ঢাকার ৪০০ বছর এবং কিছু জানা-অজানা কথা

গোলাম কাদের
ইতিহাসের এক উজ্জ্বল স্থান এখন বাহাদুর শাহ্ পার্ক। কর্তৃপক্ষের অবহেলায় এর গুরুত্ব সৌন্দর্য ভূলুণ্ঠিত। হকার, বাস কাউন্টার, মাদকসেবীদের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে পার্কটি। ঢাকার ৪০০ বছর উপলক্ষে আশা করি পার্কটির প্রতি কর্তৃপক্ষ নজর দেবেন।

আন্টাঘর থেকে আজকের বাহাদুর শাহ্ পার্ক
৪০০ বছরে ছোট ঢাকা এক বিশাল মেগা সিটিতে রূপ নিয়েছে। এই ঢাকায় বহু কীর্তি ও স্থাপত্যের মধ্যে আর্মেনীয়দের বহু কীর্তি কালের সাক্ষী হয়ে আজো টিকে আছে ঢাকার বহু স্থানে। যেমন দিলকুশা বাগানবাড়ি বা গ্রিন হাউস অথবা গভর্নর হাউস পরে বঙ্গভবনের ৮০ বিঘা জমির ভেতর এক টিলার ওপর একটি বাড়ি ছিল ‘মানুক হাউস’ নামে। আজো আছে। আর এই মানুক ছিলেন আর্মেনীয়। সম্ভবত মানুক ব্যবসায়ী বা কোনো কোম্পানির কর্তাব্যক্তি ছিলেন তাই অনেকে আজকের বঙ্গভবন এলাকাকে কোম্পানি বাগান বলে ডাকতেন। তেমনই ঢাকায় আর্মেনীয়দের বহু বাণিজ্য, কুঠি, ইমারত, ধর্মীয় উপাসনালয় ও আমোদ-প্রমোদের জন্য ক্লাব ছিল। আঠার শতকের অন্তিমকালে পুরান ঢাকার জগন্নাথ কলেজের সামনে অবস্থিত বর্তমান বাহাদুর শাহ্ পার্কের স্থানটিতে একটি ছোট ইমারত ছিল। এখানে আর্মেনীয়দের প্রিয় বিলিয়ার্ড খেলা চলতো। যে বল দিয়ে তারা খেলতো পুরান ঢাকাবাসী তখন সেই বলকে বলতো ‘আন্টা’। উনিশ শতকের প্রথমদিকে ইংরেজ ব্যবসায়ীরা এর মালিকানা স্বত্ব কিনে নিয়েছিল। পরে অযতœ-অবহেলায় ক্লাবঘর বিধ্বস্ত হয়ে একটি ময়দানে রূপ নেয়। আর এ থেকেই সাধারণ লোকজন জায়গাটির নামকরণ করে আন্টাঘরের ময়দান।
আন্টাঘরের ময়দান প্রথম আলোচনায় উঠে আসে ১৮৫৭ সালের সংঘটিত ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম তথা সিপাহি বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। কথিত আছে, সে সময় সিপাহি বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে এখানে ইংরেজ শাসকরা বেশ কয়েকজন এ দেশীয় নিরীহ সিপাহিকে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে। স্থানীয় ঢাকাবাসী তৎকালে এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে এবং ভীত ঢাকাবাসী এ এলাকা দিয়ে বহুদিন চলাফেরা একরকম বন্ধ করে দেয়। ফলে এলাকাটি একটি ভৌতিক আবহের সৃষ্টি করেছিল।
১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে এ দেশ থেকে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। ইংল্যান্ডের মহারানী ভিক্টোরিয়াকে ভূষিত করা হয় ইমপ্রেস অফ ইন্ডিয়া উপাধিতে। মহারানী ভিক্টোরিয়ার শাসন ক্ষমতা গ্রহণের ঘোষণাপত্রটি এ স্থানে পাঠ করা হয়েছিল। সেই থেকে এ স্থানটির নামকরণ করা হয় ভিক্টোরিয়া পার্ক।
পরে ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গণি পার্কটি উন্নয়নের চেষ্টা করেছিলেন। বিশেষ করে তার পৌত্র খাজা হাফিজুল্লাহর মৃত্যুতে পার্কের দক্ষিণ দিকে তার ইংরেজ বন্ধুদের সহায়তায় ১৮৮৪ সালে একটি স্মৃতিস্তম্ভ বা স্মৃতিফলক নির্মিত হয়।
