পূরণের পথে। বন্ধুবৎসল, আড্ডাপ্রিয় সারোয়ার জাহান বড়মাপের সাংবাদিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি তার অনেক সিনিয়র সাংবাদিকের খামখেয়ালি সাংবাদিক রাজনীতির জন্য যথাযথ সম্মান এবং পেশার মূল্যায়ন পাননি। অত্যন্ত সচেতন সাংবাদিক সারোয়ার ভাই। আত্মমর্যাদার জন্য তাকে ঘুরে ঘুরে পত্রিকা বদল করতে হয়েছে। অনেক পত্রিকায় তিনি তার সেই কাক্সিক্ষত সাফল্য পাননি, দেননি। তারপরও তিনি ছিলেন এ পথে অদম্য পথিক।
আজকের সমাজে যোগ্য, নিবেদিত দেশপ্রেমিক সাংবাদিকের আক্রা দেখা দিচ্ছে। আমরা আমাদের লোককেই যোগ্য সম্মান দিচ্ছি না। এই না দেয়ার কারণে সংবাদপত্র জগতে সাংবাদিকের বন্ধুসংখ্যা কমে যাচ্ছে। এমনিতে প্রবাদ আছে, সাংবাদিকদের কোনো বন্ধু নেই। তবে বন্ধুহীন ছিলেন না সারোয়ার জাহান। তার অজস্র গুণগ্রাহী, বন্ধু, ভক্ত ছিল। মৃদুভাষী, মৃদু হাসির সারোয়ার জাহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফোয়ার ইউনিটের সদস্য ও সাপ্তাহিক জয়বাংলা পত্রিকার রণাঙ্গন সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি চরমপত্র, বাংলার মুখ-এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আর সাংবাদিকতার একটি বড় সময় সম্ভবত দৈনিক দেশের শুরু থেকে বন্ধ হওয়া পর্যন্ত পত্রিকাটিতে তিনি নিবেদিত ছিলেন। এবং সাংবাদিকদের দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে, তাদের রুটি-রুজির আন্দোলন-সংগ্রামে সবার আগে তাকে পাওয়া যেতো।
সাংবাদিক সংগঠন ও রাজনীতি করে অনেকেই বাড়ি-গাড়িসহ নানা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অনেক উপরে উঠে গেছে। তিনি সাংবাদিক রাজনীতি করেছেন; কিন্তু বঞ্চিত, উপেক্ষিতদের তিনি ছেড়ে যাননি। সুযোগসন্ধানী, সুবিধাভোগীদের কাতারে তিনি ছিলেন না। পত্রিকার জগতে একজন প্রুফ রিডার যেমন তার বন্ধু ছিল, একজন যোগ্য এডিটরও ছিল তার বন্ধু। নানা বিষয়ে তার লেখার হাত ছিল, জানার পরিধি ছিল একজন যোগ্য সাংবাদিকের। অনেক অগ্রগণ্য সাংবাদিক তাকে স্নেহ করতেন। সানাউল্লাহ নূরী অত্যন্ত স্নেহ-মর্যাদার চোখে দেখতেন তাকে। অর্থনৈতিক রিপোর্টে তার জুড়ি ছিল না। কঠিন বিষয় সরল করে লেখার দারুণ ক্ষমতা ছিল তার। সাহিত্যের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা ছিল। নানা পত্রিকা, ম্যাগাজিনে জাতীয় সমস্যা নিয়ে লিখতেন। বিশেষ করে নিরন্ন মানুষের জন্য তার ভেতরে একটা কষ্টের হাহাকার ছিল। তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্যও তার লেখনী ছিল সতেজ। নিয়ত তিনি তাদের সুখ-দুঃখের কড়চা তুলে আনতেন। অকালে চলে গেলেন অনেক কষ্টের কথা বুকে চেপে, যা আমি অনুভব করি।
সংবাদপত্রে কাজটিই হলো নতুনত্বের, চ্যালেঞ্জের, সর্বোপরি টেনশনের। সাংবাদিকতা পেশার কম সাংবাদিকই প্রতিনিয়ত এ টেনশনের কারণে দীর্ঘায়ু পান না। সারোয়ার জাহানও টেনশনমুক্ত ছিলেন না।
বিবেকের কণ্ঠস্বর সাংবাদিকরা দেশ, সমাজ, রাষ্ট্রের এবং জনগণের কল্যাণেই কাজ করতেন; কিন্তু আজকাল হাওয়া একটু পরিবর্তন হয়েছে। পত্রিকার মালিকদের জন্যও সাংবাদিকদের কমবেশি কাজ করতে হয়। এটা যারা এখন পারে না তারা তো ব্যাকডেটেড, রাজনৈতিক দল এবং দলনেতাদের জন্য কাজ না করলে সেও আধুনিক না, আধুনিক সাংবাদিক না। আমাদের মাঝেও করপোরেট কালচার গড়ে উঠেছে। যদিও সংবাদপত্র শিল্প ও সাংবাদিকতা একটি ভিন্নমাত্রার প্রতিষ্ঠান এবং এখানে পেশাদারিত্ব একটু অন্য রকম, দেশ ও জনকল্যাণ সংশ্লিষ্ট। কল্যাণ রাষ্ট্রের আকাক্সক্ষা সবার চিত্তে।
সংবাদপত্র শিল্পে এখন দুই ধারা প্রবাহিত। যারা মালিক কর্তৃপক্ষের তোষামোদিতে বেশি সময় দেয়, তারা একটু ভালোই থাকেন, আছেন। আর যারা মানুষের কল্যাণ চিন্তা, কল্যাণ রাষ্ট্রের চিন্তায় মগ্ন থাকেন তাদের সংসারে টান থাকে। টানাপড়েন, পেশার টেনশনে অকালেই চলে যেতে হয়।
বলছিলাম কিছু কিছু পত্রিকার বেতন-ভাতা গার্মেন্টের চেয়েও খারাপ অবস্থা। বেতন-ভাতা হয়তো জোটে তিন মাস কাজ করে এক মাসের।
আগে সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো প্রচ- তেজিভাব নিয়ে সাংবাদিকদের পক্ষে কাজ করতো। এখন শত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও তাদের ভেতর সেই তেজিভাব নেই। কারণ সংগঠনগুলো রাজনৈতিক দোষে দুষ্ট। এমনও শোনা যায়, সাংবাদিকদের কল্যাণের বৃহৎ টাকা মর্জিমাফিকভাবে খরচ করা হয়, দেয়া হয়, কল্যাণ না দেয়ার মতো। সারোয়ার জাহানের মতো যারা অকালে চলে যান, তারা এর বিপরীত স্রোতের বাসিন্দা। তারা করে গেছেন অনিন্দ্য সাংবাদিকতা, মানুষের কল্যাণের সাংবাদিকতা। সারোয়ার জাহানের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল, সখ্য ছিলÑ এ আমার গর্ব ও গৌরবের বিষয়। তার এবং তার পরিবারে কল্যাণ হোক। অনন্ত যাত্রায় তার শান্তি কামনা করি।

গোলাম কাদের: সাহিত্যিক, কলাম লেখক ও সংগঠক।