কথাসাহিত্যিক আলাউদ্দিন আল আজাদ

সরকার মাসুদ
পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে আজাদের শিল্পচেতনা উল্লেখযোগ্য মোড় নেয়। ফলে পাল্টে যায় তার লেখার বিষয় ও ভাবনারীতি। আর্তবিপন্ন মানুষের জীবনসংগ্রাম, মনোবিশ্লেষণ, ফ্রয়েডীয় যৌনতত্ত্ব, আত্মহনন, সুবিধাবাদী রাজনীতি, মানুষের নাছোড় উচ্চাশা, স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বেশি করে জায়গা পায় তার গল্প-উপন্যাসে। উত্তরকালে শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, শহীদুল জহির প্রমুখ লেখক তাদের শিল্পরুচি ও সামর্থ্য দিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যের যে উঁচু মান তৈরি করেছেন, তার পথনির্দেশক তো আজাদের মতো অগ্রজ লেখকরাই। পরের প্রজন্মের শক্তিমান লেখকরা যেমন তাদের শক্তিমত্তা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, তেমনি তাদের ভ্রান্তি থেকেও শিখেছেন অনেক কিছু।

ছাব্বিশ-সাতাশ বছর ধরে আলাউদ্দিন আল আজাদের সাহিত্যকর্ম পড়ে আসছি, বিশেষ করে তার উপন্যাস এবং ছোট গল্প। কিন্তু যখন থেকে আমরা তার রচনার সঙ্গে পরিচিত, তারও প্রায় ত্রিশ বছর আগে তিনি লেখাজোকা শুরু করেছিলেন। এখনো, এই বয়সেও অন্যূন ৭৫ বছর, তিনি লেখার ব্যাপারে উদ্যমী, নতুন পরিকল্পনার সূচক এবং সাধ্যমতো তার রূপায়ণকারী। তার সাম্প্রতিককালের কিংবা একেবারে এই মুহূর্তের লেখায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কিছু নাও মিলতে পারে। কেননা শিল্পীর সৃজনসামর্থ্য সারাজীবন একইরকম থাকে না, বরং শেষ জীবনে তা অনেকটাই ক্ষয়ে আসে। ব্যতিক্রমীরা এ ক্ষেত্রে খুবই বিরল দৃষ্টান্ত। কিন্তু যে আগ্রহ তার শিল্পীজনোচিত আর্তি ও আকাক্সক্ষা এই লেখক তার ভেতরে জ্বালিয়ে রেখেছেন, আজো তা নিঃসন্দেহে শ্রদ্ধেয়।
সব্যসাচী লেখক পৃথিবীর সব ভাষার সাহিত্যেই বিরল। বাংলাদেশে বোধহয় বিরলতর। আলাউদ্দিন আল আজাদ সেই বিরল সাহিত্যিকদেরই একজন। শুধু তা-ই নয়, তিনি অগ্রগণ্য লেখকদের মধ্যে পড়েন। আজাদ লিখছেন অল্প বয়স থেকে। ছাত্রজীবনেই গল্প লিখে পাঠকের মনোযোগ কেড়েছিলেন। ছাত্রাবস্থায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্পের বই ‘জেগে আছি’। বইটি সে সময় যথার্থ প্রতিশ্রুতিবান তরুণ লেখকের সম্মান কুড়াতে সক্ষম হয়েছিল। তারপর থেকে সৃজনশীলতার সন্ধিৎসু আবেগে তিনি লিখে চলেন একটার পর একটা ছোটগল্প; খানিকটা পরিণত হয়ে উপন্যাস। আজাদ কয়েকটি নিরীক্ষাধর্মী নাটক এবং অসংখ্য কবিতাও লিখেছেন। কবি হিসেবেও তার অবস্থান স্পষ্ট। তিনি পঞ্চাশের দশকের কবিদের প্রথম সারির না হলেও দ্বিতীয় সারির প্রথমদিকের একজন বলে মনে করি।
