এলিস ওয়াকার উপন্যাসের নতুন ভুবন

সরকার মাসুদ
আফ্রো-আমেরিকান লেখা এলিস ওয়াকারকে কি আমরা নারীবাদী বলবো? তা হয়তো বলবো না। কিন্তু তিনি নারীর এমন কিছু সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন যা অনেক নারীবাদী লেখকেরও দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। এলিস দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন কথাসাহিত্যের মাধ্যমে Mutilation (বিক্ষতকরণ)-এর বিরোধিতা করে। শুধু তাই না, আফ্রিকান নারীরা আরো যত রকমভাবে নিগৃহীত-নির্যাতিত হয়ে থাকে সেসবও উপজীব্য হয়েছে তার উপন্যাসে। বিষয়টি একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার। আফ্রিকার আদিবাসীদের মধ্যে এই শতাব্দীতেও প্রাচীন বিশ্বাস এখনো অটুট যে, কাদার পি- থেকে মানুষরূপে প্রাণীর উদ্ভব। আদি পিতা বা বিধাতা কাদার পি- ছুড়ে মেরেছিলেন বিভিন্ন দিকে। এভাবে পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণের সৃষ্টি হয়। সৃষ্টিকর্তা ‘আম্মা’ প্রথমে যে মানুষের শরীর সৃষ্টি করলেন তা একটি নারীর দেহ। দেহটি পিঠ মাটিতে রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলো। ‘আম্মা’ দীর্ঘ দীর্ঘকাল একা ছিলেন। নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য তিনি রমণী শরীর সৃষ্টি করে তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার চেষ্টা করেন। সঙ্গমের কাজে তিনি বাধাপ্রাপ্ত হন। তার কারণ নারীর যৌনাঙ্গে পুরুষসুলভ কিছু শক্ত ব্যাপার ছিল। ‘আম্মা’ তখন রমণীর যোনি থেকে কিছু কঠিন অংশ ছেঁটে ফেলে দেন। এভাবে নারীর যৌনাঙ্গ বিক্ষত করার প্রথাটি চালু হয়।

