চাষী পর্যায়েই আলু বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ৭শ’ থেকে ৭২০ টাকায়

নিজামুল হক বিপুল/আরিফ-উল ইসলাম, মুন্সীগঞ্জ থেকে ফিরে
মাত্র দেড় থেকে দু’মাস আগে ক্ষেত থেকে আলু উঠেছে কৃষকের ঘরে। অথচ এখন বাজারে আলুর দাম চড়া। মুন্সীগঞ্জের বাজারে একজন খুচরা বিক্রেতা প্রতি কেজি আলু বিক্রি করছেন ২০ টাকা কেজি দরে। আর রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ২২ থেকে ২৩ টাকায়। মৌসুম শেষ হতে না হতেই কেন আলুর দাম এত চড়া জানতে চাইলে মুন্সীগঞ্জের হোগলাকান্দি গ্রামের আলু চাষী হোসেন মোল্লা বললেন, এ বছর আলুর ফলন ভালো হলেও চাষ হয়েছে অন্য যে কোন বছরের তুলনায় অনেক কম। বীজ, সার, কীটনাশকসহ আলু চাষের সবক’টি উপাদানের দাম বেশি হওয়ায় চাষীরা এ বছর অনেক কম জমিতে আলু চাষ করেন। তিনি বলেন, আলু চাষের সবক’টি উপাদানের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে এবার আলুর দামও একটু বেশি। তার সঙ্গে একমত পোষণ করে আরও কয়েকজন কৃষক আলুর দাম বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে প্রায় একই কথা জানালেন। সরেজমিন মুন্সীগঞ্জ ঘুরে আলু চাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আলুর দাম কমার আর কোন সম্ভাবনা নেই। বরং সামনে দাম আরেকটু বাড়তে পারে। বর্তমানে মুন্সীগঞ্জের অবস্থাসম্পন্ন আলু চাষী থেকে শুরু করে ছোট চাষীরা পর্যন্ত প্রতি মণ আলু পাইকার ও ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন ৭শ’ থেকে ৭২০ টাকা দরে। এ হিসাবে চাষীরা প্রতি কেজি আলু বিক্রি করছেন ১৭ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১৮ টাকা দরে। যা ঢাকার বাজারে আসার পর আড়তদার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে ২২ থেকে ২৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৭শ’ থেকে ৭২০ টাকা মণ দরে আলু বিক্রি হলেও যখন ক্ষেত থেকে কৃষকের ‘গোলায়’ আলু ওঠে তখন চাষীরা প্রতি মণ আলু বিক্রি করেছেন ৩৮০ থেকে ৪৬০ টাকা পর্যন্ত। এরপর মাত্র দেড় থেকে দুই মাসের মাথায় চাষী পর্যায়ে এর দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের আলু চাষীরা জানান, এ বছর মৌসুমের শুরুতে আলু চাষীদের বেশিরভাগকেই লোকসান গুনতে হয়েছে। যারা আলু ধরে রাখতে পেরেছে তারা বতর্মানে ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। আলু চাষী আবুল হাশেম জানান, তিনি এ মৌসুমে ৭০ শতক জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। প্রতি শতক জমিতে তার উৎপাদন ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১শ’ টাকা। আর প্রতি শতক থেকে আলু পেয়েছেন গড়ে দুই মণ। মৌসুমের শুরুতে বেশিরভাগ আলু বিক্রি করে দেয়ায় তার ক্ষতি হয়েছে প্রতি শতকে ১৩০ টাকা করে। তিনি বলেন, যেটুকু আলু ধরে রাখতে পেরেছিলাম এখন সেগুলো ৭শ’ থেকে ৭২০ টাকা মণ দরে বিক্রি করে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। আরেক চাষী মুন্সীগঞ্জ সদরের রনচা মধ্যপাড়ার মাহবুবুর রহমান জানান, তিনি এ মৌসুমে আলু চাষ করেছেন তিন একর ৬০ শতাংশ জমিতে। তার উৎপাদন ব্যয় শতকপ্রতি ১ হাজার ২শ’ টাকা করে মোট এক লাখ ৪৫ হাজার টাকা। আর প্রতি শতকে তার গড় উৎপাদন প্রায় আড়াই মণ। মাহবুব বলেন, আলু চাষ করে এবার লাভের মুখ দেখতে পাইনি। একই অবস্থা রনচ হাওলাপাড়া গ্রামের আলু চাষী সিরাজুল ইসলামেরও।
অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করেন রনচ কাটাখালী গ্রামের আলু চাষী মীর মোঃ সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, তিনি কোন বছরই আলু চাষ করে লোকসান দেননি। এ বছরও তার কোন লোকসান নেই। বরং গত বছরের তুলনায় এবার তার উৎপাদন বেড়েছে প্রতি একরে শতকরা ১০ ভাগ। কিভাবে এটি সম্ভব হল, জানতে চাইলে সিরাজুল বলেন, তিনি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে আলু চাষ করেন। এ কারণে তার কোন লোকসান নেই। তবে তিনি স্বীকার করেন, এ বছর মুন্সীগঞ্জের অধিকাংশ আলু চাষী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে। তিনি জানান, এ বছর তিনি প্রায় সাত একর জমিতে আলু চাষ করেছেন। প্রতি একরে তার ব্যয় গড়ে দেড় লাখ টাকা। আর আলু উৎপাদন হয়েছে একরপ্রতি গড়ে চারশ’ মণ। প্রথমদিকে ৩৮০ থেকে ৪৬০ টাকা পর্যন্ত প্রতি মণ আলু বিক্রি করলেও এখন তিনি প্রতি মণ আলু বিক্রি করছেন ৭শ’ টাকা দরে। তিনি দাবি করেন, এ মৌসুমে প্রতি শতকে তার লাভ হয়েছে গড়ে ৪৪০ টাকা করে।