লেখক জীবনের গোড়ার বছরগুলোতে কবি হিসেবে সুপরিচিতি পেলেও আলাউদ্দিন আল আজাদ পরবর্তী চার দশকে বিবর্তিত হয়েছেন একজন শক্তিমন্ত কথাসাহিত্যিক রূপে। তার ছোটগল্পের অনেকগুলোতেই ‘বিন্দুর ভেতরে সিন্ধু’ থিওরির প্রমাণ মিলবে; মিলবে ভাবের দিক থেকে, দৃষ্টিভঙ্গির আধুনিকতার নিরিখে। সমাজভাবনা, চরিত্রপাত্রের বিশ্লেষণ আর শিল্পোদ্বেগÑ এ তিনে মিলে তার ছোটগল্প হয়েছে আকর্ষণীয়। সেগুলোর আকর্ষণী হওয়ার পেছনে অন্য কারণও আছে। তা হচ্ছে ভাষার ব্যবহার। হ্যাঁ, আঠালো এবং বীক্ষণমূলক একটি গল্পভাষা আরো করেছিলেন তিনি, যা না থাকলে কাহিনীকার হওয়া সম্ভব, কথাশিল্পী নয়। আজাদের ‘বৃষ্টি’ নামে একটি গল্পের কথা বলবো। ষাট বছর বয়সী এক বৃদ্ধের তৃতীয় পক্ষের বাইশ বছরের স্ত্রীর সঙ্গে তার প্রথম পক্ষের ছেলের দেহমনের সম্পর্ক চিত্রিত হয়েছে এ গল্পে। জীবন বাস্তবতা আর অনতিক্রম্য মানস পরিস্থিতি দক্ষ হাতে রূপায়িত হয়েছে এখানে। মানব-মানবীর যৌন তাড়না, অবদমিত মনের ইচ্ছা এবং রহস্যময় পরিস্থিতি যথেষ্ট খোলামেলাভাবে হাজির করেছেন লেখক। বিষয়ের প্রতীকী ব্যঞ্জনা, প্রযুক্ত গদ্যভাষার ধরনটির অনিবার্যতা গল্পটিকে করে তুলেছে অসামান্য। তার গল্পে প্রাচুর্য আমাদের সমীহা জাগায়। একইসঙ্গে গল্পগুলোর ভেতরের ভাবস্বাতন্ত্র্যও আমাদের দৃষ্টি এড়াতে পারে না। তাই দেখা যায়, ভাষার প্রসাদ, কবিসুলভ কল্পনা, সৃজনী আবেগ, পরিপার্শ্বচেতনা, সমাজবীক্ষাÑ এ সবকিছু নিয়েও তার একটি গল্প আরেকটি থেকে কতো আলাদা। সেটা সম্ভব হয়েছে ট্রিটমেন্টের কারণে, কথাশিল্পীসুলভ অ্যাপ্রোচের কারণে। ‘অন্ধকার ‘সিঁড়ি’, ‘টেকনাফ’, ‘লাল জুতো’, ‘নীল জমিন’, ‘পতন’ নামের ছোটগল্পগুলোতে আমার এই বক্তব্যের সমর্থন মিলবে।
ছোটগল্প, গত শতাব্দীর বিখ্যাত ইংরেজ সমালোচক ডেভিড ডেইচেসের ভাষায় ‘ধ ংষরপব ড়ভ ষরভব’। কথাটির সূত্র ধরে আমরা বলতে পারি, জীবনের খুবই তাৎপর্যময় কিছু মুহূর্তের শৈল্পিক রূপায়ণ হচ্ছে ছোটগল্পের কাজ। তা ধারণ করে কোনো একটি ছোট ঘটনা কিংবা চিন্তাসূত্র কিংবা কল্পনানিবিড় মনের উদ্ভাস। তার ভেতর দিয়ে কেবল রচনাকর্মটির বৈশিষ্ট্যই নয়, লেখকমনের কাঠামোও পরিস্ফুট হয়। ক্ষমতাবান সাহিত্যিক অভিজ্ঞতার নির্যাস তুলে আনেন স্বপ্নের ছোঁয়ালাগা বাস্তবানুগ বর্ণনায়। সুতরাং গ্রহণ-বর্জনের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। সচেতন অভিজ্ঞতাই একজন লেখককে আপাত অপ্রাসঙ্গিক, দূরবর্তী জিনিসকেও গল্পের প্রাসঙ্গিকতায় যুক্ত করতে প্ররোচিত করে। আবার বৃত্তান্তের বাহুল্য অথবা অনুষঙ্গের অতিরেক বিষয়েও গুণী লেখক সচেতন আজাদের বেশকিছু গল্পে (ইতিমধ্যে উল্লিখিত) প্রাগুক্ত গ্রহণ-বর্জনের ভারসাম্য সুন্দরভাবে রক্ষিত হয়েছে। তার ছোটগল্পের শিল্পসিদ্ধি সম্বন্ধে আরো দুটি কথা বলা প্রয়াজন। ‘বৃষ্টি’ গল্পের পটভূমি খরার সময়ে লেখকের গ্রামে সংঘটিত একটি সামাজিক ঘটনা। এটা খরার সময়ের গল্প, কিন্তু মানব-মানবীর যৌনক্রিয়া ও প্রজনন ক্ষমতার আইডিয়ার সঙ্গে উর্বরতার সূত্রটি (ঋবৎঃরষরঃু পঁষঃ) প্রতীকীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এখানে। গল্পের শেষে যে যুৎসই সংলাপ বক্রোক্তির বলিষ্ঠতা নিয়ে অস্তিত্বমান, তা ওই রচনাটির শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকখানি।
