‘ইয়াজউদ্দিন মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় উত্তর দিয়েছেন’

Iajuddinসাবেক প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের একটি সাক্ষাৎকারে দেয়া বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক তোলপাড়ের পর গতকাল তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছেÑ শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেকটা ভারসাম্যহীনভাবে কি উত্তর দিয়েছেন তা তিনি নিজেও জানেন না বা বলতে পারেন না। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রাক্তন প্রেসিডেন্টকে দুরভিসন্ধিমূলকভাবে একটি অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিতেই এটা করা হয়েছে। গত রোববার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন বাংলাভিশনের একটি লাইভ টক শোতে অংশ নিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট ১১ই জানুয়ারি পরবর্তী তার সকল কর্মকাণ্ডকে ‘আল্লাহর নির্দেশিত শুভ কাজ’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, ১১ই জানুয়ারি পূর্ব ও পরবর্তী সময়ের অনেক ঘটনা ও পেছনের ঘটনা নিয়ে তিনি শিগগিরই প্রকাশ করবেন একটি বই। ওই সাক্ষাৎকারে ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ দাবি করেন, তার নির্দেশেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। রাজনৈতিক নেতাসহ ভিআইপিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে তাদের গ্রেপ্তারে যৌথবাহিনীর অভিযানও তার পরামর্শে একটি শুভ কাজ বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনের এ সাক্ষাৎকারের পর রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক তোলপাড় হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র নেতারাও প্রতিক্রিয়া জানান।

রহস্যের ব্যাপার: সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী

বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কেন সাবেক প্রেসিডেন্ট টেলিভিশনের পর্দায় হাজির হলেন তা রহস্যের ব্যাপার। তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে জিব্রাইলকে দায়ী করে সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের সাফাই গেয়ে গেছেন। এমন সময় তিনি এলেন, যখন সাবেক জেনারেলদের গ্রেপ্তার করা শুরু হলো। যখন সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে ইয়াজউদ্দিনের এ আগমনের হেতু সম্পর্কে জনমনে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কেন এসেছেন, কারা পাঠিয়েছেন।

ঠিকই বলেছেন: ওবায়দুল কাদের

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ যা বলেছেন তা ঠিকই। কারণ সংবিধান অনুযায়ী তিনি তখন রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতার মালিক। সবকিছু বাস্তবায়ন করতে তার আদেশ লেগেছে। তবে তিনি যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সবকিছু করেছেন তা আমরা আগেও বলেছি। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি প্রধান উপদেষ্টা পর্যন্ত হয়েছেন। এ সময় তিনি অদৃশ্য শক্তির নির্দেশে সবকিছু করেছেন। ১১ই জানুয়ারির পরও তিনি অদৃশ্য শক্তির নির্দেশে সবকিছু করেছেন। ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ছিলেন যখন যেমন, তখন তেমন। তিনি একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়ের রচনা করলেও সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আমরা অনেক কিছুই মেনে নিয়েছি।

আর কি বলার আছে?

বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব সেলিমা রহমান বলেন, সংবিধান লঙ্ঘনকারী সাবেক প্রেসিডেন্ট তো এসব বলবেনই। এছাড়া, তার বলার আর কি আছে? জনগণ ভালভাবেই জানে কেন জাতীয় জীবনে ১১ই জানুয়ারি ঘটেছিল। সাক্ষাৎকারে তিনি সবকিছু আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। এখন কথা হচ্ছে, এর পেছনে কিছু আছে কিনা। হয়তো কেউ উনাকে দিয়ে বলিয়েছেন। তবে কথা হচ্ছে, তিনি যে একজন মেরুদণ্ডহীন লোক সেটা এ সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে আবারও প্রমাণ করেছেন।

‘আমার কথা ছাড়া তখন কিছু হয়নি’

