ফেঁসে যাচ্ছেন ১/১১’র নায়করা

111ফেঁসে যাচ্ছেন ওয়ান ইলেভেনের নায়করা। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সংশ্লিষ্টদের গত দুবছরের কর্মকা- খতিয়ে দেখে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সর্বদলীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে মামলার প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি পুনর্গঠিত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকেও দেশ পরিচালনাকারী গত দুবছরের প্রভাবশালীদের কর্মকা-ের তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মতি রয়েছে বলে একটি বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সূত্রমতে, ওয়ান ইলেভেনের পর বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ও সাজাপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা শেখ হাসিনার কাছে ওদের বিচারের দাবি জানালে তিনি ইতিবাচক মনোভাব দেখান। তিনি অভিযোগকারী নেতাদের বলেছেন, দুদককে পুনর্গঠন করা হয়েছে। তারাই গত দুবছরের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্ত করবে। সেখানে কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না। তিনি নেতাদের দুদকের মাধ্যমে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছেন।
জানা গেছে, এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, সংসদীয় কমিটি ও দুদকে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ জমা হয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ, দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান হাসান মশহুদ চৌধূরী, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ, জাতীয় সমন্বয় কমিটির প্রধান সমন্বয়ক লে. জেনারেল মাসুদউদ্দীন চৌধুরী, সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিন, সাবেক আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে।
এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি বিগত দুবছরের দুদকের অনিয়ম ও দুর্নীতির বেশ কিছু বিষয় চিহ্নিত করেছে। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণ জানতে দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান হাসান মশহুদ চৌধূরী, সাবেক দুদক সচিব, বর্তমান সচিবসহ দুদকের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে কমিটিতে তলব করা হয়েছে। কিন্তু সাবেক সচিব দেলোয়ার হোসেন ছাড়া আর কেউই সংসদীয় কমিটির বৈঠকে যাননি। ২ জুন দেলোয়ার হোসেন কমিটির বৈঠকে উপস্থিত হয়ে সদস্যদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন। ওয়ান ইলেভেনের পর সন্দেহভাজন ৫০ ভিআইপি দুর্নীতিবাজের তালিকার ভিত্তি ও কার নির্দেশে গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয় এ বিষয়টি জানতে চান কমিটির সদস্যরা। জবাবে দেলোয়ার হোসেন বলেন, সে সময় দুদকের চেয়ারম্যান ছিলেন না; যা কিছু হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের সঙ্গে পরামর্শ করেই করা হয়েছে। ভিআইপি রাজনীতিবিদ সম্পর্কে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান ও উপদেষ্টাদের নেতিবাচক মন্তব্যও তিনি কমিটির সদস্যদের জানান। যদিও শেষ পর্যন্ত দুদক সচিব বলেন, দুদক চেয়ারম্যান যোগদানের আগ পর্যন্ত সব কাজের দায়ভার তিনিই নেবেন। কিন্তু কমিটি মনে করে, একজন সচিব কোনোভাবেই এতো বড় দায়িত্ব নিতে পারেন না। অবশ্যই সরকারের জোরালো প্রভাবেই সন্দেহভাজন রাজনীতিকদের তালিকা এবং তাদের গ্রেপ্তার করে হয়রানি করা হয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি মহীউদ্দীন খান আলমগীর যায়যায়দিনকে বলেন, দুদকের সাবেক সচিব দেলোয়ার হোসেন সংসদীয় কমিটিতে হাজির হয়ে তাদের কর্মকা-ের যেসব ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাতে কমিটি সন্তুষ্ট নয়। দুর্নীতিতে সন্দেহভাজন রাজনীতিকদের তালিকা প্রণয়নের বিষয়ে তিনি কোনো যুক্তি দেখাতে পারেননি। তাছাড়া গত দুবছরে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে কোটি কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে ব্যয় দেখিয়েছে দুদক। সংসদীয় কমিটি এসব অনিয়ম খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, কমিটিতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়ার পরও দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান হাজির হননি। কিন্তু তাতে তিনি (হাসান মশহুদ) পার পাবেন না। কমিটি এ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করছে। তাছাড়া তারা কীভাবে আইনের লঙ্ঘন করেছে তা প্রধানমন্ত্রী, আইন মন্ত্রণালয় ও পুনর্গঠিত দুদকে পাঠানো হবে। তাছাড়া মহীউদ্দীন খান আলমগীর নিজেই দুদকের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করবেন বলে স্বীকার করেন। কেন এবং কার নির্দেশে ও কী উদ্দেশ্যে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনি বিষয়টি জানতে আদালতে মামলা করবেন বলে জানান। তিনি বলেন, আগামী ৩০ জুন বাজেট পাসের পর ওয়ান ইলেভেনের মহানায়কদের কর্মকা- খতিয়ে দেখতে সর্বদলীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হবে। কেন এ বিশেষ মহল দেশকে রাজনীতিকশূন্য করার পাঁয়তারা করেছিল তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি সূত্রে জানা গেছে, উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ছাড়াও জাতীয় সমন্বয় কমিটির প্রধান সমন্বয়ক লে. জেনারেল মাসুদউদ্দীন চৌধুরীর বিরুদ্ধেও রাজনীতিকদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। গ্রেপ্তারকৃত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেয়া ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার আইনগত ব্যাখ্যা চাওয়া হবে তার কাছে। সরকারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আইন বহির্ভূতভাবে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা নেয়া ডাকাতির শামিল। সংসদীয় কমিটি প্রাথমিক তদন্ত শেষে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাঠাবে দুদকে। পুনর্গঠিত দুদকের মাধ্যমেই অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। দেশে যেহেতু গত দুবছর জরুরি অবস্থা বলবৎ ছিল সে কারণে সাবেক সেনাপ্রধানও এসব বিষয়ের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বলে মনে করেন কমিটির সদস্যরা।
