কালো টাকা, অপ্রদর্শিত টাকার ফারাক এবং আগামী বাজেট

গোলাম কাদের
বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি, যানজট সুরাহা করে এমন প্রান্তিক বা তৃণমূল মানুষের সহায়ক বাজেট জনগণ প্রত্যাশা করে। জনগণ ডিজিটাল বোঝে না, জনগণ দিনবদল বোঝে, মনবদল বোঝে। আশা করি বাজেটে দিনবদলের হাওয়া লাগবে। মনদবল হবে। দিন বদলে যাবে। দিন বদলে যাবে কি?

বাজেট সামনে রেখে বাজার গরম। আলোচনা, সেমিনার, গোলটেবিল, বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের দেনদরবার, দাবি-চাপ চলতে থাকে এবং এক সময় বাজেট ঘোষণা হয়। এরপর শুরু হয় ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। কেউ বলেন, ব্যবসায়ীবান্ধব বাজেট, কেউ বলেন গরিববান্ধব বাজেট হয়নি আবার কেউ বলেন ভোগবাদী বাজেট।
মূলত বাজেট হয় যে দল সরকারে থাকে তাদের প্রতিশ্রুতিনির্ভর। কখনো কখনো দেখা যায় দলীয় লোকজনের উদর ভরার বাজেট হয়ে যায়।
বাংলাদেশের বাজেট ঘোষণার কাছাকাছি সময়ে কালোটাকা সাদাকরণ একটি কালচারে পরিণত হয়েছে। চাপে হোক, তাপে হোক, দুর্নীতিবাজদের দাপটে হোক প্রায় প্রতিবছরই বলা হয় এবার কালো টাকা সাদাকরণের শেষ চান্স। এরপর আবার সময় বাড়ানো হয়। আসলে আয়কর আইনে কালা টাকা বলে কিছু নেই। আছে অপ্রদর্শিত বা অঘোষিত আয়। আইনে বলা আছে, বৈধভাবে আয় করা হয়েছে অথচ কোনো কারণে ওই টাকা করদাতা প্রদর্শন করেননি বা গোপন রেখেছেন, তা অপ্রদর্শিত বা অঘোষিত আয় (আনট্যাক্সড)। কালো টাকার উৎস হচ্ছে অবৈধভাবে অর্জিত আয়, যেমনÑ ঘুষ, দুর্নীতি, কালোবাজারি, খুন-ডাকাতির বিনিময়ে যে অর্থ আয় করা হয়। কাজেই অপ্রদর্শিত আয় আর কালো টাকা কখনোই এক বিষয় নয়।
দেশে যেহেতু আয়কর আদায় ব্যবস্থা জোরালো নয়, সে কারণে প্রতিবছর অর্থনীতিতে নতুন করে কিছু অপ্রদর্শিত আয় সৃষ্টি হয়। এতে অপ্রদর্শিত আয়ের পরিমাণ বাড়তে থাকে। ফলে এ টাকা বা কালো টাকা অর্থনীতির মূল টাকার হিসাবের মধ্যে আসে না।
দেশে যেহেতু দুর্নীতি বন্ধ করা যাচ্ছে না, সেহেতু দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থনীতিতে কালোটাকার সৃষ্টি হচ্ছে। বাজারে মুদ্রাপ্রবাহ বেড়ে যায়। ফলে বেড়ে যায় মুদ্রাস্ফীতির হার। এ কারণে অর্থনীতির অন্যান্য উপকরণে সৃষ্টি হয় নানা জটিলতা ও সমস্যা।
দেশে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারের আমলে বাজেটে ঘোষিত সুযোগ নিয়ে ২৪ হাজার কোটি কালোটাকা সাদা করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি অপ্রদর্শিত টাকা সাদা করা হয়েছে ২০০৭ সালে, ৯ হাজার কোটি টাকা। সর্বোচ্চ দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে এ সুযোগ দেয়া হয়। আর ওই সময় এসব টাকা বাড়তি কর দিয়ে বৈধ করা হয়েছিল। এ খাত থাকে ২০০৭ সালে সরকার আয়কর হিসেবে পেয়েছিল ৮০৩ কোটি টাকা।
দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৫০ শতাংশ রয়েছে কালো টাকা। প্রতিবেশী ভারতীয় অর্থনীতিতে কালো টাকার প্রবাহ অর্ধেকেরও কম।
অর্থনীতিতে কালো টাকার প্রভাব বেশি থাকার ফলে অর্থনীতির সূচকগুলো সম্পর্কে সরকারি পর্যায় থেকে কোনো সিদ্ধান্ত হলে অনেক ক্ষেত্রেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে না। কালো টাকার প্রভাবে এর কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে প্রথম দেশে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়। এ সুযোগের আওতায় ৭০ কোটি টাকা সাদা করা হয়। ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে আবারো কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়। এ সুযোগের আওতায় ২০০ কোটি টাকা, ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে ২৫০ কোটি টাকা সাদা করা হয়েছিল। ’৯১ সালে সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান তার বাজেট বক্তৃতায় কালো টাকা সাদা করার সুযোগকে নিরুৎসাহিত করেন। সে সময় কোনো কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়নি।
