‘বিএনপি একটি নরমপন্থী গণতান্ত্রিক দল’

22-04-2009_1605_img_2992সাদেক হোসেন খোকা
সাদেক হোসেন খোকা। বিএনপির বিলুপ্ত মহানগর কমিটির সাবেক সভাপতি। তিনি এখন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে থেকেও নেই। দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তবে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন সিটি কর্পোরেশনের কর্মকা-েই। সাপ্তাহিক-এর সঙ্গে কথা বলেছেন দলের পুনর্গঠন, মহানগর কমিটি, নাগরিক সমস্যাসহ কিছু আলোচিত বিষয় নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পার্থ সারথি দাস

সাপ্তাহিক : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা প্রসঙ্গে আপনার প্রতিক্রিয়াটা কী?

খোকা : এ বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। দলের প্রতিক্রিয়াটাই আমার প্রতিক্রিয়া। বিএনপি একটি বড় দল। এখানে দলের মত বা প্রতিক্রিয়াই বড়।

সাপ্তাহিক : বিএনপি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এখন ধীরলয়ে চলছে কেন?

খোকা : বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুটো বড় দল। এ দুটো দলের বহু কাজ। এ দুটো দলই সরকারে থাকে। যখন যারা সরকারে থাকে তখন হয়ত সাংগঠনিক কর্মকা- নানা কারণেই ব্যাহত হয়। যেমন ধরেন এখন আওয়ামী লীগ সরকারে আছে। তাদেরকে ইমিডিয়েটলি অনেক কাজ করতে হচ্ছে। তাদের অনেক মন্ত্রী রয়েছেন, নেতা রয়েছেন, তারা ব্যস্ত থাকায় ১০০ ভাগ সাংগঠনিক কাজ করা সম্ভব হয় না। আমাদের সময় আমরাও করেছি। সরকারি বা বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বহু ইস্যু তৈরি হয়। যেমন সাম্প্রতিককালে পিলখানা হত্যাকা-, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে সময় দিতে হচ্ছে। আসলে এসব কাজের কারণে বড় দলের পক্ষে নিরেটভাবে সাংগঠনিক কর্মকা- পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। সে কারণেই অনেক মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটি থাকে। কমিটি হয়ত অনেকদিন ধরে চলতে থাকে। কমিটিতে হয়ত অর্ধেক লোক থাকে, অর্ধেক বিদেশে চলে যায়। নানা কারণে এ রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সে রকম এক পরিস্থিতির মধ্যে আমরা আছি। তবে দলের পুনর্গঠনের জন্য কিছু কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। কিন্তু পিলখানা হত্যাকা-ের পর সঙ্গত কারণেই সেই কর্মকা- কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়েছিল।

সাপ্তাহিক : ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় সম্মেলন করার একটা সময় বেঁধে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এই সময়ের মধ্যে কী এই সম্মেলন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে?

খোকা : বিএনপি একটি নরমপন্থী গণতান্ত্রিক দল। এই দল গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। দল এই সময়ের মধ্যে নিশ্চয়ই কাউন্সিল করতে চাইবে। এই সময়ের মধ্যে তা করতে না পারলে দল নির্বাচন কমিশনের কাছে সময় চেয়ে নেবে। এই সময়ের মধ্যে তা করতে না পারলে নির্বাচন কমিশন নিশ্চয়ই কারণটা বোঝার চেষ্টা করবে।

সাপ্তাহিক : তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে শীর্ষ নেতাদের দূরত্ব বেড়েই চলেছে। কেন?

খোকা : না, এই অভিযোগ ঠিক না। তৃণমূল নেতাদের স্পিড থাকে আলাদা, তাদের আকাক্সক্ষাও থাকে আলাদা। তাদের অনেকে বয়সে তরুণ। তারা অনিয়ম, অন্যায় ও অবিচারের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করে ও প্রতিকার চায়। আবার যারা উপরে থাকে তারা ধীরে সুস্থে কাজ করতে চান। যেমন বেগম খালেদা জিয়া নিজের বাড়ির ব্যাপারে আইনজীবীদের নিয়ে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথের লড়াইও চালিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের কর্মীদের দাবি হলো এটা কেন হলো, এখনই এর সমাধান চাইÑ এ ধরনের দাবি তো পূরণ করা সব সময় সম্ভব নয়। মূলত আদর্শ বা নীতিগত কোনো বিরোধ তাদের সঙ্গে নেই।

সাপ্তাহিক : মহানগর কমিটি কেমন হচ্ছে?

