ইয়াজউদ্দিনকে ৯০ হাজার টাকার নাস্তা খাওয়ান জমিরউদ্দিন

এমপি হোস্টেলে অবৈধভাবে থাকতেন পঞ্চগড়ের ৫শ লোক
জাতীয় সংসদের স্পিকার আব্দুল হামিদ এডভোকেট ও সর্বদলীয় সংসদীয় তদন্ত কমিটির সদস্যরা যতোই গভীরে যাচ্ছেন ততোই খুঁজে যাচ্ছেন সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের বহুমুখী অনিয়মের চিত্র। সংসদ ভবনের পাশে পুরাতন এমপি হোস্টেলে (যেখানে বিশেষ আদালত স্থাপন করা হয়েছিল) অবৈধভাবে বসবাস করতেন পঞ্চগড়ের ৪ থেকে ৫০০ লোক। কোনো বরাদ্দ কিংবা কাগজপত্র ছাড়াই তাদের থাকার সুযোগ করে দেন জমিরউদ্দিন। বসবাসকারীদের মধ্যে যারা একটু প্রভাবশালী ছিলেন তারা বহিরাগতদের কাছে মাসিক টাকার বিনিময়ে রুমও ভাড়া দেন। শুধু এমপি হোস্টেলেই নয়, হুইপদের বাসাতেও পঞ্চগড়ের বহু লোককে অবৈধ বসবাসের অনুমতি দেন সাবেক স্পিকার।

কিছুদিন আগে হুইপদের সঙ্গে করে হোস্টেল পরিদর্শনে গিয়ে এই পরিস্থিতি দেখেন আব্দুল হামিদ। এরপরই অবৈধ বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করা হয়। গতকাল স্পিকারের সঙ্গে তার কার্যালয়ে সরকারি দলের হুইপদের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা হয়। আলোচনায় এই বিষয়টিও খতিয়ে দেখার জন্য তদন্ত কমিটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

বৈঠক শেষে একাধিক হুইপ এই প্রতিবেদককে জানান, চলতি নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুর দিন (গত ২৫ জানুয়ারি) প্রথা অনুযায়ী ভাষণ দেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তার আপ্যায়ন খরচ বাবদ তখনকার স্পিকার জমিরউদ্দিন খরচ দেখান ৯০ হাজার টাকা।

খরচের বিলে উল্লেখ করা হয়, রাষ্ট্রপতির আপ্যায়নের জন্য হোটেল শেরাটন থেকে ৪০ প্লেট নাস্তা আনা হয়। প্রতি প্লেটের দাম ২ হাজার ২৫০ টাকা। এই বিল নিয়েও গতকাল স্পিকারের সঙ্গে হুইপদের বৈঠকে আলোচনা হয়। বিলটি পরিশোধ করতে হবে বর্তমান স্পিকারকে। রাষ্ট্রপতির আপ্যায়ন বাবদ ৯০ হাজার টাকা খরচের বিষয়টিকে অস্বাভাবিক মনে করা হচ্ছে। এজন্য এই বিষয়টিও তদন্ত কমিটিতে পাঠানো হবে। এছাড়া জমিরউদ্দিনের এপিএসদের কেউ কেউ মাসে ৯৯ হাজার টাকা গাড়ির তেল খরচ বাবদ নিয়েছেন বলেও প্রমাণ পাওয়া গেছে।

গতকালের বৈঠকে আসন্ন বাজেট অধিবেশনে আসন পুনর্বণ্টন নিয়েও আলোচনা হয়। এতে সামনের সারিতে বিএনপিকে আরও একটি আসন দেয়ার বিষয়ে হুইপরা ঐকমত্য পোষণ করেন। এক হুইপ বলেন, জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ায় যে আসনটি খালি রয়েছে সেটিই বিএনপিকে ছেড়ে দেয়া হবে।

জানা গেছে, গত রোববারও হুইপদের নিয়ে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন স্পিকার। সেখানে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদীন ফারুকও উপস্থিত ছিলেন। আসন প্রশ্নে ফারুক সেদিন স্পিকারকে বলেছিলেন ‘আমরা চাই সম্মানজনক সমাধান’। এরপর সরকারি দলের হুইপরা ফারুককে অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন ‘স্পিকার যে সিদ্ধান্ত দেবেন আপনারা তা মেনে নেবেন’।

এদিকে আগামী ১ জুন সরকারি ও বিরোধী দলের দুই প্রধান হুইপকে নিয়ে বৈঠক ডেকেছেন স্পিকার। সেখানেই আসন পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।

স্পিকারের সঙ্গে হুইপদের গতকালের বৈঠকে ঢাকায় এমপিদের অফিস দেয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। পুরাতন এমপি হোস্টেলে এমপিদের জন্য অফিস করা হচ্ছে। এমপিদের অনেকে ইতোমধ্যে অফিসের জন্য লিখিত আবেদনও করেছেন। বাজেট অধিবেশনের মধ্যেই বরাদ্দ শেষ হবে।

জানা গেছে, এমপি হোস্টেলের বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী এখন ১৯০ থেকে সর্বোচ্চ ২২০ জন এমপিকে অফিস দেয়া সম্ভব। অফিসের জন্য এমপিদের আপাতত শুধু রুম, পুরনো আসবাবপত্র, এসি, কার্পেট ও দু’তিনজন স্টাফ দেয়া হবে। রঙয়ের কাজও করিয়ে দেয়া হবে। পুর্নাঙ্গ অফিস স্থাপনের জন্য সংসদ সচিবালয় বিভিন্ন দাতা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করছে।

হুইপদের রেড টেলিফোন দেয়ার বিষয়েও বৈঠকে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপকে উপমন্ত্রীর পদমর্যাদা প্রদানেরও প্রস্তাব এসেছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতিদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়ে কথা হয়। তাদের জন্য একটি গাড়ি, ড্রাইভার, গ্যানম্যান, আপ্যায়নের জন্য এককালীন অনুদান প্রদান এবং বসবাসের জন্য সংসদ থেকে ফ্ল্যাট বরাদ্দ প্রদানের প্রস্তাব গৃহীত হয়। কমিটি প্রধানরা বিচারপতিদের মতো গাড়িতে নিজস্ব পতাকা ব্যবহার করতে পারবেন বলেও প্রস্তাব আসে।

বৈঠকে বলা হয়, সরকারের নীতি ও কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে কেবিনেটের সঙ্গে সংসদের যোগাযোগ স্থাপন অপরিহার্য। এজন্য কেবিনেটের বৈঠকে সংসদের পক্ষ থেকে চিফ হুইপকে উপস্থিত রাখার প্রস্তাব আসে। নবাগত সংসদ সদস্যরা যাতে সংসদে ঠিকভাবে নিয়মকানুন মেনে চলতে পারেন, সে বিষয়ে হুইপিং করার জন্য হুইপ-চিফ হুইপদের একটি প্রশিক্ষণ আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা হয়। এছাড়া হুইপরা যাতে মন্ত্রী-সচিবদের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করতে পারেন, সে প্রক্রিয়া নিয়ে কথা হয়।

স্পিকার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এসব প্রস্তাব ও নীতিগত সিদ্ধান্ত আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই সংসদ নেতার (প্রধানমন্ত্রী) কাছে উপস্থাপন করা হবে। এরপর এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেবে সরকার ও সংসদ।

http://www.amadershomoy.com/content/2009/05/27/news0477.htm