সহধর্মিণীর স্মৃতিতে ভাষাবিদ হুমায়ুন আজাদ

লতিফা কোহিনূর
তিনি তো সারাদিনই পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। তবে সাংসারিক সব বিষয়ে তার ছিল খুব খেয়াল। দায়িত্ববোধটা খুব প্রখর ছিল। ছেলেমেয়েদের খুব যতœ করতেন, ওরাও বাবাকে খুব ভালোবাসত। আমার ওপর বেশি চাপ পড়বে বলে ওদের ছোটবেলায় স্কুলে আনা-নেয়ার কাজটা তিনিই করতেন। আমার মা ছিলেন আমাদের সঙ্গে, মায়ের পান-সুপারি দরকার হলে ঝড়ের রাতেও তিনি বের হয়ে কিনে নিয়ে আসতেন। আমরা সাধারণত বইমেলা শেষ হওয়ার পরদিনই প্রকাশক ওসমান গনির পরিবারসহ কক্সবাজার বেড়াতে যেতাম। খুবই আনন্দের ছিল আমাদের দিনগুলো।

আমার সঙ্গে তার কথা হতো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। উপন্যাস নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে, সাংসারিক খুটিনাটি নিয়ে। তাকে আমার সমস্যাগুলো বলতাম, তিনি সব নিজেই সমাধান করতেন। তিনি যদি আমার প্রতি ওই যতœটুকু না করতেন আমি হয়ত চাকরি করতে পারতাম না। তার অকাল প্রয়াণের পর আমার জীবনটাকে এক ধরনের শূন্যতা গ্রাস করেছে। আমার আশপাশে এত কিছু থাকার পরেও আমার মনে হয় কী যেন নেই। মনে হয় আমার কী যেন হারিয়ে গেছে। এক ধরনের শূন্যতার মধ্যে আমার সময় কাটে। আজ প্রায় পাঁচটা বছর চলে গেল তবুও মনে হয় এই তো সেদিনের কথা, তিনি যেন আমার পাশেই আছেন। আমার প্রতিটা মুহূর্তে মনে হয় হঠাৎ করেই তিনি আমাকে ডাক দেবেন। আমি কোনোভাবেই তাকে ভুলতে পারি না। তারপর যখন মনে হয় তিনি নেই তখন আমার মনটা অসম্ভব শূন্যতায় ভরে ওঠে।

মাঝে মাঝে আমি ভীষণ আনমনা হয়ে যাই। বিশেষ করে অবসরে যখন তার ঘরে আসি, তার বইগুলো দেখি, ছবি দেখি তখন। মনের মধ্যে ভাবনা চলে আসে যদি থাকতেন তবে কি করতেন এখন? তিনি থাকলে আরও কী করতে পারতেন? আরও কী হতো? বিভিন্ন রকম চিন্তা চলে আসে মাথায়। আমার তখন ভীষণ কষ্ট হয়। যে কষ্টটা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

আরেকটা ব্যাপার মনে কষ্ট দেয় তা হলোÑ তার স্মৃতি রক্ষার জন্য কেউ কিছু করছে না। এই যে নতুন সরকার এলো তার একটা গণতান্ত্রিক মনোভাব আছে, তারা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেন, স্বাধীনতার কথা বলেন, তাদের কথা শুনে আমরা ভাবি হুমায়ুন আজাদের হত্যার বিচারটা তাদের দ্বারা হবে এবং তার অবদান স্বীকৃত হবে। তার স্মৃতি সংরক্ষিত হবে। তাকে মর্যাদা দেয়া হবে যথাযোগ্যভাবে। এই যে, স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক দেয়া হয় হুমায়ুন আজাদ কি তা পাওয়ার যোগ্য নয়? বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনি তো বহুমাত্রিক লেখক ছিলেন, এমনকি ভাষা বিজ্ঞানী হিসেবেও তার যে অবদান সেজন্যও তো তিনি একটা পুরস্কার পেতে পারতেন। কে পেয়েছে আমি সেটা বলছি না কিন্তু হুমায়ুন আজাদ তো পেতে পারতেন? আমার খুব খারাপ লেগেছে যখন দেখেছি যে, বিভিন্ন জন বিভিন্ন পুরস্কার পাচ্ছে কিন্তু সেখানে হুমায়ুন আজাদের নাম নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য কোনো কাজ করল না। আমার এখন একটাই স্বপ্নÑসেটাও তাকেই ঘিরে যে, তার যথাযোগ্য মর্যাদা তাকে দেয়া হবে এবং সেটা আমি দেখে যেতে পারব।

http://www.munshigonj.com/MGarticles/HA/2009/LatifaHA.htm