খোকা : সকলেই চাইছে মহানগর কমিটিটি তাড়াতাড়ি হোক। কারণ রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র রাজধানীর মহানগর। ঢাকার কমিটিকে বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়। একটি বড় দল কমিটিবিহীন অবস্থায় থাকার কারণে বহু কাজ ব্যাহত হয় ও বহু কাজ স্তিমিত হয়ে যায়। তো আমাদের এই কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।

সাপ্তাহিক : কেমন হচ্ছে এই কমিটিÑ কোনো আভাস পাচ্ছেন?

খোকা : কোনো আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। তো আমি এ ব্যাপারে বলতে চাইছি যে আমাদের দলের বড় নেতারা ও যারা দলের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত তারা তো একটি দুর্বল দল করতে চাইবেন না। আগামীতে আন্দোলন ও নির্বাচন করতে হবে। দুর্বল কমিটি করলে তো তারা কোনো পারফরমেন্স দেখাতে পারবে না। সুতরাং নেতারা তাদের ইন্টারেস্টেই শক্তিশালী কমিটি করবেন। এটা নিয়ে এখন আর ভাবার কোনো অবকাশ নেই।

আমি তো ১৯৯৬ সাল থেকে মহানগর কমিটির দায়িত্ব পালন করছি। এখন সাংগঠনিক কোনো কাজ আমার নেই। কিন্তু আমি বিএনপির পক্ষ থেকে মনোনীত মেয়র হিসেবে এখনো দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু যখন আমি নগর ভবনে পা রাখি তখন আমি সকল দলের, সকল মতের ও পেশার মানুষের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করি।

আগামীর কমিটি ভালো হবে। তারা আন্তরিকতার সঙ্গে, সততার সঙ্গে, ধৈর্যের সঙ্গে ও গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল থেকে তাদের দায়িত্ব পালন করবেন।

আমি একটি শক্তিশালী মহানগর কমিটি প্রত্যাশা করি। এই কমিটিতে যে আমার থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এখানে বড় নেতারা যাকে যোগ্য মনে করবেন তারাই নেতা হবেন। এখানে আমি কী করতে পারি? আমি এখানে সহযোগিতা করতে পারি। কারণ আমি অতীতে দায়িত্ব পালন করেছি। আমার রয়েছে অভিজ্ঞতা।

সাপ্তাহিক : স্থায়ী কমিটির সদস্য এম সাইফুর রহমানসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা দলের রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন। এর পেছনে রয়েছে কলহ ও বঞ্চনা। এটা কী দলের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে না?

খোকা : আমাদের স্ট্যান্ডিং কমিটি এখন পূর্ণাঙ্গ নয়। কিছু সদস্য অসুস্থ। অনেকেই কাজে-কর্মে নেই। এখানে এক-তৃতীয়াংশই খালি। এর মধ্যে সাইফুর রহমান অসুস্থ। গত কয়েকদিন আগে আমি একটি টেলিভিশনে উনার মুভমেন্ট দেখেছি। মনে হয়েছে তিনি গুরুতর অসুস্থ। তবে সুস্থ থাকাটা বা অসুস্থ হয়ে যাওয়াটা আসলে ওই ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে। এটা তো অন্য বিষয়। এতে কারোর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তবে দলের সঙ্গে যিনি থাকেন দলের প্রতি তার একটা দুর্বলতা থাকেইÑ এটাই স্বাভাবিক। যখন তিনি সুস্থ থাকেন তখন তিনি বলেন তাহলে রাজনীতি করি। আবার যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন মনে করেন তাহলে রাজনীতি বাদ দিয়ে দেই। সুস্থতা ও অসুস্থতার কারণে আসলে একটি দোলাচল অবস্থা থাকেÑ রাজনীতি করছি, করছি না এমন একটা ভাব থাকে। বিএনপি বা বিএনপির রাজনীতির প্রতি আনুগত্য কতটুকু থাকেÑ এটাই আসলে নেতাদের যোগ্যতার মাপকাঠি।

সাপ্তাহিক : আমাদের দেশে রাজনৈতিক চাপের কারণে অনেকে ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় রয়েছে। কিন্তু আপনি বিএনপির পক্ষ থেকে মনোনীত মেয়র। এ কারণে কী কোনো সমস্যা হচ্ছে?

