প্রস্তাবিত পদ্মা সেতু: কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়

এম এইচ রশীদ ও সায়্যিদ চৌধুরী
‘উন্নত অবকাঠামোই (ইনফ্রাস্ট্রাকচার) আধুনিক সভ্যতার অপরিহার্য ভিত্তি’−বলেছেন আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ারসের সভাপতি ড. ওয়েইল ক্লটম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ছয় লাখ জরাজীর্ণ সড়কসেতুর এক-চতুর্থাংশের অনতিবিলম্বে মেরামত অথবা পুনর্নির্মাণের প্রয়োজনের প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গিয়ে তিনি সম্প্রতি এ কথা বলেন। মেরামতে অবহেলার কারণে ২০০৭ সালে মিনেসোটার একটি সড়কসেতু ভেঙে ১১২ জনের প্রাণহানি মার্কিন কর্তৃপক্ষের জন্য সতর্কসংকেতের কাজ করেছে।
সড়ক, মহাসড়ক ও রেলপথ হচ্ছে উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য প্রাথমিক অবকাঠামো, যা দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য প্রয়োজন। নদী, গভীর খাদ অথবা অন্য যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রমের জন্য মানুষ সুদুর অতীত থেকে সেতু নির্মাণ করছে। প্রকৌশলীদের উদ্ভাবনী প্রতিভা ও সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সেতু নির্মাণে বিস্নয়কর সাফল্য ও দ্রুত যোগাযোগের ক্ষেত্রে যুগান্তকরী পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। উন্নয়ন হয়েছে ত্বরান্বিত।
অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশ হয়েও বঙ্গবন্ধু (যমুনা) সেতুর মতো একটি বিশাল, দুরূহ ও দীর্ঘ সেতু নির্মাণ প্রকল্পের সাফল্যজনক সমাপ্তির জন্য আমাদের সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রকৌশলী, বিশেষজ্ঞ, আমলা, ব্যবস্থাপকসহ আমরা সবাই নিঃসন্দেহে গর্ব বোধ করতে পারি। এই অভিজ্ঞতা ও সাফল্যপ্রসুত আত্মবিশ্বাস প্রস্তাবিত পদ্মা সেতু নির্মাণে নিশ্চিতভাবেই আমাদের সাহায্য রকবে। কিন্তু এর চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বঙ্গবন্ধু (যমুনা) সেতু নির্মাণ-পরবর্তী গত দুই দশকের কারিগরি ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষালাভ এবং একই ধরনের পরবর্তী প্রকল্পের ডিজাইন ও নির্মাণকে সঠিক ও ত্রুটিমুক্ত করার কাজে এই জ্ঞানের উপযোগিতা উপেক্ষা না করা। পৃথিবীর সব উন্নত দেশই এই পেশাদারি কাজে লাগিয়ে লাভবান হয়েছে।
যমুনা সেতুর ডিজাইন ও নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আমাদের বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীরা এত দিনে নিশ্চয়ই জানেন যমুনা সেতুটি যদি এখন আবার নির্মাণ করা হয় তাহলে প্রযুক্তিগত দিক থেকে তারা মূল ডিজাইন বা নির্মাণকৌশলে কী পরিবর্তন আনতেন। কী করলে সেতুর ফাটল পরিহার করা যেত। এটা কি কংক্রিট সেতুর ওপর দিয়ে রেল চালানোর জন্য, নাকি সম্পুর্ণ অন্য কারণে? এই ফাটল কি সহজে মেরামতযোগ্য ও উপেক্ষা করার মতো, নাকি উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো? এবং এর ফলে সেতুর স্থায়িত্ব ও উপযোগিতা হ্রাসের আশঙ্কা আদৌ আছে কি না।