এবার আলাউদ্দিন আল আজাদের উপন্যাস নিয়ে কথা বলা যাক। স্বভাবের বিচারে তার উপন্যাসগুলো রোমান্টিক। একইসঙ্গে জীবনবাদী। লেখকের নিজের জীবন সম্বন্ধে বলা যায়, তা একইসঙ্গে জ্ঞানমুখী বিদ্যা ও কলাবিদ্যার পরিচর্যার শক্তি আর দুর্বলতাÑ দুয়ে মিলেই মোটামুটি সার্থক। এ পর্যন্ত ত্রিশটি উপন্যাস লিখেছেন আজাদ। তার মধ্যে আছে দৈনিক পত্রিকার ঈদ ম্যাগাজিনের জন্য লিখিত বেশ কয়েকটি উপন্যাস; যেগুলোকে উপন্যাস নয়, দীর্ঘ গল্প বললে সঠিক বলা হয়। ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ তার জনপ্রিয় উপন্যাস। শিল্পীর অপূর্ণতাবোধ, বেদনা এবং অশেষ সৌন্দর্যতৃষ্ণা এ উপন্যাসের প্রধানতম থিম। ‘শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন’ও বেশ আলোচিত উপন্যাস। এর অন্যতম কারণ উপন্যাসে অবচেতনাগত লিবিডোচিত্রের প্রবল উপস্থিতি। এ দুটিই বই, পাশাপাশি আঞ্চলিক উপন্যাস ‘কর্ণফুলী’ এবং এপিক বৈশিষ্ট্যের ছোঁয়ালাগা উপন্যাস ‘ক্ষুধা ও আশা’ আজাদের লেখক ইমেজে পিলারের ভূমিকা রাখছে। উপন্যাস চতুষ্টয় যেন মজবুতভাবে তৈরি গৃহের চারটি স্তম্ভ। এগুলোই তার অগ্রগণ্য সাহিত্যকর্ম। এগুলোর ভেতরেই তিনি বেঁচে থাকার প্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন। তার লেখাজোকার, বিশেষত গদ্যের অন্যতম চারিত্র হচ্ছে ভাবালুতাবর্জিত আধুনিক জীবনদৃষ্টি। বিষয়ভাবনা, লেখার স্টইল এবং চিন্তাচেতনার প্রগতিশীলতাÑ সব দিক থেকেই আজাদ একজন আধুনিক মানুষ। খোলা চোখ এবং সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে, সেই মনে শিল্পীজনোচিত জিজ্ঞাসা ধারণ করে তিনি এখনো নিরলস লিখে চলেছেন গদ্য-পদ্য।
শিল্পীর মনের টানাপড়েন এবং নতুন ধরনের মূল্যবোধের কারণে ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ প্রসিদ্ধ হলেও এ উপন্যাসের অন্য উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে এর নায়ক পরিকল্পনা। নায়কের পালাবদল ঘটেছিল সেই চল্লিশের দশকে, সমরেশ বসুর ‘বিবর’ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে। তার আগে নায়ক বলতে আমরা বুঝতাম আদর্শবাদী চরিত্র। সমরেশ বসুই প্রথম একটি লম্পট ও প্রতারক চরিত্রকে নায়কের মর্যাদা দেন। দেশ ভাগ পরবর্তী বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) উপন্যাসে সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, রশীদ করিম প্রমুখের হাত ধরে এলো এমন নায়ক যিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিনিধি। তারা শুধু মধ্যবিত্ত