ইয়াজউদ্দিন কহিলেন বিষাদে

iajuddinশরীফ শহীদুল্লাহ
তাকে নিয়ে কথা হয়েছে অনেক। রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী, সাধারণ মানুষ কেউ বাকি ছিল না। রাস্তাঘাট, হাটবাজার, চায়ের দোকান সর্বত্রই তার কথা। তিনিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। মহামান্য রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ যেদিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জন্য শপথ নিয়েছিলেন, সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল এই কথামালা। প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রপতির ওপর। রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে যখন বিচারপতি কেএম হাসান শপথ নিতে অপারগতা প্রকাশ করলেন তখন একাধিক বিকল্প পথের একটিতেও না গিয়ে  রাষ্ট্রপতি নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিলেন। জাতিকে অবাক করে অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন সৃষ্টি করেন নতুন ইতিহাস।

এমন ঘটনায় তখন কেউবা সরস মন্তব্য করেছিলেন, ছেলের জন্য মেয়ে দেখতে গিয়ে নিজেই বিয়ে করে ফেললেন রাষ্ট্রপতি। আর ওই কাজটা করলে যা হয়, বিয়েপাগল বাবার প্রতি ছেলের শ্রদ্ধা উঠে যায়। তেমনই হয়েছিল তখন শিক্ষাবিদ রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের বেলায়। দেশবাসী আস্থা হারিয়ে ফেলে তার ওপর। কেবল দেশবাসী নয়, উপদেষ্টা পরিষদের চার উপদেষ্টাও পদত্যাগ করেন তার ওপর আস্থা হারিয়ে। অনুগত অধ্যাপক সাহেব উপদেষ্টাদের নিয়ে মিটিং করতেন ঠিকই কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত দিতেন না। শোনা যায় সিদ্ধান্ত দিতেন অন্য কারও সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ সেরে তারপর। অনেক ক্ষেত্রে সভা চলাকালীন তিনি উঠে গিয়ে ফোনালাপ সেরে সিদ্ধান্ত দিতেন। অদৃশ্য সুতার টানে চলত রাষ্ট্রপতি নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এ কারণেই সম্ভবত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন রাষ্ট্রপতির নাম দিয়েছিলেন ‘ইয়েসউদ্দিন’।

চারদিকে যখন তাকে নিয়ে লক্ষ-কোটি সরস কিংবা বিরস মন্তব্য হতো তখন তিনি ছিলেন দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরের একজন মানুষ। গণমাধ্যমের কল্যাণে সবকিছু তার কানে পৌঁছলেও তার বলার সুযোগ ছিল না মোটেও। আর যেটুকুওবা দেশবাসী শুনেছে তা ছিল বিশেষ মহল কর্তৃক মুদ্রিত ও সম্পাদিত। তিনি এখন মুক্ত-অবসর। এই সুযোগে তিনি কিছু কথা বলেছেন। কথার মতো কথা একটাই যথেষ্ট। তিনি বলেছেন, ‘তার পরামর্শেই দুই নেত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং দেশের ভালোর কথা চিন্তা করেই তিনি তখন জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন।’ সাবেক রাষ্ট্রপতির এ কথায় যেন নড়েচড়ে বসেছে সবাই।

আপনা ভালো সবাই বোঝেন

বেসরকারি এক টিভি চ্যানেলকে দেয়া সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সরাসরি সাক্ষাৎকার নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। সাবেক রাষ্ট্রপতির পরিবার ও সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকার কাছ থেকে শোনা  যাচ্ছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ বলে দাবি করেছেন তার স্ত্রী। পুরো বিষয়টিকে ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতিও পাঠিয়েছেন তিনি। কিন্তু লাইভ অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকা  বলেছেন, এক-এগারো ঘটনার বিষয়ে অনেক প্রশ্নই সাবেক রাষ্ট্রপতি কৌশলে এড়িয়ে গেছেন। আবার শিক্ষা নিয়ে প্রশ্নগুলোর সাবলীল উত্তর দিয়েছেন। মানসিকভাবে ভারসাম্য হলে তো এত সুন্দর করে তিনি প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারতেন না।

