প্রসঙ্গ বিষ প্রয়োগ

গোলাম কাদের
মৃত মাইকেল জ্যাকসনের পোস্টমর্টেমে যদি তার মাদকতা ও বেদনানাশক অতি ওষুধ ব্যবহার নিশ্চিত হওয়া যায়, তবে আমাদের দেশের জীবিত প্রাণপ্রিয় নেতা-নেত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে কেন নিশ্চিত হওয়া যাবে না, কাকে কাকে কী ধরনের, কী পরিমাণ বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। কারণ ডাক্তার ও হেকিমরা বলেন, স্লো পয়জনিংয়ের নির্ঘাত প্রতিক্রিয়া মতিভ্রম, না হয় মানসিক রোগী।

সক্রেটিসকে বিষের পেয়ালা দেয়া হয়েছিল। হেমলক নিজ হস্তে পান করে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তৎকালে গ্রিসের এই মহাপ-িতকে শাসকের বিচারের ফল এভাবেই ভোগ করতে হয়েছে। সম্প্রতি গবেষকরা বলছেন, তৎকালীন বিচার ব্যবস্থায় এভাবে তার মৃত্যু ছিল সঠিক। সক্রেটিসের সময় দেশদ্রোহিতার বিচার ছিল নিজ হস্তে বিষপান করানো। তাই গবেষকরা বলছেন, তৎকালের আইনে বিচার ছিল সঠিক। সক্রেটিস এবং অন্য দু’একটি বিষয় অবতারণা করবো তার মূল কারণ হলো বিষ।
কিছুদিন আগে পত্রিকায় প্রকাশ, পরিবারে পুনঃপুনঃ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের এক জেনারেলের মৃতদেহ দীর্ঘদিন পর কবর থেকে তুলে তার রহস্যজনক মৃত্যুর সুরাহা করা হয়েছে। অর্থাৎ ওই জেনারেলকে প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ যে তার চুলে কলপ লাগাতে সাহায্য করতো, তার মাধ্যমে চুলে কলপের সাহায্যে বিষ প্রয়োগ করতো, স্লো পয়জনিংয়ে জেনারেল বিষক্রিয়ায় মারা যান।
মেনকা গান্ধী পরিবেশবাদী, তিনি একসময় এক বক্তব্য দিয়ে আলোড়ন তোলেন, যমুনা তীরে যে পেঁয়াজ উৎপন্ন হয় তাতে আর্সেনিক বিষ আছে। যারা যমুনা তীরের পেঁয়াজ খাবেন, ধীরে ধীরে তারা বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হবেন। আমরা প্রতিনিয়ত ভারতীয় পেঁয়াজ খাচ্ছি। ‘আমরা কি জেনেশুনে বিষ করেছি পান’ প্রবাদের মতো জীবনকে বিষক্রিয়ার ভেতর ফেলে দিয়েছি। ডাক্তার এবং আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞরা বলেন, কেউ বিষ গ্রহণ করলে অথবা জীবনে স্লো পয়জনিংয়ের শিকার হলে নিশ্চিত তিনি মানসিক রোগী হবেন অথবা তাদের মতিভ্রম হবে।
এখন মূল কথায় আসা যাক। স্বাধীনতা-পরবর্তী আমাদের দেশে রাজনীতিতে, জেল-জুলুম-হত্যা, গুপ্তহত্যা রাজনীতিবিদদের চরম সঙ্কটে ফেলে, যা থেকে আমরা আজো পরিত্রাণ পাইনি। রাষ্ট্র পরিচালনায় আমাদের রাজনীতিবিদরা দক্ষতা দেখানোর আগেই নানাভাবে আক্রান্ত হয়েছেন ও হচ্ছেন। এর কারণও আছে। রাজনীতিবিদরা কখনই দক্ষ-কৌশলী-মূল্যবোধসম্পন্ন রাজনীতিবিদ গড়ে উঠতে সহায়তা করেননি। তারা সহায়তা করেছেন ক্যাডার, মাস্তান, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, লুটেরা, দখলবাজ, জুলুমবাজ তৈরি করতে এবং কোনো না কোনোভাবে রাজনীতিবিদরাই তাদের খ—েগর নিচে বলি হচ্ছেন।
কোনো রাজনৈতিক দলই জাতিকে ভালো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব উপহার দেয়ার জন্য কোনো রাজনৈতিক প্রশিক্ষণশালা গড়ে তোলেনি, যেখানে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ লাভ করবে। জাতি তাদের মূল্যবান কর্মকা- ভোগ করবে। আমরা পাচ্ছি কী, অশিক্ষিত, অদক্ষ, ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ; যারা দেশের চেয়ে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি রাজনৈতিক প্রশিক্ষণশালা খুলেছিলেন, যেখানে মন্ত্রী থেকে সাধারণ রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। তার নিহত হওয়ার পর সেই প্রকল্পটি আর কেউ চালায়নি। প্রত্যেক দলই লোকদেখানো কিছু কর্মশালার আয়োজন করে, তাও ক্ষমতায় এলে। আসলে কর্মশালা হওয়া উচিত প্রতিনিয়ত। সেখানে সর্বাগ্রে থাকা উচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা। সেই কাজটি না হওয়ায় অমানবিক মূল্যবোধে ভারাক্রান্ত রাজনীতিবিদরা দেশের সঙ্কটকালে জড়িত হয়ে পড়ছে উচ্চাভিলাষী গ্রুপের সঙ্গে। যারা শুধু দেশকে পিছিয়ে নিয়েছে এবং নিজেরা এ নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।
