পুনর্পঠনে বুদ্ধদেব বসু তাঁর চিরহরিৎ গদ্য

শিহাব সরকার
কলেজে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েই বুদ্ধদেব বসুর ইন্দ্রজালে বন্দি হয়ে পড়েছিলেন। কবিতা নয়, স্কুল জীবনের শেষদিকে আমরা চার বন্ধু তাঁর কয়েকটি ছোটগল্প পড়ি। ঐ সময় গোগ্রাসে একের পর এক পড়ে যাচ্ছি ত্রিশ ও চল্লিশ দশকের বাংলা ক্লাসিক উপন্যাসগুলো। এরই এক ফাঁকে আমাদের হাতে এলো বুদ্ধদেব বসুর গল্প। আমার কাছে ওটা হয়ে দাঁড়ালো সাহিত্য পাঠের সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা।

দু’বছর পর যখন কলেজ ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, বুদ্ধদেব বসুর গদ্যের ভুবন আমাকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। ততদিনে অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্তের ‘কল্লোল যুগ’ পড়া হয়ে গেছে। আমার চেতন-অবচেতনের আরাধ্য কিছুকাল আগেও ছিলেন তারাশঙ্কর, মানিক, বিভূতিভূষণ (বন্দ্যোপাধ্যায়), প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ লেখক। কিন্তু দেখতে দেখতে, প্রায় অজান্তেই, আধুনিক বাংলা গদ্যের সিংহাসনে আসীন হলেন বুদ্ধদেব বসু- অন্তত আমার মতো একজন উঠতি কবির কাছে। ছোটগল্প দিয়ে আমার সাহিত্য ভাবনা এবং লেখালেখির শুরু, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই কেবল একটি-দুটি করে কবিতা ছাপতে শুরু করেছি। কিন্তু ধীরে ধীরে কবিতাগ্রন্থ হয়ে এলেও বুদ্ধদেব বসু আমার চোখে সত্তর দশক থেকে আজ অবধি একজন জাদুকরী গদ্য শিল্পী। তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে কবি বলতে বুঝি মুখ্যত জীবনানন্দ দাশকে। বুদ্ধদেব বসুর কবিতা কখনো আমাকে তেমনভাবে টানেনি। কাব্য নাটকগুলো অবশ্য উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।

