কালো টাকা ‘সাদা’ করার ব্যাপারটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদের বদলে আপস

অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী:
অর্থমন্ত্রী জাতির সামনে একটি সুবৃহৎ এবং উচ্চাভিলাষী বাজেট উপস্থাপন করেছেন। এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারলে সবার আগে আমাদের দলের তরফ থেকে অভিনন্দন জানাব। বাংলাদেশের মতো একটি দেশের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য ‘উচ্চাভিলাষী ও বিপ্লবী’ বাজেট প্রয়োজন।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী যেখানে বিশ্বমন্দার চ্যালেঞ্জের মুখে শতকরা ৮ থেকে ৯ ভাগ প্রবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছেন সেখানে আমাদের অর্থমন্ত্রীর ৫ দশমিক ৫ ভাগ প্রবৃদ্ধির ঘোষণা আসলে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য ‘বিপ্লবী ও উচ্চাভিলাষী’ এমন প্রমাণ করে না।

অর্থনৈতিক সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিতবহ বাজেট বাস্তবায়ন সহজ কাজ নয়। এর জন্য শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন (১) মন্ত্রীদের অভিজ্ঞতা ও যোগ্য নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীলতা। (২) একইসঙ্গে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সচিবসহ মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং আন্তরিকতা। অর্থমন্ত্রী অর্থ সংগ্রহ, সরবরাহ এবং মনিটর করলেও নেতৃত্ব ও বাস্তবায়ন সংকট যেন না হয় তা প্রধানমন্ত্রীকে কঠোরভাবে লক্ষ রাখতে হবে।

বিগত বাজেটে বিশেষ করে সরকারের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত কর্মচারীদের ‘ইনসেনটিভ’ প্রদান আয়বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে অনেকাংশে সফল করেছে। বেতন বৃদ্ধির চেয়ে দক্ষ কর্মচারীদের যথেষ্ট ‘ইনসেনটিভ’ অনেক বেশি কার্যকর হয় এবং যোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাজের স্বীকৃতি দেয়া হয়।

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি এবং মোবাইল ফোন আজকের জীবনের সর্বক্ষেত্রে মান উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি। এগুলো আজকে ‘লাক্সারি আইটেম’ নয়। এই বিবেচনায় এই দুটি বিষয়ে করারোপ করলেও তা সহনীয় হওয়া উচিত ছিলÑ না হলে তাদের ব্যবহার কমে সরকারের আয় হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

কালো টাকা মাত্র ১০ শতাংশ ট্যাক্স দিয়ে ‘সাদা’ করার ব্যাপারটি মূলত ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদের বদলে আপসের’ নামান্তর। ক্রমাগত তিনবছর এই অনৈতিক সুযোগ দিলে এর প্রতিক্রিয়া হবে

(ক) সাধারণ করদাতারা ২০-২৫ শতাংশ কর দিতে নিরুৎসাহিত হবে। বরং সাধারণ (শিল্প-বাণিজ্য বাদে) করদাতাদের ১০-১৫ শতাংশ উচ্চতম কর নির্ধারণ করে করের আওতা (tax net) বিপুলভাবে বাড়ানো সম্ভব।

(খ) দুর্নীতি এবং অসামাজিক অর্থ উপার্জনের প্রবণতা বাড়বে। মাত্র ১০ শতাংশ রেহাই দেয়া এবং উৎস খোঁজা হবে এ দুটিই তাদের প্ররোচিত করবে না দুর্নীতি করতে।

(গ) কালো টাকার মালিকদের অনেকেই ট্যাক্স অফিসারদের সহজে দুর্নীতি করতে প্ররোচিত করবে।

(ঘ) অবৈধ অর্থে বাড়ি কেনা ‘জায়েজ’ কাদের স্বার্থে করা হয়েছে?

বাজেটের উদ্দেশ্য মঙ্গলমুখী, কিন্তু উল্লিখিত ক্ষেত্রগুলিতে সংশোধন ও পরিমার্জন প্রয়োজন। যে ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই বিরাট আকারের বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব সেদিকে নজর রাখতে হবে।

তাই প্রতি তিন মাস পরপর জাতির সামনে এই বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতির/ব্যর্থতার বিষয়টি জনগণের সামনে হাজির করতে হবে। এই স্বচ্ছতার মাধ্যমে একটি নবদিগন্ত উšে§াচিত হতে পারে।

http://www.munshigonj.com/MGarticles/2009/BCkalotaka.htm