কালো টাকার প্রভাবমুক্ত উজ্জ্বল গতিশীল বাংলাদেশ সবার কাম্য

গোলাম কাদের
কালো টাকা সাদাকরণ হয়তো সাময়িক সুফল সরকার আশা করে, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী কুফল তো সমাজে রয়েই যায়। দুর্নীতি, লুটপাট, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, কর ফাঁকিবাজি, ঘুষ, গুপ্তহত্যা, অস্ত্র ব্যবসা, জবরদখলকৃত টাকার অঙ্ক অর্থনীতির মূলস্রোতে এসে সরকারের অনেক ইতিবাচক কর্মকা- তছনছ করে দেয়। এ ঝুঁকি নিয়েই লাখ কোটি টাকার বাজেটে তিন বছরের জন্য এ অনৈতিক উৎসাহ না জানি আমাদের সমাজে আরো অধঃপতন ডেকে আনে।

বাজেট অধিবেশনের আগে এক লেখায় বলেছিলাম, অর্থমন্ত্রী কালো টাকা সাদাকরণ নিয়ে অস্বস্তিতে আছেন। বাজেট ঘোষণা এবং পরবর্তীসময়ে এ নিয়ে তার কোনো অস্বস্তি নেই। মনে হয় মনোবেদনাও নেই। অনেকে বলেছেন, কালো টাকা সাদাকরণকে দুর্নীতি, লুটপাট, কর ফাঁকিবাজ, চোরাকারবারিদের স্বর্গরাজ্য বানিয়ে দেয়ার শামিল। গুরু অপরাধে লঘুদ-ের মতো অবৈধ উপায়ে অর্জিত বিপুল অর্থ নামমাত্র কর দিয়ে বৈধ বানিয়ে কেউ বগল বাজাবে আর কেউ বৈধ উপায়ে অর্জন করে ২০ বা ২৫ শতাংশ হারে আয়কর দেবে, এটা তো ভালো মানুষের কাছে মগের মুল্লুকের শামিল। এক অর্থে ভালো করদাতারা নিরুৎসাহিত হবেন।
নতুন বাজেটে তিনভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছেÑ শিল্প ও ভৌত কাঠামোয় বিনিয়োগ, বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনা এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ। এর মধ্যে আয়কর দিতে হবে মোট বিনিয়োগের ১০ শতাংশ এবং বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার জন্য আয়তন ও এলাকাভেদে নির্দিষ্ট হারে কর দিতে হবে। এ সুযোগ থাকবে ২০০৯-এর ১ জুলাই থেকে ২০১২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বলা আছে, দেশের বিদ্যমান কোনো আইনেই কালো টাকা সাদাকরণে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না।
বিনিয়োগে উৎসাহিত করার নামে প্রচলিত আয়কর আইনে একটি ধারা চালু ছিল, যা ১৯ (এএএ) নামে পরিচিত। ওই ধারাবলে যে কোনো শিল্প খাতে বিনিয়োগ করলে আয়ের উৎস জানতে চাওয়া হতো না। ২০০০ সালে এটি চালু করা হয়। ২০০৫ সালে ওই সুযোগ রহিত করা হয়। ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা ওই সময় ১০ হাজার কোটি কালো টাকা সাদা করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, উদ্যোক্তারা এ সুযোগের ব্যাপক অপব্যবহার করেন।
কালো টাকার সাদাকরণ শুধু এ সরকারই করছে তা নয়, অন্যান্য সরকারের আমলেও হয়েছে। ওই সময় ফ্ল্যাট, জমি, গাড়ি কিনে কালো টাকা সাদা করেছে বহুজন। এবারই শুধু গাড়ি কিনে কালো টাকা সাদা করা যাবে না।
কালো টাকা সাদাকরণ প্রক্রিয়া বিভিন্নভাবে সমাজে প্রভাব ফেলবে। মুদ্রাস্ফীতিসহ সরকারের অনেক ইতিবাচক কর্মকা- বাধাগ্রস্ত হবে জেনেও সরকার এ পথে পা বাড়িয়েছে, লাখ কোটি টাকার বাজেটে অর্থায়ন দাতা, রাজস্ব খাত থেকে শুরু করে কালো টাকা সাদাকরণেও প্রত্যাশা করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ করলেই নয়, ২০০৭ সালে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অঘোষিত আয় প্রচলিত কর হারের ৫ শতাংশ বাড়তি কর দিয়ে বৈধ করা হয়েছে। সারাদেশে ৪৩ হাজার জন এ সুযোগ নিয়ে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা বৈধ করেছে। এর বিপরীতে সরকার আয়কর হিসেবে পেয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। সরকার হয়তোবা এর চেয়ে এবার আয়কর বেশি পাবে, এই হয়তো অর্থমন্ত্রীর প্রত্যাশা। উপরন্তু উৎপাদন ও কর্মসংস্থানেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে; কিন্তু নৈতিক দিক বিবেচনা করলে কালো টাকার উৎস তো হলো ঘুষ, চোরাচালান, গুপ্তহত্যা, অস্ত্র ব্যবসা এবং অনৈতিক কর্মকা-ের উৎস থেকে আয়।