আফ্রিকার আদিবাসীরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, কোনো পুরুষ অথবা নারী একসঙ্গে নারী-পুরুষ হতে পারে না। পুরুষকে পুরুষই হতে হবে এবং নারীকে তার সব বৈশিষ্ট্য নিয়ে নারী। ফলে পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগের চামড়া এবং নারীর ভগাঙ্কুর ছেঁটে ফেলার প্রয়োজন দেখা দেয়। এভাবে পুরুষ যৌনতার ক্ষেত্রে তার নিজত্ব প্রতিষ্ঠিত করে। সুদীর্ঘকাল প্রথাটি চালু আছে আফ্রিকায়। কেবল সাধারণ মহিলাদের বেলায় নয়, এটি প্রযোজ্য হয়েছিল ক্লিওপেট্রা, নেফারতিতি প্রমুখ কুলীন নারীদের বেলায়ও। আজ যারা আফ্রো-আমেরিকান তাদের মধ্যেও প্রথাটি অস্তিমান। আফ্রিকা ও আমেরিকা ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের অসংখ্য নারী এই প্রথার কবলে পড়ে বিক্ষতযোনি হয়েছে। এর ফলে মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণ কিংবা ইনফেকশনের কারণে লাখ লাখ নারী প্রাণ হারিয়েছে; হারাচ্ছে এখনো। গত শতাব্দীর আশির দশকে প্রথাটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অঙ্কুরিত হয়। ইউরোপে এখন এর প্রতিবাদ সোচ্চার। জাতিসংঘের বক্তব্যের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সে অঞ্চলের মানুষ বলছে, নারী শরীরের নিজস্বতার ভেতর দিয়েই তার ব্যক্তিসত্তার ও আনন্দের প্রকাশ ঘটে থাকে। এটা তার একান্ত নিজের বিষয়। তার ওই নিজস্বতাকে বিকৃত করার অধিকার নেই কারো। ইউরোপের বাইরেও অগ্রসর মানবগোষ্ঠীর মধ্যে এই মত দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। Mutilation ইতিপূর্বেই প্রবন্ধের বিষয়বস্তু হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কথাসাহিত্য প্রথম রচিত হয়েছে এলিস ওয়াকারের হাতে। এ বিষয়ে এলিস একাধিক উপন্যাস লিখেছেন। আমি তিনটির নাম বলবো
১. Possessing the secret of joy
২. The Color Purple
৩.The Temple of my Familiar.
প্রথম উপন্যাস ‘দ্য কালার পারপল’ দুটি পুরস্কার জিতে নেয়। একটি হচ্ছেÑ ‘আমেরিকান বুক অ্যাওয়ার্ড’ অন্যটি ‘পুলিৎজার প্রাইজ’।
Possessing the secret of joy সম্বন্ধে আলোচনা করা যাক প্রথমে। ইংরেজি নামটির বাংলা করলে দাঁড়াবে ‘আনন্দের রহস্যের অধিকার লাভ’। কথাটির দ্বারা লেখক কি বুঝিয়েছেন? দেহসম্পর্কিত পূর্ণ অধিকার থেকে একজন নারী যে অপরিসীম আনন্দ পায়, অন্য কোনো উপায়ে সে তা পায় না। নারীর আনন্দের এই অধিকার জন্মগত। সৃষ্টি প্রক্রিয়ার কারণে ঈশ্বর তাকে যেসব বিশিষ্ট অঙ্গের এবং রমণীসুলভ যেসব অনুভূতির অধিকারী করে তুলেছে তাকে বিকৃত বা নষ্ট করতে পারে না কেউ। নারীসুলভ সজীবতা আর রহস্য তার একান্ত নিজের জিনিস। এটাকে সংরক্ষণ করার অধিকার আছে বিশ্বের প্রতিটি নারীর। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষ যখনই তার নিজস্ব যৌনতার রূপ নির্মাণ করতে চাইলো, গোলমালটা লাগলো তখনই। কেননা নারী অঙ্গ বিক্ষত করার ভেতর দিয়ে নারীকে শারীরিকভাবে উপভোগের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। `Possessing the secret of joy’’ উপন্যাসে এলিস ওয়াকার তাশি নামের এক আফ্রিকান নারীর জীবন কাহিনীর ভেতর দিয়ে রমণীর এই অধিকারের কথা ব্যক্ত করেছেন। লেখক তাশিকে আফ্রিকা এবং ইউরোপের বিপরীতধর্মী দুই ধরনের সংস্কৃতি-সংস্কারের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। তাশির শৈশব-কৈশোর অতিবাহিত হয় আফ্রিকার সংস্কারাচ্ছন্ন আদিম সমাজে। যৌবনের বেশিরভাগ সময় সে কাটিয়েছে উত্তর আমেরিকায়। জীবনের গোড়ার দিকে আফ্রিকায় থাকার ফলে সে দেশের সংস্কার ও প্রথার প্রতি তার অনুগত্য জন্মেছিল। সুতরাং যৌনাঙ্গ বিক্ষত করার বিষয়টি সহজভাবে মেনে নিয়েছিল সে। সে জন্য পরে অবশ্য তাকে অনেক ভুগতে হয়।

আফ্রিকায় যৌনি বিকৃত করার কাজে নিয়োজিত মহিলাদের বলা হয় ‘সুঙ্গা’। সুঙ্গার ধারালো চাকুর কাজটিকে মেনে নিলেও তাশির শরীরে ও মনে যে ভীতির সঞ্চার হয়েছিল তা থেকে সে নিষ্কৃতি পায়নি। `trauma’’-এর (দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত) অভিজ্ঞতা তাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। মাঝে মাঝে তাশি ভাবে, সে উন্মাদ হয়ে যাবে যদিও সে মানসিক ভারসাম্য শেষ পর্যন্ত হারায়নি। ইউরোপের উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে সে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে গেছে। এ ক্ষেত্রে মনঃসমীক্ষণ পদ্ধতিটি তার খুব কাজে লেগেছিল।

