সাংঘর্ষিক রাজনীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে

ড. মীজানুর রহমান শেলী
মহান মে দিবস উপলক্ষে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পল্টন ময়দানে মহাসমাবেশ করেছে। এ সমাবেশের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করতে সচেষ্ট হয়েছেন।
১ মে ছিল আওয়ামী লীগের বিশাল সমাবেশ। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারের গত ৪ মাসের অর্জন ও সাফল্য ব্যাখ্যা করেছেন। পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত যেসব সমস্যার সমাধান এখনও করতে পারেননি তার দায় চাপিয়েছেন বিগত জোট সরকারের ওপর। তার ভাষায়Ñ জোট সরকারের কুশাসন ও দুর্নীতির কারণেই বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন খাত পিছিয়ে আছে। রাতারাতি এসব সমস্যার সমাধান হবে না। এজন্য সরকারকে কিছুটা সময় দিতে হবে। তার দাবি জনগণকে দেয়া প্রতিশ্র“তি পূরণ করলে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে। বিডিআর বিদ্রোহের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বিদ্রোহ দমন করায় বিরোধী দল নাখোশ হয়েছে। দেশে গৃহযুদ্ধ হলে, আরও বেশি লোক মারা গেলে তারা খুশি হতো।
২ মে বিএনপির সমাবেশেও বিপুলসংখ্যক লোকসমাগম ঘটে। কেননা, জাতীয় সংসদে আসন যতই কম হোক না কেন দেশের ৩২-৩৩ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। সেক্ষেত্রে এ ধরনের সমাবেশ অস্বাভাবিক নয়। বিএনপি চেয়ারপারসনও তার রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ খাতে বিএনপি আমলে লুটপাটের যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন তার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেছেন, যে খাতে ৫ বছরে সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল সেই খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হল কিভাবে? এর পাশাপাশি খালেদা জিয়া পররাষ্ট্রনীতি, জঙ্গিবাদ ইত্যাদি নিয়ে যেসব কথা বলেছেন তা ছিল অনেকটা উত্তেজনাপূর্ণ ও আবেগপ্রবণ। প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবিত আঞ্চলিক টাস্কফোর্সের সমালোচনা করে বলেন, তারা জঙ্গিবাদের অজুহাত তুলে দেশে বিদেশী সৈন্য আনার ষড়যন্ত্র করছে। তিনি এও বলেছেন, যে প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীকে রক্ষা করতে পারেন না, তিনি দেশকে রক্ষা করবেন কিভাবে? তার এ বক্তব্য দেশের রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের সাংঘর্ষিক ধারার কারণেই ১/১১-এর সৃষ্টি হয়েছিল। নেতা-নেত্রীদের উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে ভবিষ্যতেও সে ধরনের পরিস্থিতি হোক তা কেউ চায় না। দুই নেত্রীর ভাষণ বিশ্লেষণ করলে প্রথমেই বলতে হবে, তারা নিজেদের দায় এড়াতে প্রতিপক্ষের প্রতি অভিযোগের তীর ছুড়ে মেরেছেন।
বিশ্বমন্দার ধাক্কায় দেশের অর্থনীতি যখন প্রচণ্ড চাপের মুখে তখন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দুই নেত্রীর কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল তারা ঐক্যবদ্ধভাবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবেন। বিদ্যুৎ, পানিসহ বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে একযোগে কাজ করার কথা বলবেন। বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। রাজনীতিতে মতভিন্নতা থাকবে। একদল আরেক দলের সমালোচনা করবে। কিন্তু ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে হতে হবে সংযমী ও সহিষ্ণু। কোন রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রী, যারা এখন ক্ষমতায় আছেন বা অতীতে ক্ষমতায় ছিলেন তাদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল বক্তব্য ও আচরণই কাম্য। তাদের সাংঘর্ষিক রাজনীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
ড. মীজানুর রহমান শেলী : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক মন্ত্রী