১৯৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে পার্কটির উত্তরদিকে শ্বেতপাথর দিয়ে নির্মাণ করা হয় দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিসৌধ এবং সিপাহি বিদ্রোহের নেতৃত্বদানকারী মোগল শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ্ জাফরের নামানুসারে পার্কটির নামকরণ করা হয় বাহাদুর শাহ্ পার্ক। পার্কটি ঘিরে রয়েছে কতগুলো নয়নাভিরাম পামগাছ। এগুলো আনা হয়েছিল জামালপুরের প্রকৃতিপ্রেমী ঈশ্বরগুপ্তের চৈতন্য নার্সারি থেকে। চৈতন্য নার্সারি ঈশ্বরগুপ্ত ১৮৯৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি অন্যান্য প্রজাতির গাছের মধ্যে সংগ্রহ করেছিলেন ২৫৪ প্রজাতির পাম গাছ। ইতিহাসের এক উজ্জ্বল স্থান এখন বাহাদুর শাহ্ পার্ক। কর্তৃপক্ষের অবহেলায় এর গুরুত্ব সৌন্দর্য ভূলুণ্ঠিত। হকার, বাস কাউন্টার, মাদকসেবীদের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে পার্কটি। ঢাকার ৪০০ বছর উপলক্ষে আশা করি পার্কটির প্রতি কর্তৃপক্ষ নজর দেবেন।

ঢাকায় ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ
পলাশী যুদ্ধের পর বাংলায় শুরু হয় এক অরাজক যুগ। ফলে সাধারণ জনগণ অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে পড়ে। জনজীবন দুরবস্থায় নিপতিত হয়। সবসময়ই ফকির সন্ন্যাসীরা সাধারণের দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করেই চলতো কিন্তু তখন অর্থনৈতিক দৈন্যদশা শুরু হলে সাধারণ জনগণ সন্ন্যাসীদের ভিক্ষা আর ফকিরদের খয়রাত প্রদানে অসমর্থ হয়ে ওঠে। ফলে ফকির আর সন্ন্যাসীদের জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। এর সঙ্গে পরে ফকির সন্ন্যাসীদের আরো কিছু অভিযোগ যুক্ত হয়। যেমন কোম্পানি সরকার ফকির সন্ন্যাসীদের তীর্থযাত্রায় বাধা প্রদান করেÑ যে তীর্থযাত্রা ছিল তাদের সুদীর্ঘকালের ধর্মীয় অধিকার। অন্যদিকে লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্তি কার্যক্রম ফকির-সন্নাসীদের অর্থনৈতিক দিক থেকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে। ফকিররা ছিলেন ‘মাদারিয়া’ সুফিধর্মতত্ত্বে বিশ্বাসী। সতের শতকের মধ্যভাগে শাহ্ সুলতান মুরিয়া বুরহানার নেতৃত্বে এ সুফিবাদ বাংলায় প্রসার লাভ করে। অন্যদিকে সন্নাসীরা ছিলেন বৈদান্তিক হিন্দু যোগী ও একদ-ি সন্নাসীবাদের সমর্থক, যারা ‘গিরি’, ‘পুরী’ ও ‘সরস্বতী’ ইত্যাদি শাখায় বিভক্ত ছিল।
হিন্দু-মুসলমান এ সাধকরা ধর্মকে প্রায় অভিন্ন মনে করেন। ফলে তাদের ঐক্য গড়ে তোলার সব বাধার অবসান হয়। ১৭৬০ সালে ফকির-সন্ন্যাসীদের প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়। ফকিরদের নেতা ছিলেন মজনু শাহ ও সন্ন্যাসীদের নেতা ছিলেন ভবানী পাঠক। তাদের কর্মতৎপরতায় সমর্থন দেন নাটোরের রানী ভবানী ও দেবী চৌধুরানী। ফকির-সন্ন্যাসীর আক্রমণের লক্ষ্যস্থল ছিল কোম্পানির কুঠি, কোম্পানির অনুগত জমিদারদের কাচারী ও আবাসস্থল। তাদের আক্রমণ পরিচালিত হতো গেরিলা রণ পদ্ধতিতে। ওই সময় ঢাকাসহ বরিশাল, বগুড়া, ময়মনসিংহ, রংপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, দিনাজপুর, রাজশাহী, জলপাইগুড়ি, পুর্ণিয়া, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, বর্ধমান, বীরভূম, মেদিনীপুর ও যশোর জেলায় ফকির-সন্ন্যাসীদের আক্রমণের তীব্রতা ছিল মারাত্মক। ১৮০০ সাল পর্যন্ত তা চলে প্রায় অব্যাহতভাবে।
ঢাকা জেলায় ফকির-সন্ন্যাসীদের আন্দোলন বা বিদ্রোহ শুরু ১৭৬৩ সাল থেকে। ফকির-সন্ন্যাসীরা ঢাকায় অবস্থিত কোম্পানির বাণিজ্যিক ফ্যাক্টরি আক্রমণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকার ফ্যাক্টরি দখল করতে সক্ষম হন। এদের আক্রমণ এতোই তীব্র ছিল যে ফ্যাক্টরি প্রধান ক্যাপ্টেন রালফ্ লেস্টার প্রাণভয়ে অন্যত্র পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ পরে ক্যাপ্টেন এইচ গ্রান্টকে বেশ কিছু সৈন্যসহ ফ্যাক্টরি উদ্ধারে প্রেরণ করেন। কিছুদিন পর গ্রান্ট জোরালো আক্রমণ করে কিছু ফকির-সন্ন্যাসীকে বন্দি করেন এবং তাদের দিয়েই ঢাকা ফ্যাক্টরি মেরামতের কাজ করান। মেরামতের কাজে থাকা অবস্থায় তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
