‘ভালোটাই টিকে থাকবে’ আশাবাদী একজন মানুষ আব্দুল কাদের

Best-Actor-award-150x150বাংলা নাটকের স্বর্ণযুগ বলতে আসলে কোন সময়টাকে বোঝায় এখনই তা বলা কঠিন। তবুও একটা সময় ছিল যখন ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিল না, গ্রামেগঞ্জে বিদ্যুৎ ছিল না, তবুও মফস্বলের মানুষ ব্যাটারি জোগাড় করে, একটা সাদাকালো টেলিভিশনের সামনে মাদুর পেতে জটলা করে বসে দেখত বাংলা নাটক। মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা যখন বাকের ভাই আর বদি ভাইকে ঘিরে চলতো তুমুল আড্ডা আর আলোচনা। আলোচিত সেই বদি ভাই বর্তমান, অতীত আর ভবিষ্যতের নাটক ও ব্যাক্তিগত জীবনের কথা বলেছেন জলছবির কাছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল্লাহ্ নূহ

নাটকে আপনার বর্তমান ব্যস্ততা দিয়েই শুরু করি…

আব্দুল কাদের : আসলে ব্যস্ততার ব্যাপারটা ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে। কম-বেশি ব্যাপারটা আমি হিসাবে ধরি না। আমার তিরিশটা নাটক যদি এক মাসে যায় এবং সেগুলো একটাও মনে রাখার মতো না হয় তবে কোনো ভালো কিছু হলো বলে আমি মনে করি না। আবার মাসে যদি মাত্র একটা নাটক যায় এবং সেটি হিট হয় তবে আমি মনে করি ওই একটি কাজই আমি হিসাবের মধ্যে ধরি। সংখ্যা নয়, আমি মানে বিশ্বাস করি।

এখন নাটকের ব্যাপারটা আমার কাছে কেমন যেন এলোমেলো মনে হয়। অসংখ্য নাটক হচ্ছে। এর মধ্যে পজেটিভ নাটক যে হচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু একশটার মধ্যে সেই সংখ্যা দশটা হয়। তবে সেই দশটা কখন হয় তা অনেকে জানে না। তবে আমি ভালো নাটক করার মানসিকতা রাখি, করছি এবং সামনে আরও করব।

আপনি বলছিলেন যে, নাটকে আসার সময়টা জানতে চায় সবাই। কিন্তু এই বিষয়টিই আমি যদি একটু ভিন্নভাবে জানতে চাই যে, নাটকে আসার গল্পটা যদি বলেন?

আব্দুল কাদের : স্কুলজীবনে নাটক করেছি। সেটা অনেকেই করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই আমার আসলে নাটক করা শুরু। এবং আমরা নাটক আসলে পেশাগতভাবেই শুরু করেছিলাম। আমরা নাট্যচক্র করেছি। আমি মহসীন হলের নাট্যসম্পাদক ছিলাম। সব হল মিলে আমরা নাট্যচক্র করি এবং স্বাধীনতাউত্তর খুব ভালো নাটক করি। সেলিম আল দ্বীন, আল মনসুর তখন লিখতেন। তারপর থিয়েটারে জয়েন করি। আব্দুল্লাহ্ আল মামুন, রামেন্দু মজুমদার তাদের সঙ্গে কাজ শুরু করি। এবং আমি একেবারে ছোট চরিত্র ভূমিকা থেকে শুরু করেছি। সেখান থেকে কাজ শুরু করে ধীরে ধীরে নিজের উত্তরণ ঘটিয়েছি। পরিচালক আব্দুল্লাহ্ আল মামুনের চোখে পড়ি। তখন এমন হয়েছে যে, আমাকে হিসাবে রেখে নাটকের স্ক্রিপ্ট করা হতো। সেভাবে আমি মঞ্চে কাজ করতে করতে এসেছি। আমি শিখে এসেছি। আর নাটকের শিক্ষা তো মঞ্চেই হয়।

আমার নাটকে আসার গল্প বলতে এটাই যে, অন্তরের তীব্র আকাক্সক্ষা। নাটকের প্রতি আকর্ষণ, সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ। নাটক তো শুধু বিনোদন নয়, নাটক সমাজের দর্পণ। নাটকের মাধ্যমে সমাজে মেসেজ পৌঁছে দেয়া হয়।

এখানে একটা কথা এসেছে যে, আপনাকে ধরে নাটকের স্ক্রিপ্ট লেখা হতো। এ ব্যাপারটা আসলে কেন? অর্থাৎ ঠিক কোন চরিত্রটায় আপনাকে বিবেচনা করা হতো?