বৃহদার্থে আধুনিক বাংলা গদ্যের একক রূপকার যদি হয়ে থাকেন রবীন্দ্রনাথ, তাহলে এর কৌশলগত বিকাশের স্থপতি বলতে হয় বুদ্ধদেব বসুকে। তাঁর সমসাময়িকদের প্রায় সবাই ঋজু, স্বচ্ছন্দ গদ্য লিখেছেন। কিন্তু বুদ্ধদেব বসু ত্রিশ-চল্লিশ দশকে বিকাশমান সেই গদ্যে যোগ করেছেন এক স্বতন্ত্র লাবণ্য, সতত সৃজনশীল একজন মেধাবী শব্দ-কারুশিল্পীই যার জন্ম দিতে পারে। বুদ্ধদেব বসুর গদ্যভুবনে প্রবেশ করার চল্লিশ বছর পর আমার আজ মনে হয়, চূড়ান্ত বিচারে তিনি আধুনিক বাংলা গদ্যশৈলীর অন্যতম এক জনক হিসেবে বেঁচে থাকবেন বাংলা সাহিত্যে। জীবনানন্দ দাশসহ অনেক কবির ওপর থেকে অপরিচয়ের পর্দা সরিয়ে, তিনি আমাদের নিয়ে গেছেন তাঁদের অন্তর্জগতে, নিজে ছিলেন আক্ষরিক অর্থে কবিতামগ্ন কিন্তু শেষ বিচারে গদ্যের সিদ্ধি কবিতায় তাঁর অর্জনকে ছাপিয়ে ওঠে। এ মন্তব্য অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে যখন লক্ষ্য করি ‘আমরা তিনজন’ ‘আবছায়া’ বা বনজ্যোৎস্না’-র মতো ছোটগল্প, সাড়া (১৯৩০), তিমিডোর (১৯৪৯) বা গোলাপ কেন কালো-র (১৯৬৭) মতো উপন্যাস অথবা তাঁর ব্যক্তিগত রম্য রচনা বা ভারি প্রবন্ধগুলো এই একবিংশ শতাব্দীতে কী অবিশ্বাস্য রকমের সতেজ ও প্রাণময়। কন্যা রুমি এবং প্রিয় লেখক এবং প্রীতিভাজনদের উদ্দেশ্যে লেখা তাঁর চিঠিগুলোকেও বাদ দিই কীভাবে। বিষয় এবং আঙ্গিক- উভয় দিক থেকে এই ঘোর-লাগানো গদ্যের তুলনা নেই বাংলা সাহিত্যে, যে কথা অন্য এক বিচারে প্রযোজ্য রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে অলঙ্কার প্রধান এবং তৎসম শব্দাবলী ভারাক্রান্ত বাংলা গদ্যে মুক্তির হাওয়া এনেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সাধুরীতি সত্ত্বেও তাঁর গদ্যেই আমরা প্রথম আস্বাদ পাই লেখক-পাঠকের তড়িৎ যোগাযোগে। রবীন্দ্রনাথ বাংলায় প্রথম লিখেছিলেন কমুনিকেটিভ গদ্য। অপর দিকে বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরী বা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক রৈখিক নির্মেদ গদ্যে যোগ করেছেন। তাঁর নিজস্ব ধরনের প্রকরণ। তাঁর গদ্য ইভোকেটিভ, স্তরে স্তরে যার বাঙময়তা। ফলে তাঁর ভঙ্গি সামান্য মন্থর, কিন্তু কখনো সেই গদ্য পাঠককে ক্লান্ত করে না। কারণ কী ছোটগল্প কী উপন্যাস, কী ব্যক্তিগত প্রবন্ধ- কমা, সেমিকোলন, কোলন, ড্যাশ এবং প্যারেনসিসিসের আতিশয্য সত্ত্বেও পাঠকের মর্মে তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছে যায় তাঁর চিত্রাবলী এবং মেসেজ। এ প্রসঙ্গে আমরা টমাস থার্ড, লরেন্স ডারেল অথবা কিছুটা দূরকল্পনায় জেমস জয়েস বা উইলিয়াম বারোজের নাম মনে করতে পারি।

তবে বুদ্ধদেব বসুর স্বাতন্ত্র্য এই ক্ষেত্রে যে, তিনি সহজপাঠ্য ও সরল, কিন্তু স্বাদু, এবং স্টাইলাইজড- এই উভয় ধরনের গদ্য লিখেছেন সমান্তরালভাবে। আবার কোনো কোনো পাঠে মনে হয় বয়স বাড়ার পাশাপাশি তাঁর নান্দনিকতা বোধ এবং ধুলোকাদার বাস্তবতা সঞ্জাত অভিজ্ঞতার পরিছি বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গদ্যের ধারণও পাল্টেছে। ‘পুরানা পল্টন’ (১৯৩২) শিরোনামের ব্যক্তিগত রচনায় প্রথম যৌবনে দেখা ঢাকার বর্ষার বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লেখেন, ‘পুরানা পল্টনের বর্ষার রূপ কিছুতেই ভোলবার নয়; সকাল বেলাকার ছেঁড়া মেঘের আকাশ ভিজে হাওয়া, মাঠে জমে থাকা জল, মাঠ-ভরা নতুন সবুজ ঘাস, আমাদের উঠোনের তুলসী-মঞ্চে ঘন লতার আড়ালে ঘন-নীল অপরাজিতা, মাটির গন্ধ, বুনো ফুলের গন্ধ। আকাশ-ভরা সেই নরম-নীল মেঘ, সেই অশ্রান্ত, অজস্র বর্ষণ; বাইরে তাকালে মনে হ’তো সমস্ত সৃষ্টি যেন ধোঁয়া হ’য়ে মিলিয়ে যাচ্ছে; মনে হ’তো পৃথিবীর শেষ সীমা এইখানে।’ একই রচনায় বিষণœ এবং স্মৃতিমেদুর ভাবালুতায় আপ্লুত হয়ে তিনি লেখেন, ‘পুরানা পল্টন- অনেক দিন আগে যে মেয়েকে ভালোবাসতাম, হঠাৎ কেউ যেন আমার সামনে তার নাম উচ্চারণ করলো। এককালে যে নিতান্ত আপন ছিলো, তার নাম আজ মনে ঠেকছে নতুন। অবাক হ’তে হয়- তার সঙ্গে অতদিনের ঘনিষ্ঠতা- তা কি সত্যি? সেদিন হয়তো তাকে ইচ্ছে করেই ছেড়ে এসেছিলাম, কিন্তু আজ তার নামের শব্দে মধুরতা, বিষাদঃ।’