ঢাকায় পরবর্তী আক্রমণ পরিচালিত হয় ১৭৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এ সময় ঢাকার স্থানীয় প্রশাসন হয়ে পড়ে প্রায় অবরুদ্ধ। ঢাকার প্রধান প্রশাসক মি. কেলসন কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে জানান, ফকির-সন্ন্যাসীরা তাদের যাতায়াতের পথে যে কোনো স্থান থেকেই অর্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম। ১৭৭১ সালের ২৮ মার্চ এক যুদ্ধের মাধ্যমে ফকির-সন্ন্যাসীর হাত থেকে ঢাকা মুক্ত হয়। ঢাকায় ফকির-সন্ন্যাসীদের বড় আক্রমণ পরিচালিত হয় ১৭৭৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। ঢাকা কালেক্টর জানান হনুমানগিরির নেতৃত্বে বহু সংখ্যক বিদ্রোহী সন্ন্যাসী ঢাকার পাকুল নামক স্থানে জড়ো হয় এবং তারা জনৈক জমিদারের গোমস্তা রামলোচন বসুকে অপহরণ করে। এ সময় তারা রামলোচন বসুর কাছ থেকে ৪,২০০ টাকা ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু কোম্পানির সৈন্যবাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ময়মনসিংহের দিক তারা চলে যায়। ঢাকায় ফকির-সন্ন্যাসীদের সর্ববৃহৎ আক্রমণ পরিচালিত হয় ১৭৭৩ সালের মার্চ মাসে। তখন এই দলবদ্ধ আক্রমণে ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ডকে তারা হত্যা করে। এরপর ফকির-সন্ন্যাসীদের বেশ কয়েকটি বিচ্ছিন্ন আক্রমণ পরিচালিত হয় কিন্তু সেগুলোর তীব্রতা তেমন জোরালো ছিল না।
উল্লেখ্য, ফকির সম্প্রদায় অবস্থান করতেন খানকায়, আর সন্ন্যাসীরা অবস্থান করতেন আখড়ায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ফুলার রোড
এফ বি ব্রাডলি বাট বঙ্গভঙ্গের পর নবগঠিত প্রদেশের রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে নতুন জীবনের যে স্পন্দন জেগে ওঠে তা তার রোমান্স অফ অ্যান ইস্টার্ন ক্যাপিটাল (১৯০৬) গ্রন্থে বলেন, ‘ঢাকার জীবনে আজ আবার এক নবজীবনের সূচনা হয়েছে। দুইশ বছর ধরে রাহুগ্রস্ত হয়ে থাকার পর আবার সে রাজধানীর গৌরবময় মর্যাদা লাভ করলো। এককালে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে বঙ্গদেশ গঠিত ছিল। সেখান থেকে পূর্ব বাংলা কেটে হয়েছে ‘পূর্ববঙ্গ আসাম প্রদেশ’। একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের হাতে এর শাসনভার ন্যস্ত হয়েছে। ঢাকায় ইতিমধ্যে পুনরুজ্জীবনের আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর আকাশ-বাতাসেও যেন আজ প্রাণের প্রবাহ-জাগরণের সাড়া।
এ প্রাচীন বাদশাহী নগরীর অপূর্ব প্রাণস্পন্দনে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে। সামরিক কর্মচারী, সরকারের অপরাপর কর্মচারী এবং অফিস-আদালতের জন্য নতুন নতুন ইমারত গড়ে উঠেছে। এতোদিন যে নগরী নিস্তেজ ও নির্বীর্য হয়ে পড়েছিল আজ তার প্রতিটি ধমনিতে, শিরা-উপশিরায় রক্তের চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে, জীবনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এই নগরীতেই এখন থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে অন্তত তিন কোটি মানুষের ভাগ্য, তাদের জীবন-মরণের সঙ্গে জড়িত সব গুরুতর সমস্যার বিচার হবে এখানে বসে।’