আর সেই ষড়যন্ত্রের ফলে মাইনাস টু ফর্মুলা, নির্যাতন, অসাংবিধানিক কার্যক্রম, ক্ষমতার দাপটে চেইন অফ কমান্ড ব্রেক।
এখন সময় এসেছে দেশ ও জাতিকে স্বস্তি দেয়ার জন্য শুধু কাজ আর কাজ করা। কিন্তু আমরা দেখছি শুধুই বিতর্ক এবং সঙ্কট। সঙ্কট উত্তরণের সময় বিতর্ক মোটেই শুভ ফল বয়ে আনবে না। মা দুর্গা সবাই হতে পারে না। দশ হাত প্রতীক। সংসারে অনেকেই, স্বামী-সংসার-চাকরি, সামাজিকতা দেশের ভালো-মন্দ সামাল দেয়। এর মানে এই নয়, একই সময় সব কর্ম করা যায়। সময়-সুযোগবুঝে ধীরে ধীরে সব কাজ করতে হবে, যা করোনি। বাংলাদেশের ঘরে-বাইরে শত্রুর শেষ নেই। এমনকি নেতা-নেত্রীর ঘরে-বাইরে শত্রুর শেষ নেই। আমাদের মহান নেতারাও আক্রান্ত হয়েছেন তাদের খুব কাছের লোকজনের প্ররোচণায়।
বিষ নিয়ে কথা বলছিলাম। এই সরকারের এই ছয় মাস চ্যালেঞ্জ এবং সঙ্কটের মধ্য দিয়ে কাটছে। আর নতুন নতুন সঙ্কট ও চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে। বিরোধী দলকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ফণা উদ্ধত করারও চেষ্টা চলছে। সরকারের এ ব্যর্থ চেষ্টা না করে সম্মিলিতভাবে দেশটিকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করাই এখন সমীচীন, না হয় সামনের সাড়ে চার বছরেও জনগণের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি অর্ধেকও পালিত হবে না বলে অনেকেই মনে করে।
ট্রিপল মার্ডার হয়ে গেল কারওয়ান বাজারে, তাও আওয়ামী লীগের নেতা নিহত হলেন। তারপরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নত। যাক, বিষ নিয়ে কথা বলছিলাম, বিষফোঁড়া নিয়ে নয়। বেশ আগে এক লেখায় বলেছিলাম, চমকের মন্ত্রিসভা দিয়ে চমক সৃষ্টি করা যাবে; কিন্তু ভাইয়ের শত্রু বিভীষণরা তো বসে থাকবে না। সম্প্রতি বিষ নিয়ে কথা উঠিয়েছেন বয়োবৃদ্ধ নেত্রী সাজেদা চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক, উপদেষ্টা এ কথাটি বললে ভালো হতো। বিষয়টি তাদের, কারণ সত্যি সত্যি যদি স্লো পয়জনিং হয়ে থাকে, যে কোনো সময় প্রধানমন্ত্রীর মতিভ্রম হতে পারে, মানসিক রোগী হয়ে যেতে পারেন। তাই অবিলম্বে দেশের স্বার্থেই এর তদন্ত হওয়া জরুরি এবং প্রধানমন্ত্রীর সুচিকিৎসা এ মুহূর্ত থেকেই হওয়া জরুরি। বিশেষ করে যারা গত সরকারের আমলে বিরোধীদলীয় নেতাসহ নেতা-নেত্রী আটক ছিলেন, তাদের সুচিকিৎসার আয়োজন গণতান্ত্রিক সরকারের নেয়া উচিত।
মৃত মাইকেল জ্যাকসনের পোস্টমর্টেমে যদি তার মাদকতা এবং বেদনানাশক অতি ওষুধ ব্যবহার নিশ্চিত হওয়া যায়, তবে আমাদের দেশের জীবিত প্রাণপ্রিয় নেতা-নেত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে কেন নিশ্চিত হওয়া যাবে না, কাকে কাকে কী ধরনের, কী পরিমাণ বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। কারণ ডাক্তার এবং হেকিমরা বলেন, স্লো পয়জনিংয়ের নির্ঘাত প্রতিক্রিয়া মতিভ্রম, না হয় মানসিক রোগী। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত আমাদের দুই নেত্রীকে এই সমূহ সঙ্কট থেকে রক্ষা করুন। না হয় আবার মাইনাস টু ফর্মুলা। বিষ আক্রান্ত মতিভ্রম মানুষ তো রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকতে পারে না। কেউ কেউ এ ফর্মুলা নিয়ে এগোতে পারে, সাধু সাবধান!

গোলাম কাদের: সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সংগঠক।