তিন দশক পর আমাদের সামনে উন্মোচিত হয় বুদ্ধদেব বসুর গদ্যের এক নতুন, অভিনব অবয়ব। ষাট দশকের শুরু থেকে ‘মহাভারতের কথা’ (১৯৭৪) পর্যন্ত তাঁর গদ্যশৈলী ক্রমশ হয়ে উঠেছে সংহত ও সান্দ্র। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত ‘শার্ল বোদলেয়ার: তাঁর কবিতা’ গ্রন্থের ভূমিকায় এমন এক গদ্যরীতির ভেতর পাঠক নিজেকে আবিষ্কার করেন- যার মূর্ছনা এবং সার্বিক ব্যঞ্জনাকে মনে হয় রীতিমতো অপার্থিব। এ এক ইনসপায়ারড গদ্য, বাংলা ভাষা আগে তা কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। ‘কলিদাসের মেঘদূত’, ‘হোল্ডার্লিন-এর কবিতা’, ‘রহিনার মারিয়া রিলকে-র কবিতা’- এই তিন অনুবাদ গ্রন্থের ভূমিকাকেও রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। শুধু এক অননুকরণীয় গদ্যভঙ্গি নয়, বৈদগ্ধ এবং সংশ্লিষ্ট কবিদের রচনার ক্রিয়েটিভ বিশ্লেষণও এই চারটি ভূমিকাকে অনন্য মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। এক অলৌকিক বোধে তাড়িত হয়ে লেখা ‘শার্ল বোদলেয়ার: তাঁর কবিতা’ গ্রন্থের ভূমিকার শেষদিকে আমরা আধুনিক বাংলা গদ্যশৈলীর স্থপতিকে পুরোমাত্রায় অনুভব করি। তিনি লেখেন, ‘মানুষ দুঃখী, কিন্তু সে জানুক সে দুঃখী। মানুষ পাপী, কিন্তু জানুক সে পাপী; মানুষ রুগ্ন, কিন্তু সে জানুক সে রুগ্ন, মানুষ মুমূর্ষু এবং সে জানুক সে মুমূর্ষু; মানুষ অমৃতাকাঙক্ষী এবং সে জানুক সে অমৃতাকাঙক্ষী: বোদলেয়ারের সমস্ত কাব্যে, যেমন দপ্তয়েভস্কির উপন্যাসে, এই বাণী নিরন্তর ধ্বনিত হচ্ছে। সকলে জানবে না, জানতে পারবে না বা চাইবে না; কিন্তু কবিরা জানুন। এই জ্ঞানেই আধুনিক সাহিত্যের অভিজ্ঞান।’ বুদ্ধদেবীয় এই গদ্যের আভাস পাওয়া গিয়েছিলো চল্লিশ দশকের শেষদিকে। ব্যক্তিগত প্রবন্ধ ‘নোয়াখালি’তে (১৯৪৭) তিনি লেখেন, ‘রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, শ্রীরামপুরঃ তুচ্ছ ভেবেছি এই সব নাম, অতি তুচ্ছ, আজ তারা কত বড়ো, কী মারাত্মকরকম বড়ো। ঈর্ষাযোগ্য নয় এই ভাগ্য, কিন্তুঃ কে জানে। গান্ধী আজ সেখানে, আর গান্ধীর চেয়ে বাঞ্ছনীয় আজকের দিনের পৃথিবীতে আর কী? ইংরেজি সাহিত্যের মেধাবী ছাত্র ছিলেন বুদ্ধদেব বসু। সেই সূত্রে আন্তর্জাতিক সাহিত্যের বিচিত্র স্পন্দনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিলো। তাঁর গদ্যের বিশাল ক্যানভাসের পেছনে আন্তর্জাতিক বোধ উপলব্ধিরও রয়েছে বিশাল ভূমিকা।