আব্দুল কাদের : আমার মনে হয় একটা জিনিস নাট্যকাররা আমার মধ্যে খুঁজে পান। সেটা হলো যে, আমি নাটকে কখনো অভিনয় করি না। আমি চরিত্রটাকে চিত্রায়ণ করি। এই যেমন এখন আপনার সঙ্গে কথা বলছি, এটাও একটা চরিত্র। এখানে আমি যদি অভিনয় করি বাস্তবতা বাদ দিয়ে, সেটা মেকি হয়ে যাবে। এভাবে আমি সব সময় রাস্তায় চলতে চলতে সমাজের বিভিন্ন চরিত্র অবলোকন করি। বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছি, বিভিন্ন রকম মানুষের সঙ্গে মিশছি। সব চরিত্র লক্ষ্য করি এবং সময়মতো কাজে লাগিয়ে দিই।

এবারে একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসি। পরিবারের সদস্য কয়জন?

আব্দুল কাদের : আমার স্ত্রী খায়রুন কাদের। তিনি গৃহিণী, বিউটিশিয়ান ও অভিনেত্রী । আমার এক পুত্র, এক কন্যা। পুত্রের নাম শফিউল আজম, কন্যার নাম মেহেরুন নাহার। পুত্র-কন্যা দুজনেই নিজ নিজ পেশায় নিয়োজিত।

আপনার পরিবারের সদস্যরা আপনার নাটকগুলোর চরিত্র নিয়ে কি মন্তব্য করে?

আব্দুল কাদের : ওরা খুব মজা পায়। বসে বসে দেখে আর হাসে। কারণ আমার তো দুইটা ভূমিকা। একটা হচ্ছে অফিসে আমার একটা রোল। এখানে একজন এক্সিকিউটিভ আমি। গম্ভীর হয়ে থাকতে হয়। আর অভিনয়ে আরেকরকম। এটা আসলেই মজার ব্যাপার।

এখানে অফিসের অর্থাৎ আপনার চাকরিজীবনের প্রসঙ্গ এলো। সেটা নিয়ে একটু কথা বলি, বাটাতেও তো অনেক বড় দায়িত্ব পালন করছেন, এ সম্পর্কে যদি কিছু বলেন…

আব্দুল কাদের : বাটাতে আমি যোগ দিই ১৯৭৯ সালে। তারপর ধাপে ধাপে আমি ওপরে উঠি। রিটেইল জোন ম্যানেজার, রিটেইল ম্যানেজার এভাবে মার্কেটিং ম্যানেজার, তারপর এখন কনসালট্যান্ট বিজনেস ডেভেলপমেন্ট। এমনকি আমার অবসর হয়ে গেছে ৩০ মার্চ ২০০৯তে। তারপরও ওরা আমাকে অনেক সম্মান দিয়ে রেখেছে। আমি একদিনও অবসর নিতে পারিনি। যেদিন রিটায়ারমেন্ট হয়েছে তারপর দিন থেকেই আবার অফিস করছি।

বাংলাদেশে এই কোম্পানিটাকে যে অনেকটা আমিই গড়ে তুলেছি। বাটা বাজার, বাটা শপÑ এগুলো সব আমার লিডারশিপে করা। সব মিলিয়ে আমি আমার অফিসিয়াল কাজটিকে খুব এনজয় করি। এবং আমি চাই আমার কোম্পানি আরও ভালো করুক।

আগে কোনটা হয়েছিল? চাকরি না নাটক?

আব্দুল কাদের : আমি ১৯৭৩ সাল থেকে নাটক করি। ১৯৭৬ সালে বিটপিতে জয়েন করি। ১৯৭৯ তে বাটাতে আসি। কাজেই সবার আগে আমি নাটক শুরু করি। কিন্তু আমি দুটোই চালিয়ে গেছি এবং যাচ্ছি। এ ব্যাপারে অনেকেই অনেক সময় প্রশ্ন করে যে, আপনি সময় পান কখন?

