প্রসঙ্গ, পদ্মায় সেতু বনাম টানেল

কেফায়েত উল্লাহ মাসুদ
‘মহান আল্লাহ যখন যাহা বানাইতে চাহেন তখনই তাহা হইয়া যায়’Ñ পবিত্র কুরআন, সুরা বাকারা, আয়াত-১১৭। মহাক্ষমতাবান মহান আল্লাহ আসমান ও জমিন বানিয়েছেন ৬ দিনে (সূরা হাদিস-আয়াত-৪)। ভেবে কাজ করার জন্য ওই ৬ দিনের দৃষ্টান্তকে গ্রহণ করলে মানবজাতির নিশ্চয়ই মঙ্গল হতো। শৈশবে মুরুব্বীদের মুখেও একই উপদেশ শুনেছি।
স্বাধীনতার ৩৮ বছর পর ২৯ ডিসেম্বরের পরিচ্ছন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয়ে বর্তমান সরকার দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে গড়ার ঘোষণা দিলে দেশবাসী বুকভরা আশায় উদ্বেল হয়। এমতাবস্থায় আগামী এক শতাব্দীর নিরাপদ ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে দেশ গড়ায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে প্রস্তাবিত পদ্মা সেতু নির্মাণের বেলায়ও একটি নিরাপদ সেতু নির্মাণের অনিবার্যতা স্মরণ রাখতে হবে। স্মরণ করা যেতে পারে প্রথম পদ্মার ওপর সেতু নয়, টানেল নির্মাণের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। প্রস্তাবটি অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং ভবিষ্যতের জন্য অধিকতর নিরাপদ মনে হয়েছিল। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে এরকম টানেল নির্মাণের উদাহরণ রয়েছে অগণিত।
বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় উন্নয়ন কার্যক্রমের যে ঘোষণা দিয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবেই বাহবা পাওয়ার মতো। কারণ বিগত অনেক সরকারের আমলেও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এক হাজার দিনেও সেই পরিমাণ কার্যক্রম গ্রহণের ঘোষণা দিতে পারেনি। একদিকে যেমন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা বাহবা পাওয়ার মতো তেমনি তা অস্থিরতারও কারণ হতে পারে। তবে এসব ঘোষিত কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই নির্দ্বিধায় বলা চলে যে, পদ্মার ওপর সেতু অথবা টানেল নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনো ভুল হলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের আশা-ভরসা ভূলুণ্ঠিত হবে।
এরমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পদ্মার ওপর টানেল নয়, সরকার সেতুই নির্মাণ করবে। উল্লেখ করা যেতে পারে ক্ষমতা গ্রহণের ১২ দিনের মাথায় সরকার তড়িঘড়ি করে নকশা চুক্তি অনুমোদন করে এবং ২১২ দিনের মাথায় ১৩১ কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ নকশা চুক্তি স্বাক্ষর করে নিউজিল্যান্ডভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মনসেল এয়োকমের সঙ্গে। ১৩১-এর পাশে ৭টি শূন্য বসালে ১৩১,০০,০০,০০০ কোটি টাকা হয়। টাকার অঙ্কের দৈর্ঘ দেখে মনে হয় তা ৭ সমুদ্র ১৩ নদী পারাপারের সেতু বা টানেল। যদিও প্রস্তাবিত সেতুর দৈর্ঘ হচ্ছে ৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার। সরকারের ১২ দিন বয়সের মধ্যে নকশা অনুমোদন এবং ২২ দিন বয়সে নকশা চুক্তি স্বাক্ষরকে যথেষ্ট সময়ের ফসল হিসেবে অনেকেই বিবেচনা করেননি। তাদের অভিমত হচ্ছে, তড়িঘড়ি করে সেতু তৈরির নকশা চুক্তি সম্পাদন না করে একটু সময় নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করে, সেতু ও টানেলের সুবিধাদি ও ব্যয়ের তুলনামূলক বিচার বিশ্লেষণ এবং সেই সঙ্গে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর টানেল নির্মাণের উদাহরণগুলোর বিচেনায় নিলে পদ্মার ওপর সেতু নয়, টানেল নির্মাণই অধিকতর যুক্তিযুক্ত বিবেচিত হতো। কারণ টানেল নির্মাণ হতো সাশ্রয়ী এবং অধিকতর নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত। সেতু নির্মাণের ব্যয় কমবেশি ১২ হাজার কোটি টাকা হলে