‘কল্লোল’ পত্রিকার প্রেরণা এবং অচিন্ত্য সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শৈলজানন্দ, নৃপেন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ অকৃত্রিম শুভাকাঙক্ষীর সপ্রাণ উচ্ছ্বাস ছাড়া, কাজী নজরুল ইসলাম খ্যাতি এবং সৃজনশীলতার শিখরে পৌঁছে গেলেও, তৎকালীন বিদ্বৎসমাজ তাঁর সম্পর্কে তখনো ছিলেন উদাসীন। ব্যতিক্রম অবশ্য রবীন্দ্রনাথ। আর বুদ্ধদেব বসু নজরুলের আঁচ ঠিকই অনুভব করতে পেরেছিলেন। তাঁর সামান্য ‘বিভ্রান্তি’এবং ‘আড়ষ্টতা’ বাদ দিলে বলা যেতে পারে কবি-নজরুল এবং ব্যক্তি-নজরুলকে তিনিই প্রথম বাঙালী পাঠকের সম্মুখে সাহিত্য এবং শিল্পবিচারের পটভূমিতে স্থাপন করে দেখান। এ ক্ষেত্রে তাঁর গদ্যভাষা বিষয়বস্তুকে দিয়েছে এক বিশেষ ব্যঞ্জনা। কাজী নজরুল ছিলেন তাঁর সম্পাদিত ‘প্রগতি’ এবং ‘কবিতা’ পত্রিকার নিয়মিত লেখক। সেই বিশ-ত্রিশ দশক থেকেই নজরুলের সম্মোহনী জালে তিনি আটকে ছিলেন, নজরুলের বর্ণাঢ্য জীবন এবং কবিতা বা গান- সব কিছুই তাঁকে মুগ্ধ করে রেখেছিলো। ১৯৪৪ সালে নজরুলের ওপর রচনাটি লিখে তিনি প্রমাণ করলেন কবির প্রতি কী পরিমাণ ভালোবাসা এবং অনুরাগ তিনি এতদিন লালন করে এসেছেন। ‘কালের পুতুল’ গ্রন্থের ‘নজরুল ইসলাম’ শিরোনামের প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু সোজা-সাপটা দ্বিধাহীন ভাষায় লিখলেন, ‘বাংলা কাব্যের ইতিহাসে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পরে সবচেয়ে বড়ো কবিত্ব শক্তি নজরুল ইসলামের। তিনি যখন সাহিত্য ক্ষেত্রে এলেন তখন সত্যেন্দ্র দত্ত তাঁর খ্যাতির চূড়ায় অধিষ্ঠিত, মোহিতলাল এখনো ঠিক সমান, হননি। রবীন্দ্রনাথের পরে সত্যেন্দ্রনাথই প্রধান কবি। নজরুলের রচনায় সত্যেন্দ্রীয় আমেজ ছিলো না। তা নয়- কেনই বা থাকবে না- কিন্তু প্রথম থেকেই তিনি সুস্পষ্ট এবং প্রবলভাবে তাঁর স্বকীয়তা ঘোষণা করেছিলেন।’ ত্রিশ-চল্লিশ বছর পর অনেক বাঙালী সমালোচক এবং সাহিত্য বোদ্ধা এই নজরুল-বিচার হয়তো মানতে দ্বিধা করলেন। কিন্তু নিজের মতো করে বুদ্ধদেব বসু নজরুল-মানসের যে অকাতর প্রশংসা করেছেন তাকে আমরা ভুলে থাকতে পারি না। সাহিত্যের ইতিহাসে কোনো সমসাময়িক সম্পর্কে এ ধরনের নির্ভেজাল তারিফ বিরল।