নয়, একইসঙ্গে বাঙালি মুসলমানও। তা সত্ত্বেও বাবর আলী (উপন্যাস: ‘খেলারাম খেলে যা’, সৈয়দ হক), জাহেদুল ইসলাম (‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’-এর নায়ক), কামাল (উপন্যাস: ‘শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন’, আলাউদ্দিন আল আজাদ) প্রমুখ ব্যক্তি আদর্শ ও মূল্যবোধের দিক থেকে প্রথাগত চরিত্র নয়। চিন্তাভাবনায় তারা আধুনিক ও উদারনৈতিক। ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’তে দেখা যাচ্ছে, জাহেদ স্ত্রীর তলপেটে বিয়ের আগে সন্তান ধারণের চিহ্ন দেখে মানসিক দ্বন্দ্বে জর্জরিত। কিন্তু অনেক দিন-রাত্রির মানসিক টানাপড়েনের পর শিল্পীশোভন ভালোবাসা আর মানবিকতার দ্বারা প্রণোদিত হয়ে সে ওই দুশ্চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দেয়। জয়ী হয় আধুনিক শিল্পীর মূল্যবোধ। কিন্তু এসবের ভেতর দিয়ে ঔপন্যাসিক মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনেরই বিশ্বাস্য ছবি এঁকেছেন।
‘শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন’-এও আমরা অল্পবিস্তর একই চিত্র পাই। তবে এটা আজাদের পরিণততর উপন্যাস। আগের মতো আদর্শবাদী রোমান্টিকতা এখানে নেই। আছে সামাজিক বাস্তবতার নিপুণ ছবি আর গ্লানিময় জীবনের অপ্রিয় সত্য। কাহিনীটা একটু বলি। স্বামীহীনা মধ্যবয়সী বিলকিস বানু দুই সন্তানের মা। মামাতো বড় বোনের (জেবু আপা) ছেলে কামাল কিছুদিনের জন্য থাকতে এসেছে তার বাসায়। কামালের প্রতি বিলকিস বানু আকর্ষণ অনুভব করে। কিছুতেই এ আকর্ষণ সে এড়াতে পারে না, বরং মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগে। বিলকিস কামালকে বাস্তবে কাছে পায় না, পায় স্বপ্নে। স্বপ্নে তার সান্নিধ্যে আসামাত্র বিলসিক বানুর দেহে রোমাঞ্চ জাগে, মনে ঝড় ওঠে। পরমুহূর্তেই স্বপ্নটি ভেঙে যায়। জেগে ওঠে তিনি আবিষ্কার করেন, কামাল ও তারই মেয়ে পারভিন প্রেমের আলিঙ্গনে আবদ্ধ। বিলকিস বানুর এ উপলব্ধি হয় যে, তার জীবনে শখ-আহ্লাদের মৌসুম বিগতপ্রায়; কিন্তু পারভীন-কামালের মতো তরুণ-তরুণীর জীবনে বসন্ত সমাগত। এবং জীবনের স্বাভাবিক ধর্ম এটাই। বইটিতে প্রধান চরিত্রের যে আত্মসমীক্ষা এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রে বিলকিসের যে আত্মোপলব্ধি পাওয়া যায়, তা লেখকের বিস্তৃত জীবনাভিজ্ঞতারই ফসল।
একাধিক সমালোচক ‘ক্ষুধা ও আশা’কে মহাকাব্যিক বলেছেন কেন? উপন্যাসটি আকৃতিতে ঢাউস বলে? নাকি লেখক বিস্তৃত পটভূমিতে জীবনের সমগ্রতাকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন বলে? মহাকাব্যে একটি কাহিনী বয়ানের স্বার্থে কবিকে ‘অজস্র পঙ্ক্তি লিখতে হয়। সামর্থ্যবান ঔপন্যাসিকও একটি বড় বিষয়কে ধরার জন্য শত শত পৃষ্ঠা ব্যয় করেন। কিন্তু দেখতে হবে পৃষ্ঠাগুলো ব্যয়িত হয়েছে