বাংলাদেশের দারিদ্র্য দূরীকরণে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে :ড. সালেহউদ্দিন আহমদ

130278_1বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদায়ী গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশের জন্য সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দারিদ্র্য দূর করা। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অভ্যন্তরীণ খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
গভর্নর হিসেবে চার বছরের দায়িত্ব পালন শেষ হওয়ার দুই দিন আগে গতকাল মঙ্গলবার শেষ সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কারেন্সি মিউজিয়ামের উদ্বোধন করেন। এসময় তিনি গত চার বছরে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে নেয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা পদক্ষেপ, মুদ্রানীতি প্রণয়নসহ বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনের চ্যালেঞ্জ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করণীয় নিয়ে তার মতামত তুলে ধরেন। ৩০ এপ্রিল গভর্নর হিসেবে ড. সালেহউদ্দিনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমার গভর্নর মেয়াদকালে তিনটি সরকার পেয়েছি। তিন সরকারের আমলেই কাজ করতে গিয়ে কাজে কোন প্রকার ছেদ পড়েনি। সকল কাজই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে করেছি। তিনি বলেন, বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সামস্টিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে ভাল। বিশেষ করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন এবং চলতি হিসাবের বেলেন্স অনেক ভাল রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে তৈরি পোশাক খাতের দক্ষতা বাড়ানো এবং বিশ্ব শ্রমবাজারে দক্ষ জনবল পাঠানোর উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, মন্দা মোকাবিলায় আমাদেরকে উদ্যোগ নিতে হবে। রফতানি আয়, রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি বা থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভারতের কথা ভাবলে হবে না। এসব দেশে অর্থনীতির মূলশক্তি রফতানি আয়। আমাদের জিডিপিতে রফতানির ভূমিকা ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ। রেমিটেন্স প্রবাহের উচ্চ প্রবৃদ্ধিতে আত্মতুষ্টিরও কিছু নেই। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ও দারিদ্র্য বিমোচনে অভ্যন্তরীণ খাতগুলোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে, শ্রমঘন শিল্প স্থাপনের উপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সমস্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগের গভর্নরদের কাজের ধারাবাহিকতায় আমি কাজ করেছি। তাদের কাজগুলোকে এগিয়ে নিয়ে গেছি। বিদায়ী গভর্নর আরো বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। দলগতভাবে সুদের হার কমানো/বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে চলবে না।
দেশের প্রথম মুদ্রা জাদুঘরের যাত্রা শুরু
দেশী-বিদেশী মুদ্রা সংরক্ষণ ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মুদ্রার পরিচিতি তুলে ধরার লক্ষ্যে স্বাধীনতার ৩৮ বছর পর দেশে স্থাপন করা হল কারেন্সি মিউজিয়াম বা মুদ্রা জাদুঘর। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব উদ্যোগে প্রথম একক কারেন্সি মিউজিয়াম স্থাপন করা হল। গতকাল মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল ভবনের চতুর্থ তলায় মিউজিয়ামের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। মিউজিয়ামে দেশী-বিদেশী নোট, কয়েন, স্মারক মুদ্রা সংরক্ষিত থাকছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মুরশিদ কুলী খানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে কোন একক কারেন্সি মিউজিয়াম নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই মিউজিয়াম একমাত্র এবং পূর্ণাঙ্গ কারেন্সি মিউজিয়াম। এই মিউজিয়ামের মাধ্যমে দেশী-বিদেশী মুদ্রা সম্পর্কে একটি সার্বিক ধারণা নিতে পারবেন মুদ্রা বিশেষজ্ঞসহ এ বিষয়ে আগ্রহীরা। এই কারেন্সি মিউজিয়ামে স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত যত নোট, কয়েন (ধাতব মুদ্রা) ইস্যু করা হয়েছে তা সংরক্ষণের পাশাপাশি অর্ধশতাধিক দেশের মুদ্রা সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে যেসব স্মারক মুদ্রা বের করেছে তাও এখানে সংরক্ষিত থাকছে। তবে এখনই কারেন্সি মিউজিয়াম সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হচ্ছে না। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কারেন্সি বিভাগের অনুমোদন নিয়ে আগ্রহীদের মিউজিয়াম পরিদর্শন করতে হবে।
্কারেন্সি মিউজিয়ামের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্ব দরবারে একটি দেশের জাতীয় পতাকা সে দেশের পরিচয় বহন করে। জাতীয় পতাকার পরই দেশের পরিচয় তুলে ধরে সে দেশের মুদ্রা। আমাদের দেশে একক কোন কারেন্সি মিউজিয়াম ছিল না। দেশের নতুন প্রজন্মের কাছে দেশী-বিদেশী মুদ্রা পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যই এই উদ্যোগ গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মুরশিদ কুলী খান বলেন, দেশে একটা কারেন্সি মিউজিয়াম থাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার মূল পরিকল্পনাকরী হচ্ছেন গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। প্রাথমিক অবস্থায় এই মিউজিয়াম ছোট পরিসরে হলেও পর্যায়ক্রমে এর আওতা বাড়ানো হবে। এই স্বল্প স্থান থেকে তা সরিয়ে নিয়ে বড় আকারে প্রতিষ্ঠা করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক চৌধুরী মহিদুল হক বলেন, দেশ স্বাধীনের ৩৮ বছর পর কারেন্সি মিউজিয়াম চালু হল। স্বল্প পরিসরে মাত্র সাড়ে তিন মাসে এই মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ২৩ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। পর্যায়ক্রমে মিউজিয়ামে মুদ্রা সংগ্রহ আরো বাড়ানো হবে বলে তিনি জানান।