পরবর্তীকালে আধুনিক বাংলা কবিতার পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত, জীবনানন্দ দাশকেও দুর্জ্ঞেয়তার ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত করে বৃহত্তর আটপৌরে লোকসমাজে হাজির করেছেন বুদ্ধদেব বসু। অকালমৃত বামপন্থী সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন তাঁর বিপরীত মেরুর কবি। বুদ্ধদেব বসু এই কিশোর কবির বিস্ময়কর কবি প্রতিভা সম্পর্কে পাঠককে অবহিত করেছেন। এখন কাজ যেন ছিলো তাঁর সাহিত্যগত দায়িত্ব। এই দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি অকুণ্ঠভাবে লিখে গেছেন তাঁর, সমসাময়িক ত্রিশ দশকের প্রধান কবি, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সমর সেন এবং অমিয় চক্রবর্তীর ওপর। তাঁর ভাষায় সুধীন দত্ত ‘ঃ বিশ শতকের একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি, তাঁর মতো নানাগুণ সমন্বিত পুরুষ রবীন্দ্রনাথের পরে আমি অন্য কাউকে দেখিনি।’

ত্রিশ দশকের কবিরা বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের সর্বব্যাপ্ত উপস্থিতিকে ‘অস্বীকার’ করে এক ধরনের ‘প্রথা বিরোধী’ অবস্থান নেয়ার কথা ভাবলেও, এঁরা সবাই অবচেতনায় ছিলেন রবীন্দ্রনাথে সমর্পিত। কবিতার বিষয়ের দিক থেকে এঁরা হয়তো প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর আধুনিকতার পটভূমিতে নিজেদের অল্প-বিস্তর স্বতন্ত্র করতে পেরেছিলেন। কিন্তু আমরা যদি প্রকরণের দিক বিবেচনায় আনি, দেখবো এঁরা সবাই রবীন্দ্রনাথ থেকে খুব এগোতে পারেননি। একমাত্র ব্যতিক্রম জীবনানন্দ দাশ। তার প্রথম দিকের কবিতায় রবীন্দ্রনাথের এবং নজরুলেরও ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, কিন্তু তিনি অল্প সময়ের ভেতর এক নতুন বাক্ভঙ্গি আয়ত্ত করলেন- যা বাংলা কবিতায় অনাস্বাদিত। বুদ্ধদেব বসু নিজেও কবিতায় রবীন্দ্রনাথের বলয় ছিন্ন করতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের ওপর তাঁর যে ক’টি গদ্যরচনা তার সবগুলোতেই ছাপিয়ে উঠে বাংলা কবিতার প্রধানতম পুরুষের প্রতি তাঁর নিঘাদ শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসা। রবীন্দ্রনাথে মুগ্ধ বুদ্ধদেব বসু পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ ‘সঙ্গঃনিঃসঙ্গতাঃ রবীন্দ্রনাথ’ এবং অন্যান্য গ্রন্থভুক্ত প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের বিশাল সাহিত্য ভান্ডারের রতœরাজির সঙ্গে পরিচিত করেছেন পাঠককে। যেমন কবিতায়, তেমনি রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী গদ্যের ভুবনেও বিচরণ করেছেন একজন বিস্ময়-বিমূঢ় মানুষের মতো। অথৈ রবীন্দ্রনাথকে সাধারণ, শিক্ষিত পাঠকের কাছে অন্তরঙ্গ করে তোলার প্রায় দুঃসাধ্য কাজে বুদ্ধদেব বসুর গদ্যের ভূমিকা অপরিসীম।

১৯৩০-এ প্রকাশিত ‘গাড়া’ থেকে ‘গোলাপ কেন কালো’ (১৯৬৭) পর্যন্ত কুড়িটি উপন্যাস লিখেছেন বুদ্ধদেব বসু। লিখেছেন অজস্র ছোটগল্প। ছোটগল্প বইয়ের সংখ্যা ১৫। তাঁর উপন্যাস এবং ছোটগল্পের ভাষা প্রবন্ধ এবং রম্যরচনার মতোই, বিশুদ্ধভাবে তাঁর নিজস্ব। বাংলা সাহিত্যে এ ধরনের গদ্যশৈলীর আস্বাদ আমরা আগে কখনো পাইনি। গল্প-উপন্যাসের বিষয়বস্তুর দিক থেকেই বুদ্ধদেব বসু তাঁর সমসাময়িকদের থেকে পৃথক। হাতে-গোনা কিছু কাজ বাদ দিলে তাঁর অধিকাংশ উপন্যাস এবং ছোটগল্প লিরিকধর্মী মানব-মানবীর হার্দ্য ও জৈবিক সম্পর্ক, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা জটিলতা এবং আমাদের রহস্যাল্প মনোজগৎই তাঁকে টেনেছে বার বার। ‘অবজেক্টিভ’ থীমের চেয়ে ‘সাবজেক্টিভ থীমের প্রতি তাঁর দুর্বলতা ছিলো বেশি।