এখানে স্নরণ করা যেতে পারে, যমুনা সেতুর মূল পরিকল্পনাটি ছিল একটি সড়কসেতুর। ১৯৭৫-পরবর্তী তদানীন্তন সরকারপ্রধানের ইচ্ছাতেই কনসালট্যান্ট এই কংক্রিট সেতুর ডেকের একপাশে রেললাইন বসানোর ব্যবস্থা করেন, যদিও প্রিস্ট্রেন্ড কংক্রিট গার্ডার টাইপ সেতুর ডেকে রেললাইন বসানো কারিগরি কারণেই সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ এর ফলে সেতুর প্রিস্ট্রেন্ড কংক্রিট গার্ডারে ফাটল সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। বঙ্গবন্ধু সেতুর বেলায় এর সম্ভাব্য পরিণতি হতে পারে ভবিষ্যতে এই সেতুর ওপরের রেললাইন বাতিল করে পাশে একটি আলাদা রেলসেতু নির্মাণ করা।
গত ত্রিশ বছরে আমরা অনেক পথ পেরিয়ে এসেছি। আমাদের বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক পরামর্শদাতারাও অভিজ্ঞতায় অনেক সমৃদ্ধ হয়েছেন। প্রযুক্তিও হয়েছে আরও উন্নত। তবে প্রকল্পব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ আর তাই অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রকল্পকে কারিগরি ত্রুটিমুক্ত করার গুরুত্ব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। প্রস্তাবিত পদ্মা সেতুর জন্য সঠিক স্ট্রাকচার টাইপ, মেটেরিয়াল ও নির্মাণকৌশল বেছে নেওয়া এই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
উপযোগিতা, স্থায়িত্ব, প্রকল্পব্যয় ও নান্দনিক কারণেই এ ধরনের সেতুর জন্য সঠিক স্ট্রাকচার টাইপ বেছে নেওয়া আবশ্যক। সেতুর জন্য কয়েক ধরনের স্ট্রাকচার টাইপ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে গার্ডার, ট্রাস, আর্চ, সাসপেনশন, কেব্ল স্টেইড ইত্যাদি।
বাংলাদেশের মহাসড়কগুলোয় অধিকাংশ সেতুই কংক্রিট গার্ডার টাইপের। সড়ক লেভেলের নিচে হওয়ায় সেতুর লোড বহনকারী রিইনফোর্সড অথবা প্রিস্ট্রেন্ড কংক্রিট গার্ডার টাইপ স্ট্রাকচার সড়ক ব্যবহারকারী যানবাহন থেকে দৃষ্টিগোচর হয় না।
আমাদের দেশে স্টিল ট্রাস টাইপ সেতুর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হচ্ছে পাকশীর হার্ডিঞ্জ সেতু। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি হারবার সেতুটি একটি স্টিল আর্চ সেতু। ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রানসিসকো গোল্ডেন গেট সেতু হচ্ছে সাসপেনশন টাইপের। পাশের দেশে কলকাতার বিদ্যাসাগর সেতুটি কেব্ল স্টেইড। ব্যবহার ও উপযোগিতার পার্থক্যই এসব সেতুর জন্য বিশেষ স্ট্রাকচার টাইপ বেছে নেওয়ার প্রধান কারণ, যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকল্প ব্যয়, পূর্ব-অভিজ্ঞতা ও দেশীয় প্রযুক্তিও অন্যতম কারণ।
চীন, ভারতীয় উপমহাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই স্বল্প স্প্যানেরর ইটের আর্চ টাইপের প্রাচীন জীর্ণ সেতুর বদলে আধুনিক কালে নির্মিত হয়েছে কংক্রিট আর্চ সেতু। তবে টেকসই হওয়া ও দীর্ঘস্থায়িত্বের জন্য দীর্ঘ স্প্যানের সড়কসেতুর জন্য সারা বিশ্বেই প্রকৌশলী ও হাইওয়ে কর্তৃপক্ষের পছন্দ হচ্ছে প্রিস্ট্রেন্ড কংক্রিট অথবা স্টিল সেতু। একই কারণে রেলসেতুর জন্য সবার পছন্দ স্টিল সেতু।