সুস্থ হওয়ার পর তাশি একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজেফেরে। কি কারণে নারীর যৌনাঙ্গ বিকৃত করার নিষ্ঠুর প্রথাটি প্রবর্তিত হয়েছিল আফ্রিকার আদিম সমাজে? সে প্রাচীন আফ্রিকার নানারকম মিথ-এর সন্ধান করতে থাকে। তাশির মন থেকে অবশেষে ভীতি দূর হয়, যখন সে এই প্রথার পেছনের কারণটি জানতে পারে। তার মধ্যে দার্শনিকসুলভ একটি বোধ জাগে। জীবন ও মৃত্যু সম্বন্ধে সে সচেতন হয়ে ওঠে। মৃত্যুচেতনা তার মধ্যে বরাভয়ের জন্ম দেয়। তাছাড়া তার নিজের ভাগ্যে এবং হাজার হাজার আফ্রিকান নারীর ভাগ্য অভিন্ন এমনটা ভেবে তাশি সান্ত¡না খুঁজে পায়। মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে যে উপলব্ধি করে তার মনে ভয়ের লেশমাত্র নেই।

তাশির শৈশব-কৈশরের শান্তি নিরুদ্বেগ ও মধুর ছবি এঁকেছেন এলিস। তার যৌবনকালের একটি বড় অংশ জিজ্ঞাসাদীর্ণ এবং বেদনাময়। জীবনের শেষ অধ্যায়টি শঙ্কামুক্ত ও প্রবোধনিবিড়। ছেলেবেলায় তাশির মা তাকে খুচরা পয়সা দিয়ে মহল্লার দোকানে পাঠাতো দিয়াশলাই কিনতে। কিন্তু প্রতিবারই সে দিয়াশলাই আনতে ব্যর্থ হতো, কারণ পয়সা হারিয়ে ফেলতো। আর মায়ের প্রহারের হাত থেকে বাঁচার জন্য পয়সা হারানোর রূপকথাসুলভ একটি গল্প বলতো। ক্রুদ্ধ মায়ের তিরস্কার থেকে অবশ্য সে রেহাই পেতো না। বকাঝকা খেয়ে তাশি কান্না শুরু করে দিতো। তার দুগাল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়তো। দিয়াশলাই এবং অশ্রু এই উপন্যাসের দুটি শক্তিশালী প্রতীক বলে মনে হয়। তাশি আগুন জ্বালাতে পারেনি, বরঞ্চ নিজেই নিভে গেছে। সে কি পুরোপুরি নিভে গিয়েছিল, নাকি নিভু-নিভু অবস্থায় ছিল, এই প্রশ্নটি করা যায়। কেননা, ভেতরে যদি আগুন না-ই থাকবে, তাহলে সুঙ্গা মহিলাটিকে (যে তার ভগাঙ্কুর উচ্ছেদ করেছিল) খুন করলো কীভাবে? শৈশবের ওই যে কান্না, সেটাই যেন তাশির সারাজীবনের দুর্ভাগ্যের প্রতীক।