মূলত-কবি ব’লে বুদ্ধদেব বসুর প্রায় সমস্ত গল্প-উপন্যাসে বহমান থাকে ‘পোয়েট্রি’ বা কাব্যগুণের এক অন্তঃস্রোত। এবং এই বিষয়বস্তুর বাহন হিসেবে তিনি কুশলী শিল্পী-কারিগরের মতো আয়ত্ত করেছিলেন এক অনবদ্য গদ্যভাষা, যা পাঠককে আচ্ছন্ন করে রাখে। এ পর্যায়ে আমরা মনে করতে পারি ‘তিথিডোর’ উপন্যাসের শেষ পরিচ্ছেদটি যেখানে বিয়ের শেষে ছোট মেয়েকে বরপক্ষ নিয়ে চলে যাওয়ার পর হঠাৎ-নিঃসঙ্গ, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত পিতা ফাঁকা বিয়ে বাড়িতে একা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কোনো সংলাপ নেই। প্যারেশান নেই। এ পরিচ্ছেদে আমরা পাই নাতিদীর্ঘ এক শব্দ কোলাজ- যেখানে প্রায় কোনো বাক্যই সম্পূর্ণ নয়, আছে আপাত বিচ্ছিন্ন চিত্র-খন্ডচিত্র-চিত্রকল্পের এক আশ্চর্য ধন সন্নিবেশ। বিমোহিত পাঠকের বুঝতে দেরি হয় না, সদ্য ‘কন্যা-হারানো’ বিষাদগ্রস্ত একজন বাঙালী পিতার মানাসিক শূন্যতাকে বোঝাবার জন্য এরকম একটি গদ্যভঙ্গিরই প্রয়োজন ছিলো। বাংলা কথা সাহিত্যে বুদ্ধদেব বসুর আগে কেউ এমন আর্থিকভাবে গদ্য-কোলাজ ব্যবহার করেননি। এখানে তাঁর পথিকৃতের ভূমিকা তর্কাতীতভাবে।

কলাকৈবল্যবাদের পরোক্ষ প্রতিধ্বনি এবং নিঃসংকোচে ঘোষিত সাহিত্যদর্শন ‘চাই আনন্দের সাহিত্য’কেই বুদ্ধদেব বসু তাঁর গদ্যভাণ্ডারের বিষয় এবং আঙ্গিকে ব্যবহার করে গেছেন। এই দর্শনের প্রভাবে বলা যায়, তাঁর গদ্যচর্চার প্রকরণ এবং আঙ্গিক এমন সদা-আমোদিত স্ফূর্তিময়। বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের পর জীবনানন্দ-গবেষক ও বাংলা সাহিত্য-প্রেমিক, আমেরিকান সমালোচক ক্লিন্ট বুস সীলি লেখেন, ‘তাঁকে আমার মনে হয়েছে একজন আবেগ তীব্র মানুষ। দ্রুতলয়ে কথা বলেন তিনি, অবাক সুন্দর তাঁর হাস্যধ্বনি। সবকিছুতে তাঁর আগ্রহ। আমার বিবেচনায় তিনি একজন ‘জীয়ন্ত’, ‘প্রাণবান’, ‘টগবগে’ এবং ‘উদ্যমী’ মানুষ। আমাদের আলাপ কখনো কখনো খেই হারিয়ে ফেলছিলো। অব্যক্ত ভাবনাগুলো প্রকাশের সময় তিনি আবেগে থরথর করে কাঁপছিলেন।’ এই বর্ণনা থেকে মনে হয় ব্যক্তি বুদ্ধদেব বসু নিজেই যেন তাঁর গদ্যভাষার জীবন্ত, পোট্রেট।

