তারে বহিবারে দাও শকতি

ড. মীজানুর রহমান শেলী
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার প্রশাসনকে নিয়ে বিপাকে আছে বলে মনে হয়। দিনবদল ও ডিজিটাল বাংলাদেশ পত্তনের অঙ্গীকার নিয়ে মহাজোট ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে মহাজয় অর্জন করে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব আকর্ষণীয় প্রতিশ্র“তি দেয়া হয়, তার বাস্তব রূপায়ণের জন্য দরকার বলিষ্ঠ, সুশৃংখল ও আস্থাবান প্রশাসন। আর সেখানেই যেন ঘাটতি অনুভব করছে সরকার। অথচ ক্ষমতাসীন যে কোন রাজনৈতিক দলের শক্তির এক প্রধান উৎস অভিজ্ঞ, দক্ষ, পেশাদার ও অরাজনৈতিক প্রশাসন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,
‘তোমার পতাকা যারে দাও
তারে বহিবারে দাও শকতি’।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে দল নির্বাচনে বিজয়ী হয় তার হাতে আসে ক্ষমতা ও দায়িত্বের পতাকা। এই পতাকা সফলভাবে বয়ে নেয়ার দায়িত্ব রাজনৈতিক সরকার একা পালন করতে পারে না। পেশাগতভাবে দক্ষ ও উদ্যোগী প্রশাসন পারে সে শক্তি রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে পৌঁছে দিতে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকারকে এই শক্তির জোগান দিতে প্রশাসন সফল হচ্ছে না।
ক্ষমতায় আসার পর ১০০ দিন পার করে সরকার যে প্রশাসন নিয়ে সমস্যায় আছে তা সরকার প্রধান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রীদের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট ফুটে ওঠে। ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনের উঁচুস্তরের কর্মকর্তাদের বলেছেন, কাজেকর্মে শিথিলতা ও ত্র“টি হল তাদের অক্ষমতার ফল অথবা আনুগত্যের অভাবের পরিণতি। তিনি বারান্তরে বলেন, আইন-কানুন, বিধি-রীতির দোহাই নিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যেন জনকল্যাণ ও উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি না করেন। তিনি তাদের নির্দেশ দেন যে, প্রয়োজন হলে তারা যেন প্রতিবন্ধক আইন-কানুন ও বিধি-রীতি বাস্তবসঙ্গতভাবে বদলানোর প্রস্তাব রাখেন। এতে করে রাজনৈতিক সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে জনকল্যাণ ও উন্নয়নের গতি দ্রুত করার পদক্ষেপ নিতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জেলে যাওয়ার ভয় করার প্রয়োজন নেই, জেলে যাওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সামলাবেন।
শেখ হাসিনা যথার্থই উপলব্ধি করেছেন যে, প্রশাসনে উদ্যম, উদ্যোগ ও গতি সঞ্চারিত না হলে সরকারের পক্ষে বিভিন্ন সংকট নিরসন ও অভাব-অভিযোগ মেটানো সহজসাধ্য হবে না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যতই বলিষ্ঠ এবং আন্তরিক হোক না কেন, সরকারের শক্তির মূল আধার হিসেবে কাজ করে দক্ষ ও আত্মনিবেদিত প্রশাসন। অবশ্য রাজনৈতিক স্তরের ব্যবস্থাপনা নিয়েও অতিসম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কিছুটা ক্ষোভ ও সংশয় প্রকাশ করেন। পত্রপত্রিকার প্রতিবেদনে দেখা যায়, তিনি মন্ত্রীদের কাজকর্মে গতি ও দক্ষতা আনতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আশানুরূপ সাফল্য না আনতে পারলে ছয় মাসের মধ্যে তাদের অনেককেই মন্ত্রিপরিষদ থেকে বিদায় নিতে হতে পারে।
রাজনৈতিক স্তরে প্রয়োজনীয় রদবদল প্রধান নেতা বা নেত্রী যে কোন সময়ই করতে পারেন। রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানো বা কমানো, মন্ত্রিপরিষদের রদবদল ইত্যাদি কাজকর্ম সব দেশে বিভিন্ন সময় নেতানেত্রীরা করে থাকেন এবং বাংলাদেশেও এমনটি ঘটেছে ও ভবিষ্যতে ঘটলেও বিস্ময়ের কিছু নেই।
কিন্তু রাজনৈতিক স্তরে পরিবর্তন যতটা দ্রুত এবং সহজ সম্ভব, প্রশাসনিক স্তরে তা নয়। প্রশাসনে কর্মরত ব্যক্তিদের বদলি করা যায়, দরকার হলে বিধি-রীতি মোতাবেক চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া যায় অথবা নির্দিষ্ট বয়সের আগে অবসর গ্রহণ করার ব্যবস্থা করা যায়। কিন্তু এতে করে প্রশাসনের ওপরের রূপ কিছুটা বদলানো গেলেও এর ভেতরের কাঠামো ও চালচলন সহজে পরিবর্তন করা যায় না।