টানেল নির্মাণ সম্ভব হতো ৮ হাজার কোটি টাকার নিচে। যদিও এখন বলা হচ্ছে, পূর্ব পরিকল্পিত সময়সীমা থেকে সরে এসে সরকার দুই বছর আগেই পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৩ সালের ডিসেম্বরেই ৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হবে। কিন্তু আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা তিক্ত। এতটা চটজলদি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে আশা বাস্তবানুগ বলে মনে হয় না। অথচ টানেল নির্মাণের সময়সীমার মধ্যে কোনো অনিশ্চয়তা থাকত না। অন্যান্য ঝামেলাও কম হতো। টানেলে নদী শাসনের যন্ত্রণা পোহাতে হতো না।
এত সব ইতিবাচক দিক থাকতে টানেল নির্মাণ না করে কেন যে ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ সেতু নির্মাণে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উৎসাহ তা বোধগম্য নয়। উল্লেখ্য, সেতুর পরিবর্তে টানেল নির্মিত হলে যে অর্থ সাশ্রয় হতো তা দিয়ে আর একটি টানেল নির্মাণ করা যেত। অহেতুক অর্থ ব্যয় না করার নির্দেশ আমরা পবিত্র কুরআনেও পাই (সুরা-বনি ইসরাইল, আয়াত -২৭)।
কথায় কথায় সরকারের দোষ ধরা ঠিক নয়। তবে যা জাতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তা জেনেশোনে চুপ করে থাকলে গুনাহগার হতে হবে। সুরা বাকারার ৪২ নম্বর আয়াতের আলোকে বলতে চাই, পদ্মা সেতুর ডিজাইন চুক্তি সংশোধন করে টানেল নির্মাণের নকশা আনলে জাতির জন্য মঙ্গল হতো। টানেল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলে ১৩১ কোটি টাকা গচ্চা দেয়ার ক্ষতিও জাতি মেনে নিতে পারবে যদি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা যায়। অন্যথায় যা হবে তা যথা পূর্বং তথা পরং।
সন্ত্রাসী হামলায় বর্তমান বিশ্ব জর্জরিত বিধায় বিশ্বের চিন্তাবিদগণ নতুন-পুরনো স্থাপনায় সন্ত্রাসী হামলার সম্ভাব্যতা মাথায় রেখে পৃথিবীর সর্বত্র সেতু নির্মাণের পরিবর্তে টানেল নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। সন্ত্রাসী হামলার সম্ভাব্যতা মাথায় রেখে বাংলাদেশেও একই পথে অগ্রসর হওয়া বাঞ্ছনীয়।
এখনো সময় আছে তা করার যা জাতির জন্য নিরাপদ। মহা শক্তিধর রাষ্ট্র আমেরিকা তাদের টুইন টাওয়ার ধ্বংস ঠেকাতে পারেনি। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যা, ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা, ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলা, ২৫ ফেব্রুয়ারির পিলখানা হত্যাযজ্ঞ আমরা ঠেকাতে পারিনি। তেমনি ভবিষ্যতে সন্ত্রাসী হামলায় পদ্মা সেতু ধ্বংস হলে জাতি আমাদের ক্ষমা করবে না। দেশের আর কোথাও নতুনভাবে বড় ধরনের সেতু স্থাপনের পরিবর্তে নিরাপদ টানেল নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণও হবে বুদ্ধিমানের কাজ। ভেবে কাজ করা ভালো, ভুল কাজ করে বুক চাপড়ানো বোকামি।
সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আমাদের ভালো কিছু দেবে না। আমরা যাতে পশ্চাদপদ থাকি তারা চাইবে তাই। পদ্মা সেতুর জন্য তারা টাকার বস্তা নিয়ে আসলেও আমাদের নজর দেয়া ঠিক হবে না। পক্ষান্তরে টানেল নির্মাণের জন্য সহযোগিতা করলে সতর্কভাবে অগ্রসর হতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের ব্যাপক অর্থ হচ্ছে নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। এতে নদী পারাপারের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকতে হবে। সঠিক পরিকল্পনার জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ভক্তি ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে, ভুল পরিকল্পনার জন্য ঘৃণা করবে। সেজন্য শতাব্দীর নিরাপদ ভবিষ্যৎ মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঘৃণা বর্ষিত হবে পূর্বসূরিদের জন্য।