২০০১-০২ অর্থবছরে ৪০০ কোটি, ২০০২-০৩ অর্থবছরের ১ হাজার কোটি, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৪ হাজার ৬০৩ কোটি কালোটাকা সাদা করার ঘোষণা দেয়া হয়।
গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুই দফায় অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার ঘোষণা দেয়া হয়। প্রচলিত আয়করের বাইরে ৫ শতাংশ বাড়তি কর দিয়ে সারাদেশের ৪৩ হাজার জন এ সুযোগ নিয়ে ৮ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করেছেন। এর বিপরীতে আয়কর হিসেবে সরকারের জমা পড়েছে ৮০৩ কোটি টাকা। কালোটাকা হোক, অপ্রদর্শিত টাকা হোক সাদা করার প্রক্রিয়া চালুর পর থেকে দেখা যাচ্ছে প্রথম যেখানে শুরু হয়েছিল ৭০ কোটি টাকা সাদাকরণ তা গত বছর প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকায় এসে ঠেকেছে।
এই যে কালো টাকা বলি আর অপ্রদর্শিত টাকাই বলি এর দৌরাত্ম্য দেশের অর্থনীতির মূল প্রবাহে যে দাপট সৃষ্টি করে তা যে কোনো সরকারের অনেক ইতিবাচক কর্মকা-কে বেকায়দায় ফেলে দেয়।
সম্প্রতি বাজেট নিয়ে আলোচনার ঝড়ো টেবিলে আবার উঠে এসেছে কালোটাকা বা অপ্রদর্শিত টাকা সাদাকরণের কথামালা।
যদিও অর্থমন্ত্রী এ বিষয়টি নিয়ে বিব্রত অবস্থায় আছেন। হাসিমুখে তিনি সব কথা উড়িয়ে দিতে পারেন, হাসিমুখে সামাল দিতে পারন সে গুণ তার আছে। তিনি কালোটাকা বা অপ্রদর্শিত টাকার লাগাম টেনে ধরতে পারবেন কি? তার হাতকে শক্তিশালী করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নয়া গভর্নর প্রফেসর ড. আতিউর রহমানকে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন। মুদ্রাস্ফীতির একটি কারণ এ কালো বা অপ্রদর্শিত টাকা। আশা করা যায় দুই রথী মিলে কালোটাকার দাপটের রশি টেনে ধরবেন এবং জনকল্যাণমুখী গরিববন্ধব বাজেট অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করবেন এবার। বাজেট যাতে ভোগবাদী বাজেট না হয়। মানুষ খেয়ে-পরে বাঁচার জন্য প্রতিটি সরকারকেই সংসদে নিয়ে আসে জনকল্যাণ আইন প্রণয়নের জন্য, তারপরও সরকার উল্টোপথে চলে ভোগবাদী বাজেট প্রণয়ন করে এবং দুর্নীতি বেড়ে যায়। বেড়ে যায় অপ্রদর্শিত টাকার দাপট আর সেই দাপটে সরকারের ইতিবাচক অনেক কার্যক্রম ভেস্তে যায়। সমাজে বেড়ে যায় অস্থিরতা। মাঝে মধ্যে তার মাসুল দিতে হয় নানাভাবে সরকারকেই।
তাই আগামী বাজেটে যাতে ফুটে ওঠে একটি সুসম সমাজ ব্যবস্থার প্রতিচিত্র। মানুষের, গরিবের কল্যাণমুখী একটি বাজেট। ফলে বিশ্বমন্দার তাপে যেন জনগণ তাপিত না হয়। তাড়িত না হয়। যোগ্য নেতৃত্ব দিতে পারলে বিশ্বমন্দা আমাদের কাবু করতে পারবে না। অনেকেই ধারণা করেছিল বিশ্বমন্দার ফলে আমাদের গার্মেন্ট শিল্পে ধস নামবে। কিন্তু সে রকমটি হয়নি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যা অপেক্ষাকৃত কম দামি পণ্য, এর চাহিদা বেড়ে চলেছে। সমস্যায় আছে সেসব অর্থনীতি যারা উচ্চমূল্যের প্রডাক্ট তৈরিতে নিয়োজিত ছিল। সিরামিক, চিংড়ি, ইলেকট্রনিক পণ্য এবং চামড়াজাত পণ্যে মন্দার প্রভাব দীর্ঘ নয়, হয়তো মধ্যমেয়াদি কুপ্রভাব ফেলবে এবং খুব দ্রুতই হয়তো আগের অবস্থানে ফিরে আসবে। মন্দার চূড়ান্ত পর্যায়ে এদেশ থেকে মাত্র ৭ মিলিয়ন ডলার পুঁজি প্রত্যাহৃত হয়েছে। এসব আমাদের দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত এবং মজবুত গাঁথুনির প্রতি নির্দেশ করে। তবুও মন্দাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে জনকল্যাণমূলক বাজেট ঘোষণা হবে, জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে।
সিন্ডিকেট ভেঙে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ করে, মন্দার প্রভাব জুজুর ভয় না দেখিয়ে প্রকৃত সত্যকে পাশ কাটিয়ে জনদুর্ভোগ যেন আর না বাড়ানো হয়। বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি, যানজট সুরাহা করে এমন প্রান্তিক বা তৃণমূল মানুষের সহায়ক বাজেট জনগণ প্রত্যাশা করে। জনগণ ডিজিটাল বোঝে না, জনগণ দিনবদল বোঝে, মনবদল বোঝে। আশা করি বাজেটে দিনবদলের হাওয়া লাগবে। মনদবল হবে। দিন বদলে যাবে। দিন বদলে যাবে কি?

গোলাম কাদের: সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সংগঠক।