আমৃত্যু বঞ্চনার তিক্ত অভিজ্ঞতা বয়ে বেড়িয়েছে সে, তা সত্ত্বেও হাল ছাড়েনি; স্বপ্ন দেখার চেষ্টা করে গেছে।
পাঠকের মনে হতে পারে, তাশি খুন করতে গেল কেন। কিন্তু সংবেদি পাঠকের এও মনে হতে পারে যে, এছাড়া তার অন্য কোনো উপায় ছিল না। প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে খুন করা অথবা উন্মাদ হয়ে যাওয়া, এর মাঝখানে আর কোনো বিকল্প ছিল না। গভীর মনোবেদনার জটিল আবর্তে ঘুরপাক খেতে খেতে তাশি এক সময় সুঙ্গা রমণীটিকে হত্যাই করে বসে। আসামি হিসেবে যে যখন বিচারের কাঠগড়ায় তখন সে বুঝতে পেরেছিল, তাকে মৃত্যুদ- দেয়া হবে। তাশি কিন্তু মৃত্যুভয়ে কাতর ছিল না আদৌ, বরং মনে মনে তৈরিই ছিল। এই প্রস্তুতির কথা সে কাউকে বলতে চাচ্ছিল, অথচ জীবিত কোনো ব্যক্তিকে তা জানাতেও পারছিল না। সে তাই একজন প্রয়াত ব্যক্তিকে বেছে নেয় যার উদ্দেশ্যে সে চিঠি লিখবে। এই মৃত ব্যক্তিটি তাশির বান্ধবী একমাত্র বান্ধবী লিসেথ। তার সম্বন্ধে তাশি চিঠির গোড়াতেই লিখেছে যে, মৃত্যুর পরে পরলোকে তার একজন সঙ্গীনীর প্রয়োজন পড়বে। সে জন্য সে আশা করে, লিসেথের সঙ্গেই তার দেখা হবে সেখানে। লিসেথই তো একমাত্র মেয়ে যার সঙ্গে তার প্রকৃত ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং যাকে সে গভীরভাবে ভালোবাসতো।

মাধুর্য, বেদনা, স্বপ্ন ও কল্পনা এই চারটি জিনিস দিয়ে তৈরি হয়েছে তাশির প্রতিমা। শেষের দিকে স্বপ্ন-কল্পনাই হয়েছিল তার একমাত্র আশ্রয়। সে যে তার আহূত-বেদনার্ত মনের গোপন কথা খুলে বলার জন্য জীবিত কাউকে নয়, বরং মৃত একজনকে নির্বাচন করেছিল এবং তাকে লক্ষ্য করে চিঠি লিখেছে সেটা তো প্রচ- কল্পনাপ্রবণ মনের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া অন্যকিছু নয়। চিঠিতে তাশি ইনিয়েবিনিয়ে অনেক কথাই বলেছে। সে লিখেছে ‘… আমার মায়ের নিজস্ব জিনিস যেভাবে বিকৃত করা হয়েছিল, আমার বেলায়ও তাই করা হয়েছিল। আমার বোন দুরা একজন সুুঙ্গার ছুরির ঘায়ে মারা গেছে, তার রক্তপাত বন্ধ করা যায়নি। মায়ের কষ্টটা আমি বুঝতাম। সে জন্য আমি সুঙ্গা নারীকে খুন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সুঙ্গারা বিশ্বাস করে যে, তাদের ছুরির আঘাতে যেসব মেয়ের নিজস্বতা ক্ষুণœ হয় তাদের মধ্যে কেউ না কেউ তাদের (সুঙ্গা) মেরে ফেলবে। সে জন্য যে সুঙ্গার অস্ত্রাঘাতে আমার বোন মারা পড়েছিল এবং আমি চিরকালের জন্য নিঃসঙ্গ হয়ে গিয়েছিলাম তাকে আমি খুন করেছি। আমি অস্ত্র দিয়ে তাকে হত্যা করিনি। ঘুমন্ত অবস্থায় মুখে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরেছি। আমি যে তাকে শুধু আমার জন্য খুন করেছি তা নয়। বহু যুগ ধরে যেসব নারী তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারিয়ে আনন্দের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে তাদের সবার পক্ষ থেকে আমি এ কাজ করেছি। সে জন্য আমার অপরাধবোধ নেই। আমি জানি, আফ্রিকার নারীরা এক সময় কত স্বাধীন ছিল। তাদের দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর তাদের পূর্ণ অধিকার ছিল, নিজেদের শরীরকে তারা জানতো। কিন্তু পশ্চিমা জগৎ তাদের দাসিতে রূপান্তর করে আর তখনই নেমে আসে অভিশাপ। আমার বিশ্বাস আফ্রিকার নারীরাই বিশ্বের তাবৎ নারীর মাতা। রমণী হিসেবে যদি কোনো জাতির নারী খুব কষ্ট পেয়ে থাকে এবং অসম্ভব অসহায়তার শিকার হয়ে থাকে তাহলে তারা হচ্ছে আফ্রিকার নারী। আমাকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে নিয়ে যাওয়া হবে যখন, আমি আমার চোখ দুটি বাঁধতে দেবো না। জীবনের শেষ মুহূর্তে চারপাশটা তাকিয়ে দেখবো অনেক দূরে যে পাহাড়টা নীল মনে হবে তার সৌন্দর্য উপভোগ করবো আর সেই মুহূর্তটিই হবে আমার অনন্ত মুহূর্ত।’ (অনুবাদ : লেখক)।

উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে এলিস ওয়াকার বেশ কায়দা-কৌশল অবলম্বন করেছেন। কখনো ধারাবাহিকভাবে গল্প বলে গেছেন, কখনো আবার পারম্পর্য ভেঙে দিয়েছেন। আবার ভাঙা জায়গাগুলো জোড়া লাগিয়েছেন। একটি কথা বলতে বলতে এসে যাচ্ছে অনেক কথা। কাহিনীর ভেতর নানা অনুসঙ্গ এসে ভিড় করেছে। একবার স্মৃতিকথা, একবার সংলাপ, একবার মানসিক যন্ত্রণার ব্যাখ্যা-বয়ান, আবার লেখকের বিশ্বাসজাত প্রতিবেদনও আছে। সব মিলে উপন্যাসের যে রূপকথা নির্মিত হয়েছে এক কথায় তা অসাধারণ।
`The Color purple’ উপন্যাসটি বের হয় ১৯৮২ সালে। এলিস ওয়াকার প্রধানত এই বইটির জন্য ‘পুলিৎজার প্রাইজ’ পেয়েছিলেন। এটাই তার খ্যাতি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাংলা করলে বইটির নাম দাঁড়ায় ‘বেগুনি-লাল রঙ’। একজন বঞ্চিত-নির্যাতিত নারীর জীবনযন্ত্রণা এবং তা অতিক্রম করে যাওয়ার চেষ্টাই হচ্ছে এই উপন্যাসের প্রধান থিম। মহিলাটির নাম চেলি। অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে চেলির ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবনের কথা বয়ান করেছেন লেখক। নানারকম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে সে। কৈশরের (১৪ বছর বয়সে) পিতা তাকে ধর্ষণ করে। এই দুর্ঘটনাটি তার কোমল মনে দূরবিসারী প্রভাব ফেলেছিল। সেই দুঃসহ স্মৃতি সে কোনোভাবেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি।