প্রশাসন একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থা। এর ঐতিহাসিক পটভূমি থাকে এবং এর রূপ, কাঠামো ও অন্তঃসার ইতিহাস দ্বারা নির্ধারিত হয়। বহুকাল ধরে যা চলে আসছে তার আকস্মিক আমূল পরিবর্তন অসম্ভব এবং তাৎক্ষণিক সংস্কারও দুঃসাধ্য। আর এখানেই নিহিত রয়েছে আজকের সরকারের এক প্রধান ও অন্যতম সমস্যা।
উত্তরাধিকার সূত্রে সরকার যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা হাতে পেয়েছে তার রূপ ও কাঠামো তৈরি করে গেছে চলমান সময়। ওয়াকেবহালরা সবাই জানেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পরে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে এবং পার্শ্ববর্তী ভারতে যে প্রশাসন ব্যবস্থা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে চালু ছিল, তার ধারাবাহিকতা অটুট থাকে। ১৯৪৭-এর উপমহাদেশ বিভক্তির পর যে প্রশাসন ব্যবস্থা ঔপনিবেশ-উত্তরকালে অস্তিত্বশীল ছিল, তার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল এক অভিজাত শ্রেণীর নেতৃত্ব। ব্রিটিশ আমলে উপমহাদেশের প্রশাসনের নেতৃত্বে ছিল তৎকালীন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস বা আইসিএস’র সদস্যরা। উš§ুক্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পেয়ে তারা প্রায় দুই বছর নিবিড় প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ লাভ করে মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন উচ্চপদে কাজ করতেন। আইসিএসকে বলা হতো ‘ঞযব ংঃববষ ভৎধসব ড়ভ ইৎরঃরংয ঊসঢ়রৎব.’ উপমহাদেশে ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইস্পাত কাঠামো।’ এই কাঠামোটি ১৯৪৭ পরবর্তী ভারত ও পাকিস্তানে অটুট থাকে। ভারতে ঈষৎ রদবদলের পরে এই সার্ভিসের নাম দেয়া হয় আইএএস, ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস। পাকিস্তানে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ওই একই ধারায় চালু থাকে সিএসপি বা সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান।
১৯৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ক্যাডার হিসেবে সিএসপি’র অস্তিত্ব না থাকলেও ওই ক্যাডারের বাঙালি কর্মকর্তারা মুক্ত বাংলাদেশের প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বাংলাদেশের আটত্রিশ বছরে এদের প্রায় সবাই আজ নিয়মিত চাকরির বাইরে। অনেকেই অবসর নিয়েছেন, বেশ কয়েকজন লোকান্তরে। অবসরপ্রাপ্তদের মধ্যে কেউ কেউ যোগ দিয়েছেন রাজনীতিতে, কেউ কেউ বিভিন্ন সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ সংস্থার উচ্চপদে কর্মরত।
বাংলাদেশের প্রশাসনে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের সদস্যদের অবস্থান ও অবস্থা আইসিএস বা সিএসপি’র সঙ্গে তুলনীয় নয়। সমাজ বদলেছে, বদলে গেছে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমি। আংশিক সংস্কারের ফলে প্রশাসনের পাশাপাশি সৃষ্ট হয়েছে ২৯টি বিশেষজ্ঞ ক্যাডার। যাদের মধ্যে অর্থনীতিবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ইত্যাদি ক্যাডারের সদস্যরা রয়েছেন। চাকরিতে নিয়োগ লাভের পর এদের প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। কিন্তু বিভিন্ন প্রাথমিক সমস্যার কারণে শুরুর দিকে এই প্রশিক্ষণ সময়মতো দেয়া যায়নি, যদিও এখন অবস্থার বেশ কিছু উন্নতি ঘটেছে। ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলে স্বল্পসংখ্যক লোককে উচ্চতর সিভিল ও অন্যান্য সার্ভিসে নিয়োগ দেয়া হতো, ফলে শুধু প্রশিক্ষণ নয়, পদায়ন এবং পদোন্নতির বিষয়ে তাদের বিশেষ সমস্যায় পড়তে হতো না। উদাহরণস্বরূপ প্রাক-১৯৭১ পাকিস্তানে প্রতি বছর বিশ থেকে ত্রিশজন সিএসপি অফিসার নিয়োগ দেয়া হতো। উচ্চতর অর্থনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ড সম্পর্কিত পদ, পুলিশ, কাস্টমস, সেক্রেটারিয়েট সার্ভিস, ল্যান্ড ক্যান্টনমেন্ট সার্ভিস সব মিলিয়ে বছরে বড়জোর ১০০-১৫০ জন কেন্দ্রীয় উচ্চতর সার্ভিসে নিয়োগ পেতেন। সে তুলনায় আজকাল শুধু সাধারণ প্রশাসনিক ক্যাডারেই বছরে ৭০-৮০ জন নিয়োগ পায়। অন্যান্য ক্যাডার মেলালে এ সংখ্যা কয়েকশ’তে দাঁড়ায়। ফলে প্রশিক্ষণ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে সৃষ্টি হয় বিশাল জট। তাদের অনেকেই চাকরিতে ভবিষ্যৎ অগ্রগতির পথ দেখেন অনিশ্চিত।
পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রেও এদের অবস্থা সুবিধার নয়। যে বেতন-ভাতা এখনকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পরিপ্রেক্ষিতে তা অপ্রতুল। ৫০ বা ৬০-এর দশকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার প্রকৃত মূল্যের তুলনায় আজকে যারা তাদের স্থলে রয়েছেন তাদের আয় এক-তৃতীয়াংশেরও কম। স্বাভাবিকভাবেই এই অবস্থা তাদের মধ্যে অসন্তোষ, নিরাশা ও হতাশা সৃষ্টি করে। ফলে কাজকর্মের গতি হয় শিথিল এবং অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতি হয় ব্যাপক ও বিস্তৃত।
এসব সমস্যার সঙ্গে জড়িত হয়েছে আরেক মারাত্মক মাত্রা : প্রশাসনে দলীয়করণের প্রবণতা। ১৯৯০-এর দশকের প্রথমে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত হলেও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও আচার-আচরণ এখনও ভালো করে শিকড় গাড়তে পারেনি। বড় রাজনৈতিক দলগুলো তুলনামূলকভাবে সংগঠিত ও জনসাধারণের মাঝে বিস্তৃত থাকা সত্ত্বেও স্থায়ী বলিষ্ঠতা পায়নি। সাংঘর্ষিক রাজনীতি সংবিধানে স্বীকৃত বিরোধী দলের কাক্সিক্ষত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা লাভ করতে দেয়নি। নির্বাচন হয়ে উঠেছে সব জেতা বা সব হারানোর খেলা। ফলে নির্বাচনে জয়ী হওয়া ও দলীয় ক্ষমতা অটুট রাখার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো প্রশাসনকে নিজ নিজ পক্ষে টানতে চেষ্টা করে। এর ফলে ঘটে অশুভ এবং অনাকাক্সিক্ষত দলীয়করণ, যা বিপন্ন প্রশাসনকে আরও বিপর্যস্ত, দুর্বল ও নির্জীব করে। সুযোগ-সন্ধানীরা অবশ্য এই প্রবণতাকেও কাজে লাগায়। তারা ‘যখন যেমন তখন তেমন’ লেবাস ধারণ করে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকের ভান করে। এতে তাদের লাভ হলেও রাজনৈতিক দলের দীর্ঘমেয়াদি কোন উপকার হয় বলে মনে করা ঠিক হবে না। আসলে সরকারি চাকরিজীবীরা রাষ্ট্রের ভৃত্য, কোন দল বা দলীয় সরকারের নয়। এই অবস্থায় কোন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রশাসনকে দলীয়করণ পরিণামে কাজে আসে না।
আজকের সরকার অনেক বড় স্বপ্ন নিয়ে জনগণের কাছে এসেছে। এর জন্য দলীয়করণের কোন প্রয়াস মঙ্গলকর হবে না। বরং আকর্ষিক এবং ঘন ঘন প্রশাসনিক পরিবর্তন, ঢালাও বদলি সৃষ্টি করবে সংশয় ও অনাস্থা। এমন পরিবেশে রাজনৈতিক সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থাহীনতা ব্যাপক হয়ে উঠবে। ভীত ও শংকিত প্রশাসন সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও ধীরগতি হয়ে পড়বে। এমনিতেই আমাদের প্রশাসন ব্যবস্থা বহুস্তরভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেয়ার নেতিবাচক ঐতিহ্যের শিকার।
১৯৮০ সালে সিভিল অফিসার্স ট্রেনিং একাডেমী (ঈঙঞঅ) কর্তৃক ৪৮৪টি সরকারি ফাইলের নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, জাতীয় নীতি প্রণয়নে ২৮৯ দিন এবং তা বাস্তবায়ন ও প্রয়োগে প্রয়োজন হয় ৩১১ দিন। আবার জাতীয় নীতি প্রণয়নে ২৭ জন কর্মকর্তার স্বাক্ষরের প্রয়োজন আর বাস্তবায়ন ও প্রয়োগে প্রয়োজন হয় ১৯ জন কর্মকর্তার স্বাক্ষর। গত তিন দশকে প্রশাসনিক স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই দীর্ঘসূত্রতার ঝোঁক তেমন কমেছে বলে প্রতীয়মান হয় না।
প্রশাসনে অনিশ্চিত ও আস্থাহীনতা এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করবে। আর তা হবে আমাদের জাতির কল্যাণ ও উন্নয়নের পথে এক মারাত্মক বাধা। সুতরাং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সুচিন্তিত ও সুবিন্যস্ত পরিকল্পনা এবং পদক্ষেপের মাধ্যমে পুরো প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে হবে। দলীয় আনুগত্যের কষ্টি পাথরে যাচাই করে পচ্ছন্দসই ব্যক্তিদের এখানে-ওখানে বসালেই গতিশীল, সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে না।
ড. মীজানূর রহমান শেলী : সমাজবিজ্ঞানী, লেখক ও সাবেক মন্ত্রী