জ্যৈষ্ঠ মাসের খররৌদ্রে মাথা ঠিক রাখা খুবই কঠিন কাজ। তবুও এই জ্যৈষ্ঠ মাসে সাবেক রাষ্ট্রপতি যথেষ্টই মাথা ঠিক রেখেছেন বলা যায়। এক-এগারো নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি একবার বলেছেন, ‘ওই জিনিসটা আমার সব মনে নেই।’ আবার একই প্রশ্নের উত্তরে তিনি পরক্ষণেই বলেছেন, ‘বই লিখছি, বইয়ের জন্য থাক। পরে জানতে পারবেন।’ এখন মনে নাই তো পরে বই লেখার সময় মনে পড়বে কীভাবেÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে ড. ইয়াজউদ্দিন বলেন, ‘হয়ত মনে পড়বে।’ কথা হলো, এমন সুকৌশলে যিনি উত্তর দিতে পারেন আবার এড়িয়েও যেতে পারেন তাকে বলা হচ্ছে ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’।

কেউ ফেরে না খালি হাতে

বঙ্গভবনকে ঘিরে সে এক বিরাট রহস্য। ওই ভবন থেকে কেউ ফেরে না খালি হাতে। কিছু না কিছু অপবাদ মাথায় নিয়েই বের হতে হয় ওই ভবনের বাসিন্দাকে। কেউ বন্দুকের মুখে, কেউ ইম্পিচমেন্ট হয়ে আবার কারও পাজামার ফিতা গিট্টু দেয়ার সুযোগও হয়। তড়িঘড়ি বিদায় নিতে হয় বঙ্গভবন থেকে। অঘটন ঘটনপটিয়সী রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদকে যেতে হয়েছিল জেলখানায়। ’৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে যাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছিল, তার বিরুদ্ধে ছিল মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ। ’৯৬ সালে সেই রাষ্ট্রপতির অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসায় বিএনপি তখন তাকে অপবাদ দিয়েছিল। সেই অপবাদ আর কলঙ্ক নিয়ে তখন তাকে বঙ্গভবন ছাড়তে হয়েছিল। তারপর বিএনপির কোনো অনুষ্ঠানে তাকে আর দেখা যায়নি। সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা ছিল বলে ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি বানিয়ে বেশ চমক দেখিয়েছিল। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিপুল বিজয়ী হলে আওয়ামী লীগ তখন স্থূল কারচুপির অভিযোগ তুলে তাদের নিয়োগ দেয়া রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করেছিলেন নতুন সরকারকে শপথ না পড়াতে। কিন্তু দেশ-বিদেশে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ায় এবং কারচুপির তেমন কোনো প্রমাণ না থাকায় রাষ্ট্রপতি নিয়ম অনুযায়ী বিএনপিকে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। তখন আওয়ামী লীগের তির্যক বাক্যবাণে জর্জরিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ নিদারুণ মনোকষ্ট নিয়ে বঙ্গভবন ছেড়েছিলেন।

তারপর আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল বলে জানা যায়নি। নতুন সরকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ডা. বি. চৌধুরীকে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নিজেকে নির্দলীয় প্রমাণ করতে চাইলে ছয় মাস না যেতেই সরকারের সঙ্গে তার বিরোধ চরমে ওঠে। তাকে ইম্পিচমেন্ট করা হয়। বঙ্গভবন ছাড়েন বি. চৌধুরী। বহু জল্পনা-কল্পনার পর বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়।  তারপর বাকি সব ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি বলে তাকে শুনতে হয়েছে নানা অযাচিত বাক্য। আর তাই সাবেক রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারকে তার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয় ‘ষড়যন্ত্র’, আর সুস্থ সাবলীল একজন শিক্ষাবিদকে বলা হয় ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’। এ সবকিছুই বঙ্গভবনের দান!
arif139@yahoo.com