আর একে উৎসাহিত করা হয়েছে স্বাধীনতা-পরবর্তী পটপরিবর্তন হওয়া সরকার থেকে আজ অবধি। কালো টাকার যারা মালিক তারা জানে, প্রায় প্রত্যেক সরকারের সময় তারা এ সুযোগ হাতিয়ে নেবে। তাদের হাত এতো লম্বা যে, সব সরকারই বলে এবারই কালো টাকা সাদাকরণের শেষ সময়। কিন্তু এ সময় শেষ হয় না। এ পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারের সময় বাংলাদেশে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা সাদাকরণ করা হয়েছে। আর বারবার সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হয়েছেন।
দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৫০ শতাংশ রয়েছে কালো টাকা। প্রতিবেশী দেশ ভারতের অর্থনীতিতে কালো টাকার প্রবাহ অর্ধেকেরও কম। দেশের অর্থনীতিতে কালো টাকার প্রভাব বেশি হওয়ায় অর্থনীতির সূচকগুলো সম্পর্কে সরকারি পর্যায় থেকে কোনো সিদ্ধান্ত হলে অনেক ক্ষেত্রেই এর ইতিচাক প্রভাব পড়ে না। কালো টাকার প্রভাবে এর কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়।
কালো টাকা সাদাকরণ হয়তো সাময়িক সুফল সরকার আশা করে, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী কুফল তো সমাজে রয়েই যায়। দুর্নীতি, লুটপাট, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, কর ফাঁকিবাজি, ঘুষ, গুপ্তহত্যা, অস্ত্র ব্যবসা, জবরদখলকৃত টাকার অঙ্ক অর্থনীতির মূলস্রোতে এসে সরকারের অনেক ইতিবাচক কর্মকা- তছনছ করে দেয়। এ ঝুঁকি নিয়েই লাখ কোটি টাকার বাজেটে তিন বছরের জন্য এ অনৈতিক উৎসাহ না জানি আমাদের সমাজে আরো অধঃপতন ডেকে আনে।
লাখ কোটি টাকার এ বাজেটে কতো টাকা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়বে অব্যবস্থাপনায়, দুর্নীতির করাল গ্রাসেÑ না জানি আমরা আবারো চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাই, এ আশঙ্কা রয়েই যায়।
নির্বাচনী ওয়াদা পূরণের এ বাজেট অনেক উচ্চাভিলাষী মনে হলেও জনগুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাজেটের এ আকাক্সক্ষা কতোটুকু সরকার পূরণে সক্ষম হবে, তা ভেবে দেখতে হবে। ছোট একটা উদাহরণ দিই। ঢাকার যানজট একটি বিশাল সমস্যা। দ্রুত এ সমস্যার নিরসন জরুরি। সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে ঢাকায় পাতাল রেল হবে, এলিভেটর এক্সপ্রেস হবে, সার্কুলার ট্রেন হবে, কিছু কিছু জায়গায় চারলেনের রাস্তা সম্প্রসারিত হবে। ঢাকার চারদিকে নৌপথ উন্নয়ন হবে।
আমাদের কথা না চাইতে জলের মতো অতোশত আমাদের এ মুহূর্তে প্রয়োজন নেই। যানজট নিরসনে অধিক গুরুত্ব দিয়ে পাতাল রেল অথবা ঢাকার আশপাশে দ্রুতগামী ট্রেনের ব্যবস্থা করলেই যথেষ্ট। এতো কিছু করতে গিয়ে লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার মধ্যে পড়ে হাবুডুবু খাওয়ার উপক্রম হবে, কাজের কাজ কিছুই হবে না। এ খাতে এতো আলোচনা হচ্ছে তা যেন বিদ্যুৎ খাতের মতো না দাঁড়ায়।
বাজেটের সুফল এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দিতে হবে সরকারকে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করতে হবে।
কৃষকের ভর্তুকি সঠিকভাবে দিতে হবে। যানজট নিরসনে, বিদ্যুৎ, পানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণসহ মানুষের নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন করতে হবে। পুলিশকে খালি পেটে রেখে তার কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা যাবে না। একজন গলফ খেলবে অন্যজন ক্ষুধায় কাতরাবে, এ ব্যবস্থা থাকলে সমাজে নানা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
মানুষকে সব ধরনের নিরাপত্তা দিতে হবে। খাদ্যের নিরাপত্তাও দিতে হবে। না হয় পুলিশও হেরোইন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়বে। দলীয় লোকদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অর্থাৎ মাস্তানি প্রতিহত করতে হবে।
তাই বাজেট প্রণয়ন এবং তা সুব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে ব্যয়িত হলে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব। তা না হলে দুর্নীতি, অনিয়ম আমাদের আবার গ্রাস করবে।
আগামী হোক কালো টাকার প্রভাবমুক্ত একটা উজ্জ্বল গতিশীল বাংলাদেশ, যা সবার কাম্য। লাখ কোটি টাকার বাজেটে নিশ্চয় মানুষের দিন বদলে যাবে। বাংলাদেশ বদলে যাবে। আমাদের দিনবদল হবে। আমাদের আশায় বসতি।

গোলাম কাদের: সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সংগঠক।