বাংলাভিশনের লাইভ অনুষ্ঠান ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’-এ ওই সাক্ষাৎকারে ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আমার কথা ছাড়া তখন কিছু হয়নি, কাউকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি। ভাল বুঝেই আমি জরুরি অবস্থা জারিতে মত দিয়েছিলাম। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়া দুই নেত্রীকে গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, এটা কঠিন প্রশ্ন। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কিছু হয়েছে, তাতে কিন্তু অনেক মানুষ বেঁচে গেছে। ১১ই জানুয়ারির মাধ্যমে কি কি ঘটনা ঘটেছিল জানতে চাইলে ড. ইয়াজউদ্দিন প্রথমে বলেন, ‘ওই জিনিসটা আমার সব মনে নাই।’ পরে বলেন, ‘বই লিখছি, বইয়ের জন্য থাক, তখন জানতে পারবেন।’ এক টেলিফোন প্রশ্নে রাজনৈতিক বিশ্লেষক বদরুদ্দীন উমর লাইভে অংশ নিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন। ১১ই জানুয়ারির মাধ্যমে কার নির্দেশে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিলÑ আল্লাহর নির্দেশে, নাকি সেনাবাহিনীর নির্দেশে, না আমেরিকার নির্দেশে জানতে চাইলে ড. ইয়াজউদ্দিন এর সরাসরি জবাব না দিয়ে বলেন, আমি পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দেরি করবো না। যত শিগগির সম্ভব বই বের হবে। জরুরি অবস্থা জারি খুব প্রয়োজন ছিল কিনা জানতে চাইলে উত্তরে বলেন, ‘হুঁ হুঁ’। ১১ই জানুয়ারির পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের পদ থেকে কেউ জোর করে তাকে পদত্যাগপত্র লিখে স্বাক্ষর করিয়েছিল কিনা জানতে চাইলে জবাবে ড. ইয়াজউদ্দিন স্বীকার করে বলেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ’। তবে কে বা কারা পদত্যাগপত্র এনেছিল তা বলেননি। ওই সময় সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান বিশ্বাসের কথা মনে পড়েছিল কিনা জানতে চাইলে ড. ইয়াজউদ্দিন বলেন, আমার তো তখন কিছু মনে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল ভাল কাজ করছি। মনে করি না কেউ জোর করে কিছু করিয়েছে। প্রেসিডেন্ট কীভাবে হলেনÑ জানতে চাইলে তার উত্তরÑ এটা আল্লাহতায়ালাই করে দেন। গত দু’বছরে তার বিরুদ্ধে সমালোচনার ব্যাপারে প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমি এগুলো বিশ্বাস করি না, সাত-আটবার এসব প্রচারণা হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি না, একইভাবে রটানো হয়েছে।

ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ব্যক্তিদের বিচার দাবি

বাংলাভিশনে প্রচারিত সাক্ষাৎকারকে ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের স্ত্রী প্রফেসর ড. আনোয়ারা বেগম ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, গত ২৪শে মে রোববার বিকালে ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সাবেক ছাত্র ড. কবির হোসেন তালুকদারের সঙ্গে বাংলাভিশন-এর দু’জন কর্মকর্তা আমাদের গুলশানস্থ বাসভবনে আসেন এবং একজন বিজ্ঞ শিক্ষাবিদ হিসেবে প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিনের একটি সাক্ষাৎকার নেয়া হবে বলে আমাকে জানান। এ অবস্থায় ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ শারীরিক ও মানসিক অসুস্থ থাকায় আমি অপারগতা প্রকাশ করি। ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ বিগত প্রায় দু’ মাস ধরে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ, এ কারণে তিনি ঢাকার প্রেসক্রিপশন পয়েন্ট (বনানী) হাসপাতালের চিকিৎসক কর্নেল (অব.) প্রফেসর ড. নুরুল আজিমের চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের অনুরোধে টিভি সেন্টারে যাই এবং আমি বাইরে অপেক্ষা করতে থাকি। ওই সময় তার কাছ থেকে শিক্ষাবিদ হিসেবে কোন সাক্ষাৎকার না নিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা নিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভিন্ন প্রশ্ন করে তাকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেকটা ভারসাম্যহীনভাবে কি উত্তর দিয়েছেন তা তিনি নিজেও জানেন না বা বলতেও পারেন না। আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত যে, সাবেক রাষ্ট্রপতিকে দুরভিসন্ধিমূলকভাবে একটি অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়া, বিতর্কিত ও দেশবাসীর কাছে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশে এই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ, একজন বর্ষীয়ান সাবেক রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে এ ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ব্যক্তিদের বিচারের জন্য সরকার ও দেশবাসীর কাছে আমরা বিনীতভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।