কল্যাণ-মিত্রকে অনুসরণ করুন

গোলাম কাদের
দেশ-জাতির স্বার্থে এ মুহূর্তে নানা বিতর্ক সৃষ্টি না করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কল্যাণ-মিত্রদের অনুসরণ করবেন বলে আমার বিশ্বাস। তার সেই নেতৃত্বের ধৈর্য ও গুণাবলী বিদ্যমান। বিশেষ করে কল্যাণ-মিত্রদের চেনার ক্ষমতা তার ভেতর রয়েছে। তার নিষেধ সত্ত্বেও নিজ দলের, অঙ্গদলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে যারা তাদের তো আর তিনি তার কল্যাণ-মিত্র বলতে পারবেন না। কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে কল্যাণ-মিত্র বাইরে এবং ঘরে অতীব জরুরি। অরাজকতাকে কঠোর হস্তে দমন করে সে চেষ্টাই করুন।

কথা কম কাজ বেশি। হুমকি ধমকি দিয়ে অরাজকতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে মানুষের কল্যাণে, জাতি-গোষ্ঠীর কল্যাণে নতুন সরকার কাজ করবে এটাই জাতির প্রত্যাশা। ২৫ হাজার কোটিপতির শুধু ভালো দেখলে চলবে না। তৃণমূল পর্যায়ে নিরন্ন মানুষের যাপিত জীবন, লাখো মানুষ যারা ফুটপাতে ঘুমায়, একবেলা খায় তো দুবেলা খেতে পায় না সেই ভাগ্যাহত মানুষসহ মধ্যবিত্তের হাহাকার যদি সরকার আমলে না এনে শুধু বিরোধী পক্ষকে কনুইয়ের নিচে চেপে ধরা পন্থা অবলম্বন করে তাহলে কল্যাণ রাষ্ট্র কারা করবে?
নিগৃহীত লাখো-কোটি মানুষ যারা কল্যাণ রাষ্ট্রের আকাক্সক্ষা নিয়ে নতুন সরকারকে অভিসিক্ত করেছে, তারা দিনবদলের ডাক দিয়েছে, তাদের ডাকে মানুষ সাড়া দিয়েছে কিন্তু কারা দিন বদল করবে সেই সঙ্গী সাথি যারা তাদের তো মন বদল হয়ইনি, মন বদল না হলে দিন বদল হবে কেমন করে? মুখও বদল হয়নি! অর্থাৎ মুখ ও মনন তো ডিজিটাল উপযোগী হয়নি।
সর্বত্রই যেন চলছে স্থবিরতা, হাহাকার, শঙ্কা, বিশেষ করে চোরাচালান বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত কেন, উচ্চবিত্ত অনেক ব্যবসায়ী মাথায় হাত দিয়ে বসেছে। সুতা, ডিম, দুধ, নিম্নমানের সারে বাজার সয়লাব। এমনিতে কৃষক ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায়। সার, কীটনাশক, ডিজেল ধরাছোঁয়ার বাইরে। পাট, সুতা তাঁত, আলু ও পোলট্রি শিল্প নিয়ে চলছে নানারকম ষড়যন্ত্র। গার্মেন্ট শিল্প নিয়ে ষড়যন্ত্রের শেষ নেই। কৃষকের নাভিশ্বাস তো আগেই উঠে আছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিংয়ে জীবন এখন ওষ্ঠাগত। নতুন যোগ হতে যাচ্ছে পানি সমস্যা। সব ক্ষেত্রেই চলছে তুঘলকি কা-। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অলস টাকা পড়ে আছে। কলমানির সুদের হার পড়ে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবিরতা। সময় বয়ে যায়। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
পাঁচ বছর অনেক সময়। অনেক তর্ক করা যাবে। অনেককে কিল, গুঁতা, কনুইয়ের নিচে রাখা যাবে এখানে তড়িঘড়ির কিছু নেই। বিরোধী দল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কোনো কর্মসূচি দেয়নি বরং বিরোধী দলকে লেজুড় কেটে দেয়ার অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে। এতো ভয় কিসের? দুঃখজনক হলো, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সরকারের কূটকৌশল প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে, জনগণ অতি দুঃখে পাথর হয়েও হাসছে। আমাদের জনগণ সবচেয়ে বেশি সমঝদার এটা ভুললে চলবে না। সরকারের জন্য জনবিচ্ছিন্নতা একটি খারাপ দিক। সরকারে যারা আছেন তারা কার্যকরভাবে তেমন কিছু করতে পারছেন না, যা-ও করছেন নিজ নিজ এলাকার জন্য বেশি বেশি করছেন। আগে যারা নিজ এলাকার জন্য তদবির করতেন এখন তো তারাই ক্ষমতাবান। আগে নিজের লোকদের এবং এলাকার কাজকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। সমভাবে, সমবণ্টনের ভিত্তিতে দেখছেন না।