কংক্রিটের রেলসেতুর দৃষ্টান্ত বিরল। কারণ প্রধানত দুটি−১. সড়ক ও মহাসড়ক ব্যবহারকারী মোটরগাড়ি ট্রেনের চেয়ে ওজনে অনেক হালকা, ২. রেল লোকোমোটিভ (এঞ্জিন) ও ট্রেনের ওজন সড়কযানের তুলনায় শুধু অনেক গুণ বেশিই নয়, ট্রেন চলাকালে সৃষ্ট কম্পন অনেক বেশি ‘ইমপ্যাক্ট লোড’ তৈরি করে, যার ফলে প্রায়শই প্রিস্ট্রেন্ড কংক্রিটে নির্মাণকালে আরোপিত প্রিস্ট্রেস হ্রাস পায় এবং সেতুর স্থায়িত্ব কমতে থাকে। এ কারণেই অধিকাংশ রেলসেতুর জন্য বেছে নেওয়া হয় স্টিল গার্ডার, স্টিল আর্চ অথবা স্টিল ট্রাস টাইপ স্ট্রাকচার আর কেবল সড়ক ও মহাসড়কে নির্মিত হয় সাসপেনশন ও কেব্ল স্ট্রেইড সেতু।
একই সেতুতে সড়ক ও রেল যোগাযোগের উদাহরণ প্রধানত চীন আর ভারতেই দেখা যায়। ভারতীয়রা দেশের প্রায় সব বড় নদীর ওপর সড়ক-রেল কম্বাইন্ড সেতু নির্মাণ করেছে। ফলে তাদের এ বিষয়ে দক্ষতা আর অভিজ্ঞতা দুই-ই রয়েছে। চীনের বেলায়ও এটা সত্য। আমেরিকানদের অর্থ আর মেটেরিয়ালের অভাব নেই, তাই ওরা সড়ক ও রেল যোগাযোগের জন্য আলাদা আলাদা সেতু নির্মাণে অভ্যস্ত।
মার্চ ১৯৯৭-এ চালু হওয়া ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের রাজাহমুন্দ্রিতে গোদাবরি নদীর ওপর নির্মিত সেতুটি এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম সড়ক-রেল কম্বাইন্ড সেতু। আগেই বলেছি, কলকাতার বিদ্যাসগার সেতুটিও কেব্ল স্টেইড।
এই নিবন্ধের দীর্ঘ ভুমিকার কারণ একটিই। প্রস্তাবিত পদ্মা সেতুর জন্য সঠিক স্ট্রাকচার টাইপ, মেটেরিয়াল ও নির্মাণকৌশল সম্পর্কে আলোচনা।
প্রস্তাবিত পদ্মা সেতু দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোর জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যয়বহুল একটি প্রকল্প। এ কারণেই সেতুর সঠিক স্ট্রাকচার টাইপ বেছে নেওয়া এবং নির্মাণকাজের কারিগরি ও গুণগত উচ্চমান নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে এই বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি অন্তত ১০০ বছর স্থায়ী হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক ডিজাইন এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কোড ও স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী নির্মিত হলে স্টিল সেতু অন্তত ১০০ বছর, প্রিস্ট্রেন্ড কংক্রিট সেতু ৭৫ বছর ও রিইনফোর্সড কংক্রিট (আরসিসি) সেতু ৫০ বছর পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য থাকা উচিত।
সম্প্রতি, পদ্মা সেতুর কনসালট্যান্ট পাঁচটি বিকল্প প্রাথমিক ডিজাইন উপস্থাপন করেছেন। প্রথমটি অবিকল যমুনা সেতুর টাইপ। এটি গ্রহণযোগ্য হলে যমুনা সেতুর ভুল ও এর খেসারতের পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কার কারণেই এই প্রথম বিকল্পটি বাতিলযোগ্য।