কীভাবে, কী রকম ভাষা ও জীবনপ্রত্যয়ের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়েছে সেই উপন্যাস। মনে রাখা খুবই জরুরি যে, কেবল বিশাল পটভূমি অসংখ্য চরিত্রসমেত প্রলম্বিত কাহিনী আর ঘটনার প্রাচুর্যই নয়, বরং বড় ক্যানভাসে যুগধর্ম এবং জীবনদর্শনের সমন্বিত শিল্পরূপ এপিক নভেলের লক্ষ্যযোগ্য বৈশিষ্ট্য। মহাকাব্যিক উপন্যাস বেড়ে ওঠে সুনির্দিষ্ট থিম, ভাষা ও কুশীলবদের নিয়ে। তার ভাব ও বিশ্বাস অনেকখানি আদর্শায়িতও বটে। সন্দেহ নেই ‘ক্ষুধা ও আশা’ লেখকের সুপরিকল্পনা আর পরিশ্রমের ফসল।
সমকালের অনুভব রাশিকে চিরকালের তারে বেঁধে দেয়ার আন্তরিক প্রয়াসও এখানে লক্ষ্য করা যায়। এসব সত্ত্বেও আমার ধারণা, এপিক নভেলের উপযোগী ব্যতিক্রমী জীবনভাবনা ও আত্মদর্শন এখানে অনুপস্থিত। এই মোটা বই, অতএব, ঠিক মহাকাব্যিক উপন্যাস নয়। এটাকে বরং এপিক নভেলের কতিপয় লক্ষণে আক্রান্ত রচনা বলা যেতে পারে। আজাদের এই উচ্চাশী উপন্যাসে চল্লিশ দশকের বড় বড় ঘটনা আছে। দুর্ভিক্ষ, মহামারী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, রাজনৈতিক আন্দোলন-অনশন… প্রায় সবই এতে উপস্থিত। বলা চলে, সমাজ বাস্তবতার বর্ণনায় তিনি নিখুঁত হতে চেয়েছেন। মানুষের সব প্রবৃত্তি এখানে প্রকাশিত। কিন্তু বেশিরভাগ চরিত্রকে বাস্তব মনে হয় না। কোথায় যেন একটা কমতি আছে। সে কারণে বইটি মনের মধ্যে প্রগাঢ় ছাপ ফেলতে পারে না।
‘কর্ণফুলী’ আলাউদ্দিন আল আজাদের অন্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এর পটভূমি চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের দুর্বোধ্য মুখের ভাষা এখানে অবিকল ব্যবহৃত হয়েছে। ভাষা ধারণ করে মনের আবেগ, হৃদয়ের অনুভূতি। সেদিকটা বিবেচনা করলে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ এখানে যথার্থ। ফর্ম কিংবা লিপিকৌশলের দিক থেকে ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’তে অভিনবত্ব নেই। কিন্তু থিমের বেলায় এর নতুনত্ব স্বীকার করতেই হবে। চিত্রশিল্পীর জীবন ও তার মানসিক দ্বন্দ্ব নিয়ে বাংলা ভাষায় আজাদের আগে কেউ উপন্যাস লেখেননি। সৃজনশীল মানুষের তাড়নাচ্ছিন্ন জীবন ও শিল্পকর্মের ভেতর একটি সমন্বয় স্থাপনের সৎচেষ্টা এতে লক্ষণীয়। আলাউদ্দিন আল আজাদ যে লেখক হিসেবে বৈচিত্র্যসন্ধানী, সেটা তিনি আরেকবার প্রমাণ করেছেন ‘কর্ণফুলী’ লিখে। কর্ণফুলী নদী তীরবর্তী এক বিশেষ অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি সেখানকার মানুষের প্রাত্যহিক জীবন, সেই জীবনের আশা-আনন্দ, বেদনা-বিষাদের বর্ণোজ্জ্বল একটি চিত্র পাওয়া যায় উপন্যাসটিতে। তারপরও প্রশ্ন থেকেই যায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার এবং বিষয়বস্তুগত আঞ্চলিকতা নিয়ে। এ দেশে একটি প্রবাদ সুবিদিত। তা হচ্ছে, এক জায়গার বুলি