নতুন প্রদেশের রাজধানী হয় ঢাকা। গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হয় শিলং। আর বন্দরনগরী হয় চট্টগ্রাম। আর নতুন প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর নিযুক্ত হন স্যার জোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলার। ফুলার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন ১৯০৬ সালের জানুয়ারি মাসে। প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলারের কার্যকাল খুব একটা সুখের ছিল না। তিনি তার নয় মাসের দায়িত্বকালে হিন্দু-মুসলিম বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। তার সময় বিলাতি দ্রব্য বর্জন, স্বদেশি ও ছাত্র-শিক্ষক আন্দোলন শুরু হয় এবং গণবিরোধী কিছু সার্কুলার জারি করেন তিনি। আর এর বিরুদ্ধে ‘অ্যান্টিসার্কুলার সোসাইটি’ গঠিত হয়। এমনকি তিনি ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ফুলার নয় মাসের দায়িত্ব পালনকালে প্রদেশের বিভিন্ন ঘটনায় নিজেকে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করেন। স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার ঢাকা ত্যাগ করেন ৭ আগস্ট ১৯০৬। তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। এর মধ্যে স্টাডিজ অফ ইন্ডিয়া (১৯১৩), লাইফ অ্যান্ড হিউম্যান নেচার (১৯১৪), সাম পার্সোনাল এক্সপেরিয়েন্সেস (১৯৩০)। ১৯৩০ সালের ২৯ নভেম্বর ফুলার মারা যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তার নামে ফুলার রোড তার স্মৃতি বহন করে চলছে। বৃটিশ কাউন্সিল সংলগ্ন রোডটিই ফুলার রোড।

হরনাথ ঘোষ রোড কবির নামে সড়ক
‘সৌভাগ্যের দ্বার খোলা অনিবার/আছে সকলের তরে/ উদ্যোগী যে জন কর্মপরায়ণ/ প্রবেশিতে সেই পারে।’ হরনাথ ঘোষ পেরেছিলেন। তিনি উদ্যোগী পুরুষই ছিলেন। তিনি তার সাহিত্য দিয়ে অমর হয়ে আছেন। শুধু সাহিত্যকর্ম নয়, বাংলা ভাষার জন্য কাজ করে গেছেন নিরন্তর। তিনি পাঠ্যপুস্তক, গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক লিখে অবিভক্ত বাংলায় সুনাম কুড়িয়েছিলেন। তার লিখিত বই তৎকালে অবিভক্ত যুক্ত বাংলায় আটাশটি জেলার স্কুলে ও পাঠশালাগুলোতে পড়ানো হতো। তার লিখিত সরকার কর্তৃক অনুমোদিত বইসমূহ : পাঠশালা সাহিত্য (প্রথম হতে চতুর্থ ভাগ), প্রবন্ধ পরিহাস (প্রথম হতে তৃতীয় ভাগ), সন্দর্ভসার, অমিয় কথা, শিক্ষা মঞ্জুরী, শিক্ষা মুকুল, কবিতাসন্দর্ভ, উপদেশমালা, পদ দলিল শিক্ষা, ব্যাকরণ, পাঠশালা ব্যাকরণ, রচনা পদ্ধতি, রচনা পুস্তক, স্কুল অভিধান ইত্যাদি বই, কোমল সাহিত্য, প্রবন্ধ তালিকা।
হরনাথ ঘোষ বিক্রমপুরের লৌহজং থানার দুয়াল্লী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। দুয়াল্লী এখন পদ্মাগর্ভে বিলীন জনপদ। হরনাথ ঘোষ বাংলা ১২৭১ সালের ১১ ভাদ্র জন্মগ্রহণ করেন। ১৩৪৭ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসে ৭৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। শিক্ষা বিস্তারে উৎসাহী এ জ্ঞানী পুরুষটিকে সম্মান দেখানোর জন্য তার নাম অনুসারে ঢাকা পৌরসভা একটি রাস্তার নামকরণ করেছে ‘হরনাথ ঘোষ রোড’। পুরান ঢাকার হরনাথ ঘোষ রোড তারই স্মৃতি বহন করে। হরনাথ ঘোষের অন্য একটি কবিতার অংশ : ‘নশ্বর জগতে দেখ সকলি ফুরায়/ সহায় সম্পদ যত/ সকলি ক্ষণিক আহা চপলার প্রায়।/ এই দেহ যাহে তুমি এত যতœবান/ নিশ্চয় জানিও মনে/ মিশিবে ধুলির সনে,/ না রহিবে চিহ্ন তার বিধাতৃ বিধান।/ সকলি চূর্ণিত হবে সময়ের কবলে,/ মরেও মরে না তারা,/ কীর্তি প্রভা চিরদীপ্ত রহে মহীতলে।’
হরনাথ ঘোষ অমর হয়ে আছেন তার কীর্তির জন্য। আর হরনাথ ঘোষ রোড সেই স্মৃতি বহন করছে।
গোলাম কাদের: সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সংগঠক।