মুন্সীগঞ্জে ১ শিশুর মৃত্যু

urmiভিটামিন ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক ওষুধ বিপর্যয়
ভিটামিন ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক ওষুধ বিপর্যয়ে ঝরে গেল আরেকটি কচি জীবন। রবিবার রাতে মুন্সীগঞ্জ শহরের দিয়াবাড়ী এলাকায় অকালে ঝরে গেছে সাত বছরের শিশু দিয়ামণি উর্মির প্রাণ। মুন্সীগঞ্জে দেড় হাজারের বেশি শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে ভর্তি অর্ধশত। গত ৬ জুন সারাদেশে শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়ানোর পর দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় শত শত শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। জেলা সদর ও উপজেলা হাসপাতালে ভিড় করতে থাকেন অসুস্থ শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা। ভিটামিন-এ ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক ট্যাবলেটের কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি-না কিংবা প্রচণ্ড গরম আবহাওয়ায় কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানোর কারণেই কি-না অথবা ভিটামিন ক্যাপসুলের কোনরকম ত্রুটিজনিত কারণেই প্রায় সারাদেশে বিপুলসংখ্যক শিশু এমনিভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে কি-না সে প্রশ্নের এখনো মীমাংসা হয়নি। কিন্তু প্রায় সারাদেশেই শত শত শিশুর এই অসুস্থতা ভাবিয়ে তুলেছে বিবেকবান মানুষকে। তবে এ কথাও ঠিক যে, বহু স্থানে অভিভাকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এবং পড়ছেন শিশুদের অসুস্থতার এমন খবর এমনকি মৃত্যুর খবর শুনে। মানসিকভাবে কাবু হয়ে পড়া এসব বাবা-মাকে সামলাতে হিমশিম দশা হাসপাতালের চিকিৎসকদের। গতকাল সোমবার রাজধানীর পাশেই নারায়ণগঞ্জে সহস্রাধিক শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর এসেছে আমাদের কাছে। সারা জেলায় আতঙ্ক। মির্জাপুর ও বরিশালে শতাধিক শিশু অসুস্থ। এমনি চিত্র দেশের অন্যান্য জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত।

মুন্সীগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, মুন্সীগঞ্জে বিরাজ করছে উৎকণ্ঠা। মুন্সীগঞ্জ সদরে ১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জেলার ৪টি উপজেলায় দেড় সহস্রাধিক শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এদের অধিকাংশই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। জেলার ৫টি সরকারি হাসপাতালে ৫০ অসুস্থ শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। রবিবার মধ্যরাত থেকে সোমবার দিনভর মুন্সীগঞ্জের ৩টি হাসপাতালে তিল পরিমাণ জায়গা ফাঁকা ছিল না। শ্রীনগর উপজেলায় দেড় শতাধিক শিশু, গজারিয়ায় পৌনে ২শ, টঙ্গীবাড়ীতে ২ শতাধিক, জেলা সদর মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ৮ শতাধিক এবং সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শতাধিক অসুস্থ শিশুকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জ জেলা সদরের বল্লালবাড়ি এলাকার ৭ বছরের শিশু দিয়ামণি উর্মিকে গত শনিবার বাড়ি সংলগ্ন টিকাদান কেন্দ্রে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়। সে স্থানীয় সিপাইপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২য় শ্রেণীর ছাত্রী। রাতেই কয়েকবার বমি করে উর্মি, এরপর প্রচণ্ড জ্বর। । অসুস্থ উর্মি রবিবার রাত ১টার দিকে নিজ বাড়িতে মারা যায় বলে পারিবারিক সূত্র জানায়। মৃতের বাবা পিয়াল হোসেন জানান, ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খেয়েই তার সন্তান অসুস্থ হয়। তাকে ঢাকাতে চিকিৎসা দিয়ে বাসায় আনা হলে রবিবার রাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

রবিবার রাত আড়াইটা থেকে মুন্সীগঞ্জের চরাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রাম, জেলা শহর ও টঙ্গীবাড়ী, গজারিয়া উপজেলার মসজিদে মসজিদে মাইকিং করা হয়। এতে প্রচার করা হয়ঃ “ভিটামিন-এ ক্যাপসুল সেবনকারী বাচ্চাদের তেঁতুলের পানি ও লেবুর রস মিশ্রিত শরবত খাওয়ালে শিশুরা ভাল থাকবে। তাই আপনার শিশুকে এখনই এই শরবত খাওয়ান।”

মাইকিং হওয়ার পর অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। গভীর রাতেই শিশুদের শরবত খাওয়ানো শুরু করেন। এরপর টঙ্গীবাড়ী, গজারিয়া, জেলা শহর ও সিরাজদিখানের হাসপাতালে অসুস্থ শিশুদের ভিড় পড়ে যায়। এরপর রাতেই গুজব ওঠে হাসপাতালে অনেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই গুজবে জেলা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।

মধ্যরাতে মাইকিং এবং ফোনে আত্মীয়-স্বজনের ভীত কণ্ঠস্বরে জেগে ওঠে মুন্সীগঞ্জবাসী। চরম আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় তারা ঘুমন্ত শিশুদের উঠিয়ে এই তেঁতুলের রস অথবা লেবুর রস খাওয়ানো শুরু করেন। রাত থেকে আতঙ্কিত মানুষ ছুটতে থাকেন হাসপাতালের দিকে। সুস্থ-অসুস্থ সব শিশু নিয়েই তারা ছুটে যান হাসপাতালে। হাসপাতালে এই উপচেপড়া ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় ডাক্তারদের। বিভিন্ন এলাকা থেকে সাংবাদিকদের ফোনে জানাতে থাকেঃএলাকায় মসজিদের ইমামরা মাইকিং করছেন শরবত খাওয়াতে।

জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ডা. এহসানুল করিম বলেন, মধ্যরাতে বাচ্চাদের ঘুম থেকে তুলে তেঁতুলের রস খাওয়ানোর ফলেই বাচ্চাদের বমি আর পাতলা পায়খানা হচ্ছে। আর আতঙ্কিত লোকজন ভাবছে ভিটামিন-এ ক্যাপসুলের বিষক্রিয়া। ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. আব্দুর রশিদ বলেনঃ উর্মির মৃত্যুর ঘটনা সত্য, তবে ভিটামিন-এ খেয়ে মারা গেছে কি-না তা তদন্ত করা হবে। জেলার ফুড ইন্সপেক্টর গাজী আমিনের নেতৃত্বে ২ সদস্যের টিম উর্মির বাড়িতে গেলে সেখানে জনরোষের মুখে পড়েন।

জেলা প্রশাসক মোঃ মোশারফ হোসেন বলেন, মাইকিং করে আতঙ্ক সৃষ্টিকারীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।