‘দ্য কালার পারপল’ পড়ার সময় একই সঙ্গে বেদনার ও আনন্দের অনুভূতি হয়। তিক্ততার অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে আছে এর পাতায় পাতায়। কিন্তু শত নিগ্রহ-অবমাননার পরেও লেখক জীবনকে অস্বীকার করেননি। উপন্যাসটি চিঠির আকারে রচিত। একটি নয়, একাধিক চিঠি পাওয়া যায়। বেশিরভাগই ঈশ্বরের উদ্দেশে লেখা। ঈশ্বরের উদ্দেশে কেন? কারণ ধর্ষিতা নারী তার মনোকষ্টের কথা পৃথিবীর মানুষের কাছে জানাতে পারেনি। পৃথিবীতে যা কিছু ঘটছে সবই ঈশ্বরের নখদর্পণে। কাজেই অসহায় রমণীরা কতটা বিড়ম্বনা ও আত্মগ্লানির মধ্যে দিনাতিপাত করছে তাও তার ভালো করেই জানা। তাছাড়া ঈশ্বরই তো সেই অস্তিত্বের নাম যার কাছে একান্তে প্রার্থনা করা যায়, নালিশ জানানো যায় এবং যার ওপর নির্ভর করা যায়। চেলি জানতো তার একটি চিঠিও ঈশ্বর মহাশয় পাবেন না; পাওয়া সম্ভব নয়। তা সত্ত্বেও সে চিঠিগুলো লিখেছে। এসব চিঠি সে পুরুষ তো দূরের কথা, কোনো নারীর কাছেও লিখতে পারতো না। কেননা সে এমন এক হতভাগ্য মেয়ে, যে তার পিতার দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে। চিঠিগুলো লেখার ফলে চেলি অবশ্য একটা বড় উপকার পেয়েছে। আত্মদুর্দশার কথা প্রকাশ করতে পারায় মনোবেদনা লাঘব হয়েছে অনেকখানি।

সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে চিঠি লিখতে লিখতে একটা পর্যায়ে চেলি শঙ্কামুক্ত হয়; সান্ত¡নার অনূভূতি জন্ম নেয় তার মনে। সেই সঙ্গে পৃথিবীর মানুষের ওপর আস্থা রাখতে শেখে ধীরে ধীরে। বোন নেটটিকে সে বিশ্বাস করতে শুরু করে। নেটটি তাকে চিঠি লেখে। সেই চিঠি তার বিক্ষিপ্ত মনে সান্ত¡না ও শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেয়। সবকিছু স্বাভাবিক হতে আরম্ভ করে। নেটটির পাঠানো চিঠিগুলো কেবল সান্ত¡না আর বরাভয়ই তুলে ধরেনি, আদিম আফ্রিকার ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা তথ্যও পরিবেশন করেছে। ইউরোপ যখন নগর সভ্যতার পত্তন হয়নি তখন, হাজার বছর আগে, আফ্রিকায় গড়ে উঠেছিল বড় বড় শহর। মিসরের প্রাচীন মানুষদের দ্বারাই নির্মিত হয়েছে পিরামিড। সে সময় দাস হিসেবে কাজ করতো কৃষ্ণবর্ণ ইসরায়েলরা। ইথিওপিয়া আফ্রিকার একটি বড় দেশ। কিন্তু সেই প্রাচীন যুগে ইথিওপিয়া বলতে সাধারণভাবে আফ্রিকাকেই বোঝাতো। এরকম আরো অনেককিছু আমরা জানতে পারি ওইসব চিঠির মাধ্যমে।