জানা গেছে, দেশের দুই বড় দলের প্রধান শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হয়রানিমূলক মামলা নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। কাদের নির্দেশে এসব মামলা হয়েছেÑ মামলা দায়েরকারীদের কাছ থেকে তার ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। এরই মধ্যে এসব মামলার বাদীরা তৎকালীন আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনসহ কয়েক সেনা কর্মকর্তার চাপের কথা বলেছেন বলে জানা গেছে।
তবে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইনের বিচারের দাবিতে বেশি সোচ্চার বিরোধী দল বিএনপি। একই সঙ্গে তারা সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের কর্মকা- খতিয়ে দেখারও দাবি জানিয়েছেন। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলেন, কোন প্রেক্ষাপটে জেনারেল মইন তার পদের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়েছেন তা খতিয়ে দেখতে হবে। তাকে সহায়তা করার জন্য সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ও ফখরুদ্দীন আহমদকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে। এ তিনজনকে আইএমএফ (ইয়াজউদ্দিন, মইন ও ফখরুদ্দীন আহমদ) বলে আখ্যায়িত করে বিচারের দাবি জানান তারা।
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গত দুবছরের কর্মকা- খতিয়ে দেখতে সর্বদলীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান। তিনি বলেন, দেশকে অকার্যকর করার পরিকল্পনা তারা হাতে নিয়েছিল। তাদের অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত। বিরোধী দলের প্রধান হুইপ জয়নাল আবেদীন ফারুক বলেন, বাজেট অধিবেশনে যোগ দিলে তারা আইএমএফের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে সর্বদলীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানাবেন।
সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, তাকে অহেতুক হয়রানি করার জন্য তৎকালীন দুদক ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করবেন। মামলার প্রস্তুতি এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বলেও তিনি জানান। তিনি পুরো ঘটনার সঙ্গে ইয়াজউদ্দিনও জড়িত বলে দাবি করেন। ইকবাল হাসান আরো বলেন, শুধু তিনি নন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ খলনায়কদের বিরুদ্ধে শতাধিক মানহানির মামলা হবে। তিনি বর্তমান সরকারকে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কোনোভাবে যদি ষড়যন্ত্রকারী মহলটি পার পেয়ে যায় তাহলে সংসদীয় রাজনীতির জন্য এটি খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। অন্যায়ভাবে রাজনীতিবিদদের যেভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হেয় প্রতিপন্ন করেছে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই সরকারকে ইতিবাচক হতে হবে।
এদিকে সাবেক যোগাযোগ উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দরের চাঞ্চল্যকর দুটি অনিয়মের ঘটনা নিয়ে সংসদীয় কমিটির তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিভাবকহীন একটি কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক উপদেষ্টা এম এ মতিনকে তলব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদীয় কমিটি। ক্ষমতা হস্তান্তরের মাত্র দুমাস আগে চট্টগ্রাম বন্দরের বিতর্কিত ১০ কোটিপতি পাইলটের চাকরির সময়সীমা তিন বছর বাড়িয়ে ৫৭ বছর থেকে ৬০-এ উন্নীতকরণে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। তার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির মামলা করা হবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সিনিয়র সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও মনে করেন, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের কাজের তদন্ত হওয়া উচিত। এজন্য তিনি সবচেয়ে বেশি দোষারোপ করেন ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে। তিনি বলেন, গত দুবছরে অনেক অন্যায়-অনিয়ম হয়েছে। যারা ক্ষমতা হাতে পেয়েই অনিয়ম-অন্যায় করেছেন তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া উচিত। তিনি সংসদেও সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় ফখরুদ্দীন, ইয়াজউদ্দিন ও সাবেক সেনাপ্রধানের কর্মকা-ের সমালোচনা করেছেন। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান রাশেদ খান মেনন বলেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। আমি মনে করি, গত দুবছরের ঘটনাবলীর তদন্ত হওয়া উচিত।
দুদক সূত্র জানায়, দুর্নীতি দমন কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের যোগদানের পর বিগত দুই বছরের অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত শুরু হবে।

http://www.jaijaidin.com/details.php?nid=137063