এখন চলছে সময় ‘রাজার দেশে আমরা সবাই রাজা’ এ মনোভাব। কেউ কারো কথা রাখছে না। একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অবাক হয়ে চেয়ে দেখি, যে মুক্তিযোদ্ধা নয় সেও বলছে আমি মুক্তিযোদ্ধা। যে জন্মগ্রহণ করেছে মুক্তিযুদ্ধের সময়, যার নাম মুক্তি, বিপ্লব, স্বাধীন তারা মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট নিয়ে বড় বড় পদ দল করে আছে। নতুন সরকার এলেই মুক্তিযোদ্ধাদের নতুনভাবে যাচাই-বাছাই এবং নতুন তালিকা তৈরির কাজ চলে। এভাবে কতোকাল চলবে? নব্য মুক্তিযোদ্ধারা বড় বড় সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে, বড় বড় বক্তৃতা দিচ্ছে। মনে হয় হঠাৎ করে ১৫ কোটি মানুষ মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছে, তাদের সবাইকে সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। ‘একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’Ñ আমাদের এ মনোভাব কি ব্যর্থ হয়ে যাবে? হ্যাঁ এখন এই ১৫ কোটি নতুন মুক্তিযোদ্ধাকে দেশের জন্য কাজে লাগাতে হবে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে কর্মসূচি নিতে হবে। নতুন মুক্তিযুদ্ধ অর্থনৈতিক মুক্তির যুদ্ধে শরিক হতে হবে। এ যোগ্য নেতৃত্ব দেশ-জাতি আশা করে নতুন সরকারের কাছে। হল দখল, টেন্ডার ভাগাভাগি, খুন-সন্ত্রাস, রাহাজানি এগুলো থেকে মানুষ মুক্তি চায়। মুক্তিযোদ্ধারা এগুলোতে সম্পৃক্ত হতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মও এগুলো করতে পারে না।
বিগত সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের পরও কীভাবে দেশে এক বছরে চার হাজার কোটিপতি সৃষ্টি হলো এগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। ২৭ মাসের অনিয়মগুলো, সৃষ্ট ক্ষতগুলো খুঁজে বের করতে হবে। দেশের ভাবমূর্তি নষ্টের মূলে যারা সেই উচ্চাভিলাষী টাইকুনদের আগে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
তাদের আড়ালের অপচেষ্টা জনগণ ভালোভাবে নেবে না। কার্যকরভাবে জঙ্গিবাদ দমনে চেষ্টা চালাতে হবে, ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা কেউ যেন না করে। আগে দেশ-জাতি। জাতিরাষ্ট্র এবং সর্বোপরি কল্যাণ রাষ্ট্রের গুণাবলী সরকারকেই সৃষ্টি করতে হবে। বিশেষ করে যার যার অবস্থান থেকে দেশ-জাতির কল্যাণে কাজ করতে হবে। কিন্তু এখন এমন এক সময় অতিবাহিত হচ্ছে যার যার অবস্থান থেকে সবাই অরাজকতা সৃষ্টির প্রয়াস পাচ্ছে এজন্য সরকারকেই কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কল্যাণ-মিত্রকে খুঁজে নিতে হবে। ভালোমন্দ সরকারকে খুঁজে বের করতে হবে এবং কল্যাণ-মিত্রকে অনুসরণ করতে হবে। কল্যাণ-মিত্রের অনুরসণের বিকল্প নেই। আর কল্যাণ-মিত্র অবশ্যই পরামর্শ দেবে যে কাজটি প্রথম করার কথা সেই কাজে মনোযোগী হওয়া। সর্বগ্রাসী ও সর্বব্যাপী হাত নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লে হবে না। প্রয়োজনীয়, অতীব গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোই আগে করতে হবে বিশেষ করে জনগুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আগে সমাধা করতে হবে।
চাটুকার-মোসাহেবিরা থাকবে, তাদের চেনার ক্ষমতা থাকতে হবে। চাটুকার আর মোসাহেবিরাই অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে সময়মতো উধাও হয়ে যাবে। ক্ষমতায় এসেই প্রধানমন্ত্রী নব্য আওয়ামী লীগারদের চিহ্নিত করতে বলেছিলেন। আমি মনে করি নব্য মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করা আরো জরুরি। দেশ-জাতির স্বার্থে এ মুহূর্তে নানা বিতর্ক সৃষ্টি না করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কল্যাণ-মিত্রদের অনুসরণ করবেন বলে আমার বিশ্বাস। তার সেই নেতৃত্বের ধৈর্য ও গুণাবলী বিদ্যমান। বিশেষ করে কল্যাণ-মিত্রদের চেনার ক্ষমতা তার ভেতর রয়েছে। তার নিষেধ সত্ত্বেও নিজ দলের, অঙ্গদলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে যারা তাদের তো আর তিনি তার কল্যাণ-মিত্র বলতে পারবেন না। কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে কল্যাণ-মিত্র বাইরে এবং ঘরে অতীব জরুরি। অরাজকতাকে কঠোর হস্তে দমন করে সে চেষ্টাই করুন।

গোলাম কাদের: সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলাম লেখক ও সংগঠক।