‘দ্য কালার পারপল’ উপন্যাসের ভেতর দিয়ে এলিস ওয়াকার ঈশ্বরের প্রতি প্রগাঢ় আস্থা এবং গভীর জীবনবাদিতা ফুটিয়ে তুলেছেন। অন্তর্লীন বেদনা আর উত্তরণ-উন্মুখ আত্মজিজ্ঞাসার পাশাপাশি পরিপক্ব এক আধুনিক লিপিকৌশল বইটিকে দিয়েছে উচ্চ স্তরের সাহিত্যকর্মের মর্যাদা। শুধু বিষয়বস্তু নয়, আঙ্গিক নিয়েও এবং প্রকাশ ভঙ্গির বৈচিত্র্য নিয়েও এলিস চিন্তাভাবনা করেন মনে হয়। উপন্যাসে স্থান পাওয়া সর্বশেষ চিঠিটি কেবল ঈশ্বরকে লক্ষ্য করে রচিত নয়। আরো নানাকিছুকে উদ্দেশ্য করে তা লেখা হয়েছে; সম্বোধনও করা হয়েছে সেভাবেই ‘হে প্রিয় ঈশ্বর প্রিয় তারাম-লী, প্রিয় গাছপালা, প্রিয় আকাশ, প্রিয় মানবজাতি …।’ বইটি পড়া শেষ করলে সব দুঃখ-দুর্দশাবোধের পাশাপাশি পাঠকের মনে গভীর সহানুভূতি ও ভালোলাগার অনুভূতি জাগবে। অন্য একটি চিঠিতে চেলির উদ্দেশে নেটটি লিখেছেÑ ‘পৃথিবীর মানুষ আমাদের জানতে চায়, সব দেশের কালো মানুষরা চায় আমরা আলো-বাতাসের মধ্যে থাকি, আমরা যেন বড় হই। তাদের ইচ্ছা, আমরা অতীতের দাসত্বের অনুভব অতিক্রম করে যাবো। আমাদের যে সন্তানরা আছে, তাদের আমরা যেভাবেই পাই না কেন, তারা তো ঈশ্বরেরই সন্তান আবার আমাদেরও সন্তান। এখন তাদের স্বার্থেই আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমেরিকায় থাকলেও আমরা আফ্রিকার অন্তরে অবস্থান করছি’। (অনুবাদ : লেখক)

এই উপন্যাসে আমরা যেসব চরিত্রের মুখোমুখি হই তারা খুব জীবন্ত। কোনো সন্দেহ নেই, এলিস রূপ নির্মাণে সুদক্ষ শিল্পী। এমনভাবে, এমনই মুন্সিআনার সঙ্গে তিনি চরিত্র সব সৃষ্টি করছেন যেন আমাদের সামনে তারা হেঁটে বেড়াচ্ছে। কেন্দ্রীয় চরিত্র চেলি তো আছেই, তাছাড়া নেটটি, হাজেরা, দুরা, লম্পট আলবার্ট যে কি না চেলি ও নেটটি দুই বোনের কাছে সাক্ষাৎ আতঙ্কের নাম, প্রভৃতি চরিত্র খুব সফলভাবে চিত্রিত হয়েছে উপন্যাসে। এলিসের গদ্য উল্লেখ করার মতো চরিত্রপাত্রের ছবি আঁকতে আঁকতে কিংবা কোনো পরিস্থিতি বর্ণনা করতে করতে লেখক নিজের কথা বলার জন্য ঢুকে পড়েন। এবং এমন ভঙ্গিতে কথা বলেন যে, অনায়াসে সেসব কথা কাহিনীর মূল স্রোতের সঙ্গে মিশে যায়।

এলিস ওয়াকার পরিশ্রমী লেখক। প্রায় গবেষকের সন্ধিৎসা নিয়ে তিনি কথাসাহিত্য রচনা করছেন। `Possessing the secret of joy’ সম্বন্ধে এ কথা বেশি প্রযোজ্য। তার কারণ আফ্রিকার আদিবাসীদের ভেতর সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কিত ধারণার ঐক্য নেই। তাদের মধ্যে অসংখ্য গোষ্ঠী, উপগোষ্ঠী এবং এক জাতিসত্তার ভাবনা-কল্পনার সঙ্গে অন্য জাতিসত্তার চিন্তাধারার খুব কমই মিল আছে। যে কারণে নারীর যৌনাঙ্গ বিকৃত করার বিষয়টি সম্বন্ধে বিস্তারিত জানার জন্য লেখককে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। `The color purple’ উপন্যাসে চেলিকে লেখা চিঠির এক জায়গায় নেটটি লিখেছিল … ‘আমেরিকায় থাকলেও আমরা বাস করছি আফ্রিকার অন্তরে।’ এটা তো আসলে ঔপন্যাসিকেরই মনের কথা। তার লেখকসত্তা আফ্রিকার হৃদয়ে বাস করে বলেই এ জাতীয় উপন্যাস তিনি লিখতে পেরেছেন।