ছেষট্টি বছরের জীবনে বুদ্ধদেব বসু দু’শর বেশি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। এর সিংহভাগ জুড়ে আছে গদ্য রচনা। ছোটগল্প সংকলন উপন্যাস, প্রবন্ধ ও রম্যরচনা সংগ্রহ ছাড়াও তাঁর রয়েছে গবেষণাগ্রন্থ, চিঠি এবং আত্মজৈবনিক স্মৃতিচারণ। রন্ধন কলার ওপরও তাঁর বই আছে। এসব গ্রন্থই গদ্যশিল্পী কথাশিল্পী বুদ্ধদেব বসুকে কোনো না কোনো বিচারে বাংলা সাহিত্যে অমর করে রাখবে। গদ্যশৈলীর প্রসাদগুণ বুদ্ধদেব বসুকে সাধারণ পাঠকের ভেতর জনপ্রিয় করেছে। তিনি নিজেও হয়তো তাঁর গুণমুগ্ধ পাঠককে একটি নাক-উঁচু শ্রেণীতে সীমাবদ্ধ দেখতে চাননি। বোধ করি তাঁর শিল্পীসত্তার অঙ্গীকারই ছিলো বাঙালী পাঠককে বিশুদ্ধ সাহিত্যপাঠে প্ররোচিত করা, যার জন্য তাদের স্বাচ্ছন্দ্যবোধের ব্যাপারটি তিনি কখনো বিস্মৃত হননি। নইলে তিনি কেন লিখবেন ‘উত্তর তিরিশ’ ‘কালের পুতুল’ বা হঠাৎ ‘আলোর ঝলকানি’-র মতো সুপাঠ্য ব্যক্তিগত প্রবন্ধগ্রন্থ অথবা ‘আমার ছেলেবেলা’ বা ‘আমার যৌবন’-এর মতো আবেশ-জাগানো স্মৃতিচারণ, অথবা, স্বকৃত শার্ল বোদলেয়ারের কবিতা-অনুবাদ গ্রন্থের অমন এক যুগান্তকারী ভূমিকা- যা দশকে দশকে পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের ভেতর আধুনিকতার বীজ রোপণ করেছে।

এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে ‘চুল কাটা’ এবং ‘গোপালপুর-অন্-সী’ রম্যরচনা দু’টির কথা। চুলকাটার মতো একটি দৈনন্দিন, কেজো ব্যাপারকে যে সাহিত্যমণ্ডিত করা যায়, তা বুদ্ধদেব বসুর মতো একজন ক্ষমতাবান গদ্যশিল্পীর পক্ষেই সম্ভব। ভ্রমণ কাহিনীতেও তিনি অতুলনীয়।

বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যরুচি, সাহিত্যবোধ এবং শিল্পচিন্তা পুরোপুরি তাঁর নিজের। পাশ্চাত্যের প্রভাব আছে তাঁর ওপর বিপুলভাবে। সমসাময়িকদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সচচেয়ে বেশি পশ্চিমঘেঁষা। কিন্তু বিষয় ও প্রকরণের এই পাশ্চাত্যমুখীতাকে তিনি বাঙালিয়ানায় আর্দ্র করে নিতেও ভোলেননি। ফলে সবশেষে বুদ্ধদেব বসুর কাছ থেকে আমরা এমন এক সাহিত্যসম্ভার, বিশেষ করে গদ্যে, উপহার পাই যা একক ও অনন্য। বলতে লোভ হয়, বাংলা গদ্য সাহিত্য এটি অদ্বিতীয়। হয়তো সেজন্যই আজ পর্যন্ত আমরা তাঁর কোনো সার্থক অনুসারী পাইনি। পরবর্তী প্রজন্মের প্রধান বাঙালী গদ্যকার এবং কথাশিল্পীরা তাঁর প্রভাবে নিজেদের ঋদ্ধ করেছেন, কিন্তু কেউই তাঁর মেজাজ এবং চারিত্রকে সম্পূর্ণ গ্রহণ করতে পারেননি। কারো কারো চেষ্টা ছিলো, কিন্তু বুদ্ধদেব বসু থেকে গেছেন অধরা। অন্যান্য সাহিত্যে, এমন কি বাংলা সাহিত্যেও এর পূর্ব দৃষ্টান্ত আছে। শিল্পের অনেক প্রহেলিকার মধ্যে এটিও একটি।

http://www.munshigonj.com/Special/Basu100/SihabBasu.htm