অন্য জায়গার গালি। ‘কর্ণফুলী’ পড়তে পড়তে কথাটির মর্মার্থ অনুভব করি। এ উপন্যাসে প্রযুক্ত ডায়ালেক্ট অকৃত্রিম। কোথাও কোথাও তা খাপও খেয়েছে চমৎকার; কিন্তু চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা সম্বন্ধে সামান্য ধারণাও নেই, এমন পাঠকের কাছে কর্ণফুলীর অনেক চরিত্র সত্যিকার অর্থে দুর্বোধ্য ঠেকবে। এবার আঞ্চলিকতার প্রশ্ন। কোনো বিশেষ আঞ্চলকে পটভূমি করে রচিত হলেই তা প্রকৃত আঞ্চলিক উপন্যাস হয় না; দেখতে হবে তার আবেগ ও মূল সুরটি আরো অনেক অঞ্চলের মানুষকে স্পর্শ করছে কি না, অর্থাৎ শেষ বিচারে অনুভবের সর্বজনীনতাই আসল কথা। তা না থাকলে ‘আঞ্চলিক উপন্যাস’ শব্দবন্ধটির প্রয়োগ পাঠকের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াবে শুধু। ইংল্যান্ডের একটি জনপদ সাসেক্সকে ভিত্তি করে রচিত টমাস হার্ডির ঞবংং ড়ভ ঃযব উ’ঁৎনবৎারষষবং, অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ কিংবা অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘মহিষকুড়ার উপকথা’ বোধহয় সার্থক আঞ্চলিক উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। কেননা এসব লেখার বিষয়বস্তু, উপস্থাপনা, সর্বোপরি জীবনদৃষ্টি সব দেশের সবকালের মানুষকে নাড়া দিতে সক্ষম। সে ধরনের সক্ষমতা কি ‘কর্ণফুলী’ ধারণ করে?
উপন্যাসটিতে লালন, ধলাবির মতো চাকমা ভাষায় কথা বলা চরিত্রও আছে, যাদের মুখের ভাষা সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছে। চাকমা কিন্তু চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপভাষা নয়। আদিবাসী চাকমাদের ভাষার চেহারা সম্পূর্ণ আলাদা। এ ভাষার শব্দাবলী আলাদা, ব্যাকরণ আলাদা। বাক্য গঠনরীতি বাংলা উপভাষা থেকে পৃথক। এতে আছে প্রধানত বার্মিজ (আরাকানি) শব্দে কিছু চট্টগ্রামি উপভাষার শব্দ আর যৎসামান্য বাংলা শব্দ। সে জন্য সাধারণ পাঠকের কাছে বইটির সংলাপমুখর অনেক অংশ দুর্ভেদ্য মনে হওয়া স্বাভাবিক। ঔপন্যাসিক যদি বইয়ের শুরুতেই চাকমা ভাষার এবং চট্টগ্রামের উপভাষার শব্দগুলোর (যেগুলো বইয়ে পৌনপুনিকভাবে ব্যবহৃত) একটা তালিকা দিতেন, তা হতো দূরদর্শিতার পরিচায়ক। সেটা না করে তিনি পাঠককে বিভ্রান্তিতে ভোগার সুযোগ করে দিয়েছেন।
আজাদ প্রথাগত রচনাশৈলীকেই তার কথাসাহিত্যে কাজে লাগিয়েছেন নিজের মতো করে। তার যা কিছু অর্জন তা প্রধানত বিষয়বস্তুভিত্তিক জীবনদর্শন ও শিল্পবিশ্বাসভিত্তিক।