পদ্মা সেতুর কনসালট্যান্ট উপস্থাপিত দ্বিতীয় বিকল্পটি ওপরে বর্ণিত অন্ধ্র প্রদেশের গোদাবরি সেতুর একই টাইপের। শুধু স্টিল আর্চের পরিবর্তে সুপারস্ট্রাকচারে স্টিল ট্রাস প্রস্তাব করা হয়েছে, যা পাটনার কাছে গঙ্গা নদীর ওপর মোকামা সেতুর অনুরূপ। এই প্রস্তাবটি সুবিবেচনাপ্রসুত ও পদ্মা সেতুর ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তাই আপাতদৃষ্টিতে সমর্থনযোগ্য।
স্টিল সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন ও অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ এ ধারণা সঠিক নয়। স্টিল হচ্ছে সর্বোত্তম স্ট্রাকচারাল মেটেরিয়াল। এর ফ্যাব্রিকেশন ও ইরেকশন দ্রুত ও সহজ। ব্যয় বেশি হলেও স্ট্রাকচারাল সুবিধা ও স্থায়িত্ব বেশি। প্রয়োজনমতো স্টিল স্ট্রাকচারের অংশবিশেষ সহজেই মেরামত বা নবায়ন সম্ভব। আবহাওয়াজনিত ‘কেরাশন’-এর একমাত্র অসুবিধা, যা ‘করোশন’-প্রতিরোধক রং বা সারফেস কোটিংয়ের প্রয়োগে সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। ১০০ বছরের বেশি কাল ধরে টুইন ট্র্যাক রেললাইনবাহী পাকশীর হার্ডিঞ্জ সেতু ও কলকাতার হাওড়া সেতু এর বিদ্যমান উদাহরণ। অন্যদিকে, গত ৩৮ বছরে দেশে নির্মিত ছোট-বড় অনেক রিইনফোর্সড কংক্রিট (আরসিসি) ও প্রিস্ট্রেন্ড কংক্রিট সেতু ইতিমধ্যে আবার নির্মাণ করতে হয়েছে।
বিশেষ করে সরকার যখন চার বছরের মধ্যেই ডিজাইন ও নির্মাণ শেষ করতে চাইছে, তাই আরও দু-একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত পদ্মা সেতুর পূর্ব-পশ্চিম দুই প্রান্তেই বর্তমানে কোনো রেললাইন নেই। যদিও সরকারের সদিচ্ছা ও সংকল্পে অনেক দুঃসাধ্য সাধন সম্ভব, তবু দেশের বাস্তবতা ও অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে এই সময়সীমায় প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন একটি চ্যালেঞ্জ বলেই মনে হয়। ১২০ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণ বিপুল সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। তাই অন্য একটি বিকল্পে সম্ভাব্যতা খোলামনে বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে।
এই বিকল্পটি হচ্ছে রেল লিংক বাদ দিয়ে মাওয়ায় একটি সড়কসেতু নির্মাণ করা এবং এতে যে অর্থ সাশ্রয় হবে তা দিয়ে একটি অপেক্ষাকৃত কম দৈর্ঘ্যরে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া কম্বাইন্ড রেল ও সড়ক স্টিল সেতু নির্মাণ করা। যেহেতু পশ্চিম প্রান্তে বর্তমানে রেললাইন বিদ্যমান, তাই কেবল পূর্ব প্রান্তে ঢাকার দিকে ৫৬ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণ করতে হবে। এর ফলে সহজেই ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে প্রকল্পের সঙ্গে সংযোগ সম্ভব হবে।
প্রকৌশলী ড. এম. হারুণ রশীদ: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট)।
d.mhrashid@yahoo.com.au
প্রকৌশলী সায়্যিদ চৌধুরী: সিডনিতে পাবলিক সেক্টর সিনিয়র পলিসি অ্যানালিস্ট পদে কর্মরত।
sayedchowdhury@hotmail.com