ফখরুদ্দীন আহমদকে তলবের চিন্তাভাবনা

fak-150x150মিজান মালিক
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে সংসদীয় কমিটির সামনে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে বলে জানা গেছে। ৯০ দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদকাল অসাংবিধানিকভাবে প্রায় ২ বছর ধরে রাখা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আমেরিকায় সম্পদ অর্জন ও সেদেশের স্থায়ী আবাসিক কার্ডের তথ্য গোপনের অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে তলব করা হতে পারে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সূত্রমতে, আমেরিকায় ড. ফখরুদ্দীনের নামে দুটি বাড়ি ও পৃথক দুটি ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে সংসদীয় কমিটি। সেসব তথ্য এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। কমিটি জানতে পেরেছে, ড. ফখরুদ্দীন আহমদ আমেরিকার স্থায়ী আবাসিক কার্ডধারী। তার এসএসএন নম্বর (সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর) ১৪৮৫২৮৯৯২। এ কার্ডের আওতায় তিনি আমেরিকায় নাগরিকের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন বলে জানা যায়। তার বাড়ি দুটি আমেরিকার ভার্জিনিয়া ও মেরিল্যান্ডে। ১০৮০৮ ব্রিক ইয়ার্ড কোর্ট ফটোম্যাক মেরিল্যান্ডে ২০৮৫৪ নং হোল্ডিংয়ের কেনা বাড়ির মূল্য ১৫ লাখ ৪ হাজার ৬১০ ইউএস ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ১০ কোটি ৫৩ লাখ ২২ হাজার টাকা। ৭৬০৭ নিউ মার্কেট ড্রাইভে কেনা বাড়ির মূল্য ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৭১০ ইউএস ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৫ কোটি ২৮ লাখ ২৯ হাজার টাকা। এছাড়া তার নামে সেদেশের ওয়াস্যুভিয়া ব্যাংকে ২০৯৪৮৯৫৩৬১২৪ নং সেভিংস অ্যাকাউন্ট এবং ৪৪০২৫৮৩২৫ নং সিডি অ্যাকাউন্টে আরও প্রায় কোটি টাকার সঞ্চয় রয়েছে বলে তথ্য পেয়েছে কমিটি। সূত্রমতে, কমিটি জানতে পেরেছে, আমেরিকায় সম্পদ অর্জনের তথ্য এবং স্থায়ী আবাসিক কার্ড গ্রহণের তথ্যটি গোপন করেছেন ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। সরকারি প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, ফখরুদ্দীন আহমদ বিদেশে অর্থ-বৈভব করেছেন কিভাবে তা তিনি বাংলাদেশকে জানাননি। এছাড়া তিনি আমেরিকার স্থায়ী আবাসিক কার্ড অর্জনের বিষয়টিও গোপন করে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হয়েছেন।

এসব বিষয়ে অভিযোগ আসায় তার সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে বলে জানা যায়। সূত্রমতে, ড. ফখরুদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে সংবিধান লংঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারেরও অভিযোগ উঠেছে। সাংবিধানিকভাবে ৯০ দিন বা ৩ মাসের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নিয়ে জাতিকে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিয়ে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রায় ২ বছর ক্ষমতায় ছিল। এ সময়ে তিনি তার সরকারের সামনে এবং পেছনের ক্ষমতাধর লোকজনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠায় তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভালো-মন্দ সব কাজের দায়-দায়িত্ব প্রধান উপদেষ্টার। দুদক চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে তদানীন্তন সচিব দেলোয়ার হোসেনের স্বাক্ষরে দেশের ৫০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দেয়ার বিষয়ে সংসদীয় কমিটি জানতে চাইলে তিনি (দেলোয়ার হোসেন) কমিটিকে বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে সে সময় দুদকের কাজ পরিচালিত হতো।

সূত্র জানায়, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ও দুদক সচিব দেলোয়ার হোসেনের বক্তব্যের সূত্র ধরে তাদের আনীত অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যও ফখরুদ্দীন আহমদকে সংসদীয় কমিটির সামনে তলব করার চিন্তা-ভাবনা চলছে। একই সঙ্গে তিনি কিভাবে কখন দেশের বাইরে থেকে এসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হলেন, কে তাকে মনোনয়ন দিয়েছে সেসব বিষয়েও তার কাছ থেকে জানা হবে। তার ঘনিষ্ঠদের অনেকে মনে করেন, ফখরুদ্দীন আহমদ আমেরিকার নাগরিকত্ব পেয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে কারও কাছেই কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। অবশ্য তার স্থায়ী আবাসিক কার্ড বা এসএসএন কার্ডপ্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। কেউ কেউ মনে করেন, বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি থাকাকালীন ফখরুদ্দীন আহমদ আমেরিকায় বাড়ি-গাড়ি করেছেন।

এদিকে সংসদীয় কমিটির একজন সদস্য ড. ফখরুদ্দীন আহমদের বিষয়ে তথ্যপ্রাপ্তির প্রসঙ্গটি উল্লেখ করে বলেন, অন্য দেশের স্থায়ী রেসিডেন্ট হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা হতে পারেন না। এটি আইনবহির্ভূত। এছাড়া তার দেশের বাইরে সম্পদের বিষয় এনবিআরকে জানানোও নৈতিকতার পর্যায়ে পড়ে বলে জানান তিনি।
সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ৩১ মে সরকারি বাড়ি তš§য় ছেড়ে দেন। এরপর তিনি ২ মাসের জন্য আমেরিকায় পাড়ি জমান। সেখানে রয়েছে তার পুরো পরিবার। তিনি সহসাই দেশে ফিরছেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে তিনি ২০০১ সালে বাংলাদেশে আসেন। তখন জোট সরকারের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কাছে ড. ফখরুদ্দীনকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করার জন্য প্রস্তাব করেন। কথামতো কাজ। গভর্নর হিসেবে একদিনেই তার নিয়োগ হয়ে যায় বলে জানা যায়। সাইফুর রহমান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে বোঝাতে চেষ্টা করেন, ফখরুদ্দীন আহমদ বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে ভালোভাবেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন। গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর জোট সরকারের সময় তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর ২০০৫ সালে তাকে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয় তৎকালীন সরকার। এ প্রতিষ্ঠানটি এনজিও খাতে ঋণ সহায়তার কার্যক্রম পরিচালনা করে। জোট সরকারের সময় সুবিধাভোগী ফখরুদ্দীন আহমদ প্রধান উপদেষ্টা হন কাকতালীয়ভাবে। তার ঘনিষ্ঠরা জানান, প্রস্তাবটি ছিল ড. মোহাম্মদ ইউনূসের জন্য। কিন্তু তিনি নিজে রাজি না হয়ে বন্ধু ফখরুদ্দীনের নাম প্রস্তাব করলে ওয়ান-ইলেভেনের নায়করা রাজি হয়ে যান।

সূত্রমতে, সংসদীয় কমিটি পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ পেলে ড. ফখরুদ্দীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সুপারিশ করতে পারে। এছাড়া বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কারানির্যাতিত নেতারা ফখরুদ্দীন আহমদসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনেকের বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যদিও এসব প্রস্তুতির সঙ্গে সরকারের কোন ধরনের যোগাযোগ নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কিন্তু ভুক্তভোগীরা থেমে নেই। তারা শুধু ফখরুদ্দীন আহমদই নন, রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ও সাবেক সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরিচালনায় যুক্ত অনেকের বিরুদ্ধেই মামলা করবেন বলে ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন।

[ad#co-1]