পাঁচের দশকের কথাসাহিত্য প্রসঙ্গে দুটি দিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক. বাঙালি মুসলমান লেখকের আগমন। আর্থ-সামাজিক, ধর্মীয় ও শিক্ষাগত কারণে এ আগমন যথেষ্ট বিলম্বিত হয়েছিল। দুই. পাশ্চাত্যের ভাবধারা প্রভাবিত আধুনিক সাহিত্যের শক্ত ভিত স্থাপন। ভিত অবশ্য কিছুটা তৈরি হয়েছিল মুখ্যত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, গৌনত আবু রুশদ, মাহবুবুল আলম, শাহেদ আলী প্রমুখের হাতে। পঞ্চাশের কথাকাররা তাতে বলিষ্ঠতা যোগ করেন। আলাউদ্দিন আল আজাদসহ তার প্রজন্মের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঔপন্যাসিকের বোঝার স্বার্থে, তাদের রচনাকর্মের উৎকর্ষ অনুধাবন এবং রস গ্রহণের সুবিধার্থে উপরের কথাগুলো মনে রাখা প্রয়োজন।
পাশাপাশি এটাও বিস্মৃত হলে চলবে না যে, সদ্য স্থাপিত পাকিস্তানের মুসলিম জাগরণবাদের যুগের আজাদ নৌকা বেয়েছেন স্রোতের উজানে। বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয়া সস্তা ভাববাদ দ্বারা প্ররোচিত না হয়ে তিনি শিক্ষা নিয়েছেন জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। ওই নতুন অভিজ্ঞতা রসদ জুগিয়েছে নতুন যুগের বার্তাবহ নতুন সাহিত্যের। সে সময় মুক্তমনা আধুনিক ভাবুকদের মিছিলে শামিল হয়েছিলেন অনেকেই। কিন্তু আজাদ তাদের ভেতরেও ব্যতিক্রমী। কেননা সৃষ্টিশীল লেখালেখি ছাড়াও সাহিত্যের রূপ নির্মাণ ও রসনিষ্পত্তি বিষয়ে এবং নান্দনিকতার ব্যাখ্যার ওপর বেশকিছু প্রবন্ধ তিনি লিখেছেন। সেগুলো ‘শিল্পীর সাধনা’, ‘সাহিত্যের আগন্তুক ঋতু’ প্রভৃতি বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে আজাদের শিল্পচেতনা উল্লেখযোগ্য মোড় নেয়। ফলে পাল্টে যায় তার লেখার বিষয় ও ভাবনারীতি। আর্তবিপন্ন মানুষের জীবনসংগ্রাম, মনোবিশ্লেষণ, ফ্রয়েডীয় যৌনতত্ত্ব, আত্মহনন, সুবিধাবাদী রাজনীতি, মানুষের নাছোড় উচ্চাশা, স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বেশি করে জায়গা পায় তার গল্প-উপন্যাসে। উত্তরকালে শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, শহীদুল জহির প্রমুখ লেখক তাদের শিল্পরুচি ও সামর্থ্য দিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যের যে উঁচু মান তৈরি করেছেন, তার পথনির্দেশক তো আজাদের মতো অগ্রজ লেখকরাই। পরের প্রজন্মের শক্তিমান লেখকরা যেমন তাদের শক্তিমত্তা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, তেমনি তাদের ভ্রান্তি থেকেও শিখেছেন অনেক কিছু।
বাংলাদেশের সামগ্রিক সাহিত্যরুচির বিচারে আলাউদ্দিন আল আজাদ একজন অগ্রণী লেখক। বলা উচিত, ষাটের দশকের প্রাগ্রসর গদ্যশিল্পীদের কাছাকাছি তার অবস্থান। গল্প-উপন্যাসে কবিত্বময় ভাষা, বাকনির্মাণের চমৎকারিত্ব যুগোপযোগী ভাবুকতা তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। খুঁটিয়ে পড়লে দেখা যাবে, তার কথাসাহিত্যে নানারকম ত্রুটি আছে। ত্রুটি-বিচ্যুতি কার লেখায় নেই? কিন্তু জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, বিষয়ভাবনা আর লিপিকুশলতার সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে তার ভাবমূর্তি। সেটা বহুদিন পর্যন্ত উজ্জ্বল থাকবে বলেই মনে হয়।