বিপুল উৎসাহে বর্ষবরণ

রাহমান মনি
বিভিন্ন আয়োজনে জাপানের বিভিন্ন শহরে দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে লালন করে বরণ করা হলো বাংলা ১৪১৬ বর্ষকে। বাঙালি যেখানেই থাকে না কেন নিজস্ব সংস্কৃতি লালন করতে ভালোবাসে। জাপান অর্থনৈতিক পরাক্রমশালী একটি দেশ। এখানে প্রতিটি মুহূর্ত কর্মব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কাটাতে হয়। রয়েছে অনেক প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু বাঙালি প্রমাণ করেছে নিজস্ব সংস্কৃতিকে ভালোবাসলে, লালন করতে চাইলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই বাধা সৃষ্টি করতে পারে না।

জাপান প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো যে কোনো জাতীয় আয়োজনে সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে। দলমত, জাতি-ধর্ম, নারী-পুরুষ ভেদাভেদ ভুলে সবাই মিলে কাজ করতে পারে এবং প্রতিটি আয়োজনে এই দেশেরসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদেরও সম্পৃক্ত করতে পারে। জাপানের টোকিও, ওসাকা, কোবে, হিরোশিমা, সান্সরো, সিগা, কিয়োটোসহ আরও অনেক বড় শহরে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয় বেশ সাফল্যের সঙ্গে। এবারই প্রথম বারের মতো বেশ জাঁকজমক করেই নাগাসাকিতে (Nagasaki) বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। গত বছর থেকে বৃহৎ আকারে Osaka বৈশাখী মেলার আয়োজন করে সাফল্যের মুখ দেখছে আয়োজকরা। টোকিও বৈশাখী মেলার এবারের আয়োজন ছিল ১০ম।

১৪১৬ বঙ্গাব্দের প্রথম দিনটি ১৪ এপ্রিল হলেও প্রবাসের কর্মব্যস্ততার জন্য আনন্দ ঘন পরিবেশে উদযাপন করা হয়ে ওঠে না বিধায় নিকটতম রোববারকে বেছে নেয়া হয় উদযাপনের জন্য। ১৯ এপ্রিল রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে ১০ম টোকিও বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়।

বরাবরের মতো এবারও টোকিও বৈশাখী মেলা উদ্বোধন করেন প্রবাসীদের প্রিয় মুখ এশিয়ান পিপলস্ ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটির (APFS) প্রেসিডেন্ট Yoshinari Katsuo. সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি নীতি নির্ধারকদের সমালোচনা করে প্রশাসনকে আরও নমনীয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জাপানের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিদেশিরা অনেক অবদান রাখছে। অথচ একজন জাপানি সরকার থেকে যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে, বিদেশিরা অনেক ক্ষেত্রেই তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কেন এই বৈষম্য? তিনি বলেন আমি বাংলাদেশিদের ভালোবাসি, বাংলাদেশকে ভালোবাসি। কর্মব্যস্ততার কথা ভুলে আজ আপনারা আনন্দ করবেন, নববর্ষ কে বরণ করে নেবেন, হৈ হুল্লা করবেন এই আমার প্রত্যাশা। তার বক্তব্য শেষেই সমবেত কণ্ঠে ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি মূল মঞ্চ থেকে উৎসারিত হয়ে ইকেবুকুরো নিশিগুচি পার্ক ছাড়িয়ে আশপাশ ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার জাপানি এবং সেই সঙ্গে অন্যান্য দেশিরাও জানতে পারে বাংলাদেশের হাজার বছরের শ্বাশত ঐতিহ্যের কথা।

দিনব্যাপী এ উৎসব জাপান প্রবাসীদের সর্ববৃহৎ (১১ এপ্রিল) মিলনমেলায় পরিণত হয়। তরুণীদের পরণে সাদা জমিনের লাল পেড়ে শাড়ি। খোঁপায় ফুলের মালা। হাতে চুড়ির রিনিঝিনি। পুরুষের গায়ে রঙ-বেরঙের পাঞ্জাবি অথবা ফতুয়া। কারো গালে বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা অঙ্কন। শিশুদের হৈ হুল্লা ইকেবুকুরো নিমিগুচি পার্ক প্রাঙ্গণকে ছোট্ট একটি বাংলাদেশে পরিণত করে। এখানেই রয়েছে টোকিও শহীদ মিনার।

ঢাক, ঢোল, তবলা, হারমোনিয়াম, মৃদঙ্গ, পাখোয়জের সঙ্গে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের মিশ্রণে অপূর্ব তাল বাদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে স্থানীয় বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক দল ‘উত্তরণ’ এবং তারপর ‘স্বরলিপি’ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে। তারপরই শুরু হয় বাংলাদেশ থেকে আসা আমন্ত্রিত অতিথিদের গান পরিবেশনা।

এবার বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত অতিথি শিল্পী হয়ে এসেছিলেন ক্লোজআপ ওয়ানখ্যাত নিশিতা বড়–য়া এবং সাব্বির। তবে এবারের আমন্ত্রিত অতিথিরা দর্শক মাতাতে পারেননি। সাব্বির কিছুটা বিনোদন দিতে পারলেও নিশিতা বড়–য়া একেবারেই ব্যর্থ হয়েছেন। তারা উভয়ে গানের চেয়ে কথা বেশি বলেছেন। এর আগে ক্লোজআপ ওয়ানখ্যাত রিংকু যেভাবে মাতিয়েছিলেন এবার তার কানাকড়িও সক্ষম হননি। রিংকু জাপান প্রবাসীদের মন জয় করতে ১০০ শতাংশ সফল ছিলেন।

শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক পর্ব এবং চিত্রাঙ্কন মেলার বাড়তি আকর্ষণ সব সময়। এবার শিশু-কিশোরদের ফ্যাশনশো দর্শকদের আনন্দ দিয়েছে। খুব ভালো লেগেছে পর্বটি। বাংলাদেশি সংস্কৃতির রঙ-বেরঙের পোশাক পরে শিশু-কিশোররা অংশ নেয়।

মেলায় প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক জনপ্রিয় ঔপনাসিক নাট্যকার ইমদাদুল হক মিলন উপস্থিত থেকে আগন্তুকদের আনন্দ বহুলাংশে বাড়িয়ে দেন। তবে সঙ্গে ছিলেন অনন্যা প্রকাশনীর কর্ণধার মনিরুল হক। মেলা কমিটির পক্ষ থেকে মিলনের সম্মানে মিলনমেলা নামে একটি স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়। মিলনভক্তরা সেখানে তাদের প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ এবং স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য প্রিয় লেখকের সঙ্গে ছবি তোলা জন্য ব্যস্ত থাকেন। মেলায় র‌্যাফেল ড্রতে প্রথম পুরস্কার ছিল টোকিও-ঢাকা-টোকিও রাউন্ড টিকেট। প্রবাসী ছড়াকার বদরুল বোরহান প্রথম পুরস্কার জয়ে সক্ষম হন। এটি স্পন্সর করে জাপানে টেলিকমিউনিকেশন জগতে সাফল্য অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান Ryo Internatioan Co. Ltd. সকাল, ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মেলায় মূল সময় থাকলেও এর আনন্দ শুরু হয় পূর্ব রাত থেকে এবং তা মধ্যরাত পর্যন্ত চলে।

rahmanmoni@gmail.com