এখানে আমি আসলে যেটা করি তা হলো, আমি অনেক পরিকল্পনা করে কাজ করি। যেটা আমার পরিকল্পনার ছকের মধ্যে পড়ে না সেটা আমি করি না। যেমন শুটিংয়ের কাজ করি শুক্র-শনিবারে। আর অন্য সময় যদি বিশেষ দরকার হয় তবে আমি ছুটি নিই কোম্পানি থেকে। কোম্পানি আমাকে সেই সহযোগিতা করে।

আবার পরিচালক ও অভিনেতা-অভিনেত্রীরা আমাকে খুব সহযোগিতা করে। তারা জানে যে, আমার সময় কম। তাই তারা আমার শটগুলো আগে নিয়ে সহযোগিতা করে।

আপনাকে তো বাটা ছাড়ছে না। বাটার জন্য তাহলে আপনারও নিশ্চয় বিশেষ পরিকল্পনা আছে?

আব্দুল কাদের : বাটার জন্য আমি যেটা করছি যে, ব্যবসার সমৃদ্ধিতে কাজ করা, আরও বাটা বাজার এবং বড় বড় বাটার দোকান করা, তারপর হাশ পাপিস। বাংলাদেশে বিশেষভাবে মার্কেটিং করছি আমরা। এমনিতে বাটার দোকানে বিক্রি করতামই আমরা, এখন হাশ পাপিসের আলাদা এক্সক্লুসিভ শোরুম করছি। গুলশানে একটা করেছি, বসুন্ধরা মলে একটা করেছি এবং ২০১১ সালের মধ্যে ২০টা হাশ পাপিস স্টোর করার পরিকল্পনা করেছি। আমরা বড় আকারের দোকান করব। বসুন্ধরা মলে যেমন করেছি ৭তলায় ১২ হাজার বর্গফুট জায়গা নিয়ে। যমুনা মলে চেষ্টা করছি। এভাবে বড় আকারের দোকান করার চেষ্টা করছি। যাতে ভালো ইমেজটা ধরে রাখা যায়। ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করছি। এগুলো প্রফেশনাল মার্কেটিং এপ্রোচ।

হাশ পাপিস তো ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ড?

আব্দুল কাদের : হ্যাঁ, এটা আমেরিকান কোম্পানি। বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশে তারা মার্কেটিং করে। বাংলাদেশে আমরা লাইসেন্সপ্রাপ্ত।

আবার একটু নাটকে আসি। নাটক নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

আব্দুল কাদের : ভালো নাটক করার মানসিকতা তো আছেই। তবে আমার একটা পরিকল্পনা আছে। এমন একটা সিরিয়াল করতে চাই যেটা মানুষকে খুব আনন্দ দেবে। কারণ আনন্দ দেয়াটা খুব কঠিন কাজ। আমি অনেক নাটকেই দেখেছি আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করা হয় কিন্তু হয় না। কারণ এটা একটা বিশেষায়িত ব্যাপার, যা সবাই পারে না। সে জায়গাটায় আমার যে অভিজ্ঞতা ও পরিচিতি আছে তার মাধ্যমে আমি জানি যে, আমার নিজস্ব উদ্যোগে নিজের প্রোডাকশনে আমাকেই করতে হবে। এ রকম একটা পরিকল্পনা আমার আছে।

এ যাবৎ আপনার অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্যে আপনার কাছে কোন চরিত্রটা সেরা বলে মনে হয়?