খোকা : না, এ কারণে কোনো ধরনের সমস্যা এখন পর্যন্ত হয়নি। আমি আমার মতোই কাজ করি। তবে নিজ দলের মন্ত্রীদের ও অন্য দলের অনেকের সঙ্গে আমার মতান্তর হয়। এই মতান্তর থাকবেই। এটাই তো গণতন্ত্র। আমি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরেও দায়িত্ব পালন করেছিÑ তখন অনেক চাপ ছিল। সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে তাদের সঙ্গে আমি ডিফার করেছি। এখনো কাজ করছি। এখনকার সরকারের দিন বেশি হয়নি। বিষয়টি এখনো ওই পর্যায়ে যায়নি। কারণ সরকার এরই মধ্যে বড় বড় ঘটনা নিয়ে চাপে আছে।

সাপ্তাহিক : নগরীতে পানির তীব্র সংকট চলছে। এজন্য ওয়াসার বহু ব্যর্থতা রয়েছে। আমরা যতদূর জানি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ সমস্যার সমাধান করে সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু আপনারা বারবারই এ সমস্যা এড়িয়ে যাচ্ছেন কেন?

খোকা : আমরা পানি সমস্যার ব্যাপারে কোনো কথাই বলতে পারব না। কারণ এখানে ওয়াসা রয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি আলাদাভাবে ওয়াসা থাকার কোনো মানে নেই। এই ওয়াসা আমার সিটি কর্পোরেশনের স্যুয়ারেজ ব্যবহার করবে, অনেক কিছু করবেÑ কিন্তু আমি কিছু বলতে পারব নাÑ এটা হয় না। আমি ওয়াসা নামে আলাদা কোনো কর্তৃপক্ষ না রাখার ব্যাপারে কেয়ারটেকার গবর্নমেন্টের উপদেষ্টার কাছে লিখেছিলাম।

সাপ্তাহিক : বর্ষা আসছে। কিন্তু রাজধানীর অধিকাংশ খাল দখল হয়ে গেছে। সৃষ্টি হবে জলাবদ্ধতা। এবার কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

খোকা : খালগুলো হঠাৎ করেই দখল হয়নি। দখলের মূলে রয়েছে অত্যধিক জনসংখ্যা। জনসংখ্যা না কমলে খাল বলেন, পাহাড় বলেন, টিলা বলেন, বুড়িগঙ্গা নদীÑ কোনো কিছুই ঠিক থাকবে না। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শেই খালের ওপর বক্স কালভার্ট নির্মাণ করেছিলাম। এখন তারা বলছে এটা করা ঠিক হয়নি। আসলে ওরা আমাদেরকে টাকা দেয়, তাই তাদের কথা শুনতে হয়। আমরা যতদিন না স্বনির্ভর হতে পারব ততদিন পর্যন্ত সমস্যার সমাধান হবে না।

সাপ্তাহিক : নগর ভবন থেকে সম্প্রতি ২ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি উধাও হয়ে গেছে। তাহলে কী সিটি কর্পোরেশন অরক্ষিত?

খোকা : আমাদের ১৫ তলা থেকে কিছু যন্ত্রপাতি খোয়া গেছে। আমরা এ ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করেছি। চোর তো চুরি করবেই। এখানে গার্ড ছিল, তারপরও তো চুরি হয়েছে। এরপর আমাদের যা করার তা করেছি। এখন পুলিশের কাজ সেটা বের করা।

সাপ্তাহিক : নগরীর শোভাবর্ধনের জন্য জোট সরকারের আমলে বিভিন্ন স্থানে শিল্পকর্ম স্থাপন করা হয়েছিল। সেগুলো আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে বলে সমালোচনা হচ্ছে…

খোকা : আমরা চারদলীয় জোট সরকারের আমলে এটা করেছি। শিল্পী মৃণালের নির্দেশনায় ঢাকার অতীত ্ইতিহাস ও ঐতিহ্য শিল্পে ফুটিয়ে তোলার জন্য এটি করা হয়েছে। এতে অতীতের ঘোড়ার গাড়ি, ঢাকায় ইংরেজদের চালচলনও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আসলে এটি হলো দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার।

সাপ্তাহিক : মিন্টো রোডের বাড়িতে আপনার অবস্থান নিয়ে বিতর্ক ছিল…

খোকা : আমি ওখান থেকে এখন সরে গুলশানের বাড়িতে গিয়ে উঠেছি।

সাপ্তাহিক : বর্তমান সরকারের ১০০ দিনের মূল্যায়ন করবেন কীভাবে?

খোকা : ১০০ দিন আসলে কোনো সময় না। এ সরকারের একজন মন্ত্রী নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে সমালোচিত হয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী একটি প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে সমালোচিত হয়েছেন। তবে শুরুতেই এ সরকারকে বড় বড় ঘটনা দেখতে হয়েছে। আরও সময় গেলে বোঝা যাবে এ সরকার কেমনÑএখন বলা যাবে না।