আব্দুল কাদের : আমি চোখ বন্ধ করে বলতে পারি, টেলিভিশনে ‘কোথাও কেউ নেই’-এর বদি ভাই। এ ছাড়াও আমি অনেক ভালো নাটক করেছি। যেমন, আব্দুল্লাহ আল মামুনের অনেক নাটক, হুমায়ূন আহমেদের, ফেরদৌস হাসান, ডিএ তায়েব, ইমদাদুল হক মিলন ও আরও অনেক নাট্যকারের নাটক করেছি। কিন্তু ওই নাটকটা মানুষের মনে দাগ কেটে গেছে আরকি।

মঞ্চেও আমি অনেক নাটকই করেছি কিন্তু মেরাজ ফকিরের মা নাটকটা আমার কাছে মনে হয়েছে বেশি ইম্প্যাক্ট ফেলেছে। চলচ্চিত্র আমি বেশি করিনি। কিন্তু রং নাম্বার নামে একটা সিনেমায় অভিনয় করেছি। সেখানে আমার চরিত্রটা ছিল ‘বড় ভাই’-এর। কিছু বড় ভাই থাকে না যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকে। কখনো বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যায় না। সবার সহযোগিতায় এগিয়ে যায় এবং সহযোগিতা করতে গিয়ে নানারকম মজার ঝামেলা সৃষ্টি করে ফেলে। সেটা ছিল একটা মজার চরিত্র। এ রকম অনেক ভালো কাজ করেছি।

এমন কিছু মুখ থাকে যা দেখলেই মনের মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি চলে আসে, এমন কিছু মুখ থাকে যেগুলো এমনিতেই যেন মনের মধ্যে খুশি ছড়িয়ে দেয়, আনন্দ লাগে। দর্শক আপনার মধ্যে সে রকম একটি মুখ দেখে। আপনি সেই জায়গাটিতে কাজও করছেন। আপনার কি মনে হয় এ রকম মুখ আমাদের মিডিয়াতে যথেষ্ট আছে?

আব্দুল কাদের : এটা একটা দারুণ ব্যাপার। আমাদের মাঝে কিছু কিছু এ রকম আছেন। তবে আমাদের অভিনয়ের মধ্যে একটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যে, হাসির নাটক মানেই জোর করে হাসানোর চেষ্টা নয়। খুব একটা রঙিন পোশাক পরে ফেললাম, কিছুটা চিৎকার করে অভিনয় করলাম, একটু লাফালাফি করলাম এতে লোক হাসে না। একটু নিয়ন্ত্রিত অভিনয় করতে হবে।

আমি জানি এ রকম ভালো প্রতিভা আমাদের মধ্যে আছে এবং আমি তাদের দিয়ে কাজ করাতে পারব। আমার প্রতি তাদের শ্রদ্ধাও আছে যথেষ্ট।

আপনি বর্তমান নাটকে অস্থির সময়ের কথা বলছিলেন, আপনাদের সময়ের সঙ্গে এখনকার সময়ের পার্থক্যটা কী?

আব্দুল কাদের : এখন প্রচুর নাটক হচ্ছে। এর মধ্যে ভালো নাটকও কিন্তু হচ্ছে। যেহেতু অনেক নাটক হচ্ছে সেহেতু যেগুলো খুব ভালো সেগুলো অনেকেই মিস করছে। এখানে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোও বিজ্ঞাপন প্রচার করছে বেশি। করতে হচ্ছে। আমাকে যদি এর সমাধানের কথা বলেন তবে বলব যে, এত নাটক হওয়া উচিত না। নাটক করা উচিত স্ক্রিপ্ট দেখে বাছাই করে। একজন অভিনেতা-অভিনেত্রী কত অভিনয় করবে? সকালে একটা চরিত্রে অভিনয় করছে, রাতে আরেকটা চরিত্রে অভিনয় করছে। একদিনে দুটা চরিত্রে অভিনয় করা সম্ভব না। ক্লান্তির একটা ব্যাপার আছে। এর পরের ব্যাপারটি হলো, ভালো স্ক্রিপ্ট। এমনকি অতীতের হিট করা ভালো নাট্যকারেরা এখন সিনে নাই। তাদেরকে ব্যবহার করতে হবে। আগে দেখতাম প্রোডিউসাররা গিয়ে একটা ভালো নাট্যকারের কাছে বসত ভালো স্ক্রিপ্টের জন্য। তাদের অনুরোধে নাট্যকাররা লিখতেন সুন্দর করে। কিন্তু এখন যেন কিছুটা এলোমেলো। এখন যেহেতু সংখ্যা বেড়েছে, সেহেতু মান একটু মার খাচ্ছে। সমাধানটা একপর্যায়ে এমনিতেই বের হয়ে আসবে। ভালোটাই টিকে থাকবে।

[ad#co-1]